সম্পাদকীয়

পানির স্তর নীচে নামছে

প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০১-২০১৮ ইং ০০:৫৯:২৫ | সংবাদটি ১৪০ বার পঠিত

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নামছে। অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ দ্বারা পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। আর এই সমস্যাটি দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, এই ব্যাপারে এখনই সতর্ক না হলে অদূর ভবিষ্যতে সুপেয় পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। তাদের মতে প্রতি বছর পানির স্তর দু থেকে তিন মিটার করে নীচে নামছে। ভূগর্ভের পানির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমিয়ে না আনলে আগামী পাঁচ বছরে পানির স্তর নীচে নামার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে। এতে আর্সেনিকের মাত্রাও বেড়ে যাবে। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানীয় জলের অভাব দেখা দিয়েছে। পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় নলকূপে পানি উঠছে না। বিশেষ করে শুষ্ক মওসুমে সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের সচেতনতার বিকল্প নেই।
সরকারের কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএডিসি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ এর দশকে মাত্র ৫০ ফুট নীচ থেকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করা যেতো। কিন্তু এখন একশ’ ৫০ ফুট কিংবা কোথাও তারও নীচে থেকে পানি উত্তোলন করতে হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত মাটির নীচ থেকে যে পানি উত্তোলন করা হয় তা নদী খাল বিল ও মাটি থেকে তৈরি হওয়া। পানি উঠালে প্রাকৃতিকভাবেই সেই শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু এখন আর নদী খাল বিল থেকে ভূগর্ভে পানি যাচ্ছে না। অর্থাৎ ভূগর্ভের পানি উত্তোলনের পর সেই শূন্যস্থান অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। এর কারণ হলো সেচ ব্যবস্থা। বিশেষ করে বোরো মওসুমে প্রতি বছর যে হারে পানি সেচের জন্য ভূগর্ভ থেকে তোলা হয় সেই পরিমাণ পানি মাটির নীচে যায় না।
অতীতে বিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎসগুলো ছিলো নদী-নালা, পুকুর বা জলাধার। মূলত স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত দেশের মানুষের কাছে ভূপৃষ্ঠের অর্থাৎ পুকুর, নদী-নালা বা বৃষ্টির পানিই ছিলো পানীয় জল অথবা সেচের প্রধান উৎস। ৭০ এর দশকের শুরুতে কৃষি কাজের জন্য দেশে প্রথম ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু হয়। আশির দশকে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। সেই যে শুরু, আর থামানো যায়নি। এখন তো রীতিমতো এই প্রক্রিয়া ‘ভয়ংকর’ রূপ নিয়েছে। গত চার দশকে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে শতভাগ। খাবার পানি ছাড়াও রান্না, গোসল, ধোয়া-সেচ এমনকি দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে মানুষ। এখন সুপেয় ও সেচ কাজে চাহিদার ৮০ ভাগ পানি আসে ভূগর্ভ থেকে।
বাংলাদেশে কী পরিমাণ গভীর অগভীর নলকূপ রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন সংস্থার মতে সারাদেশে কমপক্ষে ৫০ লাখ নলকূপ রয়েছে। এই নলকূপ থেকে সেচের জন্য, খাওয়ার জন্য ও শিল্পের জন্য পানি উত্তোলন করা হয়। এর ফলে আমাদের পাতাল পানি বা গ্রাউন্ড ওয়াটারের লেবেল প্রতি বছর গড়ে পাঁচ মিটার নীচে নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানি থেকে মাত্র এক মিটার ভূগর্ভে পানি রিচার্জ হচ্ছে, বাকি চার মিটার থেকে যাচ্ছে অপূর্ণ। আরও দুঃসংবাদ হচ্ছে, নদী-হাওরের পানি নানান বর্জ্যে দূষিত হওয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানিও দূষিত হচ্ছে। আর আর্সেনিকতো আছেই। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য একটা মহাবিপর্যয় অপেক্ষা করছে। এমন আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞগণ। তাই নলকূপে পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, ভূপৃষ্ঠের পানি দূষণ রোধ করতে হবে। সর্বোপরি পানির ব্যাপারে দরকার সর্বোচ্চ সচেতনতা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT