উপ সম্পাদকীয় দৃষ্টিপাত

দাওয়াত ও তাবলীগ

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০১-২০১৮ ইং ০২:০৭:২৭ | সংবাদটি ৯৪ বার পঠিত

সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন যোগ্যতায় হযরত মুহাম্মদ (সা:) সকলের উর্ধ্বে শীর্ষস্থানের অধিকারী ছিলেন। বোখারী শরীফের এক হাদীসে উল্লেখ আছেÑ নবী (সা:) বলেছেন- “আল্লাহকে ভয় করায় এবং আল্লাহকে জানায় আমি তোমাদের তথা নিখিল সৃষ্টির সকলের উর্ধ্বে। আল্লাহকে যে যত বেশি ভয় করবে, সে তত বেশি গোলামী করবে।” আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে সুন্দর নমুনা রাখা হয়েছে। ঐরূপ প্রত্যেকের জন্য যে আল্লাহ সন্তুষ্টি এবং পরকালের মুক্তির আশা রাখে (পারা-২১ রুকু-১৯) অতএব তাহার আদর্শ ও তাহার শিক্ষানুযায়ী আল্লাহর গোলামী না করা হলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং আখেরাতে মুক্তি লাভ সম্ভব হবে না।”
সত্য বলতে কী মাত্র ২৩ বৎসর সময়ের মধ্যে মুহাম্মদ (সা:) মানবজাতিকে উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত করেন যার আলোকে তারা উন্নতির পথে অগ্রসর হতে থাকে এবং এমন প্রতাপের সহিত রাজত্ব করতে সমর্থ হয় যে, দুনিয়ার কোন শক্তি তাঁদের অগ্রগমণ বন্ধ করতে পারে নাই। আল্লাহর নবী মানুষের কল্যাণ, হেদায়ত ও মুক্তির মশাল মুসলমানের হাতে তুলে ধরে ছিলেন।
কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয় বর্তমান জামানায় মুসলমান দিন দিন অধোঃগতির দিকে সবেগে ধাবিত হওয়ার কারণ হলো- আল্লাহর মনোনীত দ্বীনের ইলম ও আমল নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছে। দ্বীনের রুছুম, রেওয়াজ ও বরকত বিলুপ্ত হতে চলেছে। আল্লাহ তায়ালার সাথে আত্মার সংযোগ ছিন্ন হচ্ছে। নফসানির অনুসরণ ও অনুকরণে মানুষের আধুনিক সভ্যতার বিকৃত রূপ পশুর মত পরিগ্রহ হতে চলেছে। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই প্রত্যেক উম্মতের উপর দ্বীনি ইলম, ঈমান ও আমল শিক্ষা করা ফরজ। আর দ্বীনি ঈমান ও আমল শিক্ষা করার কারখানা/পাঠশালা হলো দাওয়াত ও তাবলীগ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় দাওয়াত ও তাবলীগ কী এবং কেন? আল্লাহপাক দাওয়াতের বদলে হেদায়তের ওয়াদা করেছেন। ঈমান সম্বন্ধে বুঝাবার নাম ‘দাওয়াত’ আর আমল সম্বন্ধে বুঝাবার নাম ‘তাবলীগ’। আযানের মধ্যে প্রত্যেকটি কালামই দাওয়াতের। এই জন্য ইহাকে দাওয়াতের আমল বলা হয়। কেবল মাত্র ‘হাইয়্যালাচ্ছালাহ’ (নামাজের জন্য উপস্থিত হও) কে তাবলীগ বলা হয়। আমাদের নবী (সা:) বলেছেন- মানুষ যখন কবরে যাবে তখন সর্বপ্রথম ঈমানের প্রশ্ন করা হবে। আমলের প্রশ্ন করা হবে না। বরং আমলের প্রশ্ন করা হবে হাশরের ময়দানে। কবরে ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে যাবে। অতএব প্রত্যেক উম্মতের উপরই ঈমান আমলের জন্য দাওয়াত ও তাবলীগ ফরজ বা অতীব জরুরী।
তাবলীগ মানে ইসলামের শিক্ষা ও জীবন ধারার অনুশীলনের আহ্বান। আর তাবলীগ নামক জামাতের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো নিজেদের আখলাক, চরিত্র, আচার আচরণ ও মানবতাপূর্ণ হৃদয়ের ছোঁয়া দিয়ে অন্যদেরকে ইসলামের শাশ্বত বাণী “লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” (সা:) প্রতি ঈমান আনয়ন করা। আল্লাহর হুকুম ছাড়া মখলুক (আল্লাহর সৃষ্টি) ভাল মন্দ কিছু করতে পারে না। হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর নীতির মধ্যেই ইহকাল ও পরকালের শান্তি ও সফলতা রয়েছে। আল্লাহর নবী (সা:) ঘোষনা করেন- আমরা যেন আল্লাহ ব্যতিত অন্য কিছুর উপাসনা না করি এবং তাহার সঙ্গে অন্য কিছুকে অংশীদার না করি। মানব জাতির জন্য ইহাই একমাত্র শিক্ষা এবং এই জন্যই তিনি আদৃষ্ট হয়েছেন। আল্লাহ পাক আরও বলেছেন- ঐ ব্যক্তির চেয়ে আর কাহার কথা উত্তম হতে পারে যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে। নিজে নেক আমল করে এবং বলে যে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের মধ্যে একজন।
তাবলীগ জামাতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- আল্লাহর দিকে তাহার সৃষ্টিকে আহবান করা। তাবলীগ নামক মুবারক জামাতের বদৌলতে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে ইসলামের পুনঃজাগরণ। আজ বিশ্বময় লক্ষ লক্ষ মুসলিমের পদভারে একত্রিত হচ্ছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিন আফ্রিকা, ইউরোপের জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন, স্পেন, ফ্রান্স সহ বিভিন্ন অমুসলিম দেশ। এই জাগরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে “দাওয়াতে তাবলীগ”। এই দাওয়াতি কাজের মুবারক জমাত বিশ্বে উন্মোচিত করছে অবিশ্বাস্যভাবে এক নীরব বিপ্লবী জাগরণের দিগন্ত। এই তাবলীগ জামাতের কৃতিত্বের মূলে রয়েছে আম্বিয়ায়ে কেরাম ও সাহাবায়ে কেরামদের আদর্শ অনুসরন করা। সৎকাজে আদেশ ও অস্যৎ কাজের নিষেধ দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্বীনের সকল কিছুই ইহার সহিত জড়িত।
দিল্লীর নিজামুদ্দিনের দারুল-উলম দেওবন্দের কৃতি সন্তান তাবলীগী দাওয়াতের সীপাহসালার আল্লামা ইলিয়াস (রহ:) সর্বপ্রথম তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন ভারতের রাজস্থানের ‘মেওয়াত’ নামক স্থান থেকে। তারই ধারাবাহিকতায় ইজতেমা প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে ঢাকা কাকরাইল মসজিদে, ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্পে, ১৯৫৯ সালে নারায়নগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পাগাড়ে অনুষ্ঠিত হয় ইজতেমা। তখন থেকেই ইজতেমায় বিভিন্ন দেশ থেকে মুসল্লিরা আসতে শুরু করেন এবং নাম হয় ‘বিশ্ব ইজতেমা’। মুসল্লীরা স্থান সংকুলান না হওয়ায় ১৯৬৭ সালে টঙ্গীর ‘কহর দরিয়া’ বা তুরাগ নদের তীরে বালুচরে জামাতের স্থান নির্ধারিত হয়। সেই থেকে তুরাগ নদের তীরে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে ২০১১ সাল থেকে তিন দিনের এই ধর্মীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে দু’টি পর্বে। এই দাওয়াতি কাজের মুবারক জমাতে ধর্মপ্রাণ মুছল্লীর আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব ইজতেমার আদলে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। টঙ্গী তুরাগ নদের তীরে আগামী ১২ জানুয়ারি বিশ্ব তাবলীগ জামাতের প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
তাবলীগ জামাতের কর্মসূচী হলো তালিম, আম ও খাস বয়ান, ছয় উসলের হকিকত, দরছে কুরআন, দরছে হাদিস, জামাত তৈরী, এক চিল্লা, তিন চিল্লা, বছর চিল্লা, জীবন চিল্লার প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন দেশে জামাত প্রেরণ। তাবলীগ জামাতের আকর্ষনীয় বিষয় হলো যৌতুক বিহীন বিয়ে ও তাশকিল।
সর্বোপরি তাবলীগ জামাতের মূল উদ্দেশ্য হলো ঈমান ও একীনের মেহনত করে দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি ও সফলতা অর্জন করা।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কাবিনবিহীন বিয়ে, প্রতারণা ও আমাদের আইন
  • স্মার্টফোনে বন্দি জীবন
  • দৃষ্টিপাত নেশার নাম ড্যান্ডি!
  • আইনজীবী-সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম চৌধুরী
  • সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল কবে শেষ হবে?
  • রাস্তাটির সংস্কার চাই
  • প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি
  • শিক্ষা ব্যবস্থা
  • আবর্জনা সমস্যা : উৎপাদনের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে
  • উচ্চশিক্ষায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রয়োজন
  • সিটি নির্বাচন : কাকে ভোট দেব?
  • রথযাত্রা
  • বিবেক দ্বারা হোক পথ চলা
  • মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার
  • পাহাড় বিষয়ে সচেতনতা দুর্ঘটনা রোধ করতে পারে
  • আপন ভুবন, অচেনা আকাশ
  • কওমি বোর্ডের রেজাল্ট পর্যালোচনা
  • স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী
  • পানি সংকট এবং ভবিষ্যত বাংলাদেশ
  • তুরস্কের নির্বাচন দেখে এসে
  • Developed by: Sparkle IT