মহিলা সমাজ

ছেলেটা

নার্গিস মোমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০১-২০১৮ ইং ০১:৪০:২২ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত


স্বায়ত্বশাসিত কর্পোরেশনের অফিসার্স হোস্টেল। সময়টা শীতকাল। স্বাভাবিকভাবে শীতটা খুব না জমলেও মোটামুটি শীত পড়েছে। ডাইনিং-এ রান্নায় ব্যস্ত রহিমা। বাজার-ঘাট এসব কাজে পটু রয়েছে একটি ছেলে। তার নাম কামিল।
-কামিল। (২০২ নং রুম থেকে ডাক)।
-জ্বী স্যার।
-আমার গরম পানি দাও গোসল করবো।
-দিচ্ছি স্যার।
-কামিল। (২০৩ নং রুম থেকে ডাক)।
-জ্বী স্যার।
-কিরে আমার গরম পানি হলো?
-দিচ্ছি স্যার।
-কামিল। (২০১ নং রুম থেকে ডাক)।
-জ্বী স্যার।
-আমাকে এক বালতি গরম পানি দাও।
-দিচ্ছি স্যার।
এভাবেই শীকালে দুপুর বারোটার পর গোসলের জন্য গরম পানি নেয়ার প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। অন্য দিকে আমি থাকি ২০৮ নং রুমে। ডাইনিং থেকে একশত ফুট দূরে। আমার গোসলের গরম পানির সিরিয়াল বুঝতেই পারছেন কি অবস্থা হয়। ইতোমধ্যে রহিমার রান্না শেষ। ডাইনিং টেবিল গোছানোর কাজও কামিল শেষ করলো। অফিসাররা টেবিলে খেতে আসবেন। কামিল তাদের খাবার পরিবেশন করবে। রান্নাঘরে রহিমা একে একে সব বাটিতে তরকারি, ডিশে ভাত প্রস্তুত করে রেখেছে। দুপুর দু’টা থেকে আড়াইটার মধ্যে সকলের খাবার শেষ। কারণ দু’টার পর আবার অফিস শুরু বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত।
বেচারা কামিল তার স্যারদের খাবার পরিবেশন করতে এতক্ষণ নাভিশ্বাস উঠে গেছে। এবার রহিমা (সম্পর্কে কামিলের মামী) আর কামিল দুপুরের খাবার খেয়ে রহিমা তার বাড়িতে চলে গেলো, অন্যদিকে কামিল দুপুরের খাবারের পর ডাইনিং সংলগ্ন ছোট্ট তার একটি বিশ্রাম কক্ষে বিছানায় গা টা এলিয়ে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হলো, এমনই সময় অবাধ্য মোবাইলটা বাজতে শুরু করলো। ঘুমের ঘোরেই মোবাইল রিসিভ করে কামিল।
-আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
-কামিল লন্ড্রি থেকে আমার কাপড়গুলো নিয়ে রেখো।
-জ্বী স্যার।
-আবার ঘুমে বিভোর। আবার মোবাইল বেজে উঠলো।
-আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
-কামিল আজ রাতের কোচে ঢাকা যাব। আমার টিকিটটা করে নিয়ে এসো।
-জ্বি স্যার।
-ছেলেটি আবার ঘুমের চেষ্টা করছে, তন্দ্রা তন্দ্রা ভাব। আবার মোবাইল বেজে উঠলো।
-আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
-কামিল আমার মোবাইলে টাকা লাগবে। তুমি বাজারে গিয়ে আমার এই নাম্বারে টাকা দিও।
-জ্বী স্যার।
এবার ওর ঘুম হালকা হয়ে গেছে। কিন্তু বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করছে না। বার বার কাঁচা ঘুম থেকে জেগে তার মাথাটা কেমন লাগছে। চোখ বন্ধ করে বালিশে মাথা গুঁজে কোনো রকম বিছানায় পড়ে থাকা। আবারও মোবাইল বাজছে।
-আসসালামু আলাইকুম।
-কামিল আমার কয়েকটা ঔষধ আনতে হবে। এর মধ্যে বেশি জরুরি প্রেসার এর ঔষধ। ঔষধের দোকানে গিয়ে আমাকে ফোনটা লাগিয়ে দিও।
-জ্বি স্যার।
এই হলো কামিলের বিকালের ঘুম। বিকাল পাঁচটার পর তার স্যারদের অর্ডার অনুযায়ী কাজ করতে ছুটতে হলো। দাঁতখানি চাল, মুসুরীর ডাল এর মতো। সন্ধ্যায় ডাইনিং এর বাজার এনে তার রহিমা মামীকে দিয়েই ২০৮ নং রুমের অভিমুখে দৌড়।
-ম্যাডাম, ম্যাডাম দরজা খুলেন আমি কামিল।
-কি হয়েছে?
-ম্যাডাম অনেক মাথা ব্যাথা, আপনি আমাকে ঔষধ দেন।
-ভাত খেয়েছো?
-জ্বী ম্যাডাম।
-ঔষধ দিচ্ছি বসো।
কামিল প্রায়ই এভাবে ম্যাডামের কাছে ছুটে আসে তার মাথা ব্যাথার কারণে। এই বিষয়টি ম্যাডামের অপরিচিত নয়। ছেলেটি ঔষধ খেয়ে মাঝে মধ্যে ঘণ্টাখানেক শুয়ে থাকে। আবার রাত সাড়ে নয়টার পর চলে রাতের খাবারের জন্য হাঁক ডাক। রহিমা যথা সময়ে রান্না শেষ করে বাড়িতে চলে যায়। কামিল রাত্রে অফিসারদের খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। খাবার শেষে টেবিলে কিছুক্ষণ গল্প গুজব চলে। মাঝে মধ্যে চায়ের অর্ডারও চলে। ধুয়ায়িত গরম চায়ে চলে যায় আরো কিছুটা সময়। কামিল ততক্ষণে রান্নাঘরে বসে রাতের খাবার খেয়ে নেয়। অফিসাররা চলে যাবার সাথে সাথেই কোনো রকমে দরজা লাগিয়ে বিছানায় গিয়েই ঘুম। রাতের ডাইনিং টেবিল প্রায়ই অগোছালো পরে থাকে।
পরদিন ভোরে রহিমা মামীর হাক ডাকে চোখ কচলাতে কচলাতে কোনো রকমে দরজাটা খুলে আবার বিছানায়। সকালের নাস্তা যথা সময়ে তৈরি হলো। এবার রহিমা ডাকতে শুরু করে।
-কামিল, সাড়ে সাতটা বাজে। স্যাররা নাস্তা খেতে চলে আসবেন। তুমি ওঠো তাড়াতাড়ি।
-উঠি মামী।
রহিমা টেবিল গোছানো শুরু করে দেয়। দু’একজন অফিসার চলেও আসেন।
-কামিল কই? নাস্তা দাও।
শব্দ শুনেই এক লাফে উঠে রান্নাঘরে। তাড়াতাড়ি টেবিল মুছে, গ্লাস ধুয়ে, পানির জগ সামনে দিয়ে, রেডি নাস্তার প্লেট তার স্যারদের সম্মুখে হাজির। এভাবেই চলে সকাল বেলাটা। সাড়ে আটটার মধ্যে ডাইনিং জনশূন্য। রহিমা কামিল নাস্তা শেষে রহিমা যায় বাড়িতে, কামিল যায় বাজারে।
প্রায়ই অফিস ছুটির পর দূর থেকে দেখা যায় সুন্দর চকচকে একটি সাইকেলের সামনে ব্যাগ ভর্তি বাজার আর আরোহী কামিল ছুটে আসছে। এরই মধ্যে রহিমা ডাইনিং এ এসে তার ধরা বাধা কাজ শুরু করে দিয়েছে। এই হলো কামিলের নিত্য দিনের কাজ। এছাড়াও আরো কত ধরনের কাজ তাকে করতে হয়। স্যারদের ফরমায়েশ মতো কো-অপারেটিভ থেকে তৈল চিনি আনা। কেন স্যার কখন নদী পার হয়ে তাদের গন্তব্যে যাবেন তখন তাদের সাহায্যকারী হওয়া ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক কাজে কামিলকে ব্যস্ত থাকতে হয়।
হাসি-খুশি উচ্ছ্বাস প্রাণবন্ত, চঞ্চল কিন্তু অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলে কামিল। প্রাইমারী পড়ালেখা অতিক্রম করে মাধ্যমিক পরীক্ষাও ভালোমত সে অতিক্রম করেছে। অনেক আশা আকাঙ্খা নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। প্রথম বর্ষটা ভালোমত কাটলেও যত বাধা বিপত্তি এসে দাঁড়ালো দ্বিতীয় বর্ষে। কামিলের বাড়ি কারখানার কাছেই ফকির টিলা। বাবা জীবিত নেই। মা আছেন। আট ভাই-বোনের অতি আদরের ভাই হলেও তাদের অভাব অনটনে টানাপোড়েনের সংসারে তার পড়ালেখার খরচ যোগান দিতে না পেরে ফাইনাল পরীক্ষার জন্য ফর্ম ফিলাপ আর সম্ভব হয় না। অত্যন্ত কষ্ট নিয়ে দুঃখের সাথে তাকে কলেজ ত্যাগ করতে হয়। ছাত্র হিসেবে খারাপ ছিল না। তবে সমসাময়িক বন্ধুরা আজ পড়ালেখা শেষ করে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব স্বচক্ষে দেখে একদিকে তার গর্ব হয় যে, তারই স্কুল জীবনের বন্ধুরা ভালো পজিশনে রয়েছে অন্যদিকে অভাবের তাড়নায় পড়ালেখা করতে না পারার কষ্টটা তাকে ভাবিয়ে তোলে।
কলেজ থেকে বের হয়ে তিন দিনের মধ্যেই শুরু হয় তার কর্মময় জীবনের সংগ্রাম। তারই কলেজের সম্মুখস্থ রাস্তার কাজে ঠিকাদারের নিয়ন্ত্রণে লেবারের কাজ করতে শুরু করলো। প্রতিদিন মাথাপিছু ২৫ টাকা দরে। এভাবে সে পর্যায়ক্রমে নদীরঘাটে বালু সিমেন্টের কাজে লেবারের কাজ, নির্মাণ শ্রমিকের কাজ, কাঠ মিস্ত্রির কাজ, রাজমিস্ত্রির কাজ সবই সে করেছে। গা-গাতরে খেটে সে কাজ করেছে। কোনো খারাপ সংস্পর্শ তাকে পায়নি। ফলে একদিন লাফার্জ সিমেন্ট কারখানায় অফিস সাইডে পাঁচ বছরের চুক্তিতে সে কাজ পায়। নিষ্ঠা ও সততার সাথে পাঁচ বছর সে চাকুরি করেছে। পরবর্তীতে কামিলের পিতার চাকুরির সুবাদে ছাতক সিমেন্ট কারখানায় দৈনিক ভিত্তিক কাজে প্রবেশ করে অফিসার্স হোস্টেলে। এই অফিসার্স হোষ্টেলে কারখানার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শুরু করে বিভাগীয় প্রধানগণ ও শাখা প্রধানসহ ডজন খানেক অফিসার ব্যাচেলার হিসেবে বসবাস করছেন। সেখানেই কামিল কাজ করছে। অত্যন্ত পরিশ্রমী একটি ছেলে এই কামিল। দীর্ঘ এগারো বছর সততা ও পরিশ্রমের সাথে কাজ করে যাচ্ছে ফলে অফিসারগণ সবাই তাকে ভালো জানেন। এ কারণেই তাকে অতিরিক্ত কাজের জন্য নতুন প্রজেক্টে কর্তৃপক্ষ নিয়েছেন। এই কাজ ছাড়াও সে নিজে রিকসা কিনে ভাড়া দিয়েছে কিছু উপার্জনের আশায়। বর্তমান যুগের ছেলেরা মুহূর্তেই বখাটে বনে যায়। অথচ কামিল তাদের দলে নেই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT