উপ সম্পাদকীয়

আসামের এনআরসি, বাঙালির গলায় ফাঁসি

মোঃ মাহমুদুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০১-২০১৮ ইং ০১:৩৬:১০ | সংবাদটি ২৩২ বার পঠিত

বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ভারতের আসাম রাজ্যে ’ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস’ (এনআরসি) এর প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২ টার পর। সবাই যখন নতুন আনন্দে ইংরেজি নববর্ষ ২০১৮ সাল বরণ করতে প্রস্তুত তখন ভারতের আসাম (অসম) রাজ্যের বাঙালিরা দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। এই রাতই তাদের দুর্ভাগ্যের শেষ রাত নয়, নির্ঘুম রাত্রিযাপনের সূচনা হিসেবেই একে দেখছেন বিশ্লেষকরা। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এই তালিকায় যাদের নাম নেই তাদের নাম থাকবে দ্বিতীয় তালিকায় যদি তারা ভারতের প্রকৃত নাগরিক হয়ে থাকেন। সমস্যা এই ’যদি তারা ভারতের প্রকৃত নাগরিক হয়ে থাকেন’ অংশ নিয়ে।
সমস্যার গভীরতা ও জটিলতা উপলব্ধির জন্য আসামের ইতিহাস ও ৪৭’র দেশভাগের ঘটনাবলীর উপর আলোকপাত করা দরকার। ১৮২৬ সালে আসাম বৃটিশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে অহমীয়াদের দ্বারা শাসিত ছিল প্রায় ৬ শত বছর। খৃস্টীয় চতুর্থ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আসাম রাজ্যের  নাম ছিল কামরূপ। মুসলিম পর্যটকদের বর্ণনা ও পূরাণে এই নাম রয়েছে। আজও আসামের একটি জেলার নাম কামরূপ যা প্রাচীন নামের স্মৃতি বহন করছে। বৃটিশরা ১৮৭৪ সালে সিলেট জেলাকে আসামের সাথে যুক্ত করে। ১৯০৫ সালে পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠন থেকে ১৯১১ সালে বঙ্গবঙ্গের সময় ছাড়া বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ আসাম প্রদেশের অংশ ছিল। বৃটিশরা আসামের বিপুল অনাবাদী জমিতে কৃষিকাজের জন্য ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে লোকজন নিয়ে যায়। আসামের সাথে সিলেটের সংযুক্তি ও ময়মনসিংহ আঞ্চল থেকে লোক স্থানান্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে আসামে বাঙালিদেরও বসবাস ব্যাপকহারে শুরু হয়। যদিও পঞ্চম শতাব্দী থেকেই আসামে (কামরূপ) বাংলার জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের রাজ্যের পক্ষ থেকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে পাবলিকেশন বোর্ড অব আসাম কর্তৃক প্রকাশিত ‘দি কম্প্রিহেন্সিভ হিস্টোরী অব আসাম’ এ উল্লেখ রয়েছে। ইতিহাসের এই বর্ণনা অনুযায়ী অহমীয়াদেরও আগে বর্তমান আসামে বাঙালিদের বসবাস শুরু হয়। অথচ আজ বাংলাভাষী আসামের নাগরিকদের বাংলাদেশী হিসেবে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাবের মধ্যে একটি ছিল অখন্ড বাংলাকে স্বাধীন রাখা, পাঞ্জাবকে পাকিস্তানের সাথে এবং আসামকে ভারতে সাথে সংয্ক্তু করা। জওহর লাল নেহরুর অসম্মতির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তখন বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ করতে হয় এবং আসাম প্রদেশের অন্তর্গত সিলেটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয় গণভোটের। গণভোটে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) সাথে সংযুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দিলে সিলেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোও পূর্ব পাকিস্তানের সাথে দেয়া হবে বলা হয়। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাইয়ের (সোম ও মঙ্গলবার) ঐতিহাসিক গণভোটে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত থাকার পক্ষে ২,৩৯,৬১৯ ভোট এবং বিপক্ষে ১,৮৪,০৪১ ভোট পড়ে। সিলেটবাসী ৫৫,৫৭৮ ভোটের সুনির্দিষ্ট ব্যবধানে পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে ভোট দিলেও শর্ত অনুযায়ী করিমগঞ্জ, বদরপুর, হাইলাকান্দি ও পাথারকান্দিকে পাকিস্তানের  সাথে দেয়া হয়নি। ব্রিটিশ ভারতের শেষ গভর্ণর লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ কেন জওহরলাল নেহরু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাকিস্তানের সাথে এই বিমাতাসূলভ আচরণ করলেন তা নিয়ে ইতিহাসের অন্দরমহলে অনেক কথা চালু আছে। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের স্ত্রী এডউইনার সাথে নেহরুর সম্পর্ক ও র‌্যাডক্লিফের নারীলিপ্সার কারণে বর্তমান বাংলাদেশের মানচিত্র ছোট হয়েছে বলেই পরবর্তীতে জানা যায়। যে অঞ্চলের বাঙালিদের নিয়ে আসামের রাজনীতি আজ সরগরম সেই বাঙালিরা ঐতিহাসিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের পথ ধরে বাংলাদেশের অংশ থাকার কথা ছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তাদেরকে উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে শত শত বছরের আবাসস্থলে বসবাস করেও ’ভারতের প্রকৃত নাগরিক’ হওয়ার জন্য নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে।
একটা দেশ তার নাগরিকদের তালিকা করবে তাতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। নাগরিক তালিকা প্রণয়ণের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক  দাবিটি বাস্তবায়িত হচ্ছে বাংলাভাষীদের বাংলাদেশী হিসেবে প্রকাশ্য প্রচারণার মাধ্যমে। এখন একজন বাঙালি কীভাবে কোন দলিলের মাধ্যমে তাকে প্রকৃত ভারতের নাগরিক প্রমাণ করবে তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। আদালত যে প্রমাণাদি গ্রহনযোগ্য হিসেবে রায় দিয়েছে সেগুলোও ভেরিফাই করবে উগ্র জাতীয়তাবাদীরা। তাই যে কারো যেকোনো দলিল গ্রহণযোগ্য নয় বলে অগ্রাহ্য করলে পরবর্তীতে ভারতের উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার শেষ সুযোগ রয়েছে। শিক্ষা ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া বাঙালি জনগোষ্ঠীর আইনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কতটুকু সুযোগ প্রকৃত অর্থে থাকবে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তালিকায় যাদের নাম থাকবে না তাদেরকে কীভাবে বিতাড়ন করা হবে বা নাগরিক সমাজ থেকে কীভাবে আলাদা করা হবে তা নিয়ে এখনই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। এসব আলোচনায় আসামের বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন।
দ্বিতীয় তালিকার অপেক্ষা না করেই এখন প্রকাশ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আসামের সচেতন উদার চিন্তক ব্যক্তিরা। আসামের শিলচর সহ বাঙালি প্রধান এলাকার ৬৫ শতাংশ ভেরিফিকেশন শেষ হয়ে গেছে জানানো হলেও তালিকায় বাঙালি প্রধান এলাকার মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষের নাম রয়েছে। তাই দ্বিতীয় তালিকায় কী থাকবে তা নিয়ে সচেতন নাগরিকরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারছেন না। যৌক্তিক কারণেই বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সভায় বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের মতো আসামে লাখ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে। আলোচনা সভার বক্তা আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. তপোধী ভট্রাচার্যের নামও প্রথম তালিকায় নেই। ৫ জানুয়ারি আসাম বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত এ নাগরিকসভায় ড. তপোধী প্রশ্ন রাখেন, মূখ্যমন্ত্রী সেনোয়াল কেন বলছেন, তালিকায় যাদের নাম থাকবে না, তাদের মানবাধিকার কেড়ে নেয়া হবে না। এতে কী ইঙ্গিত করে তাও কি বলা লাগবে। এরপরও কি কেউ বলবে না এনআরসি বাঙালি বিতাড়নের কৌশল। হিটলারের দ্বারা লাখ লাখ ইহুদি হত্যালীলা ও ১৮৭৪ সালের আসাম প্রদেশের সঙ্গে সিলেটের অন্তভূক্তির প্রসঙ্গ টেনে শাসকদের প্রতি প্রশ্ন তিনি রাখেন, বাংলায় কথা বলা কি অপরাধ? আমাদের কি রোহিঙ্গা বানানোর অপপ্রয়াস চলছে। (দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ)
এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সঞ্জীব দেবলস্কর তাঁর এক নিবন্ধে আগেরদিন লিখেন, ”যারা স্বীকার করেন বাংলাভাষী আর বাংলাদেশী সমার্থক নয়, অসম রাজ্যটিতে অসমীয়া জনগোষ্ঠীর যেমন অধিকার, তেমনই বরাহি, মিচিং, কোচ, বড়ো, বাঙালি, কার্বি, ডিমাসা, মনিপুরি সহ অপরাপর জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার, এদের কন্ঠস্বর আজ স্তিমিত, যারা যুক্তিতে বিশ্বাস করেন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করেন, এরা তো কোণঠাসা হয়ে আছেন এ রাজ্যে। ঐতিহাসিক কাল থেকেই অসম হলো অসংখ্য জনগোষ্ঠী সমন্বিত একটি রাজ্য, এখানে নাগরিক বৈধতা নিরূপনের ভার কার হাতে দেয়া যেতে পারে এটা কঠিন প্রশ্ন, কিন্তু উগ্র অসহিষ্ণু জাতীয়তাবাদী চক্রের হাতে তো দেয়া যেতে পারে না, এ তো সহজ কথা। অথচ বাস্তবে তো তা-ই  ঘটেছে। গণমাধ্যমে এবং সভাসমিতিতে উচ্চগ্রামে তো এটাই ঘোষিত হচ্ছে, অসমে বাঙালিরা উড়ে এসে জুড়ে বসা জনগোষ্ঠী- কি হিন্দু কি মুসলমান।”
উগ্রবাদীদের রক্ষচক্ষুর ভয়ে আসামের সচেতন বিবেক আজ বাকহীন। দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গের ৩ জানুয়ারীর সম্পাদকীয় কলামে এ অবস্থার বর্ণনা এভাবেই এসেছে, ”.. কথা আছে বুকের ভেতর, কিন্তু মুখ খুলে কেউ কথা বলছে না। চারদিকে রক্তচক্ষুর শাসানি।” উগ্রতা আর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জী এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এভাবে সারা ভারতের বিবেকবান মানুষ জেগে উঠলে হয়তো আসামের উগ্র জাতীয়তাবাদীরা বাঙালি খেদাও পণ থেকে পিছু হটতে পারে। নতুবা এক সময় এই উগ্র জাতীয়াতাবাদীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে বাঙালিরা ভারতের অখন্ডতা রক্ষার জন্য আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাহায্য করেছে তাদের বড় একটি অংশ কথা বুকের ভেতর রেখেই রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রহীন হওয়ার উদ্বেগ নিয়ে ইতোমধ্যে উধারবন্দ থানার কাশিপুর দ্বিতীয় খন্ডে বাসিন্দা হানিফ খান প্রথম নাগরিক তালিকায় নাম না দেখেই গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন। পুলিশ আত্মহত্যার কারণ অস্বীকার করলেও হানিফের প্রতিবেশীরা বলেন, হানিফ তালিকায় নাম না থাকা নিয়ে অস্থির ছিলেন।
আসামের প্রতিবেশী বাংলাদেশের সিলেট জেলার মানুষও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। ঐতিহাসিক কারণে এ অঞ্চলের মানুষের সাথে রয়েছে অনেকেরই আত্মীয়তার সম্পর্ক। এছাড়া রোহিঙ্গাদের মতো আসামের বাঙালিদের ঢল যদি কখনও সিলেটের দিকে আসে, তাহলে তা সামলানো কঠিন হবে। এ মানবিক বিপর্যয়ের আশংকা যা আসামের বাঙালিরা করছেন, তাতে নির্বিকার থাকা বিশ্বের যেকোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষে কঠিন। এজন্য শুধু সিলেটবাসী নয়, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশেরও সমস্যাটি নিয়ে ভাবিত হওয়া উচিত।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী কলাম লেখক

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ইয়েমেন সংকট : কে কার সঙ্গে লড়াই করছে?
  • বৃটিশ আমলে সিলেটের প্রথম আইসিএস গুরুসদয় দত্ত
  • ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব
  • প্রবীণদের যথাযথ মূল্যায়ন কাম্য
  • ইতিহাসের একটি অধ্যায় : প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান
  • সড়কে মৃত্যুর মিছিল কি থামানো যাবে না?
  • স্বাস্থ্যসেবা : আমাদের নাগরিক অধিকার
  • কে. আর কাসেমী
  • আইনজীবী সহকারী কাউন্সিল আইন প্রসঙ্গ
  • শিক্ষা হোক শিশুদের জন্য আনন্দময়
  • ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ও সৌদি আরব
  • শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত
  • ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা
  • সুষ্ঠু নির্বাচন ও যোগ্য নেতৃত্ব
  • জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • Developed by: Sparkle IT