ধর্ম ও জীবন

তাফসির

প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০১-২০১৮ ইং ২০:৪৭:৪৫ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
আল্লাহর পথে ব্যয় :
জেহাদে যেমন জনবলের প্রয়োজন থাকে, তেমনি ধনবলেরও প্রয়োজন থাকে। জেহাদের সংকল্প গ্রহণকারী মুসলমান মাত্রেই যুদ্ধের যাবতীয় সাজসরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় যানবাহন ও রসদপত্র সংগ্রহ করে নিজেকে নিজেই প্রস্তুত করে নিতো। সেখানে সৈনিক ও সেনাপতিরা কোনো বেতন নিতেন না। তারা স্বেচ্ছায় ও স্বতস্ফূর্তভাবে জানমাল দিয়ে লড়তেন। ইসলামী আকীদা বিশ্বাসের ভিত্তিতে যখন একটি কার্যকর ও সুশৃঙ্খল সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, তখনই এরূপ স্বতস্ফূর্ত ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সেবকদের বাহিনী তৈরি হয়। ইসলামী রাষ্ট্রকে এখণ আভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত দুশমনদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্যে তার নিজস্ব কোষাগার থেকে অর্থ ব্যয় করে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসে।
তবে এ কথাও সত্য যে, বেশ কিছু দরিদ্র মুসলমান এমনও ছিলো, যারা জেহাদে আগ্রহী ছিলো এবং আল্লাহর বিধান ও ইসলামের পতাকাকে শত্রুর ছোবলমুক্ত করার জন্যে প্রাণপণ সংগ্রামে ইচ্ছুক ছিলো, অথচ তাদের যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জাম, অস্ত্র ও বাহন ইত্যাদি ছিলো না এবং তা সংগ্রহের সামর্থও ছিলো না। তারা রাসূল (সা.) এর কাছে এসে দূরবর্তী রণাঙ্গনে পৌঁছার বাহন চাইতো। কেননা সেখানে হেঁটে যাওয়া সম্ভব ছিলোনা। রাসূল (সা.) যখন তা দিতে অক্ষম হতেন তখন পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুসারে, তারা নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে ফিরে যেত। কেননা তাদের অর্থ ব্যয় করে প্রয়োজনীয় বাহন সংগ্রহ করার সামর্থ ছিলো না।
এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে কুরআন হাদিসে আল্লাহর পথে দান করার বহুসংখ্যক নির্দেশ এসেছে যাতে যোদ্ধাদেরকে প্রয়োজনীয় যুদ্ধ সরঞ্জামে সজ্জিত করার ব্যয় নির্বাহ করা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেহাদের আহবানের সাথে সাথেই আর্থিক দানেরও আহবান জানানো হয়েছে। এমনকি আল্লাহর পথে ব্যয়ে কার্পণ্য করাকে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করার শামিল বলে অভিহিত করা হয়েছে। ১৯৫নং আয়াতে লক্ষ্য করুন, ‘আর তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। সৎকাজ করো। আল্লাহ তায়ালা সৎ কর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন।’
বস্তুত আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় থেকে বিরত থাকা হচ্ছে কার্পণ্যের দ্বারা নিজেকে ধ্বংস করার নামান্তর। অনুরূপভাবে, এটা সমাজকে অর্থনৈতিক ঘাটতির মধ্যে নিক্ষেপ ও সঠিকভাবে দুর্বল করার শামিল। বিশেষভাবে যে ইসলামী সমাজের ভিত্তি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান ও ত্যাগ কুরবানীর ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার বেলায় কথা আরো বেশি করে প্রযোজ্য।
এরপর আয়াতের শেষাংশে মুসলমানদেরকে আল্লাহর পথে জেহাদ ও অর্থ ব্যয়ের পর্যায় থেকে উন্নীত করে এহসান এর পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘তোমরা ‘এহসান’ বা সৎ কাজ করো। আল্লাহ সৎ কর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন।’
এহসান ইসলামে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী একটি গুণ। রসূল (সা.) এহসানের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর এবাদত করবে যেন তাকে দেখতে পাচ্ছো। আর যদি তাঁকে তুমি দেখতে না পাও, তবে অন্তত এতোটুকু মনে রাখো যে তোমাকে তিনি অবশ্যই দেখতে পান।’
মানুষের মন যখন এ পর্যায়ে উন্নীত হয়, তখন সে স্বতস্ফূর্তভাবে যাবতীয় এবাদাতে নিয়োজিত হয়, সকল গুনাহ থেকে বিরত থাকে, ছোট ও বড় সকল কাজে এবং গোপন ও প্রকাশ্য সকল অবস্থায় আল্লাহকে দেখতে পায়।
এই উক্তিটির মধ্যদিয়ে আল্লাহর পথে সশস্ত্র জেহাদ ও অর্থ ব্যয় সংক্রান্ত আলোচনার সমাপ্তি টানার অর্থ স্পষ্টত এটাই দাঁড়ায় যে, জেহাদের ব্যাপারে আল্লাহ মানুষের মনকে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর ‘ইহসানে’ উন্নীত করতে চান। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT