উপ সম্পাদকীয়

আপন ভুবন, অচেনা আকাশ

প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০১-২০১৮ ইং ২০:৪০:২৭ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত

আর যাঁদের কথা মনে পড়ে তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ফজলুল করিম, অর্থনীতির ইমদাদুল হক মজুমদার, সফিউর রহমান, ইসলামের ইতিহাসের হায়দার হোসেন, শফিক উদ্দিন, দর্শনশাস্ত্রের ফজলুর রহমান, আব্দুর রশীদ, আব্দুল হালিম, সংস্কৃতের জগদীশ ভট্টাচার্য, অঙ্কে মুহিব আলী, আব্দুল মতিন, শামসুদ্দিন প্রমুখ। এরা সবাই বসতেন শিক্ষক মিলনায়তনে। বিজ্ঞান-শাখার অধ্যাপক নূরুজ্জামান, গোলাম রসুল, বিধুভূষণ চন্দ, প্রশান্ত, পীযূষ ভট্টাচার্য, বাণিজ্যের খলিলুর রহমান চৌধুরী, হোসেন আলী, এঁরাও মাঝে মাঝে এসে আড্ডায় যোগ দিতেন। এঁরা সবাই সাধারণত বসতেন তাঁদের নিজ নিজ বিভাগে। মুহিব আলী-আব্দুল মতিন-ফজলুর রহমান সাহেবদের মত দু’একজন অতি সিনিয়র ও অতি সিরিয়াস অধ্যাপক ব্যতীত বাকি সবাই ছিলেন খুব প্রাণবন্ত ও আমুদে। রসায়নের নূরুজ্জামান সাহেব ও বাংলার হাসনা আপা ছিলেন স্বামী-স্ত্রী। দু’জনেই ছিলেন খুবই সজ্জন ও সদালাপী।
এমসি কলেজের ক্যাম্পাস ছিল বাংলাদেশের সুন্দরতম ক্যাম্পাসগুলোর একটি। শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে মাইল তিনেক দূরে সিলেট-তামাবিল সড়কের টিলাগড় পয়েন্টে বেশ কয়েকটি টিলা ও তাদের উপত্যকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ক্যাম্পাসটি। রাস্তার ওপর একটি সাদামাটা গেইটে কলেজের নাম লেখা। সেখান থেকে ভারী সুন্দর পীচের রাস্তাটি আস্তে আস্তে উঁচু হতে হতে উঠে গেছে প্রশাসনিক ভবনের দিকে। ওই রাস্তা বেয়ে ধীরে ধীরে উঠতে হবে টিলাভূমিতে ওঠার গতিতে, যেন নিয়ম না মেনে দুদ্দাড় করে দশমিক কাঁপিয়ে উঠতে মানা এমসি কলেজের মূল চত্বরে। ওই পীচঢালা পথ বেয়ে একটু উঠলেই হাতের ডান দিকে অপেক্ষাকৃত নিচুভূমিতে লাল টিনের ছাউনি, সাদা চুনকাম করা দেয়ালের ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরি। হাতের বাঁ দিকে একটা পাকা চৌচালা ঘর। ওটি মেয়েদের কমনরুম। সামান্য আরেকটু এগিয়ে গিয়ে ওই বাঁ দিকেই প্রশাসনিক ভবন। ওই ভবনে যাওয়ার আগে এখানে আপনাকে থেমে দম নিতেই হবে। কারণ এতক্ষণ ঈষৎ চড়াই পার হওয়ার পর সামনে মইয়ের মত খাড়াভাবে উঠে যাওয়া সিঁড়িগুলো একটি দু’টি নয়, অনেকগুলো। যেন টিলার ওপর অবস্থিত দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। দেখতে ভারী সুন্দর। দাঁড়িয়ে ছবি তোলার উপযুক্ত স্থান। টিলার গা কেটে বসানো লাল পাথুরে ইটের এই সোপানরাজির উল্টোদিকে একই ধরনের আরও কিছু সিঁড়ি। তবে মাত্র কয়েকটি। এগুলো দিয়ে উঠে যেতে হবে এম.সি কলেজের বিরাট দ্বিতল কলাভবনে। কলাশাখার প্রায় সবগুলো ক্লাসই হয় এই ভবনে।
সারা ক্যাম্পাস জুড়ে পাতা সবুজ ঘাসের গালিচা। তার ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে কালো পীচের ঝকঝকে তকতকে রাস্তা। যেন সবুজ শাড়ির কুচকুচে কালো পাড়। এখানে ওখানে নানা রঙের নানা জাতের ফুলের কেয়ারি। বলতে পারেন, সেই সবুজ শাড়িটির জমিনে নানা রঙের নানা ঢঙের বুটিদার কাজ। কোথাও কোথাও অবিকল একই রকম দেখতে বিরাট আকৃতির পামগাছের সারি। মূল ক্যাম্পাসের পেছন দিকে বিশাল লাইব্রেরি ভবন। ওতে কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সংগৃহীত ও সংরক্ষিত হাজার হাজার মূল্যবান পুঁথি-পুস্তকই শুধু নয়, দেয়ালে শোভা পাচ্ছে এই কলেজের ভূতপূর্ব অনেক প্রতিথযশা অধ্যক্ষ-অধ্যাপকের অয়েল পেইন্টিং। লাইব্রেরি ভবন পার হয়ে এগিয়ে গেলে কলেজ মিলনায়তন-কাম-ছাত্রদের কমনরুম। তার সামনেই একটি নাতিবৃহৎ জলাশয়। ওতে কাউকে কোনদিন ¯œান-টান করতে দেখা যায়নি। তবে দুপুরের রোদ টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে ওটার বুকে অসংখ্য রূপালি মুদ্রা ছড়াতে দেখেছি আমি। আর রাতের নির্জনতায় সোনালি জোছনা গায়ে মেখে পরীরা তো এমন জলাশয়েই নাইতে নামে। রোজ কলেজ ছুটির পর চারদিকের সুশান্ত সুনীল নির্জনতায় কলেজের এদিকটা মনে হত রূপকথার মায়াপুরীর মত। না, তখন মাদকসেবীদের নামও শোনা যায়নি, ছিনতাইকারীরাও মাটি ফুঁড়ে উদয় হতো না আঘাটা-বেঘাটায় সায়াহ্নের স্তব্ধ সমাহিত রূপটাকে ছিনিয়ে নিতে। তখন অদূরবর্তী ছাত্রাবাসের দুই বন্ধু পুকুর পাড়ে বসে যখন আনমনে ঘাসের ডগা ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা বলত, কিংবা অকস্মাৎ শান্ত সরসীর নীরে দু’টি নুড়ি ছুড়ে মারত, তখন এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে নিশ্চয়ই কারও কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না।
সেই ১৯৬৩ সালে টিলাগড় পর্যন্ত সিলেট শহর পুরোপুরি বিস্তৃতিলাভ করেনি। আর ঊনিশ শ বিশের দশকে এলাকাটিতো বোধ হয় গ্রামই ছিল। একটা জনবসতি বিরল বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় এম.সি কলেজের বিশাল ক্যাম্পাস শিক্ষার্থী-দর্শনার্থী নির্বিশেষে সকলেরই চোখ জুড়াত সন্দেহ নেই।
কোন কোন ভবন ছিল ছোট ছোট টিলার ওপর, যেমন প্রশাসনিক ভবন, আবার বৃহদাকারের দ্বিতল কলাভবনটি দেখলেই বোঝা যায় পাহাড় কেটে ভূমি খানিকটা সমতল করে ওটা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা লাল টিনের চাল ও দেয়ালে সাদা চুনকাম করা একতলা শেড দু’টি যেন পদার্থবিদ্যা ও রসায়নশাস্ত্রের ল্যাবরেটরি নয়, মাথায় লাল স্কার্ফ জড়ানো সাদা ফ্রক, সাদা স্কার্ট পরা দু’টি কিশোরী, তারা দাঁড়িয়ে আছে অভ্যাগতদের অভ্যর্থনা জানাতে কলেজ গেইটের পাশেই। আর একাডেমিক ভবনগুলো থেকে খানিকটা দূরে ছাত্রাবাসের লম্বা লম্বা পাঁচটা ব্লক, লাইন করে দাঁড়ানো লাল ফৌজের পাঁচ সারি সুশৃঙ্খল সৈনিক দলের মত। ছাত্রাবাসের সামনে রাস্তার দক্ষিণ পাশে বিশাল ময়দান। তবে এর অস্তিত্বের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ছাত্রদের কদাচিত খেলাধূলা করতে দেখা যেত, শূন্য মাঠ প্রায় সারা বছরই শুয়ে শুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। ছেলেরা লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকত। আর সুযোগ পেলেই ছুটত শহরে। সেখানে ‘লালকুঠি’, ‘দিলশাদ’ আর ‘রঙমহলে’ সিনেমা দেখা ছিল বড় আকর্ষণ।
এই ছাত্রাবাসই বোধ হয় ছিল দেশের একমাত্র ছাত্রাবাস যেখানে দুপুর ও রাতের খাবার ছাড়াও বিকেলে সামান্য সব্জি-ডালযোগে ভাত খেতে দেয়া হতো ছাত্রদের। অর্থাৎ তিন বেলা পেট পুরে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা। টু স্কোয়ার মিল নয়, থ্রি স্কোয়ার মিল আ ডে!
যুগ যুগ ধরে কালের করাল থাবা হরণ করেছে এই অপূর্ব সুষমামন্ডিত ক্যাম্পাসটির প্রায় সকল অঙ্গভূষণ। চারপাশের বিশাল এলাকাজুড়ে নীল নির্জনতায় সমাহিত সেই ধ্যানমগ্ন উঁচুনিচু টিলাগুলো আজ আর নেই; কিছুটা রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক প্রয়োজনে, আর বেশির ভাগই ভূমিখেকোদের ক্ষুন্নিবারণের জন্য আত্মাহুতি দিয়েছে গাছপালা-টিলাটক্কর। এখন চারপাশে শুধু মানুষ আর মানুষ। সেই সঙ্গে ইট-পাথরের ঠাসবুনুনিতে গড়ে ওঠা জনাকীর্ণ জনপদ, আবাসিক-অনাবাসিক স্থাপনা, যার মধ্যে বিপণি-বিতানই বেশি।
প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ছেড়ে আসা করিমুল্লাহ হাউসকে সম্প্রতি দেখতে গিয়ে আমার রীতিমত কান্না পাচ্ছিল। করিমুল্লাহ হাউস? কোথায় করিমুল্লাহ হাউস? সেই ঝোপঝাড় ভর্তি টিলার ওপর দুই বিগত যৌবনা যমজ সুন্দরীর মত পাশাপাশি দন্ডায়মান করিমুল্লাহ হাউস নামক প্রাচীন অট্টালিকা দু’টির চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। চতুষ্পার্শ্বের গাছপালা, লতাগুল্ম কেটে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে নিতান্ত সাদামাটা কয়েকটি বসতবাড়ি। সেই রাত্রিদিবস গা ছমছম করা নৈঃশব্দও আর নেই। মনে পড়ে, একদিন এক নির্জন দুপুরে একটি আট-দশ হাত লম্বা বিষধর সর্পকে নিতান্ত অলস ভঙ্গিতে বাড়ির পাশের ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে যেতে দেখে আমার রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল। রোজ রাতে থেকে থেকে শেয়ালের ডাকও খুব একটা সুখানুভূতির সৃষ্টি করত না। ওই টিলা, ওই ঝোপঝাড়, দালান, সব কেটেকুটে ভেঙেভুঙে সাফ করা হয়েছে সেই কবে। আর সামনের আলীশান পুকুরটিও জ্যান্ত ‘সমাধিস্থ’ হয়ে হয়ে অপেক্ষায় আছে নতুন স্থাপনার। কে বলবে একদা এখানে একটি গাছপালার ছায়াঘেরা সুশীতল জলাধার ছিল। এখন পড়ে আছে শুধু এক মৌন হাহাকার। ‘কোথা সে ছায়া সখী, কোথা সে জল!/কোথায় সে বাঁধা ঘাট, অশথতল!’ .....
সে আমলে ‘সিনথেটিক’ পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবহার  খুব বেড়ে গিয়েছিল’। ষাটের দশকের শুরুতে তো ওটাই রীতিমত ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এগুলোর স্বাস্থ্যহানিকর দিক সম্বন্ধে কোন সচেতনতা তখনও সৃষ্টি হয়নি। বরং ‘সিনথেটিকের’ ময়লা কাপড়চোপড় হাতে কেচে ধুয়ে পরিষ্কার করে হাওয়াতে ঝুলিয়েই চটজলদি শুকিয়ে ফেলা যেত বলে লোকে সহজে প্রলুব্দ হয়ে ওঠে ওগুলোর প্রতি। ফলে ‘ক্যারিলিন’ টেরিলিন’ ইত্যাদি নামের শতকরা একশ ভাগ কৃত্রিম আঁশের তৈরি শার্ট-প্যান্ট এবং মেয়েদের পরিধেয় ‘নাইলন’ শাড়ি সূতীবস্ত্রকে প্রায় হটিয়ে দিয়েছিল বাজার থেকে। যাদের কাপড়-চোপড় কম ছিল, সেই সব মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ এ ধরনের একটি শার্ট বা প্যান্ট রাতে ধুয়ে দিয়ে সকালবেলা দিব্যি ফকফকে পোশাক পরে কাজে যেতে পারত। ইস্ত্রি করারও দরকার ছিল না। তবে সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, এ জাতীয় কাপড়গুলো কখনওই ছিঁড়ত না, যেন এগুলো অমরত্বের বর নিয়ে ফ্যাক্টরি থেকে বের হতো। আজকাল সূতীবস্ত্রের উৎপাদন, জনসাধারণের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা, তাদের আয় ও জীবনযাপনের মান আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায়, নিতান্ত হতদরিদ্র মানুষ ছাড়া কেউ এগুলো ব্যবহার করেন না।
‘সিনথেটিক’ কাপড় সম্বন্ধে এত কথা বলার কারণ, ষাটের দশকে ছাত্র-শিক্ষক সবাই আমরা এর গুণগ্রাহী ছিলাম, এটা এস্তেমাল করতাম দেদারসে। দশ-বারো টাকায় একটা মোটামুটি চলনসই মানের ক্যারিলিন/ টেরিলিন শার্ট পাওয়া যেত। পনের-বিশ টাকা হলে তো আর কথাই নেই। সে আমলে হাফ হাতা বুশ শার্ট পরত তরুণরা। আর ফুলহাতা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে পরার চল ছিল বেশি। কেবল প্রবীণদের  দেখা যেত শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত টেনে লম্বা করে পরতে। আমি চোখ বুঁজলে এখনও যেন সিলেট এম.সি কলেজের শিক্ষক মিলনায়তনে শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে বসে থাকা এক ঝাঁক তরুণ অধ্যাপককে দেখতে পাই; আনোয়ার হোসেন, তকদীর হোসেন, আবুল কালাম আজাদ, তাইয়েবুর রহমান, আরও অনেকেই। এর মধ্যে আবার প্রবীণ প্রফেসর মুহিব আলী, আব্দুল মতিন, ফজলুর রহমান সাহেবরা শুধু শার্টের হাতাই লম্বা করে পরতেন না, কখনও কখনও শার্টের গলার বোতামটিও সেঁটে দিতেন। আর প্যান্টের মুহুরির ঘের যে কত বার বদলাল দেখলাম তার ঠিক নেই। ব্রিটিশ আমলের ঢিলেঢালা পাতলুনের জায়গায় ড্রেন-পাইপের মত চোঙ্গা পাতলুন এল উনিশ শ ষাটের দশকের প্রথম ভাগে। একই অবস্থা মেয়েদের সালওয়ার-কামিজের কে কত চামড়াসাঁটা প্যান্ট-সালওয়ার-কামিজ পরতে পারে, এক শ্রেণির ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল তার প্রতিযোগিতা। এর আগে পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে শুরু হয়েছিল কোল বালিশের খোলের মত ঢোলা পাঅলা প্যান্টের ফ্যাশন। একেকটা প্যান্টের মুহুরি ছিল ২৪ ইঞ্চি ২৬ ইঞ্চি, যার ভেতরে অনায়াসে পোষা ছাগল-কুকুর-বেড়াল ঢুকিয়ে নেয়া যেত! এই ফ্যাশন অবশ্য বেশিদিন চলেনি। এর পরই এল চোঙ্গা মার্কা জামা-কাপড়ের জমানা। এর চালু নাম ছিল ‘টেডি’ ড্রেস। প্যান্টের মুহুরি এক ঝটকায় ২৬ থেকে নেমে ১৩/১৪ হয়ে গেল, সালওয়ার যেন চামড়া কেটে সেঁধিয়ে যাবে শরীরে।
তরুণদের মধ্যে আরেকটা ফ্যাশন ছিল চামড়ার বাহারি ডিজাইনের ‘পাম্প সু’ যা ‘মোকাসিন’ নামেই বেশি পরিচিত ছিল-পায়ে দেয়া। ফিতেঅলা কাবুলি স্যান্ডেল বা ওই ধরনের স্যান্ডেল-সুও জনপ্রিয় ছিল। ‘মোকাসিনের’ অগ্রভাগটা প্রায়শই ছিল সায়েবদের নাকের মত ছুঁচোলো।
পদের (পা নয় চাকরি অর্থে) সঙ্গে মানানসই এক জোড়া দৃষ্টিনন্দন ‘অক্সেফোর্ড সু’ কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম ঢাকা থেকে। সেই কালো চকচকে নতুন জুতা, হাতা গুটানো ‘ক্যারিলিনের’ নতুন সাদা শার্ট এবং বিস্কিট রঙের সুতী পাতলুন পরে নিজেকে খুব একটা গবেট মনে হল না প্রথম দিন টুয়েলভ-বি সেকশনের ছাত্রছাত্রীদের সামনে দাঁড়াতে। ক্লাসটি ছিল কলাভবনের দোতলায় সবচেয়ে বড় হলরুমটিতে। পড়–য়ারা সব বিজ্ঞান শাখার ছাত্রছাত্রী। হরগঙ্গা কলেজের মত হাতেগোনা দু’ চার জন মাত্র ফার্স্ট ডিভিশনের ম্যাট্রিক পাশ করা, বাকিরা সব সেকেন্ড ও থার্ড ডিভিশন, এমনটি এখানে নয়। এদের মধ্যে ফার্স্ট ডিভিশনের ছড়াছড়ি। থার্ড ডিভিশন বোধ হয় কেউ নেই। শিগগিরিই বুঝতে পারলাম, নামকরা সব স্কুল থেকে পাশ করে আসা এসব ছাত্রছাত্রী বাস্তবিকই মেধাবী ও চৌকশ। এদের জানার আগ্রহও যথেষ্ট, কথাবার্তায় আছে বুদ্ধির ছাপ।
হরগঙ্গা কলেজের নয় মাসের অভিজ্ঞতার আলোকে বেশ গুছিয়ে-গাছিয়ে, যথাসাধ্য রসকষের ভিয়েন দিয়ে, প্রথম দিনের প্রথম বক্তৃতা শেষ করলাম। ভাল লাগল শ্রোতৃমন্ডলীর সাগ্রহ অংশগ্রহণ, প্রশ্ন উত্থাপন, অখন্ড মনোযোগ ইত্যাদি সবই। পরে অন্যান্য ক্লাসেও মোটামুটি একই রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আসলে সে আমলে এতদঞ্চলের সব স্কুলের ভালো ভালো ছাত্রছাত্রী সরকারি এম.সি কলেজে ভর্তি হতে আসত। অবশ্য ছাত্রীরা শুধু বিজ্ঞান শাখায়ই ভর্তি হতে পারত, কলাশাখায় তাদের ভর্তি করা হতো না। এর কারণ শহরে তখন মেয়েদের একটি বেসরকারি কলেজ (বর্তমান সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ) চালু ছিল। ওটাকে চাঙ্গা রাখতেই এই নিয়ম করা হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে এম.সি কলেজে সব শ্রেণি মিলিয়ে মেয়েদের সংখ্যা ছিল অনুমানিক ২৫/৩০ জন। এরা সবাই উচ্চমাধ্যমিক (বিজ্ঞান), ¯œাতক (বিজ্ঞান) ও অর্থনীতি (সম্মান)-এর ছাত্রী ছিল উল্লেখ্য, তখনকার দিনে আমাদের দেশে মেয়েরা বাণিজ্য নিয়ে পড়ত না বললেই চলে।
উচ্চ মাধ্যমিক ও ¯œাতক (কলা) পর্যায়ে ইংরেজি ও বাংলা ছিল বাধ্যতামূলক। ফলে এই দুই বিষয়ের শিক্ষকদের প্রায় সব শ্রেণিরই ক্লাস নিতে হতো। আমিও তাই নিতাম। ¯œাতক (কলা) শ্রেণির কয়েকজন ছাত্র ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে ইংরেজি সাহিত্য পড়ত। এদেরকে কিছু কিছু নির্বাচিত গদ্য-পদ্য পড়িয়ে বেশ আনন্দ পাওয়া যেত। বিশেষ করে কাব্যরচনা করে। তখন এম.সি কলেজে ¯œাতক পর্যায়ে কেবল অর্থনীতিতেই বোধ হয় অনার্স চালু ছিল। ফিজিক্স-কেমিস্ট্রির কথা ঠিক মনে পড়ছে না।
এমনিতে ¯œাতক (কলা) ক্লাসে পড়াতে হতো ফাংশনাল ইংলিশ বা ব্যবহারিক ইংরেজি বলে একটা বিষয়। এর উদ্দেশ্য বোধ হয় ছিল ছাত্রছাত্রীদের দৈনন্দিন জীবনে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, কল-কারখানায় ব্যবহৃত ইংরেজির তালিম দেয়া। বিলেতে মুদ্রিত ও প্রকাশিত দু’টো বই ছিল পাঠ্যতালিকাভুক্ত। আর আমাদের অর্থাৎ ইংরেজি শিক্ষকদের কাজ ছিল ‘কী করে চা বানাতে হয়’, ‘বাড়িতে মেহমান এলে কীভাবে রিসিভ করবে?’ ‘সাইকেলের টায়ার ফেঁসে গেছে, এখন কী করবে?’ এমনি সব ‘মহা গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়ে নিবন্ধ লিখতে দেয়া, সেই সঙ্গে সাহেবদের জীবনে ব্যবহৃত এবং আমাদের দেশে অজ্ঞাত কিছু বাকধারা, শব্দবন্ধ ইত্যাদির অর্থ নামী-দামী দু’চারটা অভিধান ঘেঁটেঘুঁটে আগে নিজে শিখে ছাত্রদের শিখিয়ে পন্ডিত করে তোলার চেষ্টা করা।
তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি, আসলে আমাদের দেশে সেই আমলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী, সেই উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য (যদি থাকে) অর্জনে প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় ও পাঠক্রমে কোনো ধারাবাহিকতা বা সমন্বিত প্রয়াস বিদ্যমান আছে কিনা-এসব বিষয়ে সামান্যই গুরুত্ব আরোপ করা হতো। (আজ এতদিন পর স্বাধীন দেশেও বোধ হয় আমরা অন্ধকার ঘরে একটি অস্তিত্বহীন কালো বিড়াল খুঁজে মরছি। শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের বড় বড় ‘স্বাপ্নিক’ ও ‘দার্শনিকদের’ কান্ড-কারখানা দেখে তো তাই মনে হয়)।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচী বরং ছিল অনেকটা সুবিন্যস্ত ও অর্থবহ। যে ছাত্র বা ছাত্রীটি মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েছে কোনোমতে নোট বই-টইয়ের পাচন গিলে, তাকে কলেজে এনেই পোলাও-কোর্মা ধরিয়ে দিলে তা তার কাঁচা নাড়িতে সইবে কেন? কাজেই তাকে চা বানানো আর সাইকেলের টায়ার সারানো না শিখিয়ে, ইংরেজির ক্লাসে বাপ-দাদার আমলের সেই ‘আই গো’ ‘হি গোজ’ এর ওপর আরেকটু চুন-বালি লাগিয়ে পদ্যের জানালাটি (প্রসঙ্গত পাঠ্য তালিকায় কবিতার যে বইটি অন্তর্ভূক্ত ছিল তার নামটিও ছিল ‘ম্যাজিক কেজমেন্ট’, বাংলা হতে পারে ‘মায়াবী জানালা’) একটু খুলে দিয়ে কিছু ঝরঝরে গদ্যের ঝর্ণাতলায় অবগাহিত করে, নাট্

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভেজাল প্রতিরোধে প্রয়োজন আইনের বাস্তবায়ন
  • পদ্মার সর্বনাশা ভাঙন রোধ প্রসঙ্গে
  • ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ
  • ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • দেশীয় চ্যানেল দর্শক হারাচ্ছে কেন?
  • বিশ্ব বরেণ্যদের রম্য উপাখ্যান
  • আশুরা ও কারবালার চেতনা
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী
  • অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব
  • শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা
  • প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • Developed by: Sparkle IT