শিশু মেলা

ডাক্তার পিপুন

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০১-২০১৮ ইং ০২:০৯:১৪ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

কদিন ধরে ইতুলের খুব মন খারাপ। কোনোকিছু ভালো লাগে না তার। না পড়তে, না খেতে, না খেলাধুলা করতে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছে ইতুল। বৃষ্টির র্ঝ র্ঝ শব্দ তার খুব পছন্দ। চুপচাপ বসে আপনমনে বৃষ্টির শব্দ শুনছে সে।
ইতুলের মন খারাপ হওয়ার অবশ্য যথার্থ কারণ আছে। ঘরে তার বাবা খুব অসুস্থ। ক্যান্সার ধরা পড়েছে বাবার। রোগের শেষ পর্যায়। রোগটা বাবাকে যেন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সারাক্ষণ বাবা শুধু কোঁকান। বোঝা যাচ্ছে, বাবার খুব কষ্ট হচ্ছে। বাবা এত বেশি কোঁকান যে, মনে হয় তার বুকের ভেতর প্রাণপাখিটা যেন বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে। যেকোনো সময় অঘটন ঘটে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইতুল কী করবে? কী-ই বা করার আছে তার? বাবার জন্য সে কোনোকিছু করতে পারছে না বলেই তার মন খারাপ। মন ভীষণ ভীষণ খারাপ।
ইতুল অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ক্লাসের ফার্স্ট বয় সে। বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছে তার। বাবার শারীরিক অবস্থা দিন দিন যেভাবে খারাপ হচ্ছে বাঁচবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু বাবা না থাকলে তার পড়াশোনার খরচ যোগাবে কে? বড়ই ভাবনার বিষয়। তার বুঝি আর পড়াশোনা করা হলো না।
বিকেলে বৃষ্টি ছাড়ার পর ইতুল বাড়ির পিছনে বড় পাহাড়টায় বেড়াতে বের হলো। একাকী বের হলো সে। একাকী বেড়ানোতেও আসলে অনেক আনন্দ। আপনমনে কত কী ভাবা যায়। কত কী চিন্তা করা যায়। ভাবতে ভাবতে পথ চললো সে। পাহাড়ের উঁচু-নিচু টিলাময় পাথুরে পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ইতুল অনেকদূর চলে গেল।
যেতে যেতে সে এমন এক জায়গায় এসে থামলো, সামনে আর কোনো পথ নেই। চারদিকে বড় বড় গাছ, ঝোপঝাড়। গভীর বন-জঙ্গল। জঙ্গলের ভেতর খোলামেলা একটুখানি জায়গা। ওখানে দুটো ধাতব চেয়ার পাতানো। ক্লান্ত ইতুল একটি চেয়ার অধিকার করে বসলো। কিছু সময় পর হঠাৎ কিছু বুনো পাখপাখালি আর বানরের চেঁচামেচি শুনতে পেলো সে। মনে মনে ভাবলো, এত চেঁচামেচি করছে কেন ওরা?
তার একটু পরই ইতুল শুনতে পেলো শো-শো-শো অদ্ভুত একপ্রকার যান্ত্রিক আওয়াজ। আওয়াজ শোনামাত্র তার তো কান খারা। চোখ ছানাবড়া। বসা থেকে ওঠে পড়লো ইতুল। ওঠে এদিক ওদিক কিছু একটা খুঁজতে লাগলো। সহসা সে দেখতে পেলো, চৌকোণ আকারের সিলভার রঙের আশ্চর্য একটি মহাকাশযান শূন্যে ভেসে ভেসে তার দিকেই আসছে। মহাকাশযানটি দেখে ইতুল অবাক হয়ে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। মনে মনে ভাবলো সেÑএটা আবার এদিকে আসছে কেন?
ওর ভাবনার অবসান ঘটিয়ে মহাকাশযানটি ধীরে ধীরে এসে খোলা স্থানটিতে নামলো। নামার পর মহাকাশযান থেকে বেগুনি রঙের একপ্রকার আলো নির্গত হতে লাগলো। তারপরই ওটার দরজা খুলে গেল। দরজা খুলে নভোচারিদের মতো পোষাক পরা ঠিক ওরই বয়সি একটি মেয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলো। মেয়েটি তার মাথার হেলমেটটি খুলে ইতুলের সামনে এসে দাঁড়ালো। পরে বলতে লাগলোÑএদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ এই বিজন বনে তোমাকে একাকী দেখে চমকে উঠলাম। ভাবলাম, যাইÑওর সাথে একটু গল্প করে আসি। তাই এলাম। আচ্ছা, তোমার নাম যেন কী?
ফুটফুটে মেয়েটিকে দেখে ইতুল খুব অবাক হলো। তার উপর মেয়েটির মিষ্টি কণ্ঠের কথাবার্তা শুনে সে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেল। বললো, আমার নাম ইতুল। তুমি কে বোন? কোথা থেকে এলে?
ইতুলের প্রশ্নের জবাবে মেয়েটি বললো, আমার নাম পিপুন। সুদূর মহাকাশে ‘অ্যাঞ্জেল হোম’ নামে একটি গ্রহ আছে। আমি সেই অ্যাঞ্জেল হোমে বাস করি।
ইতুল বললো, পিপুন! অ্যাঞ্জেল হোম! নাম দুটো তো খুব সুন্দর! তা পিপুনÑআমাদের পৃথিবীতে কী মনে করে এলে?
পিপুন বললো, আমি একজন এমবিবিএস ডাক্তার। মাঝেমধ্যে গুরুতর রোগির চিকিৎসা করতে তোমাদের পৃথিবীতে আসি। আমাকে দেখতে ঠিক তোমার বয়সি এবং ছোট বলে মনে হলেও আমি কিন্তু ছোট নই। আমার বয়স এখন চল্লিশ চলছে। বারো তেরো বছর আগে আমি ডাক্তারি পড়া শেষ করেছি।
পিপুনের কথা শুনে ইতুল অবাক হয়ে বললো, আশ্চর্য তো! তোমার মতো একজন মেয়ের বয়স আমাদের পৃথিবীতে বড়জোর সাত কী বা আট হয়ে থাকে। আর তুমি বলছো তুমি একজন এমবিবিএস ডাক্তার। বয়স চল্লিশ। আমার কিন্তু মোটেও বিশ্বাস হচ্ছে না।
ইতুলের কথা শুনে পিপুন বললো, তোমার বিশ্বাস না হলেও এটাই সত্যি কথা।
ইতুল বললো, যদি সত্যি হয়, তাহলে তো আপনি আমার মুরব্বি। আপনাকে আর তুমি বলা যাবে না।
পিপুন বললো, কেন? তুমি বলতে দোষ কোথায়?
ইতুল বললো, দোষ আছে। আমাদের পৃথিবীতে বয়সে যারা বড় তাদের সম্মান করতে হয়। মুরব্বিদের সম্মান না করলে লোকে বেয়াদব বলে। তাই আপনি বলতে হয়।
ইতুলের কথা শুনে পিপুন সহসা হেসে ওঠল। বোঝা গেল সে খুব মজা পেয়েছে। পরে বললো, অ্যাঞ্জেল হোমের নিয়ম-কানুন কিন্তু এরকম নয়। একটু ভিন্ন। ওখানে বয়সে বড় হলেই কাউকে সম্মান করার নিয়ম নেই। নিয়ম হলো, লোকটি অবশ্যই জ্ঞানী হতে হবে। ওখানে শুধু জ্ঞানী ব্যক্তিকেই সম্মান করা হয়।
পিপুনের কথা শুনে ইতুল খুব মজা পেলো। হেসে ওঠল সে। হাসতে হাসতে বললো, অ্যাঞ্জেল হোমে তো দেখছি ভারি আশ্চর্য নিয়ম।
ইতুলের হাসি দেখে পিপুনও হেসে ওঠল। পরে হাসি থামিয়ে সে তাকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছাÑতোমার মনটা কী কোনো কারণে আজ বেশি খারাপ?
ইতুল বললো, হ্যাঁ। কিন্তু আপু আপনি কী করে বুঝলেন? ইতুল পিপুনকে সম্মান করে কথা বলতে শুরু করলো।
পিপুন বললো, না মানে তোমাকে দেখে আমার কেন জানি মনে হলো কিছু একটা সমস্যা যাচ্ছে তোমার। কী সমস্যা? আমাকে বলতে পারো।
ইতুল বললো, আমার বাবা খুব অসুস্থ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্যান্সারে ভুগছেন। ডাক্তার বলে দিয়েছেনÑশেষ পর্যায়। এখন তখন অবস্থা।
পিপুন বললো, ক্যান্সার আর এমন কী অসুখ। অ্যাঞ্জেল হোমে কেউ কখনও ক্যান্সারে ভোগে না। ওখানকার রোগগুলো আরও জটিল। সবই দুরারোগ্য ব্যাধি। তুমি জানো না ইতুল। আমি অ্যাঞ্জেল হোমের একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ। আমি তোমার বাবার চিকিৎসা করতে চাই। আমার বিশ্বাস আমার হাতে চিকিৎসা পেলে তিনি সেরে উঠবেন।
পিপুনের কথা শুনে ইতুল বললো, সত্যি বলছেন আপু, আপনি আমার বাবার চিকিৎসা করবেন?
পিপুন বললো, হ্যাঁ। আমাকে তোমাদের বাসায় নিয়ে চলো। আমি চিকিৎসা দিয়ে তোমার বাবাকে সারিয়ে তুলতে পারবো।
বাবা সেরে উঠবেন শুনে ইতুল আবেগে একেবারে কেঁদে ফেললো। তার কান্নাভরা ঝাপসা চোখের সামনে ভেসে ওঠলÑবাবা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন। তার দিকে তাকিয়ে বাবা মিটিমিটি হাসছেন। ঠিক আগের মতো হাসছেন। আগে যেমন করে তিনি ইতুলকে কাছে ডেকে নিতেন, তেমনি তাকে কাছে ডেকে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কল্পনায় বাবার হাতের পরশ পেয়ে ইতুলের প্রাণটা যেন জুড়িয়ে গেল।
পিপুন বললো, কী এত ভাবছো ইতুল? ছোটদের এত বেশি ভাবতে নেই। বেশি চিন্তাভাবনা করলে মন খারাপ হয়ে যায়। চলো, আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো। গিয়ে দেখি তোমার বাবার অবস্থাটা কেমন।
ইতুল দুহাতে চোখ মুছে নিয়ে বললো, চলুন আপু।
বলে দুজন গিয়ে পিপুনের মহাকাশযানটায় চড়ে বসলো। শো-শো-শো আওয়াজ তোলে মহাকাশযানটি শূন্য ওড়া দিলো। দেখতে না দেখতেই ওটি ইতুলদের উঠোনে এসে নামলো। ইতুলের মা তখন উঠোন ঝাট দিচ্ছিলেন। আচমকা একটি মহাকাশযান তাদের উঠোনে এসে নামতে দেখে তিনি প্রথমে হকচকিয়ে উঠলেন। পরে এর ভেতর থেকে ইতুল ও পিপুনকে নামতে দেখে তিনি আশস্ত হলেন। কৌতূহলী হয়ে মা জিজ্ঞেস করলেন, বাবা ইতুল! তোর সাথের মেয়েটি কে রে বাবা?
ইতুল বললো, ডাক্তার আপু মা। তিনি অ্যাঞ্জেল হোম নামক গ্রহের বিরাট ডাক্তার। বাবার চিকিৎসা করতে এসেছেন।
‘ডাক্তার আপু!’ কথাটি শোনামাত্র মা বড় বড় চোখ করে একবার পিপুনের দিকে তাকালেন। বিড়বিড় করে বললেন, এতটুকুন ছোট্ট খুকি! ডাক্তার হলো কেমন করে?
কথাটি ইতুল শুনতে পেলো না। পিপুন ঠিকই শুনলো। শুনে বললো, আমি মহাকাশের মানুষ মা। মহাকাশের মানুষরা দেখতে এমনি হয়।
পিপুনের কথা শুনে মা বললেন, ওÑতাই বলো। তা কী খাবে মা?
পিপুন বললো, আমি এখানে রোগির চিকিৎসা করতে এসেছি মা। রোগির চিকিৎসা করতে গিয়ে অ্যাঞ্জেল হোমে খাবার গ্রহণ বারণ। ভালোয় ভালোয় আগে চিকিৎসাটা হয়ে যাক। তারপর ভেবে দেখবো কী খাওয়া যায়।
ইতুল পিপুনকে নিয়ে অসুস্থ বাবার কাছে গেল। বাবা একপ্রকার অচেতন হয়েই বিছানায় পড়েছিলেন। পিপুন বাবার নাড়ি দেখে চমকে ওঠল। বললো, ও মাই গড! আর একটু দেরি হলেই অঘটন ঘটে যেতো।
বলে সে তার ব্যাগ খুলে একটি যন্ত্র বের করলো। দেখতে অবিকল ইসিজি যন্ত্রের মতো। অনেক তার লাগানো। ছোটখাটো যন্ত্র। পিপুন প্রথমে ইতুলের বাবাকে কিছু একটা ইনজেকশন পুশ্ করলো। পরে ইসিজি যন্ত্রের মতো দেখতে যন্ত্রটি বাবার বুকে স্থাপন করলো। পিপুন সময় নিয়ে ছোট বেলুনের মতো দেখতে অন্য একটি যন্ত্রের সাহায্যে চেপে চেপে বাবার শরীর থেকে কী যেন বের করে আনলো। পিপুন ছোট বেলুনে প্রতিবার চাপ দেওয়ার সাথে সাথে অচেতন বাবাকে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠতে দেখা গেল। এ প্রক্রিয়া অনেকক্ষণ ধরে চালিয়ে পিপুন একসময় থামলো। সে যন্ত্রটিকে বাবার শরীর থেকে খুলতে খুলতে বললো, বিপদ কেটে গেছে। আমি আমার ইকোমিটারটি দিয়ে উনার শরীরের ক্যান্সারের কোষগুলো নষ্ট করে দিয়েছি। আপাতত উনাকে জাগাবার দরকার নেই। উনার উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। ঘণ্টাখানেক পর উনি নিজেই জেগে উঠবেন।
পিপুন ইতুলের বাবার চিকিৎসাটা শেষ করে তার যন্ত্রগুলো ব্যাগে পুরলো। ততক্ষণে বাইরে আবারও তুমূল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই পিপুন তার মহাকাশযানে গিয়ে ওঠল। ইতুলের মা পিপুনকে কিছু একটা মুখে দিয়ে যাওয়ার জন্য ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক অনুরোধ করলেন। কিন্তু পিপুন কিছুতেই রাজি হলো না। বললো, খাবার হিসেবে পৃথিবীতে একমাত্র বৃষ্টিটাই আমার পছন্দ। বাইরে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টি খেতে খেতেই আমি অ্যাঞ্জেল হোমে ফিরে যাবো। বলে ডাক্তার পিপুন তার মহাকাশযানের ইঞ্জিন চালু করলো। শোÑশোÑশো আওয়াজ শোনা গেল। পরক্ষণে মহাকাশযানটি শূন্য ওড়া দিলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT