উপ সম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস

মোঃ রফিকুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০১-২০১৮ ইং ০১:০২:২০ | সংবাদটি ৮৬ বার পঠিত

১০ই জানুয়ারি ১৯৭২, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালো রাত্রিতে পাকিস্তান বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের অন্ধকার কারা প্রকোষ্টে বন্দি করে রাখে। এদিকে পাক হানাদার বাহিনী ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে নিয়াজী ও টিক্কাখানের নেতৃত্বে নিরস্ত্র ও নিরীহ স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর অভিযান পরিচালনা করে নির্বিচারে গুলি করে মারতে থাকে। এ যেন হত্যাযজ্ঞের এক মহাউৎসব। প্রাণভয়ে সাধারণ লোকজন দিকবিদিক ছুটতে থাকে। শহরের-বন্দরের মানুষজন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে থাকে। বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসে এক মহা অমানিশা।
সাড়ে সাত কোটি বাঙালি যখন পাকিস্তানীদের হাত থেকে মুক্তির জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল তাদের সাংবিধানিক অধিকার বিশেষ করে ভোটাধিকার নিয়ে, তখন পাকিস্তানী শাসকদের মাথায় বাড়ি পড়ে। কিভাবে পূর্বপাকিস্তানী জনগণকে তা থেকে বিচ্যুত করা যায়? জেল, জুলুম ও হত্যা চালিয়ে বাঙালিদের আন্দোলন সংগ্রাম দমন করা যায়। তারা সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যখন বাঙালিদের দমন করা যাবেনা, তখন পেশীশক্তি ও অস্ত্রের জোরে পূর্ব পাকিস্তানের আজকের বাংলাদেশকে শ্মশানে পরিণত করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে উন্মেষ ঘটেছিল, তা তারা বুঝতে পারে নাই।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসিত প্রভৃতি আন্দোলনে বাঙালিদের দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বুঝেও অখন্ড পাকিস্তানের রক্ষায় হেন কাজ নেই যেটা বা স্টীম রোলার তারা চালায় নাই। ব্রিটিশের দুইশত বছরের গোলামী মানুষের মন থেকে মুছে যেতে না যেতে পাক-বাহিনীরা জোর দবস্তি করে আরো চব্বিশ বছর গোলামীর জিঞ্জিরে বাঁধিয়ে রাখলো। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যে স্বপ্ন নিয়ে ভারত উপমহাদেশ থেকে দ্বিখন্ডিত হলো তা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আশায় গুড়েবালি হলো। দিনকে দিন মাস কে মাস, বছরকা বছর পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের বেড়াজাল তৈরি করে। পূর্ব বাংলার জনগণকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে অট্টালিকা-প্রাসাদ বাণিজ্যকেন্দ্র, ব্যাংক-বীমা, প্রশাসন, প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে লাগলো। পূর্ববাংলা প্রদেশটা যেন তাদের কাছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান-বিজ্ঞানে শাসক প্রশাসনে উপেক্ষিত হতে লাগল। বাংলার জনগণের ধৈর্য্যরে বাঁধ আস্তে আস্তে ভেঙে যেতে শুরু হলো। ভাষার প্রশ্নে স্বাধীকারের প্রশ্নে জাতির মহান নেতারা হোসেন সোহরাওয়ার্দী, এ.কে.এম ফজলুল হক, মৌলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ এই শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন।
তারা প্রথমেই ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রণ্ট নির্বাচনে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী মুসলিম লীগকে ৩০৯ আসনের মধ্যে ৩০০ আসন লাভ করে সূচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এই রায় ছিল ১৯৪৭-৫৪ পর্যন্ত পাকিস্তানীদের কুশাসনের ও বৈষম্যের প্রতি বাংলার জনগণের ঘৃণার প্রতিফলন। এই রায়কে দেশে-বিদেশে ব্যালটবাক্স বিপ্লব বলে অভিহিত করা হয়। ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষী রাষ্ট্রভাষায় স্বীকৃতি পায়। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান যখন মার্শার’ল জারী করেন তখন পূর্ব বাংলার জনগণের মনের মধ্যে স্বাধীকার আন্দোলনের বীজ দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। ইতোমধ্যে ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিমলীগ আওয়ামীলীগ নাম ধারণ করেন। আর তখন এই পরিস্থিতিতে আওয়ামীলীগ আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ সংগ্রাম শুরু করে।
১৯৬৬ সালে জাতির জনক বাঙালি জাতির সামনে ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন এবং ঘোষণা দেন এই ছয় দফা বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর এই ছয় দফাকে নস্যাৎ করার জন্য আগরতলা ষড়যন্ত্রের নাটক সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৮ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাবার জন্য নির্বিচারে ধর-পাকড় শুরু করে অন্ধকার কারা প্রকোষ্টে ঢুকান। তাতে বাংলার জনগণ স্বাধীকারের স্বপ্ন বাদ দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পূর্ব বাংলায় হরতাল প্রতিরোধ মিছিল মিটিং বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। ছয় দফা বাঙালি জাতির কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা বিদ্বেষ জন্মিতে থাকে। বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামীলীগ নেতৃবন্দের মুক্তির দাবিতে সমস্ত পূর্ববাংলা যখন আন্দোলন সংগ্রামে টালমাটাল, তখন আইয়ুব খান ক্ষমতা ছেড়ে ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে পর্দার অন্তরালে চলে যায়। বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্ধির মুক্তি দিয়ে ইয়াহিয়া খান যথাসময়ে নির্বাচন দিবেন বলে পূর্ববাংলার জনগণক আশ্বস্থ করতে চেষ্টা চালান। এদিকে তখন ছাত্র আন্দোলন প্রচন্ড রূপ ধারণ করে। ১৯৬৯ সালে ছাত্র সংগঠনগুলো একত্রিত হয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এতে বাঙলার জনগণের মুক্তির সনদ ছয় দফার সাথে এগার দফা যেন স্বাধীনতার জন্য আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল। আওয়ামীলীগ ও ছাত্র আন্দোলনের কর্ণধার হয়ে গেলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বাংলার মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে গেলেন। এই ১৯৬৯ সালের ছাত্র-জনতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করে।
ইয়াহিয়া খান ৭০ সালে নির্বাচন দিলেন। প্রাদেশিক পরিষদে এই নির্বাচনে ১৬৯ আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ পায় ১৬৭ আসন। নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পরিষদ গঠনের জন্য ১লা মার্চ নির্ধারণ করা হলো। কিন্তু ইয়াহিয়া খান পরবর্তীতে তা স্থগিত করেন। এতে বাঙালিরা বুঝে গেল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ কায়দায় ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তাই তারা বঙ্গবন্ধুর আদেশ নির্দিশের অপেক্ষায় প্রহর গুণতে লাগলেন। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ১-৬ সারা বাংলায় হরতাল পালন করা হয়। অবশেষে সাতই মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে তার আজীবন সংগ্রামের অভিজ্ঞতার নিরিখে ১৯ মিনিটে যে ভাষণ দেন তাতেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। প্রায় দশ লক্ষ জনগণের উপস্থিতিতে ও মুহুর্মুহু করতালী ও সমর্থনে সেদিন ঢাকা আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকে। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তুমি কে আমি কে বাঙালি-বাঙালি ইত্যাদি।
অবস্থা বেগতিক দেখে ইয়াহিয়া-ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তান এসে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে ১৬ মার্চ থেকে আলোচনা শুরু করে। কিন্তু তাদের এই আলোচনার পিছনে ছিল নাটক ও ষড়যন্ত্র। আলোচনা চলবে, আলোচনার দ্বার বন্ধ নয় বলে হঠাৎ ২৫শে মার্চ ইয়াহিয়া-ভুট্টো গোপনে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়। নির্দেশ দিয়ে যায় টিক্কাখান ও নিয়াজীকে বাংলা ও বাংলার জনগণকে খতম করে দেওয়ার জন্য। নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষ নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে এবং রাতের আধারে বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডির ৩২নং বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিক্ষেপ করে। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতারের পূর্বে তার বার্তার মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা করে যান। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয় বৈদ্যনাথ তলায়। ১৭ এপ্রিল প্রবাসী সরকার শপথ গ্রহণ করে। কর্ণেল এম.এ.জি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনাক করে ১১টা সেক্টরে সৃষ্টি করা হয়। এসব সেক্টর প্রধানরা সামরিক বাহিনীর লোক ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনী গঠন করে সারা পূর্ব বাংলায় যুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে। স্বদেশী, বিদেশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সহযোগিতা ও সমর্থনে বাংলার সূর্য সন্তানরা দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করার মরণপণ লড়াই করে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হয়। দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের ও দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রচিত হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী হায়েনার বাঙালি মুক্তিবাহিনীর নিকট রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে। তখনও বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্টে। তাঁর অন্ধকার সেলের পাশে হানাদার বাহিনী কবর কুড়ে রেখেছিল। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমি ফাঁসির কাষ্ঠে গিয়েও বলব আমি বাঙালি; বাংলা আমার ভাষা, আমার বাঙালিকে মাথা নত করতে দেব না। তোমরা আমার লাশটা আমার বাঙালিদের কাছে পাঠিয়ে দিও। পাকিস্তানী গোষ্ঠী জেলের মধ্যে তাকে নানাভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করে স্বাধীনতা থেকে সরে আসার জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু তিনি মেনে নেন নাই। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিবেকের কাছে নরাধম, নিষ্ঠুর শাসকগোষ্ঠী ৮ই জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করে দেয়। বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিমানে প্রথমে লন্ডন, পরে ভারত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি ঢাকায় এয়ারপোর্টে অবতরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম.এ.জি ওসমানীসহ মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার বঙ্গবন্ধুকে ঢাকায় এয়ারপোর্টে রাষ্ট্রীয় সালাম দিয়ে ঐতিহাসিক জনসভায় নিয়ে আসেন। এখানে বঙ্গবন্ধু তার স্বাধীনতার আন্দোলনের স্বপ্নের কথাও নয় মাস কারা নির্যাতনের কথা জাতির কাছে তুলে ধরেন। জাতির কাছে তার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার অঙ্গীকার করেন।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সাংহাইর সর্বোত্তম বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন
  • মাদক ও তরুণ প্রজন্ম
  • নির্বাচনের গুরুত্ব ও ভোট
  • প্রাথমিক শিক্ষার গবেষণাধর্মী বই
  • কেমন মেয়র চাই
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • প্লাস্টিকের ভয়াল থাবা
  • আব্দুল¬াহ আল মাহবুবশিক্ষার্থীর বিকাশে পরিবারের ভুমিকা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেয়া হোক
  • সিলেটের ডাক
  • নারীর প্রতি সহিংসতা প্রসঙ্গে
  • সিলেটের ডাকের শিশুমেলা
  • সবুজ প্রবৃদ্ধির কৌশল : পরিবেশ-প্রতিবেশ
  • এরদোগানের শাসনে তুরস্কের ভবিষ্যৎ
  • বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং নদী রÿার্থে করণীয়
  • পয়ত্রিশ বছরে সিলেটের ডাক
  • আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকব?
  • Developed by: Sparkle IT