উপ সম্পাদকীয়

যুগনায়ক বিবেকানন্দ

সুব্রত কান্তি দাস প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০১-২০১৮ ইং ০১:৫৫:০৫ | সংবাদটি ২৬ বার পঠিত

মানবতার কল্যাণে যুগে যুগে যাঁরা কাজ করে গেছেন, তাঁদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ অন্যতম। আচার-সর্বস্ব অধ্যাত্মবাদের বেড়াজাল থেকে মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ এক পথিকৃত। দর্শনের ছাত্র ছিলেন তিনি। জীবনের খেয়া পাড়ি দিতে সময় পেয়েছেন মাত্র সাড়ে-ঊনচল্লিশ বছর । তাঁর নাতিদীর্ঘ জীবন থেকে মানব জাতি যে সার্বজনীন জীবন-দর্শনের পরিচয় পেয়েছে , তার মধ্যে এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও কি  আমাদের জীবন-জিজ্ঞাসার উত্তর অনুসন্ধান করা সম্ভব?  
পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর ভাষায়, ‘স্বামীজী যা লিখেছেন, বলেছেন, তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পরেও সেগুলোর গুরুত্ব বা আকর্ষণ নিশ্চয়ই অনুভূত হবে এবং সম্ভবত অনাগত বহুকাল ধরে সেগুলো আমাদের প্রভাবিত করে চলেবে। সাধারণ অর্থে রাজনীতিবিদ বলতে যা বোঝায়, স্বামী বিবেকানন্দ নিঃসন্দেহে তা ছিলেন না। তবুও তিনি ছিলেন ভারতের আধুনিক জাতীয় আন্দোলনের একজন স্রষ্টা। আপনারা মনে করলে এর বদলে অন্য কোন শব্দ ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু আমি তাঁকে  এই রকমই মনে করি। পরবর্তীকালে যাঁরা জাতীয় আন্দোলনে কমবেশী সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই স্বামী বিবেকানন্দের কাছ থেকেই সেই প্রেরণা পেয়েছিলেন। প্রত্যক্ষভাবেই হোক কিংবা পরোক্ষভাবেই হোক, আজকের ভারতবর্ষকে তিনি প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছেন।  প্রজ্ঞা, তেজ এবং শক্তির এই যে প্রবাহ স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে উৎসারিত হয়েছে, আমি মনে করি, আজকের তরুণ- তরুণীরা তার সদ্ব্যবহার করতে ভুলবে না।’
ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী স্বামীজীর সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে জওহরলার নেহেরুর মতই মন্তব্য করেছেন। প্রণব মুখার্জী বলেছেন, ‘তাঁর বাণী ছিল যুক্তি  ও  বিচারের বাণী এবং বিশ্বজনীনতার বাণী, যে-বাণী আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই বাণী জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে আজও সমভাবে প্রযোজ্য। তাঁর মতো মানবজাতির এমন এক নেতার আবির্ভাবের জন্য মানব সমাজকে শত-সহস্র বছর ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাঁর নিজের সময়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক । বর্তমানে তিনি অধিকতর প্রাসঙ্গিক এবং অনাগত ভবিষ্যতেও একইভাবে, হয়তো আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক থাকবেন। বস্তুত যতদিন মানব সভ্যতা থাকবে ততদিন বিবেকানন্দ প্রাসঙ্গিক থাকবেন।’
প্রণব মুখার্জীর মন্তব্যে প্রনিধানযোগ্য বিষয় হলো, তিনি স্বামীজীকে একজন ‘নেতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষ তাঁকে আপাতদৃষ্টিতে একজন ধর্মীয় গুরু ভাবলেও বোদ্ধাজন তাঁকে একজন মানব হিতৈষী সমজসংস্কারক নেতা  হিসেবেই দেখেন। ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতির প্রকৃতি ও আন্তঃস¤পর্ক সম্বন্ধে সর্বার্থেই এক আধ্যাত্মিক, উদারনৈতিক, কল্যাণকামী, বহুত্ববাদী এবং সমন্বয়ী বিশ্ববিক্ষা ছিল বিবেকানন্দের ভাবনার ভিত্তি। গেরুয়া বসন পরিহিত একজন সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসী তাঁর  আধ্যাত্মিক চেতনার সাথে  রাজনীতি ও সমাজ ভাবনার যে রশায়ন করেছেন তা থেকে  শিক্ষা নিতে তাঁর কাছে ফিরে যেতেই হবে। দেশ কালের সীমা অতিক্রম করে সত্যানুসন্ধানের জন্য বার বার তাঁর কাছে ফিরে যেতে হয়। এ কারণেই স্বামী বিবেকানন্দ সকল দেশের, সর্বকালের, সর্বজনের ।
এ.এল.ব্যাসম বলেছেন, ‘স্বামী বিবেকানন্দই প্রথম ধর্ম গুরু যিনি ভারতের বাইরে মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন।’ ব্যাসমের কথার সত্যতা পাওয়া যায় চীনের বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হুয়াং জিন চুয়ান রচিত ‘দি মডার্ন ইন্ডিয়ান ফিলোসফার বিবেকানন্দ’ গ্রন্থে। হুয়াং জিন চুয়ান বলেছেন, ‘চীনদেশে স্বামী বিবেকানন্দকে আমরা একজন ধর্মীয় নেতামাত্র মনে করি না। আমরা তাঁকে আধুনিক ভারতবর্ষের  একজন সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক হিসেবে দেখি। প্রমাণ আছে যে, ভারতবর্ষে তিনিই সর্বপ্রথম সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন। ভারতবর্ষের বহু বিপ্লবীর কাছে তিনি ছিলেন প্রেরণার উৎস । তিনি তাঁর লেখায় ও বক্তৃতায় প্রায়ই চীন স¤পর্কে উদ্ধৃতি দিতেন এবং উচছসিত প্রশংসা করতেন। তিনি একবার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, চীন দেশের সংস্কৃতি অবশ্যই একদিন না একদিন ফিনিক্সের মতো আবার জেগে উঠবে এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য কৃষ্টির মিলনের মহৎ লক্ষ্য সাধনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। বিবেকানন্দের এই চিন্তাধারা কিভাবে গড়ে উঠেছিল তাঁর  জীবনীকার রোমাঁ রোলাঁ তা বর্ণনা করেছেন। ভারতে গণতন্ত্রবাদী দেশপ্রেমিকদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তিনি আমাদের গৌরবময় অতীত সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং চীনের মেহনতি জনগণকে ভালবাসতেন।  অতীতে স্বামী বিবেকানন্দ  চীনের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় দৃঢ় সমর্থন ও গভীর সহানুভূতি প্রদর্শন করেছিলেন এবং তাদের উৎসাহিত করেছিলেন সারা বিশ্বের জনগণের সঙ্গে একতাবদ্ধ হতে। চীনের জনগণ এরকম একজন ব্যক্তিকে ভুলতে পারে না এবং সব সময় তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে।’
বারাক ওবামা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকাকলীন ভারতের পার্লামেন্টে উভয় কক্ষের এক যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং স্বামী বিবেকানন্দকে স্মরণ করে বলেছিলেন, তাঁরা শুধু ভারতবর্ষের নন, তাঁরা সমগ্র পৃথিবীর। স্বামীজীর প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন: ‘জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভেদ-বিভেদ অস্বীকার করে শান্তি ও  সহিষ্ণুতার বাণী নিয়ে যে ভারত-মানস তার চিরায়ত শক্তিকে সর্বদা প্রকাশ করে চলেছে, তার আধুনিক কালের এক মহান প্রতিভূ স্বামী বিবেকানন্দ। আমার নিজের শহর শিকাগোতে তিনি গিয়েছিলেন এক শতাব্দীরও আগে। শিকাগোর ধর্মমহাসভা-সুখ্যাত স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, সাধুতা, পবিত্রতা এবং দয়া-দাক্ষিণ্য পৃথিবীর কোন ধর্মের নিজস্ব স¤পদ নয়, তা সর্বদেশের এবং সর্বধর্মেরই ঐশ্বর্য। কারণ, সব ধর্মই সর্বোচ্চ মহান চরিত্র পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে। নতুন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব আজ আমাদের ওপর। বিশ্বজনীন স্থায়িত্ব, শান্তি ও সুরক্ষা অক্ষুন্ন রাখার ব্রত আমাদের সকলের। নতুন আমেরিকা গঠনের জন্য বিশ্বজনীন স্থায়িত্ব ও সুরক্ষা পৃথিবীকে উপহার দেওয়ার জন্য সব রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন। সেই কাজে স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের কাছে এক আলোকদিশারি । নতুন আমেরিকা গঠনে তিনি আমার প্রেরণাদাতা।’ স্বামীজী এমনই প্রাসঙ্গিক এখনও, এমনই জীবন্ত মানুষের কাছে- দেশে-বিদেশে। বিবেকানন্দ ছিলেন অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্ত করার কারিগর।
বিবেকানন্দের শিকাগো ভাষণে যে বিশ্বজনীন বেদান্তবাদের কথা বলা হয়েছে, তা তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের  দেশ কাল ও সম্প্রদায়ের গন্ডি অতিক্রম করা মতবাদ ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’  তথা সার্বজনীনতাবাদেরই মূর্ত প্রকাশ।
শিকাগো ভাষণে স্বামীজী বললেন ‘যদি কখনও একটি বিশ্বজনীন ধর্মের উদ্ভব হয়, তবে তা কখনও কোন দেশে বা কালে সীমাবদ্ধ হবেনা ; যে অসীম ভগবানের বিষয় ঐ ধর্মে প্রচারিত হবে,ঐ ধর্মকে তারই মতো অসীম হতে হবে ; সেই ধর্ম শুধু ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা মুসলমান হবে না - সেই ধর্ম সব ধমের্র সমষ্টিস্বরূপ হবে, অথচ তাতে উন্নতির সীমাহীন অবকাশ থাকবে ; উদারতার সেই ধর্ম অসংখ্য প্রসারিত হস্তে পৃথিবীর সব নরনারীকে আলিঙ্গন করবে। সেই ধর্মের নীতিতে কারও প্রতি বিদ্বেষ বা উৎপীড়নের স্থান থাকবে না ; সেই ধর্মে প্রত্যেক নর-নারীর দেবস্বভাব স্বীকৃত হবে এবং তার সমগ্র শক্তি মনুষ্য জাতিকে দৈবী-স্বভাব উপলব্ধি করতে সাহায্য করবার জন্যই সর্বদা নিযুক্ত থাকবে।’ স্বামীজীর শিকাগো ভাষণ মানুষের মগ্ন চৈতন্যে প্রথম ধাক্কা । স্বামী বিবেকানন্দের কন্ঠে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের যে বিশ্বজনীন বেদান্তবাদের কথা প্রচারিত হয়েছে তা সত্যের প্রকাশিকা। এই সত্য প্রকাশে নির্ভিক যাঁরা, তাঁরা যখন যেথায় যা বলেছেন, তা সবই একই সত্যের  লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যজাত। রজ্জবের ভাষায়-‘একটি সত্য কথা অন্য সব সত্যকথার সঙ্গে মিলবেই--যা মিলবে না সেটা মিথ্যা।’ সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে বাইরের দিকে ধর্মে ধর্মে বৈচিত্র ও পার্থক্য দেখা গেলেও ভিতরের দিকে ধর্মে ধর্মে  আছে বিস্তর মিল। ধর্মে ধর্মে মিলের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘সত্য’। এই ‘সত্য’ মানে মানবতার কল্যাণ।
আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের বর্তমান অবস্থা থেকে  উত্তরণের  উপায় হিসেবে ‘সত্য’- ই হবে মহৌষধি। ‘সত্য’ অনুসন্ধান করেই সমাজের দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা, বিবেক বিকৃতি, ধর্মীয় সন্ত্রাস ইত্যাদিকে মোকাবিলা করতে হবে। ‘সত্য’ অনুসন্ধান মানে সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা। ‘সত্য’ অনুসন্ধান মানে ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ । দরকার চরিত্র ও বদ্ধিবৃত্তি উৎকর্ষসাধনের শিক্ষা। স্বামীজীর ভাষায় শিক্ষা হলো মানুষের মধ্যে যে-পূর্ণত্ব প্রথম থেকেই বিদ্যমান তার বিকাশ। তাঁর কাছে খাঁটি মানুষ তৈরিই ছিল শেষকথা। চাকরি আর গাড়ি-বাড়ি করার মানসিকতা সৃষ্টিকারী শিক্ষা ব্যবস্থা কোন দিনই মানুষের মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে না। বিবেকানন্দ  ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ স¤পর্কে যে কথা বলেছেন, তা তো “মদিনা সনদ” এরই যথার্থ প্রতিফলন।  মানুষের বহু পরিচয়ের সযতœ উদযাপনের সঙ্গে কিভাবে অপরের অধিকারকেও সমান মর্যাদায় স্বীকার করা যায়, তার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত স্বামীজীর চিন্তায় আমরা পাই। আর এখানেই তাঁর সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মূল্যস্ফীতি রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে
  • শিশু শ্রমিক ও শিশু শ্রম
  • সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল
  • কাতালুনিয়ার স্বাধীনতা : প্রাসঙ্গিক কথা
  • অসহিষ্ণু মানুষ, অবক্ষয়গ্রস্থ সমাজ
  • প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে হবে
  • বাস্তবতার নিরিখে সরকারি চাকরির বয়স
  • প্রফেসর ডা. এম এ রকিব
  • রূপে রূপে কুসংস্কার মাওলানা
  • ব্যাংকিং খাত নিয়ে শঙ্কা
  • নৈতিকতার বিপর্যয় : চাই কঠিন সাজা
  • স্থাপত্য বিভাগের আলোকোজ্জ্বল এক দশক
  • বর্নিল আয়োজনে স্থাপত্যকর্মের প্রদর্শনী
  • বই পড়ার মাধ্যমে অসহনশীলতা দূর হতে পারে
  • ধনির সম্পদে গরিবের অধিকার
  • দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থেকে মুক্তির পথ
  • শীত গ্রীষ্মে বাঙালির জীবন
  • কবিতা
  • রেসিপি
  • কুয়াশা ভূত
  • Developed by: Sparkle IT