উপ সম্পাদকীয়

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০১-২০১৮ ইং ০১:৫০:৩৩ | সংবাদটি ১২৫ বার পঠিত

এখন প্রভাত। ফজরের নামাজ অন্তে দূরের কোন এক মসজিদ থেকে উচ্চ নিনাদে ভেসে আসছে কোন এক অজানা মানুষের প্রয়ানের সংবাদ। মনটাকে বিষাদে আচ্ছন্ন করে দেয়। আবার যেন ধাক্কা দিয়ে জানিয়ে দেয় জন্মগ্রহনের সাথে সাথে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার নিশ্চয়তাসূচক বার্তাটি এবং ঘোষিত বার্তাটি সেটিরই বহি:প্রকাশ। আমার মতো সকল জীবিতরাই সেটি শুনে আবার শেষ মুহূর্তের কথাটি স্মরণ করে বিহ্বল হয়ে পড়েন। নিরেট বাস্তবতা আবার জাগতিক বিশ্বের দুর্বার আকর্ষণ নতুবা অতি আয়েশের জীবন সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। প্রায় প্রত্যেকেই ভাবেন আমি কি আর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবো! আমাকে অনেক কিছু পেতে হবে। অট্টালিকা থেকে শুরু করে হেন বস্তু নাই যা আমি চাইনা। আমি যে কোন মূল্যে সে গুলি অর্জন করবো আর দিনাতিপাত করবো মহাসুখে অনন্তকাল ধরে। আমার সৃষ্টিকর্ম দেখে সকলেই বাহবা বাহবা বেশ বেশ বলবেই। অতি বাস্তবতা হলো এই জাতীয় ধ্যান ধারনার বশবর্তীদেরও মৃত্যুর মতো পরিণতি বরণ করে নিতে হয় আর তার পারলৌকিক ক্রিয়াদী সম্পন্ন করার পর আপনজনরা তার লালিত স্বপ্নটির কথাই পূনরুচ্চারণ করেন এই বলে যে প্রয়াত ব্যক্তিটি বেঁচে থাকবেন তার কর্মে, তার গড়ে তোলা বিভিন্ন স্থাপনায়। আসলে কি তাই। মৃত্যু একটি অমোঘ বাস্তবতা আর এটি মুছে দেয় একজন ব্যক্তির ইহলৌকিক সকল উপস্থিতি, হোক সেটা তার বানানো নানা কীর্তি বা অন্য কোন ভাবমূর্তিগত অবস্থান।
এতো নিরেট বাস্তবতা, এতো দৃষ্টান্ত তারপরও বেশির ভাগ মানুষই অমর হয়ে থাকতে চায়। যারা বিচ্যুত হয়ে পড়ে তাদেরকে অপোগন্ড নতুবা অকালকৃষ্মান্ড হিসাবে আখ্যায়িত করেন অন্যরা অর্থাৎ যারা বাস্তবতার নিরীখে অমরত্ব লাভ করতে নিরন্তর বুদ্ধি খাটিয়ে চলেছেন। যারা ইতিহাসে স্থান লাভ করেছেন তারা কখনো দৌড়ান নাই জাগতিক বিত্ত বৈভবের দিকে বরং তারা সময় ব্যয় করেছেন সৃষ্টিশীলতা আর মানবপ্রেমের বারতা পৌঁছে দিতে। বর্তমান জামানায় কার কি আছে, সম্পদ লাভে কতোটুকু সমর্থ হয়েছে সেটি নিয়েই সকলে ভাবিত। দাড়ি পাল্লায় মেপে মেপে ওজন করা হচ্ছে কতোটুকু সাফল্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি লাভ করতে পেরেছেন আর সাফল্যের স্বীকৃতি কতোটুকুইবা তার প্রাপ্য।
জাগতিক প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে অনেকেই পিছপা হন না। যে কোন মূল্যে সকল বাধা অতিক্রম করতে চান। নিষ্ঠুরতা, অনৈতিকতা থেকে শুরু করে একেবারে গুম, খুন পর্যন্ত সবকিছুই কবুল তারপরেও আমার সোনার হরীণ চাই। দুগ্ধ ফেননিভ শয্যায় শুয়েও চোখ নিদ্রালু হয় না কারণ বস্তুগত সাফল্য লাভ নিশ্চিত করলে পন্থা নির্ধারণে আর সম্ভাব্য বাধা অপসারণে শক্তি, বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজনে পশু প্রবৃত্তির প্রয়োগ প্রভৃতির মূলুক সন্ধান করতে করতেই। নিজ গৃহের শয্যাটি ছেড়ে কোন মুহূর্তে যে শেষ শয্যা দৃষ্টির আড়ালে মাটির ঘরে ¯্রফে একটি কাপড় ঢাকা প্রাণহীন দেহখানি লয়ে যেতে হবে সেটি ভাবনায় আনতে সকলেই গররাজী। মৃত্যু আসলে দেখা যাবে। এটিই মোক্ষ।
এত কিছুর পরও আমরা আমাদের উৎপত্তি কর্মপ্রবাহ আর সমাপ্তি কোন জায়গা আর কি নিয়ে শেষ যাত্রা সে ভাবনায় যেতে চাইনা। কি পেলাম আর কোনটা হারালাম সেই ভাবনায় দেহমন ক্লান্ত করে ফেলি। আরও পেতে হবে তাই জীবনপাত করতেও রাজী। নিজের বিবেক বুদ্ধি আর মানবিক গুনাবলী সমূহও বিসর্জন দিতে পিছপা হতে গররাজী। যাই ই পাইনা কেন আমাদের কিছু না কিছু যে দিতে হবে সে ভাবনার অবকাশটুকু আমরা পাই না নতুবা পেতেও চাইনা। মৃত্যুর পরে জানাজার নামাজে কতোজন মানুষ উপস্থিত হলো সেটা নিয়ে উত্তর পুরুষরা গল্পে গল্পে মাতোয়ারা হন আর সম্পদ কতটুকু রেখে গেলেন সেটা নিয়ে ভাবনায় মশগুল হতে পছন্দ করেন এমনকি রক্তারক্তি কান্ড ঘটাতে পিছপা হন না অনেক ক্ষেত্রে।
এই সেদিন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাহেবের জীবনাবসান ঘটেছে। তিনি আজ বিগত কিন্তু তার কর্ম কূশলতা আর নবপ্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর প্রয়াস নিয়ে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। স্বল্প সময়ে অনুরূপ কর্মকে সাধনার বাস্তবরূপই বলতে হবে। অনুরূপভাবে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দীন সাহেবেরও প্রয়ান ঘটেছে। তিনিও তার নগরবাসীর কাছে কতোটুকু প্রিয়পাত্র ছিলেন তার প্রকাশ ঘটেছে মৃত্যু পরবর্তী ঘটনাবলীতে। কর্ম বেঁচে থাকে কথামালা আর ক্ষমতা আকড়ে থাকার যোগ্যতা কখনোও বিবেচিত হয় না। নিজের জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্ব ভুলে গিয়ে এতো সালের মধ্যে এটা করবো আর এতো সালের মধ্যে সাধারণ মানুষের অবস্থানগত পরিবর্তন এই মাত্রায় নিয়ে যাব জাতীয় প্রতিজ্ঞা শুধুই কল্পনার ফানুস হিসাবে বিবেচিত হয় সাধারণ মানুষের কাছে। কারণ যাদের জন্য এতো কিছু বলা হচ্ছে তারা কিন্তু যাপিত জীবন নিয়েই ত্যাক্ত বিরক্ত। অধিক সংখ্যকই কাঙ্খিত সেই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জিত হওয়া পর্যন্ত বেঁচে না থাকারই কথা। তার পরেও সুন্দর সুন্দর কথামালা আর স্বপ্নের রঙিন ফানুস কার না ভালো লাগে।
আজ মানুষ নিজ জীবনের নিরাপত্তা চায়। সংবাদপত্র খুললেই যদি খুন, গুম এর সচিত্র বিবরণী চোখে পড়ে আতংক জাগাবেই। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক সাহেব অহরহ বলেই যাচ্ছেন তার পুলিশ বাহিনীটি জনগণের বন্ধু। তার কথা এবং বাস্তবতা যে ভিন্ন সেটির নজীর আমি নিজেই প্রত্যক্ষ করলাম বিগত সাতাশে ডিসেম্বর বুধবার বেলা ঠিক একটায়। সিলেট গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ঠিক সম্মুখে। উল্লেখিত থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং একজন অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তার আচরণে। একটি জানাজা অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্য সিলেটের একজন অতি সম্মানিত  ও বিশিষ্ট ব্যক্তি সপরিবারে যাচ্ছিলেন আপন গাড়িটিতে। ওয়ারেন্টভূক্ত আসামীর মতো আচরণ কথা হয় আরোহীদের গাড়ীটির চালকের সাথে। এমনভাবে বাহনটিকে আটকানো হয় যা  ছিল আপত্তিকর আবার কাগজপত্র ঠিকঠাক পাওয়ার পরও চালকটিকে নামিয়ে নিয়ে তার লাইসেন্স রেখে দেন। জানাযার নামাজ এর সময় আসন্ন, আরোহী ব্যক্তিটির সামাজিক মর্যাদা কোনকিছুই আমলে নিতে রাজী নন। রক্তচক্ষু, দুর্বিনীত আর নিষ্ঠুর আচরণের মূর্থপ্রতীক বললে বোধ হয় ভুল বলা হবে ওই পুলিশ কর্মকর্তাটির ব্যাপারে। বিশেষ অনুরোধে লোকটির নামটি উল্লেখ করা থেকে বিরত রইলাম। গাড়িটি ব্যক্তিগত, জানাজার নামাজের সময় যায় যায় কিছুই তিনি মানলেন না। ফলশ্রুতিতে জোহরের জামাতটি বাদ গেল আবার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সাথে যোগাযোগ এর মাধ্যমে এই তথাকথিত জনগণের বন্ধুটির কবলমুক্ত হওয়া গেল ওই বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পরিবারটির। আল্লাহর মেহেরবানীতে উর্ধতন কর্তাটির বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তাই। অন্যদিকে বিচার্য বিষয় হলো কিভাবে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি পরিবার সহ নাকানি চুবানি খেলেন অন্যদিকে সাধারণ একজন নাগরিককে কিভাবে এ জাতীয় জনগণের বন্ধু পুলিশ কর্মচারীদের হাত থেকে মুক্ত করা যাবে! সেটি ভাবনার খোরাক জোগায়।
ভাবনার বিষয় বৃহত্তর ক্ষেত্রেও রয়েছে বিস্তর। রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয়ী মেয়র সাহেব জেনারেল এরশাদ সাহেবের দলীয় ও আশীর্বাদ পুষ্ট একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তার দলের প্রার্থী ছিলেন। ক্ষমতাসীন দলটি ইস্পিত ফললাভ এ যৎপরোনাস্তি আনন্দ লাভ করেছেন কারণ জেনারেল এরশাদ দলটির চারিদিকের শূন্যতা পূরণ করে রেখেছেন। বর্তমান সরকারের মন্ত্রিপরিষদে যেমন তিনি বা তার দল রয়েছে তেমনি রয়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলের আসনে। আবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসাবে জেনারেল এরশাদ সাহেব সকল সুবিধা ভোগ করেই চলেছেন। বিদেশে চিকিৎসা লাভ করছেন সরকারী কোষাগারের লাখ লাখ ডলার মূল্যমানের অর্থ ব্যয় করে। দেশাভ্যন্তরেও হেথঅহোথা ভ্রমণ করে চরেছেন সরকারী ব্যয়ে এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মর্যাদায়। বেগম রওশন এরশাদ আবার রয়েছেন সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রীর ভূমিকায়। এখানে গাছেরটা আর তলেরটা খাওয়ার উপমাটি দিলে বোধ হয় কম বলা হবে। আমার জ্ঞান ভান্ডারে আর কোন উপমা না থাকায় ভাষার বাহুল্য বাড়াতে পারছিনা বলে দুঃখিত। তারপরেও বলবো খেলারাম খেলে যা নীতিটা শতভাগ যেন কার্যে রূপায়িত হয়েছে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। জানিনা আর কি দেখতে হবে অনাগত বা নিকট ভবিষ্যতে!
লেখক : অধ্যক্ষ, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রবীণদের যথাযথ মূল্যায়ন কাম্য
  • ইতিহাসের একটি অধ্যায় : প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান
  • সড়কে মৃত্যুর মিছিল কি থামানো যাবে না?
  • স্বাস্থ্যসেবা : আমাদের নাগরিক অধিকার
  • কে. আর কাসেমী
  • আইনজীবী সহকারী কাউন্সিল আইন প্রসঙ্গ
  • শিক্ষা হোক শিশুদের জন্য আনন্দময়
  • ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ও সৌদি আরব
  • শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত
  • ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা
  • সুষ্ঠু নির্বাচন ও যোগ্য নেতৃত্ব
  • জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • মূর্তিতেই দুর্গা : বিশ্বাসের বিষয় তর্কের নয়
  • শিক্ষার্থীর মনোজগৎ বিকাশে কার কী ভূমিকা
  • দুর্গের কর্তা দেবী দুর্গা
  • Developed by: Sparkle IT