শিশু মেলা

ইচ্ছা পূরণ

মোঃ মনজুর আলম প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০১-২০১৮ ইং ০২:১১:০২ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

হালিমা মন খারাপ করে ঘরে বসে আছে। দুইদিন তাদের ঘরে কোনো খাবার নেই। বাবা মিনহাজ দিনমজুর। প্রায় সময় কাজ না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরে আসেন। হালিমা ও তার ভাই সোহেল উপোস করতে করতে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অভাবের সংসারে বাচ্চাদের অনেক ইচ্ছাই অপূরণীয় থেকে যায়। কেউ কোনো কিছু তাদের সামনে খেলে তারা ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকে।
হালিমা একদিন তার বাবাকে বলল বাবা, আমাদের সবাইকে সিলেট নিয়ে যাও না। সিলেটে নাকি বেশি টাকা রোজগার হয়! বাবা বললেন, কিশোরগঞ্জ থেকে সিলেট যেতে যে টাকার প্রয়োজন তা পাব কোথায়? মিনহাজ মিয়াও সিলেট যেতে ইচ্ছুক। একদিন তারা সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে ঠিকই পৌঁছে গেলেন। অচেনা একটা স্থানে বেশি দূর না গিয়ে স্টেশনের পাশেই একটি কলোনিতে তারা অবস্থান করা শুরু করলেন। পরদিন সকালে হালিমা ও সোহেল বাসা থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রেলের আসা-যাওয়া দেখছিল। তাদের গ্রাম ছেড়ে আসার সে দুঃখ কিছুটা যেন রেল দেখে দেখে ভুলতে লাগল। এখানে গ্রামের সেই বিস্তীর্ণ মাঠ নেই, গ্রামের সেই বড় বড় পুকুর নেই। নেই সেই বিশাল জলাভূমি। একটু ভালো খাবার একটু ভালো পরার জন্য এখানে আসা। বাবা রিকশা চালালে ভালো রোজি হবে জেনে রিকশা নিয়ে প্রতিদিন বের হন। হালিমা ও সোহেল প্ল্যাটফরমে গিয়ে বসে থাকে। যাত্রীরা কিছু খেলে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তাদের চাহনিতে খাবার ইচ্ছা বোঝে অনেকেই এটা সেটা দিয়ে তাদের ইচ্ছা পূরণ করেন।
রেলপথে কত কত যাত্রী প্রতিদিন যাওয়া আসা করেন। কেহ কেহ সপ্তাহে বা মাসে ৬-৭ বার বিভিন্ন প্রয়োজনে যাতায়াত করেন। এদের মধ্যে অনেকেই হালিমা ও সোহেলকে চেনেন। ট্রেন আসতে বিলম্ব হলে ওয়েটিং রুমে বসা বা প্ল্যাটফরমে হাটা ছাড়া যাত্রীদের আর কি করার থাকে। যারা সোহেল ও হালিমাকে চেনেন তাদের মধ্যে একদিন এক যাত্রী রেশমা জান্নাতুল রুমা, হামিলাকে কাছে ডাকলেন জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কী কর? হালিমা বলে স্টেশনে ঘুরাঘুরি করি। আমার ইচ্ছা যাত্রীরা যা খায় আমি যদি তা খাইতে পারতাম আমার আব্বায় শুধু চাল, ডাল আনে অন্যকিছু তাই খাইতে পারি না। স্টেশনে কত বড় লোক যায় তাদের খাওয়ার সময় চেয়ে থাকি কেউ দেয় আর কেউ দেয় না। রুমা বললেন, এগুলি খেতে কি তোমার ইচ্ছা হয়?
হ্যাঁ আপা খুব ইচ্ছা হয় কারণ কমলা, আঙ্গুর, আপেল এতো মিষ্টি এই স্টেশনে আসার আগে কোনো দিন খাইনি। আমার ভাই সোহেল ও আমি এই ভালো ভালো খাবার থেকে আমাদের মা-বাবার ইচ্ছা পূরণ করি, আম্মা-আব্বা এমন ফলমূল পাবে কোথায়?
সোহেল বললো, আপা আমাদের বড় ইচ্ছা আমরাও আপনাদের মত বড় হতে চাই আমরাও একদিন এভাবে গরিবদের ইচ্ছা পূরণ করতে চাই।
তাইলেতো তোমাদেরকে লেখাপড়া করতে হবে।
হালিমা ও সোহেল এক সাথে বললো, আমাদের বাবা গরিব ঠিকমতো কাপড় দিতে পারে না, ভাত দিতে পারে না তারা কেমনে পড়ালেখার খরচ দেবে?
এসব কথা শুনে কলেজ পড়–য়া রুমা চিন্তায় পড়ে গেলেন এবং তার মনে বাচ্চাদের এমন অবস্থা দেখে কিছু একটা করার তাড়া জেগে উঠে। কলেজে ফিরে রুমা তার সহপাঠী জাহিদুল, আজিজুর, আহমেদ, রাসেল, রেহান এদের সাথে আলাপ করে ঠিক করলেন স্টেশনে শিশুদের জন্য কিছু করার। তাদের পর্যবেক্ষণে তারা দেখলেন রেলস্টেশনের পাশে বসবাসকারী কলোনীর বেশির ভাগ মানুষই অপরাধের সাথে জড়িত। ক্ষেত্র বিশেষে তাদের শিশু কিশোরদের মাধ্যমে কেউ হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা ইত্যাদি সরবরাহ করে থাকে। এই দৃশ্য রুমার সহপাঠীদের ভাবিয়ে তুলেছে। তারা সকলে রেল স্টেশনে এদের জড়ো করে প্ল্যাটফরমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করলেন। স্টেশন ম্যানেজার ও মাস্টার তাদের এ কাজে সাহায্য করলেন। হালিমা ও সোহেলের মতো অনেকের এখন ইচ্ছা পূরণ হতে থাকল। তারা এখানে বড় হবার স্বপ্ন দেখে। তাদের ইচ্ছায় রুমা বাহিনীর কারণে রঙিন স্বপ্ন শিশুদের অভিভাবকদের আলোড়িত করল। সমাজ সচেতন কিছু ছাত্রের কারণে ক্ষতি থেকে মুকুলে ঝরা বাচ্চারা ফুল হয়ে ফুটতে থাকল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT