ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী

সৈয়দা মানছুরা হাছান মিরা প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০১-২০১৮ ইং ০১:০৫:৪৭ | সংবাদটি ৩৭ বার পঠিত

হযরত শাহজালাল (রহ.) ও তিনশত ষাট আউলিয়ার স্মৃতিধন্য এই সিলেট প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। চা শিল্পের ব্যাপকতার জন্যে ‘দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ির দেশ’ হিসেবে যার রয়েছে জগৎজোড়া খ্যাতি। এই সিলেটে জন্মেছেন দেশবরেণ্য বহু মনীষী, পন্ডিত, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, শিল্পপতি যাঁরা সময়ের চাহিদায় দেশমাতৃকার কল্যাণে রেখেছেন অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর। সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থান প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ। বাংলাদেশে প্রায় অর্ধ শতাধিক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বাস। সিলেটের অধিবাসীদের মধ্যে একটি বৃহৎ অংশ বাঙালি হলেও রয়েছে কিছু ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ও নি¤েœ সিলেটের কয়েকটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার পরিচয় তুলে ধরা হল :
মনিপুরী সম্প্রদায় :
সাধারণত অনুমিত হয়ে থাকে যে, উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মনিপুর বার্মা যুদ্ধের (১৮১৯-২৬) সময়েই মনিপুরী জনগোষ্ঠী মনিপুর রাজ্য ছেড়ে এসে সিলেট সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু করে। ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে মনিপুর বার্মা বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে সাত বছর পরাধীন ছিল। তখনই মনিপুরের রাজা চৌরজিৎ, অনুজ, মারজিত ও গম্ভীর সিংহ সহ সিলেটে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই বিপুল সংখ্যক মনিপুরী সিলেট অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। সিলেট শহর, মৌলভীবাজার জেলার ভানুগাছ, শ্রীমঙ্গল, সাতগাঁও, হবিগঞ্জ জেলার বিশগাঁও অঞ্চলে এবং সুনামগঞ্জ জেলার রতনপুর অঞ্চলে এদের বাস। ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে মনিপুরীদের অধিকাংশই সনাতন অর্থাৎ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এদের মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা অত্যন্ত নগন্য। তাদের ভাষা বাংলা ভাষা থেকে আলাদা।
গোষ্ঠী জীবনে বিশ্বাসী মনিপুরীদের প্রতিটি পাড়াতেই রয়েছে এক বা একাধিক মন্দির ও তৎসংলগ্ন মন্ডপ। এই মন্ডপকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় ঐ পাড়ার ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকান্ড। মনিপুরী ছেলেরা পারিবারিক পরিবেশে ধুতি ও গামছা পরে থাকে। তবে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেরা প্যান্ট-শার্টই বেশি পরিধান করে থাকে। মেয়েরা নিজেদের বোনা এক ধরনের কাপড় এবং ব্লাউজ পরিধান করে থাকে। কাপড়টিকে তাদের ভাষায় ‘ফানেক’ বলে। এছাড়া মেয়েরা ওড়না ব্যবহার করে থাকে। মেয়েদের কেউ কেউ আজকাল শাড়িও ব্যবহার করে।
সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত মণিপুরীরা। জীবিকার দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে মনিপুরীদের প্রধান জীবিকা হল কৃষি। কাঠমিস্ত্রীর সংখ্যাও কম নয়। তবে শহরাঞ্চলে মনিপুরীদের মধ্যে জীবিকা হিসেবে সোনা-রূপার অলংকার তৈরি, মোটর মেকানিক এবং কাঠমিস্ত্রীর সংখ্যা বেশি।
ঐশ্বর্য ও বৈচিত্র্যে ভরা মনিপুরী সংস্কৃতির রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। মনিপুরী সংস্কৃতির সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা হল নৃত্যকলা। মনিপুরী নৃত্যের আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য হল চক্রাকৃতি। মনিপুরী নৃত্যকে বহির্বিশ্বে সর্বপ্রথম পরিচয় করিয়ে দেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ১৯১৯ সালে সিলেটে মনিপুরী নৃত্য দেখে মুগ্ধ হন এবং শান্তি নিকেতনে ঐ নৃত্য শিক্ষার প্রবর্তন করেন।
খাসিয়া ক্ষুদ্রজাতি :
সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার পাহাড়ি এলাকায় খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের সংখ্যা প্রায় বিশ হাজার। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, খাসিয়ারা ব্রহ্মদেশ থেকে এসেছে। প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে সিলেটের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর এলাকায় তারা বসতি স্থাপন করে। খাসিয়া সমাজ কয়েকটি গোত্রে বিভক্ত। তারা মাতৃতান্ত্রিক। খাসিয়া মেয়েরা পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় বলে কন্যা সন্তানকেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করা হয়। উল্লেখ্য যে, পুরুষরা পশুপাখি শিকার এবং বাইরের কাজ করে থাকেন।
খাসিয়া জনগোষ্ঠী পান, সুপারি, গোলমরিচ ইত্যাদির চাষ করে। খাসিয়াদের সাংস্কৃতিক জীবন বেশ জমজমাট। এরা আনন্দ, বিবাহ ও উৎসবে নৃত্যগীত করে থাকে। গানগুলো তাদের নিজস্ব ভাষায় রচিত।
গারো সম্প্রদায় :
সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে গারোদের বসবাস। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা, তাহিরপুর ও ছাতক উপজেলার একাংশে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এরা অত্যন্ত ভদ্র, ন¤্র ও নিরীহ প্রকৃতির হয়ে থাকে এবং কোলাহলবর্জিত জীবন যাপনে অর্থাৎ পাহাড়-পর্বত ঘেঁষেই বসবাস করতে আগ্রহী। এ উপজাতিরা হাজং, গারো, কুচ, বানাই, জবাং এবং হাদি প্রভৃতি সম্প্রদায়ে বিভক্ত। হাজং, কুচ ও বানাই সম্প্রদায়ীরা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী। গারো, জবাং এবং হাদিরা খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী। প্রত্যেকটি উপজাতির আলাদা নিয়মকানুন রয়েছে। এদের বিবাহ অনুষ্ঠানগুলি ও আলাদা ধরনের হয়ে থাকে। এদের সমিতি রয়েছে। এ সমিতির কর্তারা তাদের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • শিতালং শাহ’র গানের ঐতিহ্য
  • দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • সিলেট অঞ্চলের জলসা : একাল-সেকাল
  • সিলেটের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  • ঐতিহ্যের মনিপুরী তাঁত
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক সিলেটি বীর সেনানী
  • রেলওয়ে কি হারানো শ্রী ফিরে পাবে যোগাযোগমাধ্যম
  • সিলেটের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অপরূপা এ নদীর নাম সুরমা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিশ্ব দরবারে সিলেটি শীতলপাটি
  • চুঙ্গা পিঠা : বাঁশ দিয়ে প্রাতঃরাশ
  • কবিতা
  • মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল ওসমানী
  • সিলেটি ভাষা ও নাগরী সাহিত্য ধারা
  • লোক সাহিত্যের সমৃদ্ধ জনপদ সুনামগঞ্জ
  • সিলেটের শীতল পাটি
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযুদ্ধে বরাক উপত্যকার কবিগান
  • Developed by: Sparkle IT