উপ সম্পাদকীয়

প্রকৃতির কাছ থেকে শেখা

আব্দুশ শাহীদ চৌধুরী জিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০১-২০১৮ ইং ০১:৫৬:১৩ | সংবাদটি ১৫৪ বার পঠিত

কনকনে শীতের সকাল। আলস্য ভেঙে ঘরের বাইরে পা রাখা। সকালের মিষ্টি রোদে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দুগুলো যেনো মুক্তোদানার মতো। তখনও কুয়াশা আচ্ছাদিত পুরো গ্রাম। আড়াইমাইল দুরে যেতে হবে।  ধান কাটা শেষ। লোকজন ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে নতুন রাস্তা বানিয়ে নিয়েছে। পায়ে হাঁটার পথ। তিন গ্রামে রিক্সা মাত্র দুটো। বাবার পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে বাজারে পৌঁছলাম। বাজারের দক্ষিণেই স্কুল। তখনকার সময় সবাই দক্ষিণের খুবই ভক্ত ছিল। প্রায় সবাই দক্ষিণ দুয়ারি ঘর বানাতো। দক্ষিণি বাতাস গায়ে লাগিয়ে কেওড়া বনের পত পত শব্দে আমরা উপস্থিত হলাম আলী আমজদ হাইস্কুলে। প্রধান শিক্ষকের রুমের কাছে যেতেই আমার পা কাঁপতে লাগল। কোন রকম পা টেনে টেনে স্যারের রুমে ঢুকলাম। কেনো জানি স্যার বাবাকে বেয়াই বলে সম্বোধন করতেন। অনেক কথার পর বাবা আমাকে দেখিয়ে স্যারকে বললেন, ‘ওকে মানুষ করার দায়িত্ব আপনার, আমাকে শুধু হাড্ডি ফেরত দিলেই চলবে।’ আমি বুঝে গেলাম আমার ভবিষ্যৎ। দেখতে দেখতে শেষ করলাম পাঁচটি বছর। অসম্ভব ভাললাগার দিনগুলো। স্কুলের সামনেই বিশাল খেলার মাঠ। প্রতিদিন সকালে একটু আগেই স্কুলে চলে যেতাম। বইগুলো ক্লাসে রেখেই এক দৌঁড়ে চলে যেতাম মাঠে ফুটবল নিয়ে। ফুটবল নিয়েই চলত লড়াই। কেউবা ভলিবল নিয়ে ব্যাস্ত। ঘণ্টা বাজার সাথে সাথেই দৌঁড়ে টিউবওয়েলে হাত মুখ পরিস্কার করেই ক্লাসে যাওয়া। আবার টিফিনের সময় ফুটবল অথবা ভলিবল অথবা ব্যাডমিন্টন খেলা। মনে হতো যেন খেলাধুলার জন্য স্কুলে আসি। কখনো স্কুল ফাঁকি দিতাম না। তখনকার সময় বাড়িতে বসে সময় কাটানো ছিল অসম্ভব। ছিল না বিদ্যুৎ , ছিলনা টেলিভিশন। দৌঁড়-ঝাপ আর খেলাধুলা, আনন্দ আর আদরে ভরপুর ছিল সবার জীবন।
আজ শহর কিংবা গ্রামে নেই বই পড়ার আনন্দ, নেই খেলাধুলার পর্যাপ্ত জায়গা। দুই রুমের অথবা তিন রুমের বাসায় বন্দি নগরজীবন। বাচ্চাদের নেই মনোরম পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ। রাঙিছড়া চা বাগান থেকে আসত আমাদের সাথের দুটো ছেলে। স্বপন নাইডু তো বরই পাতা দিয়ে বাঁশি বাজাত। সবাই পিছনের বারান্দায় জড়ো হয়ে তার সুরে সুর মেলাতাম। মেয়েরাও কমন রুম থেকে উঁকি মেরে দেখত আর শুনত বরইপাতার সুর তোলা গান। জাতীয় দিবসগুলো পালিত হতো খুব ধুমধামে। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে সবাই খালি পায়ে সকাল বেলা প্রভাতফেরিতে যোগ দিতাম। অসম্ভব আনন্দ থাকত মনে। সারা রাত ঘুম হতো না। ভোরে উঠে শিশির ভেজা ঘাস মাড়িয়ে সবার সাথে যাওয়া সেই আনন্দ আজ আর নেই। একজন শিক্ষক হিসেবে বলতে চাই আজকের বাচ্চাদের পড়াশুনা পুরোপুরি রোবটের মত। সকালে ঘুম থেকে ছোট বাচ্চাকে টেনে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় স্কুলে। ঘুম ঘুম চোখ। রিক্সায় অথবা গাড়িতে অনেক সময় বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ে। আবার রাতেও ঘুমাতে হয় দেরিতে। সেদিন রাস্তায় দেখলাম মোটর সাইকেলের পেছনে বসা বাচ্চাকে কাপড় দিয়ে বেঁধে বাবা বাইক চালাচ্ছেন গন্তব্যস্থল স্কুল। ছোট্ট বাচ্চাদের আনন্দের সাথে পড়াশুনার কোন সুযোগই নেই। প্রচুর পরিমাণে ঘুম যেখানে বাচ্চাদের জরুরি সেখানে তারা ঘুমানোর সুযোগই পায় না। স্কুল থেকে ফিরে কোচিং অথবা বাসার শিক্ষক এবং নিজের হোম ওয়ার্ক করতে করতেই কখন যে রাত ১২টা বাজে কেউ তা খেয়াল করে না। বাবা-মা  যুগের সাথে তাল মেলাতে যান্ত্রিক এই শহুরে জীবনে নিজদের জীবনযাত্রাকেও যেন যান্ত্রিক করে ফেলেছেন। তাই সন্তানদের যান্ত্রিক এই পরিবেশে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাবা-মা চায় তার শিশুটি যেন আরও অধিকমাত্রায় পরিশ্রম করুক আরও চাপ দিয়ে কিভাবে জিপিএ ফাইভ অথবা বৃত্তি পাওয়ানো যায় তার ব্যাবস্থা করতে। সাপ্তাহে একটি মাত্র বন্ধের দিন সেটিও যেন তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয় বিভিন্ন কো-কারিকুলাম কাজে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য। যেমন-চিত্রাংকন শিখানো, গান-বাজনা শিখানো ইত্যাদিতে।
অন্যদিকে, শহরে মানুষ দিন কি দিন বৃদ্ধির পাশাপাশি সংকুচিত হচ্ছে শহরের জীবনযাত্রার মান। আগে প্রতিটি পাড়ামহল্লায় একটি দু’টি খেলার মাঠ থাকলেও দিন বদলের পালাক্রমে আজ যেন সেগুলো বিলুপ্ত প্রায়। তাই শিশুরা বাধ্য হয়েই  সময় কাটানোর জন্য মোবাইলে গেইম অথবা টেপে গেইম অথবা বাবা-মায়ের সাথে সিরিয়াল দেখে। বন্দি জীবন, পুরো পুরো বন্দি জীবন। ঘর এবং স্কুল এই দু’এর মধ্যে সীমাবদ্ধ জীবন। প্রচুর পরিমাণে গাইড বই পড়তে হয় ভাল ফল করার জন্য। পাঠ্য বইতে নেই সৃজনশীল পদ্ধতির বেশি বেশি নমুনা। আর স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা সেতো এক মহাযুদ্ধ। আহারে সরকারি অথবা বেসরকারি ভালো মানের স্কুলে ভর্তির জন্য যে লড়াই করে বাচ্চারা তা দেখলে মনে হয় ওদের ভবিষ্যৎ অভিবাবকরাই লিখে রাখতে চায়। অভিভাবকরা এটা পুরোপুরি ভুলে যায় কালকে কি হবে অথবা আগামীতে কি হবে তা শুধু সৃষ্টিকর্তারই হাতে। আবার নতুন এক নিপিড়ন তা হলো ইংরেজি মাধ্যম। বাসার কেহ ইংরেজি বলতে পারে না, স্কুলেও তেমন চর্চা হয় না পরিবেশ ও নেই ইংরেজি চর্চার তারপরেও বাবা-মায়ের চাহিদা আমার বাচ্চা ইংরেজি স্কুলে পড়ে বড় কিছু হবে। এটা একটা গর্ব যে আমার বাচ্চা ইংরেজি স্কুলে পড়ে। ইংলিশ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি না করে কিভাবে আমরা আশা করতে পারি যে বাচ্চাগুলো অনর্গল ইংরেজি বলবে আর ভাল রেজাল্ট করে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। অর্থাৎ আজ আর নেই আনন্দ, নেই বিনোদন আছে শুধু চাপ চারদিকে যেন মানুষ হওয়ার চাপ।
আমরা শিখেছি প্রকৃতি থেকে, সবুজ প্রকৃতি দেখে শিখেছি ষড়ঋতু। বর্ষাকালের বর্ণনা অথবা শীতকালের বর্ণনা আমরা শিখেছি প্রকৃতির সাথে ওঠাবসা করে । বড় বড় বিল্ডিং এ থেকে বাইরের কিছুই বুঝে না আজকের বাচ্চারা। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি হচ্ছে তা বুঝার উপায়ই নেই কারণ জানালা থাকে সবসময় বন্দ । জানালাতে ভারি পর্দা টানা। রুমে এসি। এয়ারটাইট পরিবেশ। তাইতো বলি এতো এতো হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার কেন গড়ে উঠেছে। ইধষধহপব ফরবঃ এর অভাবে সবাই রোগি। ফাস্ট ফুড না খেলে মনে হয় পরিবেশটা জমে না। মোবাইল আর ফেইসবুকেই সীমাবদ্ধ সবার জীবন। যৌবনের ভাটা পড়ে যাচ্ছে এখনো ইচ্ছে করে খোলা মাঠে দৌড়াতে আর বুক ভরে শ্বাস নিতে। আমাদের শিক্ষকরা, অভিভাবকরা বিশেষ করে দাদা-দাদিরা ছিলেন অসম্ভব রকমের মায়ামমতার মূর্ত প্রতীক। নানা বাড়ি ছিল আনন্দের আর খুসির এক জায়গা। পানি চক্রের মতো জীবনচক্র চলছে কিন্তু স্মৃতি হয়ে থাকছে শুধু ফেলে আসা দিনগুলো।
লেখক : শিক্ষক।
    

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সাংহাইর সর্বোত্তম বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন
  • মাদক ও তরুণ প্রজন্ম
  • নির্বাচনের গুরুত্ব ও ভোট
  • প্রাথমিক শিক্ষার গবেষণাধর্মী বই
  • কেমন মেয়র চাই
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • প্লাস্টিকের ভয়াল থাবা
  • আব্দুল¬াহ আল মাহবুবশিক্ষার্থীর বিকাশে পরিবারের ভুমিকা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেয়া হোক
  • সিলেটের ডাক
  • নারীর প্রতি সহিংসতা প্রসঙ্গে
  • সিলেটের ডাকের শিশুমেলা
  • সবুজ প্রবৃদ্ধির কৌশল : পরিবেশ-প্রতিবেশ
  • এরদোগানের শাসনে তুরস্কের ভবিষ্যৎ
  • বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং নদী রÿার্থে করণীয়
  • পয়ত্রিশ বছরে সিলেটের ডাক
  • আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকব?
  • Developed by: Sparkle IT