মহিলা সমাজ

ছেঁড়া ধারাপাত

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০১-২০১৮ ইং ০১:৩৯:২৫ | সংবাদটি ২১ বার পঠিত

দুপুরে বাজারে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে হাশেম সাহেবের মাথা খারাপ। কারণ, তার মানিব্যাগে দশ টাকা মাত্র। বাসায় চোর আছে। পকেট থেকে তার টাকা কে নিয়েছে, সেটা বুঝতে পেরে মৃদু হাসলেন তিনি। তবে এই বিষয়টা নিয়ে তার ভাবনা এখন একটু কম। রিক্টারস্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা যে রকম কম বেশি থাকে। সেই রকম। এখন তাঁর চিন্তা কিভাবে সবজি, মাছ এ গুলো কিনে নিয়ে বাসায় যাবেন। নইলে যে তার গুন্ডি বউকে সামলানো যাবে না। হিসাব মেলাতে অবশ্য তার তেমন সময় লাগে না। তিনি যে ম্যানেজমেন্ট এ মাস্টার্স। কিন্তু কোনোদিন কোনো কলেজে চাকুরির জন্য তিনি আবেদন করেন নি। কেন যে করেন নি? সেটা এক অজানা রহস্য! কেউ কেউ বলে তাঁর নাকি বেশি কথা বলার অভ্যাস। কলেজের প্রভাষক হলে সেটা আরও বেড়ে যেতে পারে। সেই আশঙ্কায় তার এক মামা পরামর্শ দিলেন, ভাগিনা তুমি স্কুল মাস্টার হও। বাচ্চা পোলাপান পড়াও। দেখবা, কথা বেশি কইলেও হ্যাঁরা তোমারে ‘বক’ স্যার কইব না। বক বক স্যার এর শর্ট মিনিং ‘বক’ স্যার। মামার কথা সেদিন তিনি মাইন্যা নিলেন। লাভ অইল একদিকে। অন্যদিকে লোকসান। পরিবারের অভাব ছাড়ে না। তিনি অবশ্য চালু মাল। কোন জায়গায় তেল আর কোন জায়গায় পানি ঢালতে হয়। এই বিষয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক পি,এইচ,ডি ডিগ্রী তার কমপ্লিট। তাইতো আজ তার পকেটে মাত্র দশ টাকা। অথচ সবজি দোকানে গিয়ে দোকানি বককর মিয়াকে বললেন,
-বুঝলা বককর, আমাদের সমাজের অবস্থা দিন দিন খারাপ অইতাছে। এই তো আমি পকেটে পাঁচশত টাকার দুইডা তাজা নোট নিয়া বাসা থেকে বের ওইলাম। ওমা! পথে একটা মোটর সাইকেলে চারজন গুন্ডা পোলা আইস্যা মোরে কয়, চাচা। টাইম কম। কুইকলি দিয়া দেন। আমি কইলাম তগোরে আমি কী দিমু? কয়, পেটে ছোঁরা ভইর‌্যা দিমু বুড়া। যা আছে দিয়া দে। জান বাঁচাইতে গিয়া টাকাগুলো অগোরে দিয়া দিলাম। তয় যাওনের সময় একটা পোলা মোরে ধন্যবাদ দেয়। কইলাম ধন্যবাদ দিয়া কী অইব। কয়। চাচা, আম্নের ট্যাকায় খাইমু ঘুরমু, মোবাইলে গার্ল ফ্রেন্ড এর সাথে রসের আলাপ করুম আর আম্নেরে একটা ধন্যবাদও দিবার পারুম না। এই রকম বে-শরম আমরা নই। এখন বুঝো। অগো পিড়িতের টাকাও আমারে সাপ্লাই দিতে অইব। বদ নছিব কারে কয়! ঘরে জ্বালা। বাইরে জ্বালা। এই কথা শুইন্যা সবজি ওয়ালা আলু, পটল, করলা, গাজর, শসা এক কেজি করে ব্যাগের মধ্যে ভইর‌্যা দিয়া কইল, নেন চাচা। ট্যাকা পরে পাইমুনে। আগে ঘর সামলান।
সবজি ওয়ালার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাশেম সাহেব রওয়ানা দিলেন মাছ বাজারের দিকে। পরিচিত এক দোকানিকে পেয়ে বড় একটা পাঙাশ মাছ পছন্দ করলেন। তারপর কইলেন,
-কী কইমু রইম মিয়া। ডায়াবেটিস বাইর‌্যা গেছে। ভাবলাম হাঁইট্টা বাজারে যাই। পেটের চর্বি কমবে। তোমার চাচি পাঙাশ ছাড়া অন্য কোনো মাছ নিলে ফোলা মাইর‌্যা বইয়া রয়। মান ভাঙাতে কাছে গেলে কয় তোমার ভড়্ আমি মোডা দ্যাখবার চাই। ভালো লাগে। আরাম পাই। পাশের বাসার মাইয়্যারা ডরে মোর লগে কথা কয় না। অগো স্বামী বাতাসের লগে পইড়া যায়। তোমার চাচী এখন বুঝুক মজা। মুই পেট লইয়া হাঁটতেও পারি না। পকেট চোর ক্যামনে টাকা নিছে কইবারও পারি নাই। এই কথা শুইন্যা দোকানি ব্যস্ত অইয়া বড় পাঙাশটা ব্যাগের মধ্যে ভইর‌্যা দিয়া কইল, নেন চাচা। আম্নে খানদানি মানুষ। ট্যাকা পাইমুনে।
মাছ ওয়ালার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাশেম সাহেব এবার গেলেন মাংসের দোকানে। তা-ও আবার পাশের বাসার গোলাম আলী উরফে কসাই মিয়ার দোকানে। গিয়ে কইলেন, তিন কেজি মাংস দিয়া দাও কসাই মিয়া। এই নামে কসাই মিয়াকে কেউ ডাকে না। গোলাম আলী নামে ডাকে। তাই আজ ‘কসাই মিয়া’ নামডা শুইন্যা তাঁর গিয়ার বাইর‌্যা গেল। নিজেরে ক্যাডার ক্যাডার মনে অইল। তাই মৃদু হাইস্যা কইলেন, তিন কেজি ক্যান্ মিয়া। পাঁচ কেজি নেও। ট্যাকার চিন্তা আমি করি না। হাশেম রিলাক্স মাইন্ডে বাজার কইর‌্যা রিক্সাতে উঠলেন। বাসার সামনে আসার পর রিক্সাওয়ালাকে কইলেন, দাঁড়াও। টাকা পাঠাইয়া দিতাছি। বলে, বাসার ভিতরে চলে গেলেন। কাজের মাইয়্যা কইলে ভুল অইব। তাঁদেরই এক আত্মীয় রাবুকে ডেকে তার হাতে দশ টাকার নোটটা দিয়ে কইলেন, রিক্সা ওয়ালারে দিয়া আয়। রাবু রিক্সা ওয়ালারে নিয়ে দশ টাকা দিলো। মাত্র দশ! অবাক হয়ে রিক্সা ওয়ালা কইল। জবাবে রাবু কয়। ভাগো মিয়া। চাচাজির এই মাত্র ডায়রিয়া শুরু অইছে। হ্যাঁর কন্ডিশন ভালো না। শেষে তোমারও ছুইট্টা যাইব। এটা কার এরিয়া জানো? বাকের ভাই’র। তাঁর লাইগ্যা আশে পাশে কেউ দোকান খুলে নাই। স্যালাইন পাইবা কই মিয়া। ভাগো! মুহূর্তের মধ্যে রিক্সা ওয়ালা চলে গেল।
শম্পা আর শাফি। হাশেম সাহেবের সন্তান। শম্পা এম,সি কলেজে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে। একটা আবৃত্তি সংগঠনের সাথেও সে জড়িত। শাফি পলিটিক্যাল সায়েন্স এ অনার্স ১ম বর্ষে পড়ে। পাড়ার মাঠে ক্রিকেট খেলে। সরল টাইপের ছেলে। বন্ধুর সংখ্যা তার একদম কম। বড় বোন শম্পা’র সাথে বন্ধুর মতো সে সবকিছু শেয়ার করে। পাশের বাসার কসাই মিয়ার পোলা সজল তার বোনকে ভালোবাসে। এ কথা সে ছাড়া আর কেউ জানে না, তাই মাঝে মধ্যে সজলদের বাসায় যায়। পরিবেশ দেখতে। সেই সুযোগে সজলের ভাই সাজু’র সাথে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তার কাছ থেকেই শাফি শুনেছে, সজল বাকের ভাই’র গ্রুপের সদস্য। তবে নামে আছে। কামে নাই। সজল বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী। বাকের ভাই এ জন্য সজলকে কোন কামে লাগায় না। বরং, শ’-পাঁচেক টাকা হাতে দিয়া কয়, শম্পারে কিছু কিন্যা খাওয়াইয় মিয়া। না খাইলে মাইয়্যারা মিডা মিডা কথা কয় না। পোলা অগো খাওয়ায় বেশি। সেই যে পোলার প্রতি হ্যারা দুর্বল অইয়া পড়ে। তয় আমাগো শম্পারে নিয়া সেই ডর নাই। তোমারে ছাড়া আর কোনো পোলারে সে পেয়ার করবো না। শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়া কথাটা কইলাম। আমার নাম বাকের। সবদিকে মোর সোর্স আছে। সব খবর রাখি। মুখে একটি সিগারেট জ্বালিয়ে দিয়ে বাকের ভাই বুম্ বুম্ কইর‌্যা মোটর সাইকেল নিয়া চইল্যা গেলেন।
দুপুর বেলা শুইয়া থাকনের সময় না। তবুও ববিতা বেগম শুইয়া রইছেন। প্রেশারটা বেড়েছে। কলবেল বেজে উঠল। রাবু দরজা খুইল্যা দিলো। পাশের বাসার একটা পোলা আইস্যা কয়। বাকী চাচা বাসায় আছেন? খবর আছে! বড় গলায় ববিতা বেগম কইলেন, এই পোলা। মুই সব শুনতাছি। মোর সোয়ামিরে তুমি বাকী চাচা কও! সাহস তুমি পাইলা কই?
-সাহস আবার পাইমু কই! বাজারের সককল দোকানি হ্যাঁরে বাকী চাচা কইতাছে। আমি কইলে দোষ কী? আম্নে খালি শুইয়া থাকেন। বডি নিয়া নড়াছড়া করতে পারেন না। এই সব খবর আম্নে জানবেন ক্যাম্নে! শম্পা আফায় যে পাশের বাসার কসাই মিয়ার পোলা সজল ভাইয়ের লগে পিড়িত কইর‌্যা অন্তরঙ্গ ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করেছে। সেইডা আম্নে জানেন? এই খবর দিতে মুই চাচারে খুঁজতে আইছিলাম।
-শম্পায় কী করছে?
-প্রেম করছে। বাকের ভাই’র দলের ক্যাডার সজল এর লগে।
-মাই গো, মাই! এই সব কী শুনতাছি!
-ঠিকই শুনছেন। লন্, এইবার মোরে এক গ্লাস শরবত দেন।
-খারাপ খবর নিয়া আইছ। খাওয়ামু কী। ভাগো!
শম্পা বাসায় আসলে মা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন সজলের লগে তাঁর প্রেমের গুঞ্জন সত্য না মিথ্যা? শম্পা কিচ্ছু বলার পূর্বে কসাই মিয়া বাইরে চিৎকার কলে বলছেন, যার বাপ্রে দোকানিরা বাকী চাচা কইয়া ডাকে তাঁর মাইয়ারে আমি পোলার বউ বানাইতে পারুম না। ববিতা বেগম তোমার মাইয়া তুমি যেখানে পারো সেখানে বিয়া দেও। মোর পোলার পিছে লেলাইয়া দিয়ো না। এই কথা শুনার পর তুমুল ঝগড়া লেগে যায়। সজল বাকের ভাইকে ফোন দেয় ঝগড়া থামানোর জন্য। বাকের ভাই আসেন। এসে ঝগড়া থামিয়ে বলে যান, আগামী কাইল মুই সজল এর লগে শম্পার বিয়া দিমু। দেখি কে থামায় সেই বিয়া। বাকের ভাই’র কথার উপরে কথা নাই। রাবু, ববিতা বেগমকে বুঝাইল। চাচীজান, আফামনি ভালো কাম করছে। পাত্র দেখাদেখির টেনশন নাই। খরচ কম। আম্নাগো জান বাঁচলো। হালা কসাই মিয়ার দোকান খালি কইর‌্যা মুই সককল মাংস আইন্যা ফ্রিজে ভইর‌্যা রাখুম। কৈ’র তেল দিয়া কৈ ভাজুম। চাচীজান, আমনে যাই কন্। সজল ভাই’র লাখান পোলা পাইবা না। এতো ভদ্র পোলা মুই জিন্দেগিতে দেহি নাই। আফামনিরে বুকের মধ্যে বাইন্দ্যা রাখব। এই তো সেদিন আফামনির জ্বর। ফোন কইর‌্যা সজল ভাইরে বোধ অয় কইছে। ওমা! সন্ধ্যা বেলা মোড়ের দোকানে মোরে পাইয়া সজল ভাই’য়ে কয়। রাবু আফা। শম্পা’র জ্বর উঠছে। কিছু খাইতেছে না। তুমি ওরে জোর কইর‌্যা না হয় কিছু খাওয়াইবা। নইলে উইক অইয়া যাইব। এমনিতেই মরা জান। মুই কইলাম, আচ্ছা। ভাইজান খাওয়ামুনে। মোরে একখান একশত ট্যাকার নোট দিয়া কইল, লও তোমার আগাম পেমেন্ট। মা গো মা! এখনই কী মায়া। বিয়া অইলে তো এই পোলা ছাড়াবাড়া অই যাইব। পোলার বাপ আবার হারামের আড্ডি। একদিন কী এক কাজে অগো বাসায় গেছিলাম। মোরে দেইখ্যাই বেডায় কয়, যা বেডি ভাগ! তোর শইল্যের গন্ধ সহ্য করা যাইতেছে না। মোর মাথা গরম অইয়া গেল। মুই কইলাম। চাচা মিয়া, আম্নের বউ’র শইল্যে গন্ধ নাই! রাইত অইলে তো হ্যাঁরে ছাইর‌্যা কথা কন্ না। কইলজার ভিতর গাঁথিথ রাখেন, সিনার লগে বান্ধি রাখেন। বেডায় তখন কিচ্ছু কয়বার পারে নাই। শুধু খালি হাসে।
পরদিন উভয় পরিবারের সম্মতিতে শম্পা’র সাথে সজলের বিয়ের বাদ্যি বাজল। পুরো অনুষ্ঠানের সার্বিক দায়িত্ব পড়ল বাকের ভাই’র উপরে। বিশেষ দায়িত্ব পড়ল রাবু’র উপর। শম্পা’র বাবা বাকী চাচাকে কেউ খুঁইজ্যা পাইতেছে না। দোকানিরা বলা বলি করছে, কাম শেষ অইয়া গেলে বেডায় আইয়া পড়ব। ফেইসবুকে সজলের সাথে শম্পা’র অন্তরঙ্গ ছবি দেইখ্যা আপাতত গুঁতি খাইয়া রইছে। যাই কও মাইয়্যা কিন্তু জিনিয়াস। সজলরে দিয়া বাকের ভাইরে ম্যানেজ করছে। যে হালায় অগো বিয়াতে বাধা দিতে আইব। বাকের ভাই তাঁরে সাইজ কইর‌্যা ফালাবো। বাকের ভাই তাঁর নাম।
কসাই মিয়া বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছেন। ভেতরের ঘরে মেহমানদের ভীড়। রাবু, কসাই মিয়ার কাছে গিয়া কইল,
-চাচা। মুই আইয়া পড়ছি।
-যা, ভেতরে যা। কনের সাথে কথা ক’গিয়ে।
-ক্যাম্নে যামু চাচা। মোর শইল্যে তো গন্ধ!
-আরে যা। বাকের মিয়া’র বিলাতি সেন্ট এর গন্ধে মোর নাক ডিপা লাইগ্যা রইছে। কিছু বুঝতাছিনা।
-ভয় পাইছেন চাচা! নাক খুইল্যা দেই? আমার নাম রাবু। বলেই সে কসাই মিয়ার নাকের মধ্যে রেক্সোনা ডিওডরেন্ট স্প্রে করলো। গন্ধ সইতে না পেরে কসাই মিয়া ওয়াক্ ওয়াক্ করছেন। এই ফাঁকে বাকের ভাই তার মোটর সাইকেল নিয়া চইল্যা যাইতাছেন দেইখ্যা রাবু কাছে গিয়া কইল্য, যাও কই মিয়া বাকের। মোরে লইয়া যাও। খরচ বাঁচাও। আশপাশের লোকজন হাসতাছে। এমন সময় রাবু চিৎকার কইর‌্যা কয়। হাসতাছো কী মিয়ারা। বাকের ভাই’র গুন্ডামী আইজ থাইক্যা শেষ। গন্ধ-টন্ধ যা আছে মুই দূর কইর‌্যা ফালামু। কী কন্ বাকের ভাই? লজ্জিত মুখে শুক্না একটা হাসি দিলেন বাকের ভাই। পাড়ার সবাই হাত তালি দিয়ে স্বাগত জানালো। বুম্ বুম্ শব্দে বাকের ভাই’র মোটর সাইকেল চইল্যা গেল দূরে। দূরে কোথাও। দূরে দূরে। আমার মন কেমন করে। দূরে কোথাও! দূরে...

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT