ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেট অঞ্চলের জলসা : একাল-সেকাল

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০১-২০১৮ ইং ০১:০৬:১৯ | সংবাদটি ২৬ বার পঠিত

জলসা বা ওয়াজ মাহফিল। গ্রামবাংলায় বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে ছিল উৎসবের মতো অবকাশ। মাদরাসাগুলো বছরে দু’বার নিদেনপক্ষে একবার মাহফিলের আয়োজন করত। বার্ষিক বা সালানা জলসা। আর ষান্মাসিক জলসাকে বলা হতো ইনামি জলসা। বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলই ছিল প্রধান। এখনো এ রেওয়াজ আছে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সভা সমাবেশ গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত হওয়ার ফলে ওয়াজ মাহফিলের বাড়তি আমেজে কিছুটা ভাটা পড়ে গেছে।
বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলগুলো অগ্রহায়ণ পৌষ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বৃষ্টি বাদলা নেই। আবহাওয়া সমাবেশের অনুকূল। ফসল তোলা শেষ। ধান কাটার পর মাঠ জুড়ে শুধু নাড়া খাড়া হয়ে আছে। এ রকম মাঠে শামিয়ানা টানানো হয়। দু’একদিন আগে থেকেই বাঁশের প্যান্ডেল তৈরি হয়। বিস্তৃত মাঠে মাহফিল। মঞ্চ আছে। চৌকির ওপর বিশিষ্ট মেহমানরা বসে আছেন। চেয়ারে বসেছেন বক্তা। শামিয়ানার নিচে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছেন শ্রোতারা। চাটি পাটি আছে। আবার নুয়ে পড়া নাড়ার মধ্যেও বসেছেন অসংখ্য লোক। মনোযোগ দিয়ে শুনছেন ওয়াজ। মাহফিলের সপ্তাহ দশ দিন আগে থেকেই শুরু হতো প্রচারণা। হাটবাজারে তরুণ ছাত্ররা টিনের চোঙায় এলান দিতেন। মাহফিলে ওয়াজ করতে কে কে আসছেন তাদের নামধাম জানিয়ে মাহফিলে শরিক হওয়ার উচ্চকণ্ঠ আহবান কিশোরদেরও আকর্ষণ করত। কারণ মাহফিল ঘিরে মেলা বসত। দিনরাতব্যাপী ব্যতিক্রমী সমাবেশ। যুবক তরুণরাও উৎসবের আনন্দ গ্রহণ করতেন। রাতে বাড়ির বাইরে ওয়াজ মাহফিল উপলক্ষে বের হওয়ার সুযোগ পেয়ে শিশু-কিশোররা মেলার আনন্দে উৎফুল্ল।
সমাবেশে দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার লোক এসে জড়ো হতেন। এলাকার প্রতিটি বাড়ি থেকে সরবরাহ করা হতো দুপুরের খাবার। প্রত্যেকে সামর্থ্য অনুযায়ী ভাত তরকারি পাঠাতেন। কেউ গোশত ভাত, কেউ ডাল ভাত। জোহরের নামাজ শেষে গণভোজের দৃশ্য ছিল মজার বিষয়। লাইন ধরে বসতেন হাজার হাজার মানুষ। বিছিয়ে দেয়া হতো কলাপাতা। কারো পাতে গোশত ভাত, কারো ডাল ভাত। কোনো খেদ নেই। পরম তৃপ্তিতে ভোজন শেষে পাশের খাল, নদী বা পুকুরে গিয়ে হাত ধোয়ার পর সামান্য বিরতি। মাদরাসার ছাত্ররা মাঠ পরিস্কার করে নিতেন। এ দিকে মাইকে তখন হয়তো সুকণ্ঠী কোনো তরুণ ছাত্র সুর করে হামদ নাত পরিবেশন করছেন। ‘আয় খোদায়ে পাক দরিয়া ক্যায়সে হোঙে পার হাম’, ‘লে জা মুঝে এক পল মে’ ইত্যাদি।
আবার শুরু হলো ওয়াজ। ধর্মানুরাগী লোকজন বেহেশত, দোযখ, গুনাহ, নেকির কথা শুনে কাঁদছেন। মাওলানারা উর্দু আরবি শে’র, কাহিনী, মিছাল দিয়ে শ্রোতাদের কাঁদাচ্ছেন। বিশেষ লেহনে ওয়াজ। কিশোরদেরও আকর্ষণ করত। রাতে বাড়ি থেকেও শোনা যেত জিকিরের আওয়াজ। দিন ও রাতে ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে কিশোর ও যুবকরা মেতে উঠত আনন্দে। দূরের আত্মীয়রাও এ উপলক্ষে আসতেন। ওয়াজ শোনা এবং কুটুম বাড়ি বেড়ানো দুটোই হয়ে যেত।
সাধারণত কওমি মাদরাসাগুলোই এ রকম জলসার আয়োজন করে। জানা যায় খেলাফত আন্দোলনে কারাবরণকারী, কানাইঘাট উপজেলার উমরগঞ্জ ইমদাদুল উলুম মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা, মরমি কবি আল্লামা ইবরাহিম তশনা ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে সিলেট অঞ্চলে এই ওয়াজ মাহফিলের প্রচলন করেন। মাহফিলে মাওলানারা ওয়াজের মাঝে মাঝে আল্লাহর রাহে দান খয়রাতের জন্য আহবান জানাতেন। অনেকে মুক্ত হস্তে দান করতেন। মহিলারা ডিম, মোরগ, লাউ, এমনকি অলংকার পর্যন্ত পুরুষদের মারফত মাহফিলে পাঠাতেন। মাইকে নামসহ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে স্লোগান উঠত। ‘নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবর’ এর মিলিত ধ্বনিতে সবাই উদ্দীপ্ত হয়ে উঠতেন। অমুক গ্রামের অমুকের বিবি বা তমুক সাহেব এত টাকা দিয়েছেন। সবাই খুশি। এতে যেসব ফল ফসল বা বিক্রয়যোগ্য পণ্য উঠত, তা ওয়াজ মাহফিল শেষে পরদিন বাদ ফজর নিলাম ডাকা হতো। এক টাকার ডিম, পাঁচ টাকার মুরগি ধনাঢ্য কেউ কেউ আট দশ গুণ বেশি দামে কিনে নিতেন। এতে মাদরাসার তহবিল গড়ে উঠত। মাদরাসাগুলোর আয়ের এটি ছিল একটি উৎস।
ইনামি বা পুরষ্কার প্রদান জলসা হতো অনেক মাদরাসায়। এ রকম মাহফিলে ক্লাসের ভালো ছাত্রদের কিতাব পুরস্কার দেয়া হতো। নাম ডাকা হতো। মেহমানরা প্রদান করতেন পুরষ্কার। এই সব সমাবেশ এলাকায় একটি উৎসবের মতো ছিল। মাহফিলে আগত বক্তাদের বিশ্রাম এবং খাবার আয়োজন হতো সম্পন্ন লোকজনের বাড়িতে। জকিগঞ্জ উপজেলার বারহাল মাদরাসার বার্ষিক জলসাগুলোর স্মৃতি আমার আছে। ষাট দশকের শেষাংশে এভাবে আমার শৈশব কৈশোরে বাড়িতে দাওয়াত খেয়েছেন অনেক বিশিষ্ট আলেম। ওই সময় জননন্দিত আলিমদের মধ্যে আল্লামা মোশাহিদ বাইয়মপুুরি, মাওলানা আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলি, মাওলানা আবদুর রহিম চরিপাড়ী, মাওলানা ওয়ারিছ উদ্দিন হাজিপুরি, মাওলানা লুৎফুর রহমান বর্ণভী, মাওলানা ফাজিল ফজলে হক প্রমুখের সুনাম সমাদর ছিল বেশি।
ওয়াজ মাহফিল চলত রাতেও। ডে-লাইট বা পেট্রোমাস থাকত। পাশে বাজারও চলত রাতভর। যুবকরা বাজারে আড্ডা জমাতেন। রাতে এ রকম বাইরে বিচরণের মওকা সব সময় পাওয়া যেত না। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে খাবার যোগান দেয়া হতো। অঞ্চল বিশেষে বিশেষ কায়দায় তৈরি রুটি এবং চোঙা পিঠাও আসত মাহফিলে। শিরনি হিসেবে সবাই তৃপ্তিতে খেতেন।
পাকিস্তান আমলে গ্রামগঞ্জে মিছিল সমাবেশ প্রায় ছিল না। জলসার সময় আয়োজক মাদরাসা অন্যান্য মাদরাসায় দাওয়াত দিতেন। ওইসব মাদরাসার ছাত্র শিক্ষক পায়ে হেঁটে মিছিল করে টিনের চোঙায় স্লোগান দিতে দিতে গ্রামের নীরব পথ মুখরিত করে ছুটতেন। নারায়ে তাকবিরের সঙ্গে থাকত সমকালীন ইস্যুভিত্তিক স্লোগান। দূরে থাকতেই মিছিলের শব্দে আয়োজক মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জেনে যেতেন কারা আসছেন। মঞ্চের পাশ থেকে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যেতেন ওই মাদরাসার ছাত্র শিক্ষক। অভ্যর্থনা জানাতেন দলবদ্ধ মেহমানদের। একইভাবে ওয়ায়েয বা বক্তাদেরও দাঁড়িয়ে তকবির ধ্বনিতে ইস্তেকবাল করা হতো।
ওয়াজ মাহফিলের রেওয়াজ আজও আছে। তবে এখন আধুনিকতার পরশ লেগেছে। কলাপাতা নেই। বৈদ্যুতিক আলো এসেছে। আর মাহফিলগুলোও এখন আগেকার মতো এতো সাড়া জাগানো হয় না। কারণ রাজনৈতিক সমাবেশ দেখে এখন গ্রামের শিশু-কিশোরও এতে নতুনত্ব পায় না।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • শিতালং শাহ’র গানের ঐতিহ্য
  • দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • সিলেট অঞ্চলের জলসা : একাল-সেকাল
  • সিলেটের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  • ঐতিহ্যের মনিপুরী তাঁত
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক সিলেটি বীর সেনানী
  • রেলওয়ে কি হারানো শ্রী ফিরে পাবে যোগাযোগমাধ্যম
  • সিলেটের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অপরূপা এ নদীর নাম সুরমা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিশ্ব দরবারে সিলেটি শীতলপাটি
  • চুঙ্গা পিঠা : বাঁশ দিয়ে প্রাতঃরাশ
  • কবিতা
  • মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল ওসমানী
  • সিলেটি ভাষা ও নাগরী সাহিত্য ধারা
  • লোক সাহিত্যের সমৃদ্ধ জনপদ সুনামগঞ্জ
  • সিলেটের শীতল পাটি
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযুদ্ধে বরাক উপত্যকার কবিগান
  • Developed by: Sparkle IT