উপ সম্পাদকীয়

যানজট ও জনদুর্ভোগ নিরসনে যা প্রয়োজন

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০১-২০১৮ ইং ০২:০৮:০৩ | সংবাদটি ২৩ বার পঠিত

বাংলাদেশ পৃথিবীর ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। এ দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকল্পে রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের সমন্বিত পদক্ষেপের কোন বিকল্প নেই। বিশেষ করে শহর এলাকার আইন শৃঙ্খলা, যানজট, জনদুর্ভোগ ও নৈরাজ্য এমন উচ্চতর মাত্রায় উপনীত হয়েছে যে, যার ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রা অত্যন্ত নাজুক ও অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য শহরগুলোর জীবনযাত্রার মানদন্ডে আমাদের অবস্থান প্রায় সর্বনিম্নে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এবং চায়না জনবহুল হওয়া সত্ত্বেও এদের যাতায়াত, ট্রাফিক ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক উন্নত। বর্তমানে বিশ্বে যে দেশের যাতায়াত ব্যবস্থা যতই উন্নত সে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থাও ততই উন্নত।
বর্তমান দুর্বিষহ পরিস্থিতির উন্নয়নে সাধারণ মানুষের কিছু ভাবনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় অবগতি ও কার্যকরী পদক্ষেপের জন্য উপস্থাপন করা হলো-
১) যানবাহন নিয়ন্ত্রণ আইন, পরিবেশ আইন, জন দুর্ভোগ আইন সংশ্লিষ্ট ফৌজদারী আইনের ধারা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং তা দৃশ্যমান ও প্রচারিত হতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন পেশার মালিক ও কর্মচারী সমিতির প্রতিনিধিবৃন্দ, স্থানীয় প্রশাসন সাংসদ এর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা, সর্বোপরি জনগণকে আইনী ব্যবস্থায় আনার জন্য সচেতন ও সম্পৃক্ত করা।
উল্লেখ্য, আমাদের আইনের ধারাসমূহের কোন ঘাটতি নেই মূল সমস্যা রাজনৈতিক ও আর্থিক এবং আইনের প্রয়োগে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়া।
২) উক্ত আইনসমূহ বাস্তবায়নের জন্য বিকল্প বাহিনী গড়ে তোলা, যাতে এক পক্ষের কাজ অন্য পক্ষ এসে তদারকও পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এর জন্য কমিউনিটি পুলিশ, আনসার, স্কাউট ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের পারিতোষিক প্রদানের ভিত্তিতে রাস্তায় আনা যেতে পারে। কিছুদিনের জন্য র‌্যাবকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
৩) লাইসেন্সবিহীন গাড়ির ড্রাইভার, ড্রাইভারের সহকর্মী ও ফিটনেসবিহীন ও কোন গাড়ি রাস্তায় বেরুতে পারবে না। কোন গাড়ি বিনা স্টপেজ দাঁড়াতে ও পার্কিং করতে পারবে না। এই মর্মে যৌথ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিদ্ধান্তসমূহ জনসম্মুখে প্রচার করতে হবে। আইন অমান্যকারীদের উপরও ধরপাকড় বাড়াতে হবে। দৈনিক কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার হিসাব দৈনিক ভিত্তিতে দাখিল করতে হবে ও জনসাধারণ ও মিডিয়াতে জানাতে হবে।
৪) সরকারি কর, রাজস্ব পরিশোধ, বীমা করা ছাড়া কোন গাড়ি রাস্তায় নামাতে পারবে না। পরিশোধের স্বচ্ছতার জন্য দালিলিক ষ্টিকার এবং গাড়িতে বিভিন্ন রং ব্যবহার করতে হবে।
৫) স্বাধীন পরীক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তবে তাদের সততা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতা থাকতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদের নেতৃত্বে ঘন ঘন অভিযান চালাতে হবে ও মিডিয়াতে প্রচার করতে হবে। দায়িত্ব পালনের অবহেলার জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক অফিসার ও পুলিশকে দায়যুক্ত করতে হবে।
৬) জনগণের মধ্যে আইন না-মানার পরিণতি কি হতে পারে তা দৃশ্যমান হতে হবে ও রাস্তায় সামারী বিচার করে জরিমানা আদায় করতে হবে।
৭) সাধারণ মানুষের চলাচল নির্বিঘœ করার জন্য ফুটপাতগুলো উন্মুক্ত করতে হবে। কোন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না এই মর্মে সর্বদলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এর বাস্তবায়ন অসম্ভব।
৮) ফুটপাতগুলো যথাযথ মেরামত ও নালা নর্দমাগুলো পরিষ্কার রাখার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে ও এর কার্যকারিতায় স্থায়ী বন্দোবস্ত করার জন্য রোষ্টার পদ্ধতির মাধ্যমে তদারকী ব্যবস্থা করতে হবে।
৯) বিদ্যুতের খুঁটি, টেলিফোনের খুঁটি রাস্তার মধ্যস্থানে থেকে সরাতে হবে ও তারগুলো মাটির নীচে দিয়ে অথবা মাঝপথে সঞ্চালন করাতে হবে।
১০) ট্রাফিক সিগন্যালগুলো সচল করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য জনবহুল শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তার শিক্ষা নিতে হবে। কেন এই পদ্ধতি ব্যর্থ হচ্ছে তার প্রতিবিধান করতে হবে। সি সি টিভি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন অমান্যকারীকে তাড়া করতে হবে ও নগদ শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১১) রাস্তায় জ্রেব্রাক্রসিং নির্দেশিকা সংরক্ষণ করতে হবে। মুছে যাওয়া দাগগুলো নিয়মিত রাঙিয়ে দিতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালের সামনে স্পিড ব্রেকার দিতে হবে। নিয়নবাতি, সাইনবোর্ড দিয়ে নির্দেশিকা চালু করতে হবে।
১২) ওভারব্রীজ দিয়ে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে।
১৩) গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ওভারব্রীজ নির্মান করতে হবে। আবর্জনা ফেলার স্থানগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে ও রাস্তার উপর থেকে সরাতে হবে।
১৪) নগরীর কেন্দ্রস্থলে রিক্সা চলাচল বন্ধ করতে হবে। রিক্সা লাইসেন্স পরীক্ষা করলে এর চলাচল সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসবে। দ্রুতগতির ও স্লথগতির গাড়ি চলাচল রোধ করতে হবে।
১৫) রাস্তায় পুলিশ টহল জোরদার করতে হবে। বর্তমান দায়িত্বের পাশাপাশি নতুন দায়িত্ব দিতে হবে ও এলাকা ভিত্তিক পুলিশ প্রশাসনের জবাবদিহিতার পদ্ধতি চালু করতে হবে ফুটপাতে যাতে পুনরায় হকার না বসে সে মর্মে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং জনগণকে সচেতন করতে হবে।
১৬) ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ও তত্ত্বাবধানে জটিকা অভিযান পরিচালনা করতে হবে। দোষী যেই হোক যেমন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও জনগণকে আইনের আওতায় এনে বেআইনী কাজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা ও জরিমানা করতে হবে।
১৭) বর্তমান জরিমানা আদায়, রাজস্ব আদায় পদ্ধতি নবায়ন ইত্যাদি সহজ করতে হবে। অনলাইন ভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
১৮) ট্রেক্সী ক্যাবের মিটারিং পদ্ধতি পূণঃ মূল্যায়ন করে এর ব্যবহার ও প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি গাড়িতে ভাড়ার তালিকা বাধ্যতামূলকভাবে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
১৯) বাস, টেম্পু চলাচলের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করে টিকিট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি গাড়ির ভাড়া র্নিধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিটি গাড়িতে ভাড়ার তালিকা বাধ্যতামূলকভাবে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
২০) সরকারি ও বেসরকারি খাতে গণপরিবহন বাড়াতে হবে। অবসর প্রাপ্ত ফৌজি সমিতির মাধ্যমে বেসরকারি খাতে বাস চালু করতে হবে।
২১) রাস্তার পার্শ্বে অবস্থিত সকল মেডিকেল সেন্টার, হাসপাতাল ও বিদ্যালয়সমূহে ট্রাফ্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
২২) রাস্তার উপর জনসভা, পিকেটিং, অবস্থান ধর্মঘট ইত্যাদি বন্ধ করতে সার্বজনীন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
২৩) মিডিয়াকে এই ব্যবস্থাসমূহের আওতায় আনতে হবে ও স্বাধীনভাবে মতামত ও সুপারিশ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। দৈনিক প্রতিটি চ্যানেলে কিছু কিছু ট্রেনিং প্রোগ্রাম ও সরকারি বিধি-বিধান পালনের জন্য অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। গণসচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে মিডিয়াকে কাজে লাগাতে হবে।
২৪) ড্রাইভার ও গাড়ির জীবন বৃত্তান্ত স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মাধ্যমে হাল নাগাদ করতে হবে।
২৫) এলাকা ভিত্তিক ট্রাফিক কর্মকর্তাদের নাম নিয়মিত প্রদান করতে হবে এবং জনগণের অসুবিধাগুলো শুনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
২৬) দুষ্টের দমনকারীকে পুরস্কার ও ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
২৭) প্রতিবেশি দেশসমূহের ট্রাফিক ব্যবস্থা পদ্ধতি সমূহ শিক্ষা নেওয়ার জন্য নিয়নিমত ট্রেনিং এর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এদের উপর দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে। ট্রাফিক কমিশনার মহোদয়কে নিয়মিত বিফ্রিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২৮) রাস্তার উপর অবৈধ বিল বোর্ড, বিজ্ঞাপন বোর্ড সরিয়ে নিতে হবে। অপ্রিয় লেখাগুলো মুছে ফেলতে হবে।
২৯) উড়াল সেতুর ব্যবস্থা দ্রুত করতে হবে ও প্রস্তাবিত সেতুর কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
৩০) যেখানে ডিভাইডারই নেই সেখানে ডিভাইডার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩১) যাতায়াত, মেরামত ও ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে দৈনিক কত টাকা খরচ হচ্ছে তার খাতওয়ারি হিসাব জনসমক্ষে প্রচার করতে হবে।
৩২) সর্বোপরি সরিষার ভূত তাড়াতে হবে ও জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায় যানজট সার্ভে করতে হবে, গবেষণা করা, ট্রাফিক ডাটা পর্যালোচনা করা অন্যান্য দেশের মতো পূর্বাবাসমূলক ট্রাফিক ব্যবস্থা ব্যবহার, ট্রাফিক ডাটাগুলো পর্যালোচনা করে কিভাবে যানবাহন চলাচলকে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে তা নির্ধারণে ডিশিশন সাপোর্ট সিষ্টেম অপটিমাইজার নামক আলোচিত প্রযুক্তির মাধ্যমে রাস্তায় ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা সহজে চিহ্নিতকরণ তার প্রতিক্রিয়া, ট্রাফিকের অবস্থা এবং সমস্যা সম্যাধানের জন্য কোন পন্থা গ্রহণ করতে হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও আইনি ব্যবস্থা দূর করতে পারে ট্রাফিক জট নামক দুঃস্বপ্নকে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রফেসর ডা. এম এ রকিব
  • রূপে রূপে কুসংস্কার মাওলানা
  • ব্যাংকিং খাত নিয়ে শঙ্কা
  • নৈতিকতার বিপর্যয় : চাই কঠিন সাজা
  • স্থাপত্য বিভাগের আলোকোজ্জ্বল এক দশক
  • বর্নিল আয়োজনে স্থাপত্যকর্মের প্রদর্শনী
  • বই পড়ার মাধ্যমে অসহনশীলতা দূর হতে পারে
  • ধনির সম্পদে গরিবের অধিকার
  • দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থেকে মুক্তির পথ
  • শীত গ্রীষ্মে বাঙালির জীবন
  • কবিতা
  • রেসিপি
  • কুয়াশা ভূত
  • ইসলামের প্রচার ও আল্লামা ফুলতলী
  • প্রসঙ্গ : রাষ্ট্র ও সরকার
  • আসুন শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই
  • সামরিক সহায়তা স্থগিত ও পাক-মার্কিন সম্পর্ক
  • জাতীয় উন্নয়ন ও প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গি
  • সুশিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ
  • ব্যাংকিং খাতের গতিশীলতা
  • Developed by: Sparkle IT