সম্পাদকীয়

শীতার্থদের কষ্ট

প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০১-২০১৮ ইং ০২:০৭:০৭ | সংবাদটি ১২৪ বার পঠিত

‘মাঘের শীতে বাঘও পালায়’ কথাটি প্রচলিত লোকমুখে। চিরায়ত বাংলায় গ্রামীণ মানুষেরা শীতের তীব্রতা বোঝাতে এই কথাটি বলে থাকেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হয়তো বাক্যটি ভুলে গেছে মানুষ। কারণ ইদানিং শীত মওসুমে তেমন একটা শীত অনুভূত হয়না। বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বেড়েছে উষ্ণতা। ফলে শীতের তীব্রতা ও স্থায়ীত্ব কমে গেছে। অন্তত এই রকমই ব্যাখ্যা করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। এবার ঘটেছে ব্যতিক্রম। গত এক সপ্তাহের শৈত্য প্রবাহ বুঝিয়ে দিচ্ছে শীত তার বৈশিষ্ট্য হারায়নি এখনও, আছে স্বমহিমায়। বরং এই বছর মাঘে নয়, পৌষেই বেড়েছে শীতের তীব্রতা। তাই হয়তো এখন বলতে হবে এই রকম ‘পৌষের শীতে বাঘ পালায়’।
গত সপ্তাহখানেক ধরেই শুরু হয়েছে শৈত্য প্রবাহ। চলতি মাসের তিন তারিখ দেশের উত্তরাঞ্চলে শুরু হয় তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। তা ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। এর মধ্যে দেশের ইতিহাসের সর্বনি¤œ তাপমাত্রাও রেকর্ড করা হয়। আটই জানুয়ারি তেতুলিয়ায় সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছিলো দুই দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর বাইরে সারাদেশে সর্বনি¤œ তাপমাত্রা এখনও দশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। আবহাওয়া দপ্তর বলছে-এই পরিস্থিতি আগামী তিন চার দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এ পর্যন্ত ঠান্ডাজনিত রোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন। এদের বেশির ভাগই শিশু। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবেরিয়া থেকে আসা শীতলতম বায়ুর কারণে এই তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। তারা বলছেন, ৪০/৫০ হাজার ফুট ওপরের জেট বায়ু নেমে এসেছে ৩০/৩৫ হাজার ফুট-এ। বর্তমানে উল্টো ঘূর্ণাবর্ত নামে শীতল বায়ু প্রবাহ বইছে।
শীত হচ্ছে ষড়ঋতুর বাংলাদেশের একটি অন্যতম ঋতু। বলা হয় গ্রীষ্মপ্রধান বাংলাদেশ। আর তাই এই জনগোষ্ঠীর কাছে শীত সারা বছরের একটি আরাধ্য ঋতু। বলা যায় মানুষ সারা বছর এই ঋতুটির অপেক্ষায়ই থাকে। তারা নানাভাবে এই সময়টিকে উপভোগ করতে চায়। রকমারী পিঠা-পুলির আয়োজন হয় ঘরে ঘরে। বসে গ্রামীণ মেলা। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এইসব ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসলেও একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। শীতের আরেকটি অনুষঙ্গ হলো অতিথি পাখী। শীত প্রধান দেশগুলোর হাজারো ধরনের পাখী শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে চলে আসে আমাদের দেশে। অতীত থেকেই এই ধারা শুরু হয়। এরা ঠাঁই নেয় বাংলার ঝোপঝাড়, হাওর-বিলে। সাম্প্রতিককালে সেই পাখীদের আগমনও কমে গেছে। শিকারীরা মেরে ফেলছে পাখীদের।
ঋতুচক্রের আবর্তে শীত আসে। আসে গ্রীষ্ম, বর্ষাসহ অন্যান্য ঋতু। এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই এদেশের মানুষ বেঁচে আছে হাজার বছর ধরে। তারপরেও অনেক সময় এই ধারার ব্যত্যয় ঘটে। নানা ঋতুতে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। যা মোকাবেলা করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠেনা। বন্যা, সাইক্লোন, টর্নেডো যেমন জনজীবন বিপর্যস্ত করে, তেমনি তীব্র শীতও মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দেয়। শীতে নানা ধরনের রোগ ব্যাধির সাথে সাথে রয়েছে অসহায়, গরীব, দুঃখী মানুষের কষ্ট। তাদের শীতের তীব্রতা ঠেকানোর সামর্থ্য নেই। তাই শীত ঋতু এদের কাছে ‘উপভোগের’ ঋতু নয়, বরং দুর্ভোগের। গরীব শীতার্ত মানুষের শীত নিবারণের দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনি সমাজের বিত্তশালীদেরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। সেই সঙ্গে শীতে যেসব অতিথি পাখী এসেছে আমাদের দেশে, তাদেরও যাতে ধ্বংস করা না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT