উপ সম্পাদকীয়

গৃহকর্মী নির্যাতন

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন খন্দকার প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০১-২০১৮ ইং ০১:৩৭:০৮ | সংবাদটি ৯৩ বার পঠিত

শহরে তো বটেই এমনকি একটু স্বচ্ছল হলে গ্রামেও গৃহকর্মী নেই এমন পরিবার পাওয়া দুষ্কর। গৃহকর্ত্রীর বিলাসী জীবনের কাছে গৃহকর্মীর মানবেতর জীবন হার মানছে প্রতিনিয়ত। যে বয়সে আমাদের ছেলে-মেয়ে বই খাতা কলম নিয়ে নামি দামি স্কুলে যাচ্ছে, বিপরীতে একই বয়সী গৃহকর্মী সভ্য সমাজের ভদ্রমহল দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মুমূর্ষু হচ্ছে প্রতিক্ষণে। নেই তাদের কর্মঘন্টা, নেই সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ। আছে শুধু বঞ্চনা, নির্যাতন, অধিকারহীনতা। তাদের দুঃখ শোনার লোকতো সমাজে বড়ই অভাব। শুনে বা লাভ কি, যারা সমাজের মোড়ল তাদের ঘরেতো বেশি নির্যাতিত হচ্ছে গৃহকর্মী। কাজের মেয়েরা রেহাই পাচ্ছে না যৌন হয়রানি থেকে। সমাধান একটি। সকলের মানসিকতা পরিবর্তন করা।
কিছুদিন আগে ঢাকা যাওয়ার পথে কর্তাব্যক্তির সিটের নিচে অসহায় অবস্থায় একটি ছোট মেয়ে বসে থাকতে দেখে ভদ্রমহোদয়কে প্রশ্ন করলাম, ছোট্ট মেয়েটির জন্য একটি টিকিট কেটে সিটের ব্যবস্থা কি করা যেত না? উত্তরে ভদ্রলোক বললেন, এই তো বুঝি হাজী মোহাম্মদ মহসিন, কোথা থেকে এলেন? উত্তর শুনে ভদ্রলোকের আপাদমস্তক নজরে আনার চেষ্টা করলাম। দেখে মনে হয় উচ্চশিক্ষিত, পরনে স্যুট-কোট-টাই। আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। এ কেমন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জাতির মানবতা। আমরা কি দিন দিন অধঃপতনের সর্বনি¤œ স্তরে পৌঁছে যাচ্ছি। সভ্য সমাজে এসে অসভ্যতার ছোঁয়া আমাদেরকে স্পর্শ করল। হায়রে! আমাদের বোধোদয়ের আর কত দেরি। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) বিদায় হজ্জের ভাষণে গৃহকর্মীর অধিকারের যেই ঘোষণা দিয়েছিলেন তা কি আমরা বেমালুম ভুলে গেছি। বিশ্বনবী বলেছিলেন, ‘হে লোকগণ! তোমাদের গৃহকর্মী, যা তোমরা ভক্ষণ করবে তা তাদেরকেও খেতে দেবে। যা তোমরা পরিধান করবে তা তাদেরও পরিধান করাবে। ভুলে যেয়োনা, তারাও তোমাদের মতো মানুষ’। অথচ আমরা সবকিছু ভুলে নির্যাতনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছি। তাদের শ্রমকে আমরা উপভোগ করি কিন্তু তাদেরকে একটু ভালোবাসা, আদর ¯েœহ দিতে কার্পণ্য বোধের অভাব নেই।
আপনার ছেলেমেয়েদের যতেœর ব্যাপারে একটু গাফিলতি করেন না। কিন্তু ঐ ছেলেমেয়ে গুলো যারা সমাজে গৃহকর্মী হিসেবে পরিচিত তারা তো কারো না কারো সন্তান। তাদের প্রতি কেন আমাদের এত নিষ্ঠুরতা? মা-বাবার বয়সী গৃহকর্মীর সাথে যখন খারাপ আচরণ করেন তখন কি নিজের মা-বাবার কথা মনে পড়ে না? আপনারা খাবেন ভালো খাবার, আপনাদের উচ্ছিষ্ট তাদের খাবার-এর চাইতে জঘন্য নিচু মনের কাজ আর কি হতে পারে। রাসুল (সা:) বলেন, ‘যখন তোমাদের কোন গৃহকর্মী কিছু রান্না করে তার মনিবের কাছে নিয়ে আসে যার তাপ ও ধোঁয়া সে সহ্য করেছে, তখন তার উচিত হবে সেই গৃহকর্মীকে কাছে বসিয়ে তা থেকে কিছু খাদ্য প্রদান করা। যদি খাদ্যের পরিমাণ কম হয়, তাহলে সে যেন তার হাতে এক বা দুই গ্রাস খাবার প্রদান করে’-সহীহ মুসলিম। আমাদের ব্যস্তময় জীবনের ধুলো-ময়লা মাখা জামা-কাপড় গৃহকর্মী এক নিমিষেই পরিষ্কার করে দেয়। কিন্তু তাদের বড়ই আফসোস, তারা আমাদের মনের ময়লা আবর্জনা গুলো ধোয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিতে পারে না। আপনি আরেক জনের ছেলেমেয়েকে নির্দয়ভাবে প্রহার করেন, একবার কি ভেবে দেখেছেন আপনার ছেলেমেয়েকে কেউ প্রহার করলে আপনার কেমন লাগবে। আপনার বাচ্চারা কোন ভুল করলে আপনি তাদেরকে বলেন কিছুনা, ছোট্ট মানুষ ভুল তো করবেই। আর অপরের ছেলেমেয়েরা (গৃহকর্মী) ছোট ভুল করলে খড়গ হস্তে তাদের দেহকে রক্তাক্ত করেন। আগুনের ছেঁকা দিয়ে, গরম পানি ঢেলে তাদের শরীর ঝলসে দেন এবং অত্যাচারের স্ট্রিমরোলার চালিয়ে মুমূর্ষু করেন। অথচ রাসুলুূল্লাহ (সা:) গৃহকর্মীদের অন্যায় ও ভুলকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য তাকিদ দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসুলুূল্লাহ (সা:) এর খিদমতে আসলেন। অতপর আরজ করলেন: হে রাসুলুূল্লাহ (সা:) গৃহকর্মীদেরকে আমরা কতবার ক্ষমা করব? রাসুলুূল্লাহ (সা:) কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, গৃহকর্মীদের প্রত্যেক দিন সত্তর বার ক্ষমা করবে’।
গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’ ঘোষণা করেছিল, ঐ নীতিমালাকে আইনে রূপান্তরিত করে বাস্তবায়নের অনুরোধ জানাই। আদুরী নির্যাতনের দায়ে গৃহকর্ত্রী নদীর যাবজ্জীবন কারাদন্ড আমাদের সমাজে ন্যায় বিচারের উজ্জ¦ল দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকবে। তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা দ্বারা বিদেশের মাটিতে গৃহকর্মী নির্যাতন বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। সর্বোপরি মানসিকতা যতদিন পরিবর্তন হবেনা ততদিন এই কঠিন নির্মমতা থেকে গৃহকর্মীরা রেহাই পাবেনা।
লেখক : কলামিস্ট। 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কাবিনবিহীন বিয়ে, প্রতারণা ও আমাদের আইন
  • স্মার্টফোনে বন্দি জীবন
  • দৃষ্টিপাত নেশার নাম ড্যান্ডি!
  • আইনজীবী-সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম চৌধুরী
  • সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল কবে শেষ হবে?
  • রাস্তাটির সংস্কার চাই
  • প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি
  • শিক্ষা ব্যবস্থা
  • আবর্জনা সমস্যা : উৎপাদনের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে
  • উচ্চশিক্ষায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রয়োজন
  • সিটি নির্বাচন : কাকে ভোট দেব?
  • রথযাত্রা
  • বিবেক দ্বারা হোক পথ চলা
  • মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার
  • পাহাড় বিষয়ে সচেতনতা দুর্ঘটনা রোধ করতে পারে
  • আপন ভুবন, অচেনা আকাশ
  • কওমি বোর্ডের রেজাল্ট পর্যালোচনা
  • স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী
  • পানি সংকট এবং ভবিষ্যত বাংলাদেশ
  • তুরস্কের নির্বাচন দেখে এসে
  • Developed by: Sparkle IT