ধর্ম ও জীবন

ইলমে তাসাউফের খেদমতে আল্লামা ফুলতলী (রহ.)

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০১-২০১৮ ইং ২০:৪৭:১৭ | সংবাদটি ২০১ বার পঠিত

যে বিষয় চর্চা করলে মানুষকে উত্তম চরিত্র গঠন করতে সাহায্য করে, আল্লাহর পরিচয় লাভ করতঃ তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পথ দেখায় এবং যার মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান মোতাবেক শান্তিময় জীবন পরিচালনা করার শিক্ষা লাভ করা যায় তাকে ইলমে তাসাউফ বলে। ইলমে তাসাউফে ইলমুল কলব, ইলমে, মুকাশাফা, ইলমে লাদুনী ও ইলমে বাতিন নামেও অভিহিত করা হয়। ইলমে তাসাউফ হচ্ছে ইসলামের অন্যতম প্রাণশক্তি। ইলমে তাসাউফ থেকেই ইসলাম ধর্মের অভ্যন্তরীণ শক্তি উৎসারিত। ইসলামের মৌলিক শিক্ষাই হচ্ছে ইলমে তাসাউফ শিক্ষা। ইসলামী শরীয়তের সাথে ইলমে তাসাউফ এমনভাবে মিলিত যেমন দেহের সাথে মানুষের আত্মা মিলিত। আত্মা ছাড়া যেমন দেহের কোনো গুরুত্ব নেই তেমনি ইলমে তাসাউফ ছাড়া ইসলামী শরীয়তের কোনো গুরুত্ব নেই। ইলমে তাসাউফ ছাড়া ইসলামী শরীয়ত চলতে পারেনা। নবী-রাসূলগণ পথহারা মানুষকে যে ইলিম শিক্ষা দানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সঠিক পথের সন্ধান দান করেছেন সেই ইলিমই হচ্ছে ইলমে তাসাউফ। রাসূলেপাক (সা.) এর ওফাতের পর ইলমে তাসাউফ শিক্ষা দানের এই সুমহান দায়িত্ব পালন করেছেন আউলিয়ায়ে কেরামগণ। বিংশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলে ইলমে তাসাউফ শিক্ষাদানের মাধ্যমে পথহারা মানুষকে যিনি সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন এবং ইলমে তাসাউফের খেদমতে যিনি নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন তিনিই হচ্ছেন জৈনপুরী সিলসিলার অন্যতম বুজুর্গ শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী সাহেব কিবলা ফুলতলী (১৯১৩-২০০৮)। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর নিকট অসংখ্য অগণিত আলেম-উলামা ইলমে তাসাউফ শিক্ষা লাভের জন্য আসেন এবং তিনি তাদেরকে ইলমে তাসাউফের সবক প্রদান করেন।
শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ ফুলতলী (রহ.) মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তাঁর পীর ও মুর্শিদ হযরত শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহ.) এর নিকট থেকে ইলমে তাসাউফের দীক্ষালাভ করেন। আল্লামা ফুলতলী (রহ.) তাঁর পীর ও মুর্শিদ শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহ.) অনুমতিক্রমে হিন্দুস্তানের রামপুরের প্রখ্যাত আলেম রামপুর আলিয়া মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা গোলাম মহি উদ্দিন (রহ.) এর নিকট চিশতিয়া নেজামিয়া তরীকার বাইআত গ্রহণ করেন এবং অনেক সাধনার পর সনদ লাভে ধন্য হন। আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর ইলমে তাসাউফ তথা তরিকতের সনদ হচ্ছে-(১) আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.)। (২) হযরত মাওলানা শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহ.)। (৩) হযরত মাওলানা হাফিজ আহমদ জৈনপুরী (রহ.)। (৪) হযরত মাওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী (রহ.)। (৫) হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরলভী (রহ.)। (৬) হযরত শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)। (৭) হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)। (৮) হযরত শাহ আব্দুর রহিম মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)। তাঁর থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে এই সনদ রাসূলেপাক (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে।
ইলমে তাসাউফের মাধ্যমেই মানুষের মনের অন্ধকার দূর হয়। আল্লাহতে যখন মানুষ নিজেকে বিলীন করে দেয় তার মধ্যে তখন আল্লাহর অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। মানুষকে ইলমে তাসাউফ শিক্ষা দেয়ার জন্য আল্লামা ফুলতলী (রহ.) স্থানে স্থানে খানকার ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর নিজ বাড়িতে থাকতো সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক খানকার ব্যবস্থা। এসব খানকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু থেকে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান হাজার হাজার উলামায়ে কেরামগণ উপস্থিত হতেন। উলামায়ে কেরাম তাঁর নিকট থেকে ইলমে তাসাউফের সবক গ্রহণ করেছেন। ইলমে তাসাউফের খেদমতে আল্লামা ফুলতলী (রহ.) বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁরই পবিত্র সংস্পর্শে এসে পরিশুদ্ধ ও যথার্থ জীবন গঠন করেছেন অনেকে। আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর মোবারক হাতে ইলমে তাসাউসের বাইআত গ্রহণ করে তাঁর খলিফার মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন অনেকে। আল্লামা ফুলতলী (র:) এর খলিফাগণের প্রধান হচ্ছেন তাঁরই বড় সাহেবজাদা আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী। তাঁরই তত্ত্বাবধানে বর্তমানে ইলমে তাসাউফের খেদমত চলছে বিশ্বব্যাপী। আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর খলিফাগণ বিভিন্ন স্থানে সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক খানকার ব্যবস্থা করে ইলমে তাসাউফের সবক প্রদান করছেন এবং তালিম-তরবিয়ত প্রদান করছেন নিরবধি।
ইলমে তাসাউফ চর্চার মূলকথা হল-আত্মাকে শুদ্ধ করা। যার আত্মা শুদ্ধ হয়ে গেল তার সমস্ত শরীরই শুদ্ধ হয়ে গেল। এজন্য আমরা দেখতে পাই, যারা ইলমে তাসাউফ চর্চায় লিপ্ত, যারা ইলমে তাসাউফ লাভ করেছে তারা অন্যায়-অপকর্ম করেনা বা অন্যায়-অপকর্মে সহযোগিতাও করেনা। এজন্য আত্মাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করতে ইলমে তাসাউফ চর্চার বিকল্প নেই। আউলিয়ায়ে কেরামগণ মানুষের আত্মাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করার জন্য তাঁদের মুরিদগণকে বিভিন্ন দোয়া-দুরূদ ও নেক আমল করার উপদেশ ও তাগিদ দিয়ে থাকেন। আল্লামা সাহেব কিবলা ফুলতলী (রহ.) ও সেই একই নিয়মে তার মুরিদগণকে বাইআ’ত করানোর পর বিভিন্ন দোয়া-দুরূদ ও নেক আমল করার জন্য বিশেষ তাগিদ প্রদান করতেন। বিশ্ব বরেণ্য ওলীয়ে কামিল আল্লামা ফুলতলী (রহ.) বাইআ’ত পরবর্তী সকলকে যেসব অমূল্য নসিহত বা উপদেশ প্রদান করতেন তা হচ্ছে-অন্যের উপকার করার চেষ্টা করবেন, মন্দ করার চিন্তা অন্তরে আনবেন না। পরের ভাল দেখলে নিজের মন খুশি রাখবেন। পরের বিপদ দেখলে নিজে দুঃখিত হবেন। যে পরের মন্দ করার ইচ্ছা করে তার দুনিয়া-আখেরাত ধ্বংস হয়ে যায়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শান্তি মনে আদায় করবেন। মন কাতর করে রুকু সিজদা আদায় করবেন, জীবন উজালা হয়ে যাবে। নামাজ পড়ে কিবলামুখি হয়ে আল্লাহর যিকির করার চেষ্টা করবেন। প্রতিটি শ্বাসের সাথে কলিমার অভ্যাস করবেন। শ্বাস গ্রহণ করতে ‘লা-ইলাহা’ এবং শ্বাস ফেলতে ‘ইল্লাল্লাহ’। মুখ-জিহবা নড়াচড়া না করে প্রতিটি শ্বাসের সাথে জিকির করবেন। মনে রাখবেন, একটি শ্বাস ফেলার সাথে সাথে জীবন থেকে একটি শ্বাস কমছে। চোখ বুজে ধ্যান করে এরূপ করবেন। নিয়মিত করলে অভ্যাস হয়ে যাবে (আল্লামা সাহেব কিবলা ফুলতলী (রহ.) তখন জিকির করার নিয়ম দেখিয়ে দিতেন)। মনে দৃঢ় বিশ্বাস রাখবেন, আল্লাহ আমাকে দেখছেন। আমি আল্লাহকে একবার স্মরণ করলে আল্লাহও আমাকে একবার স্মরণ করবেন। রোজ ২০০ বার দুরূদ শরীফ এবং ১০০ বার আসতাগফার শরীফ পাঠ করবেন।
ইলমে তাসাউফের খেদমতে আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর অবদান ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর এই সুমহান খেদমতের ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত পথহারা মানুষ সঠিক পথের সন্ধান পেতে থাকবেন। মহান আল্লাহপাক আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর ইলমে তাসাউফের সেই খেদমতকে কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখুন। আমীন

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT