ইতিহাস ও ঐতিহ্য

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক সিলেটি বীর সেনানী

এম আহমদ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০১-২০১৮ ইং ০১:০৪:১৬ | সংবাদটি ২০৮ বার পঠিত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জীবিত এক শতায়ূ বীর সেনানী  শাহ নূর মোহাম্মদ। তিনি সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা। মরহুম শাহ নাহার মোহাম্মদ, মা মরহুমা অছিরা বিবির এই কৃতি সন্তানের জন্ম পহেলা জানুয়ারি ১৯২০ খ্রীস্টাব্দে। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ রয়েল সেনা বাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন শাহ নূর মোহাম্মদ। ১৯৪৩ সালে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে ট্রেনিং একাডেমিতে ইনস্ট্রাকটর ও হাবিলদার পরে অনারারী ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে পদন্নোতি লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে ট্রেনিং শেষে তাকে ইতালিতে বদলী করা হয়। সেখানে দ্বিতীয় বিশ^ যুদ্ধে অংশ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে জার্মানরা আত্মসমর্পণ করে।
১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সরকার তাকে আমেরিকায় যাওয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু মায়ের অসুস্থতায় মায়ের সেবা করার উদ্দেশ্যে সরকারের অনুমতি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। দেশে আসার সময় ব্রিটিশ সরকার তাকে আত্মকর্মসংস্থানের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে সম্মাননা সনদ প্রদান করে বিদায়ী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ ও দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের মাধ্যমে দেশে পাঠায়। এসময় তিনি সড়ক পথে মিশর থেকে ইরাক পর্যন্ত আসেন। ইরাকে মসুলে হযরত ইয়াকুব (আ.) ও বাগদাদ শরীফে হযরত বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) এর রওজা জেয়ারত করেন। পরে ফিলিস্তিনে মসজিদে আল আকসায় যান। সেখানে জোহরের নামাজ আদায় করেন। সেখান থেকে মিশরের কায়রোতে গিয়ে  পিরামিড ও ভেতরে ঢুকে নীচে মুর্তি দেখেন।
তিনি হযরত ইউসুফ (আ.) কে ফেলে দেয়া কূপে দুদিন চেষ্টার পর নেমে দেখে আসেন। তিনি জানান, কূপের কাছে নির্মিত মসজিদটি ভারতের মুম্বাইয়ের দানবীর মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলী নির্মাণ করে দেন। বোম্বে থেকে জাহাজে করে ইরাকের বসরায় তিনি যান। জাহাজের নাম ছিল আল মদীনা। জাহাজের মালিক ছিলেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট সওদাগর আব্দুল বারি চৌধুরী।
পরে সেখান থেকে তাকে ইতালি নিয়ে যাওয়া হয়। স্থল যুদ্ধে অংশ নিয়ে যুদ্ধের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, ইতালির ট্রান্ট, বারী, বারলেতা (ফলের বাগান সমৃদ্ধ) ও রোম শহরে (১৫ দিনের ছুটি) নেপেলে আগ্নেয়গিরি, মিলান, তরিন টাউনে দায়িত্ব পালন করেন। এটা ছিল জার্মান বর্ডারের কাছে। তিনি অন্যান্য ট্রেনিংসহ পারমাণবিক গ্যাস ছাড়ার ট্রেনিং গ্রহণ করেন। এসময় মুখে রেস বোটার লাগাতে হয় বলে জানান তিনি। এসময় অনেকের শ^াস বন্ধ হয়ে যায়। তিনি এক্ষেত্রে সফল ছিলেন বলে জানান বিশ^জয়ী এই সেনা কর্মকর্তা। তাকে সবাই বাঙালি বাবু বলে ডাকতেন বলে জানান।
পরবর্তীতে অবসর সময়ে তিনি ভারতের আসামে সরকারী ট্রান্সপোর্টে সহকারী স্টোর কিপার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে দেয়ার পর কোম্পানীর কার্যক্রম আসাম থেকে শিলংয়ে বদলি করা হয়। সেখান থেকে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। তিনি সিলেট জেলা স্বাস্থ্য সহকারী এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে সেটেলমেন্ট বিভাগে বেঞ্চ সহকারী হিসেবে নতুন চাকরিতে যোগ দেন। এর পরে সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রসেস সার্ভার হিসেবে যোগদান করেন এবং পরে তাকে বিশ^নাথে সার্কেল অফিসের কার্যালয়ে বদলি করা হয়। পরে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর নেয়ার পর তিনি সিলাম পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের মোতাওয়াল্লী হিসেবে দীর্ঘ দিন দায়িত্ব পালন করেন।
শাহ নূর মোহাম্মদ ব্রিটিশ সেনা বাহিনীর সৈনিক হিসেবে ৩৯৪৫ স্টার ইতালি স্টার, ডিফেন্স মেডেল, ওয়ার মেডেল লাভ করেন। বর্তমানেও তিনি ব্রিটিশ আর্মির বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে জালালাবাদ সেনানিবাসে ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজে তাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সম্প্রতি দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাহেদ মোস্তফা তার বাড়িতে যান এবং তার শারীরিক খোঁজখবর নেন। তার অবসর সময় কাটে আল্লাহর ইবাদত ও বই পত্রিকা পড়ে। তিনি কোরআন তেলাওয়াত সহ কাসাসোল আম্বিয়া এবং বিভিন্ন ইতিহাসের বই নিয়মিত পাঠ করেন।
শতায়ূ এই সৈনিক এখনো হাটাচলা ও চোখে ভাল দেখেন। তার মানবিক গুনাবলী অসাধারণ। তার স্ত্রী, ৪ পুত্র ও ৪ কন্যা সন্তান রয়েছেন। তারাও শিক্ষিত, সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তিনি মৃত্যুর আগে সুখি সমৃদ্ধ দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ দেখে যেতে চান। ইমান নিয়ে মরতে চান। এই দোয়া চান সকলের কাছে।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT