উপ সম্পাদকীয়

সময়ের হালচাল-ভুক্তভোগীর ভাবনা

মো: মোস্তফা মিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০১-২০১৮ ইং ০১:০১:০৪ | সংবাদটি ৮৬ বার পঠিত

বাংলাদেশের যা কিছু অর্জন তার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সফলতা। আবার যা কিছু ব্যর্থতা তার মূলেও রয়েছে রাজনৈতিক ব্যর্থতা। নবাব সিরাজের পতনের পর থেকে গণমানুষের যে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অধিকার তথা গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তা আজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি। তার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব শতভাগ দায়ী। প্রতিটি রাজনৈতিক সংগ্রামে গণমানুষের সর্বাধিক স্বার্থের কথা বলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করে ছিল এবং সর্বাধিক গণমানুষও আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিল। আবার রাজনৈতিক নেতৃত্বও গণমানুষের সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিত করার কথা বলে রাজনৈতিক সার্বভৌম ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক সুবিধার টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলেও গণমানুষের মূল্যবোধ ভিত্তিক সর্বাধিক প্রত্যাশা কখনো পূরণ করা সম্ভব হয়নি। গণমানুষ বার বার প্রতারণার স্বীকার হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তার যে, ইতিবাচক পরিবর্তন হবে তার কোন সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য যে অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক ছিল তা আজও প্রনয়ণ করা সম্ভব হয় নাই। আজও নীতি প্রনয়ণের সাথে রাজনৈতিক দুষ্ট চক্র এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সমূহ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে অদৃশ্য ভাবে জড়িত। এই গোষ্ঠী ও চক্র সমূহ রাষ্ট্রের সর্বাধিক উপকার ভোগী।  
রাজনৈতিক ময়দানে উদার দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা না থাকার কারণে রাজনীতিকদের মধ্যে রাজনৈতিক সুসম্পর্ক উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে অংশগ্রহণ মূলক সময় উপযোগী টেকসই সর্বজনীন রাজনৈতিক পরিকল্পনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রাষ্ট্র বা সমাজ ব্যবস্থার সকল উন্নয়নের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বিদ্যমান না থাকার কারণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমূহ হোচুট খাচ্ছে, আবার যুগের চাহিদা ভিত্তিক মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন পরিকল্পনা না থাকার কারণে জনশক্তিকে পেশাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে একদিকে অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে অপর দিকে ঠিক একই ভাবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা জ্যামেতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাথে সাথে বৈষম্যমূলক ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কোন মূল্যে বিশাল অর্থ-বৃত্তের পিছনে সমাজের সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগীতা চলছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সততা ও নৈতিকতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। সততা যাদুঘরে স্থান পাচ্ছে। সততার মর্যাদার স্থান দখল করে সমাজের অসত চক্র এবং তাদের প্রভাবই স্থান পাচ্ছে সমাজে।      
ব্যক্তি, পরিবার, সামাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হচ্ছে অনৈতিক আকাঙ্খা-যা প্রকৃতির নীতি বিরোধী। এই অনৈতিক আকাঙ্খা পূরণের ক্ষেত্রে আর্থিক লোভের বিষয়টি মূখ্য ভূমিকা পালন করছে। অতি আর্থিক লোভের কারণে সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের এবং সম্পদের ইনসাফ ভিত্তিক বণ্টনের ক্ষেত্রে জ্যামেতিক হারে ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ী পর্যন্ত ক্রেতাদেরকে ওজনে কম দেওয়া একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ২৫০ গ্রাম পণ্যের মধ্যে ১৫ গ্রাম পূণ্য কম দেওয়া হয়। ডিজিটাল নিক্তির নামে ডিজিটাল জালিয়াতি করা হচ্ছে। আবার সমিতির নামে ব্যবসায়ী জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। মনিটর কর্তৃপক্ষের অনৈতিক লোভ ও অদৃশ্যমান চাপের কারণে কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম হচ্ছে না। পৃথিবীতে প্রতিটি ধর্মের আগমন ঘটেছে অধর্মকে বিনাশ করার জন্য এবং এর ফলে বহু জাতি ও জনপদ সৃষ্টিকর্তা ধ্বংস করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তÍ ্ইতিহাস জানা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধর্ম্মাবলী লোকজনের মধ্যে অধার্মিক কর্মকান্ড সমূহ লোপ পাচ্ছে না। ধর্মীয় বিধি-বিধানও অধার্মিক কর্মকান্ড সমূহ প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থার মানবিক বোধ সম্পন্ন ইতিবাচক উন্নয়নে বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষিত পেশাজীবিরা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা উত্তর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁ বিপ্লবের মতো। তাঁদের সেই গৌরবউজ্জ্বল ভূমিকাও কালের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। মানব সভ্যতার সমৃদ্ধ প্রতিটি জনপদ তখনই ধ্বংশ হয়েছে যখন অনৈতিকতা চরম পর্যায়ে পৌছেছে। চলমান সময়ের মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অবকাশ রয়েছে।
বৈষম্যমুক্ত সর্বজনীন কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা ভূখন্ডগত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্জন করতে সক্ষম হলেও মানবিক বোধ সম্পন্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় নাই। স্বাধীনতা উত্তর আইনের শাসনের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ নির্মাণ করা সম্ভব হয় নাই। দুর্নীতিমুক্ত যে দেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল তা আজও স্বপ্ন হয়ে আছে। সর্বজনীন যে মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক বন্ধন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে বজায় রাখা সম্ভব হয় নাই।  আদৌ সেটা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে কি না তারও কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পরস্পরের মধ্যে হিংসা-প্রতিহিংসা, প্রচন্ড সন্দেহ-অবিশ্বাস সমাজকে পর্যায়ক্রমে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নীতিবান ও নীতিবাক্যকে ঘৃণা করা হচ্ছে এবং নীতি ভঙ্গকারীকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। নীতি ভঙ্গকারীকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা চলছে।
আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার সরকারি-বেসরকারিসহ প্রত্যেকটা স্তরের সেবা সমূহ প্রশ্নবিদ্ধ। সমিতি বা ইউনিয়নের নামে প্রত্যেকটা স্তরে সংখ্যালঘু কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠকে অনিয়মের মাধ্যমে শোষণ করছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিরবে সহ্য করছে। প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না, কারণ সমিতি ধর্মঘট ডাকলে সব অচল হয়ে যাবে। সংখ্যালঘুর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে রাষ্ট্র সর্বাধিক জনস্বার্থে রাষ্ট্রের সার্বভৌম আইন প্রয়োগে ব্যর্থ।
পরিবহণ সেক্টরের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত টাউন বাস না থাকার কারণে সিএনজি উল্লেখযোগ স্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগে। কিন্তু জনস্বার্থে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে ভুক্তভোগীদের মতে, বর্তমানে সিএনজি চালকগণ সমিতি/স্ট্যান্ডের নামে রীতিমতো চাঁদাবাজীর ন্যায় যাত্রীদের নিকট থেকে ভাড়া আদায় করছে। ভুক্তভোগীগণ নিরবে সহ্য করে যাচ্ছেন, কারণ তাদের কথা বলার জায়গা নাই। যারা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে অনিয়ম প্রতিরোধ করার কথা তাঁরা নিরব। যেখানে ৫ টাকা ভাড়া সেখোনে প্রশাসনের সম্মুখে ১০ টাকা নেয়া হচ্ছে, ১০ টাকার পরিবর্তে ১৫ টাকা, ১৫ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা নেয়া হচ্ছে। শহর থেকে শহরের বাহিরে যেখানে ৪০/৪৫ কিলোমিটারের দূরত্বের (পাঁকা+ভাঙ্গা রাস্তাসহ) জন্য ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৫০ টাকা, সেখানে ভাঙ্গা রাস্তার দোহাই দিয়ে সমিতির একক সিদ্ধান্তে স্বৈরাচারী কায়দায় ১৫ কিঃমিঃ দূরত্বের জন্য (সিলেট-সুলতানপুর রোডে) ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৪০/৪৫টাকা। ভাঙ্গা রাস্তায় চালকের চেয়ে যাত্রীগণ শারীরিক এবং মানসিকভাবে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু যাত্রীদের কান্না কেউ শুনতে পায় না। যেখানে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ সমিতি/স্ট্যান্ডের নিকট জিম্মি, সেখানে যাত্রীগণ আরো বেশী অসহায়।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, রাষ্ট্র বা সমাজ ব্যবস্থার প্রত্যেকটি সেক্টরের দায়িত্বশীলরা শারীরিক এবং মানসিকভাবে কোন না কোন অনিয়মসহ বিভিন্ন দুর্নীতির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। ফলে অনিয়মসহ বিভিন্ন অমানবিক কর্মকান্ডের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সকল দায়ভার রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের এবং তা এড়িয়ে যাবার তাদের কোন সুযোগ নাই। মহাকালের যাত্রা পথে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ জবাব দিতে বাধ্য। বিধায় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং সকল অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করার মাধ্যমে সর্বাধিক জনকল্যাণমূলক স্বার্থ সুরক্ষায় তৎপর হওয়া আবশ্যক।  
লেখক : অধ্যক্ষ-নর্থইস্ট বালাগঞ্জ কলেজ, সিলেট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কাবিনবিহীন বিয়ে, প্রতারণা ও আমাদের আইন
  • স্মার্টফোনে বন্দি জীবন
  • দৃষ্টিপাত নেশার নাম ড্যান্ডি!
  • আইনজীবী-সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম চৌধুরী
  • সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল কবে শেষ হবে?
  • রাস্তাটির সংস্কার চাই
  • প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি
  • শিক্ষা ব্যবস্থা
  • আবর্জনা সমস্যা : উৎপাদনের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে
  • উচ্চশিক্ষায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রয়োজন
  • সিটি নির্বাচন : কাকে ভোট দেব?
  • রথযাত্রা
  • বিবেক দ্বারা হোক পথ চলা
  • মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার
  • পাহাড় বিষয়ে সচেতনতা দুর্ঘটনা রোধ করতে পারে
  • আপন ভুবন, অচেনা আকাশ
  • কওমি বোর্ডের রেজাল্ট পর্যালোচনা
  • স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী
  • পানি সংকট এবং ভবিষ্যত বাংলাদেশ
  • তুরস্কের নির্বাচন দেখে এসে
  • Developed by: Sparkle IT