উপ সম্পাদকীয়

আব্বাসীর কণ্ঠে নজরুল

ডাঃ জি.এম আনোয়ার হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০১-২০১৮ ইং ২০:৪২:২৫ | সংবাদটি ১১৬ বার পঠিত

বক্ষে আমার কা’বার ছবি / চক্ষে মোহাম্মদ রসুল, / শিরোপরি মোর খোদার আরশ / গাই তাঁরি গান পথ বেভুল।
আল্লাহর ঘর পবিত্র কা’বা আমার সামনে। আবেগ, শিহরণ, রোমঞ্চ, ভক্তি-শ্রদ্ধায় আমার সমস্ত মন-প্রাণ উদ্বেলিত। মোস্তফা জামান আব্বাসীর ভরাট ও দরদী কণ্ঠের নজরুলের এই গজলটি মনে ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে এক বিস্ময়কর অনুভূতি।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী সংগীত ও কবিতার সাথে আমরা শৈশব থেকেই পরিচিত। এই বছর (২০১৭) পবিত্র হজ্জ্ব পালনের জন্য দেড় মাস ব্যাপি পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনা সহ আরব ভূমিতে যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই নজরুলকে উপলদ্ধি করেছি। নজরুলের ইসলামী কবিতা ও গজল আরবের আকাশে বাতাসে নীরবে নিভৃতে ঝংকৃত হয়েছে, অনুরণিত হয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭ সিলেটের শহীদ সোলেমান হলে সীরাত উদযাপন কমিটির উদ্যোগে ‘নাতে রাসুল’ সন্ধ্যায় বাংলার গানের পাখি মরহুম আব্বাস উদ্দীনের সুযোগ্য পুত্র মোস্তফা জামান আব্বাসীর কণ্ঠে নজরুলের ইসলামী সংগীতগুলি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম এবং আমার আরবভূমিতে নজরুলের উপলব্ধি রোমন্থন করছিলাম। নজরুলের জন্ম ঐতিহ্যবাহী ইসলামী পরিবারে। শৈশবে মক্তবে শিক্ষকতা। পরবর্তীতে লেটো দলে যোগ দিয়ে, রুটির দোকানে ফাই-ফরমাশ খাটা সেই বালক। যে দুখু মিঞা নামে পরিচিত। পূর্ব ও পশ্চিম বাঙলার বিভিন্ন স্কুলে পড়াশুনা করে সবশেষে আসানসোলের রানীগঞ্জ শিয়ারশোল স্কুলে পড়াশুনা করেন। এই স্কুলের মেধাবী ছাত্র নজরুল দশম শ্রেণীতে পড়াকালীন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ৪৯নং বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে পশ্চিম দিকে করাচী পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু কখনও আরব ভূ-খন্ডে যান নাই। কিন্তু তাঁর হৃদয়-মন ইসলামের প্রাণ কেন্দ্র আরবভূমির জন্য ব্যাকুল ও তৃষ্ণার্ত ছিল। পবিত্র কা’বা এবং নবিজীর (স:) রওজা মোবারকের জন্য তাঁর প্রাণ ছিল আকুল।
দূর আরবের স্বপন দেখি বাংলাদেশের কুটীর হতে / বেহুশ হয়ে চলেছি যেন কেঁদে কেঁদে কা’বার পথে। / হায় গো খোদা কেন মোরে পাঠালে কাঙাল করে / যেতে নারি প্রিয় নবীর মাজার শরীফ জিয়ারতে।
নজরুল এক অলৌকিক প্রতিভা। নজরুল সকল দেশে সকল শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করে না। নজরুল আমাদের জন্য আল্লাহ পাকের এক খাস নেয়ামত।
নজরুল প্রতিভার বিকাশ মাত্র স্বল্প সময়ের জন্য কিন্তু তা বহুমাত্রিক, বৈচিত্রময় ও সমৃদ্ধ। নজরুলের কবিতা ও গান উপযুক্তভাবে অনুদিত হলে বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই বিপুল সমাদর লাভ করে বিশ্ব সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবে বলে, আমরা বিশ্বাস করি।
নজরুলের ইসলামী কবিতা ও সংগীতগুলি বাংলা সাহিত্যের এক পরম সম্পদ। এই গুলির সংখ্যাও প্রচুর এবং ইসলামের মূল বার্তার অত্যন্ত অনুগত। এইসব গান ও কবিতায় এমন একটি মূলভাব ও সুর ধ্বনিত যা তাওহীদ। রেসালাত ও আখিরাতের প্রতি একটি নিখাদ বিশ্বাসের অভিব্যক্তি। বাংলা ভাষায় এমন সুরের মূর্ছনা নজরুলের আগে কখনো শোনা যায়নি, পরেও না। এক্ষেত্রে অদ্যাবধি তিনি একক ও অনন্য। আর রাসূল (স:) প্রতি দুর্বার আকর্ষণ ও মুহাব্বত নিয়ে যে সকল গান ও কবিতা নজরুল রচনা করেছেন।
তা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাত। এর মধ্যে শিল্পগুণতো আছেই, বলিষ্ঠ ঈমানী চেতনার অন্ধকার জয়ী নূরও আছে। এই সব গানের মহিমা এমন অপরাজেয়, যা বহুকাল বাঙালি মুসলমানের মনপ্রাণকে জান্নাতী সৌরভে ভরপুর করে রাখবে। নজরুল না আসলে বাংলাভাষী মুসলিমরা এই ধরনের গান ও কবিতার শ্বাশ্বত সওগাত হতে চিরকাল বঞ্চিত থাকত। অবশ্য অনেকেই সুন্দর সুন্দর ইসলামী কবিতা ও গান লিখেছেন। কিন্তু ভাব, ভাষা, সুর, আবেগ, উপমা, শিল্প সুষমায় নজরুল এক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এক প্রজ্জ্বোলিত দীপ্তশিখা।
ইসলাম শান্তি ও সাম্যের ধর্ম-মানবতার ধর্ম। যার বাস্তব প্রতিরূপ দেখা যায় পবিত্র হজ্জ্বের সময় আরবভূমির মক্কা, মদিনা, আরাফাত ও মীনার প্রান্তরে। সাদা-কালো, আরব-অনারব, ধনী-দরিদ্র, আমির-ফকির পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে নানান ধরনের লক্ষ লক্ষ মুসলিম একই লক্ষ্যে, একই পোশাকে, একই ধ্বনিতে হাজির হয় মহান আল্লাহর দীদার লাভ ও প্রিয় নবিজীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে। তাদের মধ্যে যে ঈমানী চেতনা, সাম্যের অভিব্যক্তি, মানবিক চেতনা তা স্বচক্ষে না দেখলে উপলব্ধি করা অত্যন্ত দুরূহ। যেমন-
আজি ইসলামী ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান / নাই বড় ছোট সকল মানুষ এক সমান / রাজা প্রজা নয় কারো কেহ। / ইসলাম বলে সকলের তরে মোরা সবাই, / সুখ দুঃখ সমভাগে করে নেব সকলে ভাই।
পবিত্র হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে যখন বাড়ী থেকে রওয়ানা হলাম। নজরুলের সংগীত মনে উৎসাহ দিচ্ছিল :
‘চল রে কাবার জেয়ারতে চল নবিজীর দেশ / দুনিয়াদারির লেবাস খুলে পররে হাজীর বেশ।’
পবিত্র আরব ভূমিতে পৌঁছিয়েই মনে পড়ল নজরুলের সেই জনপ্রিয় গজলটি, ‘আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ, এই পথে মোর চলে যেতেন নূর-নবী হজরত।’ পবিত্র কা’বা তাওয়াফ করে এবং জমজমের পবিত্র পানি পান করে দেহ ও মনে জান্নাতী তৃপ্তি লাভ করলাম। মনে ধ্বনিত হল-
খোদার ঘরের দীদার পাইব,
হজ্বের পথে জ্বালা জুড়াইব, / ................. / পাব পিপাসার পানি / আবে জমজম তৌহিদ পিয়ে, / ঘুচাব পথের গ্লানি। / আল্লাহর ঘর তওয়াফ করিয়া / কাঁদিব সেথায় পরান ভরিয়া-
পবিত্র কা’বার নিকটবর্তী মা আমিনার গৃহ, যেখানে মহানবী (স:) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ‘খোদার হাবিব হলেন নাজেল খোদার ঘর ঐ কাবার পাশে। ঝুঁকে পড়ে আর্শ কুর্শী, চাঁদ, সুরষ তাঁয় দেখতে আসে।’
অদূরেই অভিশপ্ত আবু লাহাবের বাড়ী। ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে সেখানে টয়লেট করা হয়েছে। কবি নজরুল তাঁর ‘কাব্যে আমপারা’ গ্রন্থে সুরা লাহাবের অনুবাদ করেছেন :
শুরু করি নামে সেই আল্লাহর / করুণা নিধান যিনি কৃপার পাথার / ধ্বংস হোক আবু লাহাবের বাহুদ্বয় / হইবে বিধ্বস্ত তাহা হইবে নিশ্চয়। / করেছে অর্জন ধন সম্পদ সে যাহা / কিছু নয়, কাজে তার লাগিবে না তাহা / শিখাময় অনলে সে পাশিবে ত্বরায় / সাথে তার সে অনল কুন্ডে যাবে হায় / জায়া তার অপবাদ ইন্ধন বাহিনী / তাহার গলায় দড়ি বহিবে আপনি।
১০ই জিলহাজ আরাফা দিবস। সকল পাপীকে আল্লাহতায়ালা এই দিন ক্ষমা করেন। ‘আওকাতে তোর থাকে যদি আরাফাতের ময়দান, চল আরাফারেত ময়দান। এক জামাত হয়, সেখানে ভাই নিখিল মুসলমান।’ মীনা হচ্ছে হযরত ইব্রাহীম (আ:) ও হযরত ইসমাইল (আ:) স্মৃতি বিজড়িত স্থান। ‘এই দিনই মীনা ময়দানে, পুত্র ¯েœহের গর্দ্দানে, ছুরি হেনে খুন ক্ষরিয়ে নে’ রেখেছে আব্বা ইব্রাহীম সে আপনা রুদ্র পন, ছি! ছি! কেঁপো না ক্ষুদ্র মন। ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’
কা’বা শরীফের কয়েক কিলোমিটার দূরে হেরা পর্বত। এখানেই নাজিল হয়েছিল সর্বশেষ আসমানী কিতাব-পবিত্র আল কোরআন। ‘হেরা গুহার হীরার তাবিজ কোরান বুকে দোলে, হাদিস ফেকাহ বাজুবন্দ দেখে পরান ভোলে।
মক্কা থেকে বেশ দূরে তায়েফ নগরী। এখানেই মা হালিমার গৃহে প্রিয় নবিজীর শৈশব কেটেছে। ‘আমিনা দুলাল নাচে হালিমার কোলে, তালে তালে সোনার বুকে সোনার তাবিজ দোলে।’
প্রিয় নবিজীর (স:) প্রিয় শহর মদীনার জন্য নজরুলের অন্তর ছিল চাতক পাখির মত তৃষ্ণার্ত ‘ওরে ও দরিয়ার মাঝি, মোরে নিয়ে যাবে মদিনা, তুমি মুর্শীদ হয়ে পথ দেখাও ভাই আমি যে পথ চিনি না।’ নজরুল ছিলেন প্রকৃত আসেকে রসুল। প্রিয় নবিজীকে তিনি সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। তাঁর বিভিন্ন কবিতা ও গানে তা ফুটে উঠেছে। নবিজীর ভালোবাসায় তিনি যে সকল উপমা ব্যবহার করেছেন, তা অসাধারণ, অনবদ্য। ‘হে মদিনার বুলবুলি গো গাইলে তুমি কোন গজল, মরুর বুকে উঠল ফুটে প্রেমের রঙিন গোলাপ দল।’ / ‘আল্লাহকে যে পাইতে চায় হজরতকে ভালবেসে, আরশ কুর্শী লওহ কালাম না চাইতেই পেয়েছে সে।’
আরব ভূমির যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই নজরুলকে মনে পড়েছে। নজরুল বাস্তবে আরবে যেতে না পারলেও, কল্পনার চক্ষে লিখেছেন। আর বাস্তবে তিনি যদি ভ্রমণ করতেন তবে তাঁর লেখা আরও কত বেশী সমৃদ্ধ হত!
সুদুর মক্কা মদিনার পথে আমি রাহী মুসাফির / বিরাজে রওজা মোবারক যথা মোর প্রিয় নবিজীর॥ / বাতাসে যেখানে বাজে অবিরাম/তৌহিদ বাণী খোদার কালাম। / জিয়ারাতে যথা আশে ফেরেস্তা শত আউলিয়া পীর। কবি নজরুল সারা জীবন বাসনা করেছেন-রাসূল (স:) রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়ানোর। রওজায় দাঁড়িয়ে প্রিয় নবিজীকে সমস্ত হৃদয় উজাড় করে সালাম দেওয়ার আকাক্সক্ষা তিনি আজীবন লালন করেছেন। কিন্তু তাঁর সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি কোনদিনই। সে বেদনার কথা কত গানে তিনি প্রকাশ করেছেন। সে বাসনার তীব্রতায় পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাত রচনা করেছেন।
হজ্জ্বে গেলেন মোস্তফা জামান আব্বাসী। গেলেন মদিনায়। রাসূল (স:) রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়ালেন। আব্বাসী ভাইয়ের বর্ণনায়-‘আমি নবীর রওজায় দাঁড়ালাম। দরুদ পড়লাম। তারপরও শুরু করলাম নজরুলের নাতগুলি গাওয়া। আমার দু’চোখে অশ্রু নদীর মত বয়ে যাচ্ছে। মুখ বেয়ে ভিজে যাচ্ছে বুক। অনবরত চলতে থাকে সুরের ধারা। কতক্ষণ চলেছে আমি জানি না। যখন শেষ হলো তখন মনে হলো, আমার বুকটা হালকা হয়েছে। নজরুলের প্রতি কিছুটা শোধ হয়েছে ঋণ।’
কী আশ্চর্য্য, যে কবি সারা জীবন বাসনা করেছেন প্রিয় নবীর রওজা মোবারক জেয়ারতের। তাঁর সে সুর ও বাসনা পৌঁছে গেল প্রিয় নবিজীর কাছে। পৌঁছে গেল আব্বাসীর কণ্ঠে।
আর এই নিবন্ধের লেখক, আমি এক গোনাহগার হজ্জ্বে গিয়ে পবিত্র কাবা শরীফে নজরুলের নামে তাওয়াফ করে, মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর মাগফেরাত ও নাজাতের জন্য দোয়া করেছি। আর প্রিয় নবিজীর (সা:) রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে নজরুলের সালাম পৌঁছে দিয়েছি। দয়াময় আল্লাহ নজরুল ইসলামকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন। আমীন।
মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই / যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান / শুনতে পাই॥
লেখক : বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতির চিকিৎসক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সনদ অর্জনই কি শিক্ষার লক্ষ্য?
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • সিসিক মেয়র এবং আমাদের প্রত্যাশা
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
  • ১৫ আগস্ট ’৭৫ : ধানমন্ডি ট্রাজেডি
  • সেই দিনটির দুঃসহ স্মৃতি
  • মুক্তিযোদ্ধার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • চিরঞ্জিব বঙ্গবন্ধু
  • ক্ষমা করো পিতা
  • এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ
  • পোয়েট অব পলিটিক্স
  • শুধু সাক্ষরতা বৃদ্ধি নয়, প্রকৃত শিক্ষা চাই
  • নাগরিক সাংবাদিকতা ও দায়বদ্ধতা
  • শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : আমাদের শিক্ষা
  • বঙ্গবন্ধু ও ১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডি
  • কান্নার মাস
  • ছাতকে সহকারী জজ আদালত পুনঃ প্রবর্তন প্রসঙ্গে
  • মধ্যপ্রাচ্য কেন এতো সংঘাত ও যুদ্ধ প্রবণ অঞ্চল
  • Developed by: Sparkle IT