ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০১-২০১৮ ইং ০১:০৬:৪৯ | সংবাদটি ১৩৪ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সি আং রউফ এর স্মৃতি স্তম্ভ
২৪. উপজাতীয় আনুগত্যের সংকট
সূত্র : দৈনিক ইনকিলাব ২৮ জানুয়ারি ২০০৪
পার্বত্য চুক্তি নিজেই সরকারকে অসাংবিধানিক দায়িত্ব পালন থেকে মুক্ত করে দিয়েছে। এটি বাতিল, বা সংশোধনের প্রয়োজন নেই। উপজাতীয় প্রধান নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা গত বহু বছরেও পার্বত্য চুক্তি বুঝতে ও নিজে উগ্র অশালীন বিদ্রোহী চরিত্র শুধরাতে সক্ষম হননি। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিলেন, সন্তু লারমার মাঝে আচরণগত পরিবর্তন অবশ্যই হবে। দীর্ঘ দিন যাবৎ সশস্ত্র বিদ্রোহের নেতৃত্বদানের দ্বারা, তার মাঝে উগ্র একনায়ক সূলভ চরিত্র গড়ে উঠেছে। তার অবসান হওয়া সময় সাপেক্ষ। তিনি নিজেকে একজন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রপ্রধানরূপে ভাবতে শিখেছেন। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদে বরিত হয়ে, তিনি নিজেকে আরো ছোট কিছু ভাবতে পারছেন না। এ কারণে কেবিনেট মন্ত্রীদের পরোয়া না করা, তাদের স্বাগত জানাতে উপস্থিত না হওয়া ইত্যাদি ঔদ্ধত্য হলো, তার সাময়িক সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স ধরণের অহমিকা। তবে তাকে শুধরাবার সময় দেয়া উচিত।
উপরোক্ত বিবেচনায়, সন্তু বাবুর উগ্র আচরণ ও সমালোচনায় আওয়ামী সরকার ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন। তাকে ক্ষেপাতে কড়া বক্তব্য দেননি, কঠোর কোনো ব্যবস্থাও গ্রহণ করেননি। অথচ দেশ ও জাতির অখন্ডতা রক্ষা ও সংবিধান মান্যতায়, সন্তু বাবুকে অঙ্গীকারবদ্ধ করা সত্ত্বেও, তার অপ্রিয় প্রতিটি কাজের গোড়াপত্তন আওয়ামী সরকারই করে গেছেন। তাকে একদিকে মর্যাদার তুঙ্গে তুলেছেন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে অভ্যর্থনা দিয়ে আপ্যায়িত করে রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা দিয়েছেন। অপরদিকে সাংবিধানিক সংস্থানহীন একটি ভঙ্গুর আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষুদ্র চেয়ারম্যান পদে নামিয়ে দিয়ে অনুগ্রহের পাত্রে পরিণত করেছেন। যে অগ্রাধিকার ও মর্যাদাগুলো মঞ্জুর করে, তাকে খুশিতে ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছিল, তা সাংবিধানিক বাধায় এখনি ফাঁপা বেলুনের মতো ফুটে যাওয়ার উপক্রম। জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পূর্ণ মন্ত্রীর পদ নিজেই ধরে রেখেছেন, আর পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদটিও জনৈক বাঙালি এমপি’র করায়ত্ত হয়েছে। এ করা বেআইনী নয়। সন্দেহ থাকলে সন্তু বাবু আইনী লড়াই করে দেখতে পারেন। অগ্রাধিকার আর সংরক্ষিত পদের ব্যাপারেও আইনী লড়াই হলে, নিশ্চিতরূপেই সন্তু বাবু হেরে যাবেন। এসবই হবে আওয়ামী চুক্তির কৌশলপূর্ণ মোসাবিদার সুফল। সন্তু বাবুদের ডুবাতে আর কাউকে কিছু করতে হবে না।
তবু সন্তু বাবু কিসের বলে বকে বেড়ান যে, চুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। অথচ চুক্তির মূলোৎপাটনের বর্ণনায় তারই স্বাক্ষর আছে। মুখবন্ধেই চুক্তির গোড়া কর্তন হয়ে গেছে। এ জন্য কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দোষ তার নিজেরই। দোষ ধরিয়ে দিয়ে তাকে কেউ ক্ষেপাতে চায় না। ধামাচাপা চলছে। বকাঝকা সহ্য করা হচ্ছে। কেউ রহস্য ভেদ করছে না। এ যে অপ্রিয় সত্য কথন। উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন শিবিরে বিভক্ত, তবু তারা এক সুতায় বাঁধা। বিএনপি আর আওয়ামীতে উপজাতীয়দের যারা দলভূক্ত, তারাও সন্তু বাবুর প্রতি অনুরক্ত। কেউ তার বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে সোচ্চার নন। আগে তিনি আওয়ামী সরকারের চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেছেন। কিন্তু আওয়ামীপন্থী এক দীপঙ্কর তালুকদারের মৃদু কিছু প্রত্যুত্তর ছাড়া, অন্যান্য আওয়ামীপন্থী উপজাতীয়রা নিশ্চুপ থেকেছেন। দীপঙ্কর বাবুর দৃঢ়তা এখানে যে, তিনি খাঁটি আওয়ামীপন্থী। বর্তমান জোট সরকারে বা বিএনপিতে দৃঢ় চেতা এরূপ কোনো উপজাতীয় নেতা নেই। যারা আছেন তারা জেএসএস থেকে ধার করা। তাই দলে না থাকলেও তারা মূল গুরু সন্তু বাবুর বক্তব্যের কোনো প্রত্যুত্তর দেন না। গুরু যখন বলেন : গত ইলেকশনে আমি ভোট বর্জন করায় আওয়ামী বাক্সে উপজাতীয় ভোট পড়েনি, তাই তুমি বিএনপি প্রার্থী মনি স্বপন বাঙালি ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছো। আমারই কৃত চুক্তির বলে তুমি এখন উপমন্ত্রী। আমি পূর্ণমন্ত্রীর জন্য আন্দোলন করছি। তাতে সফল হলে তার সুফল পাবে তুমি। আমার বিরোধিতা করা তোমার পক্ষে আত্মঘাতী। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই মনি স্বপন দেওয়ান সরকারের পক্ষে মুখ খুলেন না। সন্তু বাবু সরকারকে নেস্ত-নাবুদ করেন, কিন্তু গুরুকে তিনি প্রত্যুত্তর দেন না। একই অবস্থা রাঙামাটির জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডঃ মানিক লাল দেওয়ানের ও উদ্বাস্তু পূণর্বাসন টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ানের। মনি স্বপনের মতো এই দুজনও জেএসএস শিবির ত্যাগী লোক। তবে সাবেক গুরু সন্তু বাবুর প্রতি এখনো তারা অনুগত। তারা তাকে ক্ষেপাতে অনিচ্ছুক। হুমকি ধমকি আর সমালোচনায় সরকার নেস্ত-নাবুদ হচ্ছেন। কিন্তু সরকারের এই ক্ষমতাভোগীরা গুরুর বিপক্ষে চুপ। এদের ক্ষমতায় বসিয়ে রেখে বিএনপি বা জোট সরকারের লাভ অতি ক্ষীণ? এরা খাঁটি সরকার দলের লোক হলে, প্রতিবাদী আওয়াজে সন্তু বাবুকে কোণঠাসা করে তোলা সম্ভব হতো। উল্টা তারা ভাবছেন, তাদের পদোন্নতি ও মর্যাদা বৃদ্ধির সহায়ক হলো সন্তু বাবুরই আন্দোলন। উপমন্ত্রী দেওয়ানের সুপারিশে অপর দুই দেওয়ান চেয়ারম্যান হয়েছেন। এটা আরেক স্বজনপ্রীতি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমল থেকে প্রতিটি সরকার পছন্দসই উপজাতীয় নেতৃবৃন্দকে বড় বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদে সমাসীন করে তাদের সপক্ষে টানারও উপজাতীয়দের খোশ করার চেষ্টা করে আসছেন। এছাড়াও সাধারণভাবে উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে উপজাতীয়দের পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য: তাদের মন থেকে বঞ্চনার মনোভাব আর বিদ্রোহ অসন্তোষ দূর করা। তবু তাতে বাঞ্ছিত সুফল ফলেনি। অতঃপর রাজনৈতিক মাধ্যম সুবিধা পত্তন করা হয়। গঠিত হয় স্থানীয় শাসন ভিত্তিক আঞ্চলিক জেলা ও উপজেলা পরিষদ।
উন্নয়ন বোর্ডকে করা হয় আরো গতিশীল। সংসদীয় আসন দু’টির স্থলে তিনটি করা হয়েছে শান্তি স্থাপন ও ভারত থেকে শরণার্থীদের ফিরিয়ে এনে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে ক্ষমা ও প্রচুর সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি সমঝোতা চুক্তিও সম্পাদিত হয়েছে। প্রধান বিদ্রোহী নেতা সন্তু লারমা আঞ্চলিক পরিষদে চেয়ারম্যান ও তার সঙ্গী সাথীদের সদস্য পদে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসিত হয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয়ও একটি উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্ক ফোর্স গঠন করে, তাতে উপজাতীয়দের করা হয়েছে মন্ত্রী ও চেয়ারম্যান। অনেককে দেয়া হয়েছে উপমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা। মোটা বেতন ভাতা আর দামী গাড়ি-বাড়ি তাদের প্রাপ্য হয়েছে।
আশা করা গিয়েছিল: এই অনুগৃহিত নেতারা অতঃপর কৃতজ্ঞতা ও শালীনতায় অভ্যস্ত, আর বিদ্রোহী আচার আচরণ ও উগ্রতা পরিত্যাগে উদ্বুদ্ধ হবেন। ফিরে আসবেন স্বাভাবিক ও ভদ্র জীবনযাপনে। অবসান হবে অশান্তি, হানাহানি, হিংসা ও বৈরিতার। কিন্তু সকলই গরল ভেল। নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে প্রচন্ড সন্ত্রাস ও অরাজকতার। এই পরিস্থিতি আরো অধিক উপজাতীয় তোষণ, অশান্তি ও অসন্তোষকে মদদ দিচ্ছে।
সব পাওয়ার সূত্র বৈরিতা নয়। সব পাওয়া ঝটপট এক সাথে হয় না। পূর্ণতা অর্জন সময় ও ধৈর্যসাপেক্ষ। তজ্জন্য দেশ ও জাতিকে স্বপক্ষে টানতে হবে। উপজাতীয় সমাজে এই কৌশলের প্রচন্ড অভাব আছে। বাঙালি প্রধান এই দেশে বাঙালি বিতাড়ন আন্দোলন, আর ক্ষমতাসীন সরকারকে হেনস্তা করা, উপজাতীয় রাজনীতির সঠিক কৌশলরূপে মান্য হতে পারে না। সন্তু লারমা তাদের ভুল নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সচেতন উপজাতীয়দের এই ভুল শুধরাতে এগিয়ে আসার প্রয়োজন আছে।
সরকারে উপজাতীয়দের অনেক বন্ধু আছেন। সবাইকে বৈরি ভাবা ভুল। এভাবে বৈরি করার দায়-দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই উপর বর্তাবে।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT