পাঁচ মিশালী

নির্যাতনের উত্তরাধিকার লিজি

পোর্টার অনুবাদ : সালমান আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০১-২০১৮ ইং ০০:২০:০৫ | সংবাদটি ১৯ বার পঠিত


আহমদ হোসাইন আল আমিন মরচে পড়া ইসরায়েলী একটি ট্যাংকের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। তার পরনে চেক শার্ট এবং মাথায় হলুদ বেসবল টুপি। ট্যাংকটির উপর উড়তে থাকা হেজবুল্লাহর এবং লেবাননের পতাকা দুটি তিনি ঠিক করে দিচ্ছিলেন। তার গলার লোহার মালাটি বাতাসে টুংটাং শব্দ করছিলো।
‘আজ আমার অনেক কাজ।’ আমিন বললেন।
ট্যাংক এবং অন্যান্য সামরিক যানগুলো একটি বিধ্বস্ত বিল্ডিয়ের সামনে পড়ে আছে। আর বিল্ডিংয়ের ছাদ পড়েছে মাটিতে। এর দেয়াল ভেঙ্গে চুরচুর হয়েছে। ধাতব অংশ এবং তারগুলো ধ্বংসস্তুপের উপরে আটকে আছে।
এই হলো খিয়াম কারাগার; যার বিবরণ দিলাম। একদা এটি ফরাসী সেনাবাহিনীর ব্যারাক ছিলো। ১৯৮৫ সালে এটি একটি কারাগার এবং নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত হয়। যার নিয়ন্ত্রণ ছিলো ইসরায়েলের প্রক্সি মিলিশিয়া সাউথ লেবানিজ আর্মির হাতে। যার সংক্ষিপ্ত রূপ এসএলএ।
২০০০ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত এই কারাগারে প্রায় ৫ হাজারের মতো বন্দীদের নির্যাতন করা হয়েছে। কারাগারটি বন্ধের সময় সেখানে ১৪৪ জন মানুষ আটক ছিলেন। সর্বশেষ বন্ধীদের মধ্যে আমিন ছিলেন একজন। কারাগারটি বন্ধ হলে তারা মুক্তি পান।
এসএলএ এবং ইসরায়েলীরা খিয়াম কারাগারে যাদের নির্যাতন করেছে এবং যাদের মেরে ফেলেছে; তাদের স্মরণে লেবাননী হেজবুল্লাহ গ্রুপের সহায়তায় কারাগারটিকে একটি মেমোরিয়ালে পরিণত করা হয়। কিন্তু ২০১৬ সালে গ্রীষ্মে ইসরায়েল লেবাননের উপর ৩৪ দিনের যে আগ্রাসন চালায়; তখন তারা খিয়াম কারাগার ও তার আশেপাশের গ্রামে বিমান হামলা করে।
চার সন্তানের জনক আমিনের বয়স এখন ৫৬। ১৯৯৬ সালে গ্রেফতারের পর আমিন খিয়াম কারাগারে চার বছর ছিলেন। আমিন আজ ধ্বংসস্তুপের মধ্যে বেঁচে যাওয়া মেমোরিয়ালের অবশিষ্ট অংশের রক্ষণাবেক্ষণ করছিলেন। এই জায়গাটিতে বন্দীদের নির্যাতন করা হতো। আমিন একটি ধাতব বস্তুর সাথে হেলান দিয়ে বসেছেন। এখানে তাকে এবং অন্যান্য বন্দীদের হাত বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো হতো। তিনি বললেন, এখানে কমপক্ষে ১০ জন বন্দী নির্যাতন সহ্য না করে মৃত্যুবরণ করে।
আমিন বললেন, ‘বন্দীদের এই কারাগারে নগ্ন করে তাদের উপর কখনও ঠান্ডা কখনও গরম পানি ছিটিয়ে দেওয়া হতো। বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো। সর্বশেষ তাদের জখমে নুন ছিটিয়ে দেওয়া হতো।’
‘আমাদের কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক করে রাখা হয়। আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি; এবং আমাদের কোর্টেও তোলা হয়নি।’ আমিন যোগ করলেন।
তিনি বললেন, ‘খিয়াম একটি অভিশপ্ত জায়গা, একটি অভিশপ্ত ঠিকানা। এটি লেবাননে ইসরায়েলী আগ্রাসন এবং নির্যাতনের চিহ্ন হয়ে আছে।’
আমিন এখনও খিয়াম গ্রামেই থাকেন। একবার তাকে পাঁচ মাস সেলে রাখা হয়। সেলগুলো অন্ধকার এবং ছোটো। ভেতরে এক মিটার স্কয়ার জায়গা। সামনে ভারী লোহার দরজা। লোহার দরজার সামান্য ফাঁক গলে একটুখানি আলো পাওয়া যেতো।
মহিলা বন্ধীদেরও খিয়ামে কারাগারে রাখা হতো। আমিনের মতে মহিলা বন্ধীদের সংখ্যা খিয়ামে ৫ শ‘য়ের মতো ছিলো।
‘আমাকে একবার চার নম্বর রুমে রাখা হয়েছিলো। ওই রুমের বিপরীতে মহিলাদের রাখা হয়েছিলো। আমি শুনতাম, মহিলারা পরষ্পর কথা বলতো। কিন্তু তারা কী কথা বলতো তা শুনা যেতো না। শুধুমাত্র অস্পষ্ট কিছু শব্দ এবং তাদের চিৎকার শুনা যেতো।’ আমিন মনে করলেন।
আমিন নিশ্চিত যে ইসরায়েলী বাহিনী তাদের বর্বরতা এবং নির্যাতনের কালো দাগ মুছে দিতে ২০১৬ সালে খিয়াম মেমোরিয়ালটি বিমান হামলা করে গুড়িয়ে দেয়।
আমিন বললেন, এখনও নিয়মিত পর্যটকেরা স্মৃতিসৌধটি দেখতে ভিড় করেন। যাদের মধ্যে আছেন আমেরিকা, ইউরোপ, ব্রিটেন এবং লেবাননের নাগরিকরা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পাঁচ শ‘য়ের বেশি পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন।
আগস্টের অসহ্য গরমের দিন। লেবাননী চারজনের একটি দল খিয়াম স্মৃতিসৌধটি দেখতে এলেন।
‘এটা এখন লেবাননী ইতিহাসের একটি অংশ। আমরা এখানে কী বর্বরতা হয়েছিলো, তা দেখতে এসেছি।’ বললেন ইউসেফ। যিনি পশ্চিম বেকা প্রদেশ থেকে এসেছেন। এটা তাদের দ্বিতীয় সফর। জুলাই ২০১৬ সালের আগ্রাসনের পূর্বে একবার তারা এটি পরিদর্শন করে গেছেন।
‘এটা এখন তো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।’ সামির বললেন। ‘ইসরায়েল ইচ্ছে করে এটি ধ্বংস করে দিয়েছে, যাতে মানুষ তাদের বর্বরতার কথা জানতে না পারে।’
এই জায়গাটি দক্ষিণ লেবাননীদের সহিংসতার দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে সহিংসতা বন্ধ হয়। তবে এখনও কোনো স্থায়ী যুদ্ধ বিরতি হয়নি। ইসরায়েল নিয়মিত হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চরবৃত্তি এবং অন্যান্য অভিযোগ করে আসছে। অন্যদিকে, লেবানন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নানা সীমালংঘনের অভিযোগ করছে।
খিয়ামের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা দায়িত্বশীলগণ এবং এই কারাগার থেকে জানে বেঁচে যাওয়া মুক্তিপ্রাপ্তরা এটাকে নতুন করে নির্মাণ করে বড় একটি স্বৃতিসৌধ বানাতে চাইছেন; যাতে এর ভয়াবহ স্মৃতি সবসময় জাগ্রত থাকে।
আমিন বললেন, ‘কারগারটি ওরা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। এই জন্য আমরা শীঘ্রই এর নির্মাণ কাজ শুরু করতে চাইছি। এটি একটি বড় প্রজেক্ট হবে। যাতে এই কারাগারের পূর্বের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া থাকবে এবং এটা কিভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, তারও বিবরণ থাকবে।’
যাই হোক, খিয়াম কারাগারটিকে নতুন করে নির্মাণ এবং এটিকে স্মৃতিসৌধ বানানো হলে ইসরায়েল ফের এখানে হামলার করার সম্ভাবনা প্রবল হবে। যদি হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন, হেজবুল্লাহর শক্তি পরীক্ষা করা ইসরায়েলের জন্য নাবালক সুলভ আচরণ হবে।
ডেভিড দাউদ নামের একজন আমেরিকান বিশ্লেষক বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হেজবুল্লাহ ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধে যাবে না। এর কারণ হচ্ছে, সিরিয়ায় তাদের বাশার আল আসাদের জন্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে।
‘হেজবুল্লাহর পূর্ণ মনোবিশেষ এখন সিরিয়ায় এবং সেখানে তাদের ঘাম ঝরছে। আর ইসরায়েলও যুদ্ধ চায় না। তাদের সিনিয়র সামরিক পদস্থ কর্মকর্তারা শুধু হম্বিতম্বি করছে, আসলে এটা একটা ভীতি সৃষ্টি করার জন্য।’
ইসরায়েল কখনও খিয়াম কারাগার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেনি। তার এসএলএর মাধ্যমে কারাগারটি পরিচালনা করেছে। তবে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হিউম্যান রাইট ওয়াচ এর রিপোর্ট বলছে, খিয়াম কারাগারে ইসরায়েলী গোয়েন্দা এজেন্টরা লেবানীনদের জিজ্ঞাসাবাদে সরাসরি সংযুক্ত ছিলো। যা ইসরায়েলী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদন করে।
দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েল চলে যাওয়ার পর এসএলএও নিস্ক্রিয় হয়ে যায়। এসএলএর নেতা জেনারেল অ্যান্টনি লাহদ ফ্রান্সে পালিয়ে যান। ফ্রান্সে তিনি ২০১৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
সর্বশেষ আমিন বললেন, ‘খিয়াম কারাগারের নির্যাতন আমাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অধিকার। বৈদ্যুতিক শকগুলোর প্রতিক্রিয়া এখনও শরীরে অনুভূত হয়; এর ব্যথা এখনও সারেনি। [আল জাজিরা]


শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT