উপ সম্পাদকীয়

মরণনেশা ইয়াবার আগ্রাসন

ডাঃ মাওঃ লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০১-২০১৮ ইং ০১:৫৩:৪৬ | সংবাদটি ১০৮ বার পঠিত

আমাদের দেশে কিছুতেই দমানো যাচ্ছে না মরণনেশা ইয়াবার আগ্রাসন। তালিকার পর তালিকা করেও ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ আনতে পারছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। অলিগলিতে বিক্রি হচ্ছে মরণনেশা ইয়াবা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রিকশা ও ভ্যানচালকেরা জড়িয়ে পড়েছে মরণনেশা ইয়াবার আগ্রাসনে। সম্প্রতি দেশে আলোচিত ১০টি হত্যাকান্ডসহ নারকীয় অপরাধের শতাধিক ঘটনার কারণ ইয়াবা আসক্তি। গলা কেটে হত্যা, ছিনতাইকারীর হাতে রাজপথে শিশুখুন, স্ত্রীকে হত্যার পর স্বামীর আত্মহত্যা-এ ধরনের বর্বরোচিত অপরাধের ঘটনা একের পর এক ঘটছে আমাদের দেশে। জানা গেছে, এসব পৈশাচিক অপরাধের নেপথ্য কারণ হলো, ভয়াবহ মাদক ইয়াবার প্রভাব।
একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম, মাদকাসক্তির দরুন কেবল গত এক বছরেই দেশে ঘটে গেছে দুই শতাধিক হত্যাকান্ড। চুরি ও চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও হত্যার মতো অপরাধেও ইয়াবাসেবী এবং এই মাদকের ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে জড়িত। অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ঢাকা মহানগরীতে সংঘটিত ১০টি হত্যাকান্ডসহ সব ক’টি বড় অপরাধে জড়িত দুর্বৃত্তরা ইয়াবা সেবনকারী। অনেকের মতে, এবার সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি হলো ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীর দয়াগঞ্জে ছিনতাইকারী এক নারীর ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দিলে কোল থেকে পড়ে তার ৬ মাসের শিশুর করুণ মৃত্যু। এ ঘটনার হোতা ইয়াবা ও হেরোইনের মতো মাদকে আসক্ত। পুলিশের কাছে সে স্বীকার করেছে, মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতেই বেপরোয়া হয়ে ছিনতাই করেছে। ইয়াবার প্রভাবে তার ঘুম হয় না। ১৫ ডিসেম্বর মহাখালীর একটি বাড়িতে ৮০ বছরের অসুস্থ স্বামীর সামনেই তার বৃদ্ধা স্ত্রীকে গলা কেটে খুন করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক তিন তরুণের সবাই ইয়াবায় আসক্ত। ওরা সারা রাত ওই বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করে সকালে ঘরে ঢুকে এই হত্যাকান্ড ঘটিয়ে লুট করে পালায়। ৮ অক্টোবর সকালে টিকাটুলির রাস্তায় ছিনতাইকারী বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র তানহাকে হত্যা করেছে। সংশ্লিষ্ট আসামি দু’জন ইয়াবাসেবী বলে পুলিশ জানায়। ১৭ ডিসেম্বর শুক্রাবাদে এক প্রকৌশলীর লাশ পাওয়া যায় । এই হত্যাকান্ডে ইয়াবার বেআইনি কারবারিরা জড়িত বলে জানাগেছে। এ দিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, দেশে ইয়াবা আসক্তর সংখ্যা  বাড়ছে।
২০১৫ সালের চেয়ে এদের সংখ্যা বেড়ে দেড় গুণ হয়ে গেছে এক বছরেই। চিকিৎসা করা হয়েছে, এমন মাদকসেবীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ইয়াবা সেবন করে থাকে। এরা বেশি বিপজ্জনক এবং বয়সের দিক থেকে প্রধানত তরুণ ও তরুণী। এদের কারণে ঘরে-বাইরে সর্বত্র অশান্তি ও অপরাধ ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে, ওরা প্রতিদিন নেশা করার টাকা না পেলে মা-বাবাকে মারধর এবং ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। কেউ কেউ নেশার টাকা না পেলে  নিজের ভাই-বোনকে অপহরণ এবং মা-বাবার কাছে মুক্তিপণের টাকা চাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কলেজশিক্ষার্থী তার লেখাপড়ার খরচের টাকা দিয়ে গাঁজা ও ইয়াবা কিনে পুরো মাদকাসক্ত হওয়া এবং পড়ালেখা ছেড়ে দেয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। এদের কেউ কেউ ঘরের জিনিসও চুরি করে নেশার খরচ জোগাড় এবং প্রায়ই কয়েক দিন থাকে লা-পাত্তা। পরিবারের মানহানির ভয়ে মা-বাবা এসব গোপন রেখে মাদকাসক্ত সন্তানের নেশার ব্যয় বহনে বাধ্য হচ্ছেন। পুলিশ -র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকতারাও মনে করছেন এ মুহূর্তে ইয়াবা ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হলে যুব সমাজ আরো ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক বলেছেন, ‘মাদকাসক্তরা অপরাধপ্রবণ হয়ে থাকে।
মাদক হলো ‘অপরাধের জননী’। বিশেষত ইয়াবা সেবনকারী নিজেকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ফলে তারা হত্যা ও নির্যাতনের মতো অপরাধে জড়িয়ে যায়।’ গত কয়েক দশকে এ দেশে মাদক সেবনের প্রবণতা এবং এর প্রভাবে নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা অনেক বেড়েছে। এর পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের অনুপ্রবেশ এবং এর অবৈধ ব্যবসায়। এদিকে, মাদকাসক্তির মরণনেশায় তরুণ সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। যাদের জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার হওয়ার কথা, তাদের এহেন পরিণতি দেখে বোঝা যায়, আগামী দিনে সমাজের অবস্থা কী দাঁড়াবে। এ মুহূর্তে মরণনেশা ইয়াবা ও মাদকের ভয়াল আগ্রাসন রোধের কোনো বিকল্প নেই। মাদকাসক্তের চিকিৎসার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো, এই প্রবণতার শিকার যাতে কেউ না হয়, সে লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া। এ জন্য গণসচেতনতার মাধ্যমে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজ নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। দেশে মাদকের অনুপ্রবেশ, উৎপাদন, মজুদ, সরবরাহ, বিক্রিসহ এর ব্যবসায় ও সেবনের সব পথ কঠোরতার সাথে অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি। এ জন্য আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার। এ ব্যপারে দ্রুত কিছু না করলে সামনে সমূহ বিপদ।
লেখক : চিকিৎসক-কলামিস্ট।
 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সাংহাইর সর্বোত্তম বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন
  • মাদক ও তরুণ প্রজন্ম
  • নির্বাচনের গুরুত্ব ও ভোট
  • প্রাথমিক শিক্ষার গবেষণাধর্মী বই
  • কেমন মেয়র চাই
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • প্লাস্টিকের ভয়াল থাবা
  • আব্দুল¬াহ আল মাহবুবশিক্ষার্থীর বিকাশে পরিবারের ভুমিকা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেয়া হোক
  • সিলেটের ডাক
  • নারীর প্রতি সহিংসতা প্রসঙ্গে
  • সিলেটের ডাকের শিশুমেলা
  • সবুজ প্রবৃদ্ধির কৌশল : পরিবেশ-প্রতিবেশ
  • এরদোগানের শাসনে তুরস্কের ভবিষ্যৎ
  • বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং নদী রÿার্থে করণীয়
  • পয়ত্রিশ বছরে সিলেটের ডাক
  • আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকব?
  • Developed by: Sparkle IT