পাঁচ মিশালী

মূল্যবোধের পচন ও শিশুরা

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০১-২০১৮ ইং ০০:২০:৪৬ | সংবাদটি ৮৩ বার পঠিত

একটি শিশুকে যদি মানুষ করতে চাও, লাগবে সারা গাঁও। কথাটি খুবই ছোট কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রত্যেক জাতি স্বত্ত্বার অন্তর্নিহিত ভবিষ্যৎ। জাতির বোধ, বিশ্বাস, আশা, আকাক্সক্ষা, সম্মান, দুর্নাম সবকিছু। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিই শিশুর শিক্ষক। পুরো সমাজটাই তার পাঠশালা। ছোট্ট শিশুটি যখন ভুমিষ্ট হয় তখন ঘরকে আলোকিত করে। পিতা-মাতার মুখে হাসি ফুটে। পুরো পরিবারটিই আনন্দে উদ্বেলিত হয়।
শিশুরা কখনো পরিবর্তন হয়না। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম (আ.) এর শিশুটি যেমন ছিল নিষ্পাপ, আজো জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি শিশুই নিষ্পাপ। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা বেশীর ভাগই নির্ভর করে পিতা-মাতা ও সমাজের উপর। তার হৃদয় কোমল, মসৃণ, সহজ সরল। তার মধ্যে থাকেনা চিন্তার জটিলতা, হিংসা ও অহংকার। যার সাথে খানিক পূর্বে সে ঝগড়া করেছে একটু পরেই তার তা মনে থাকেনা আবার তার সাথে খেলায় মেতে উঠে।
শিশুরা কাদামাটির ন্যায়। কুমার কাদামাটি দিয়ে যেভাবে যা খুশি বানাতে পারে। কিন্তু একটু শক্ত হওয়ার পর আর তা করা যায়না। আজকের শিশুর বেড়ে উঠাই জানান দেয় আমাদের ভবিষ্যৎ কি হবে? সে নিজের, দেশের ও সমাজের সম্পদ হবে না বোঝা হবে? আর তা নির্ভর করে আমাদের পরিচর্যার উপর। আমাদের খামখেয়ালীপনার কারণেও একটি নিষ্পাপ শিশু অনেক অন্যায় কাজের অনুশীলন করে থাকে।
মিথ্যা বলা মহাপাপ। সকলের কাছে মিথ্যাবাদী ঘৃণার পাত্র। মিথ্যাবাদীকে কেউ বিশ্বাস করেনা। সন্তান আমাদের সামনে মিথ্যা কথা বললে আমরা কড়া শাসন করি। কিন্তু দেখা যায় আমরা খুব অনায়াসে তাকে মিথ্যার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। একটি শিশু কান্না করছে অথবা ঘুমুচ্ছে না। তখন তাকে নানাভাবে কান্না থামানোর জন্য বা ঘুম পাড়ানোর জন্য মিথ্যা ভয়, মিথ্যা আশা দিয়ে থাকি। বলতে থাকি বাঘ আসছে, পাগল আসছে আরো কত কি। আবার আশা দিয়ে থাকি তোমাকে এই দেব, সেই দেব ইত্যাদি। কিন্তু আদৌ কি বাঘ, পাগল আসে বা তাকে দেওয়া ওয়াদা অনুযায়ী তার প্রাপ্য দেই।
ছোটকালে আমরা দেখেছি কারো বাচ্চা দুষ্টুমি করলে বা অন্যায় কিছু করলে কেউ দেখলে শাসন করত, ধমক দিত। কিন্তু আজকাল তা আর চোখে পড়ে না। কেউ অন্য কারো সন্তানকে শাসন করেনা এর পিছনেও আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়ই দায়ী। আগে সন্তান এসে বাবা মাকে যদি বলত অমুক ব্যক্তি আমাকে ধমক দিয়েছে বা শাসন করেছে মা-বাবা তখন বলত নিশ্চয় তুমি কোন অন্যায় করেছ। অন্যায় করলে যে কেউ তোমাকে শাসন করবে। আবার আমাদেরকে এসে জানালে তোমাকে পিটুনি দেব। বর্তমানে পিতা-মাতা তার উল্টো কাজটাই করেন। বলেন অমুক আমার ছেলেকে শাসন করার কে? তার ঘরে আমার ছেলে খায় নাকি ইত্যাদি। এতে করে ইজ্জত বাঁচানোর তাগিদেই কেউ কারো সন্তানকে শাসন করেনা।
কয়েকদিন আগে এক শনিবারে আমার বড় ছেলের মাদ্রাসায় অধ্যক্ষের কক্ষে বসে আছি এমন সময় একজন ছাত্র আসল। ছাত্রটি আসার পর অধ্যক্ষ মহোদয় ছাত্রটিকে বললেন দেখি তোমার গায়ে কোন দাগ আছে কিনা? ছাত্র তার জামা উল্টিয়ে দেখাল, দেখা গেল তার গায়ে কোন দাগ নেই। ছাত্রটি বের হয়ে যেতে না যেতেই একজন মহিলা এসে অপেক্ষা না করেই বলতে শুরু করলেন ওর চাচাকে আপনি এক্ষুনি ফোন করেন। সে আপনার ফোনের অপেক্ষা করছে। তিনি খুব রেগে আছেন ইত্যাদি। অধ্যক্ষ সাহেব বললেন আমি একটু পরে অমুক স্যার আসলে ফোন করব। আমি দর্শক হিসাবে ঘটনাগুলো দেখছি। ভদ্র মহিলা বের হয়ে যাওয়ার পর আমি মহোদয়কে জিজ্ঞাসা করলাম ঘটনাটা কি? তিনি বললেন গতকাল চতুর্থ শ্রেণীতে পাঠ না আদায় করার কারণে অমুক শিক্ষক এই ছেলেটিকে কয়েকটি বেত্রাঘাত করেছিল। এতে নাকি তার গায়ে দাগ পড়েছিল। তার অভিভাবক যখন তা জানতে পারেন তখন ওনারা মামলা করার জন্য থানায় যাচ্ছিলেন বিষয়টি আমি জানতে পেরে অনেক বুঝিয়ে থামিয়েছি। এখন এ বিষয়ে তার চাচাকে ফোন করতে হবে। আমি তখন মহোদয়কে বললাম জনাব আমরা যারা সন্তানের বাবা-মা আমরাওতো সন্তানকে অনেক সময় বেত্রাঘাত করি, শাসন করি। সমাজে কতজন বাবা-মা আছেন যারা সন্তানকে মারেন না? সন্তানের সাথে পিতা-মাতার যেমন শত্রুতা ও হিংসা থাকেনা তেমনি শিক্ষকেরও থাকে না। এ পৃথিবীতে সবাই হিংসা ও শত্রুতা করতে পারে। কিন্তু পিতামাতা ও শিক্ষক কি কখনো হিংসুক বা শত্রু হতে পারে? সন্তান ও ছাত্র যত বড় হয় পিতা-মাতা ও শিক্ষক তত খুশি হন। তবে খেয়াল রাখা জরুরী শাসন যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়। এ কথায় আমার ছোটকালের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমি চতুর্থ শ্রেণীর ফাস্টবয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আমাদের বাড়ির পাশেই। একদিন সকালে জাতীয় সংগীত গাওয়ার জন্য সারিবদ্দ হয়ে দাঁড়াচ্ছি। আমার একজন স্যার হঠাৎ করে আমাকে জোরে বেত্রাঘাত করে বসলেন। আমি ছোটকাল থেকে রাগি প্রকৃতির। আমি রাগ করে লাইন থেকে বের হয়ে চলে আসলাম। বাড়িতে এসে আব্বাকে বললাম। আব্বা আমাকে খুব ধমকালেন আমাকে নিয়ে তিনি স্কুলে গেলেন। স্কুলের অফিস কক্ষে সকল স্যারদের সামনে আমাকে ঐ স্যারের পায়ে ধরিয়ে মাফ চাওয়ালেন। স্যারকে আব্বা বললেন তাকে মাফ করে দিন। বুঝতে পারেনি ইত্যাদি। স্যারদের আরোও বললেন, আমার ছেলেকে যত প্রয়োজন শাসন করবেন। স্যার আমার মাথায় হাত বুলালেন, আমাকে মাফ করে দিলেন। আব্বা এর এক বছর পরই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। ঐ স্যার ব্যতিত যে স্যারগণ সেখানে ছিলেন তাদের তিনজন দুনিয়াতে নেই। আল্লাহ তাদের সকলকে জান্নাত নছীব করুন।
বর্তমানে আমাদের অনেকের অভ্যাস টিভি দেখা। ইদানিং আরোও একটি অভ্যাস যোগ হয়েছে ইন্টারনেট ব্রাউজিং ফেসবুক চালানো। বই পড়া আমরা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। সন্তান যদি পড়া বন্ধ করে টিভি দেখতে আসে বা মোবাইল হাতে নিয়ে খেলায়রত হয় আমরা তাকে ধমক দেই। কিন্তু নিজের অভ্যাস ছাড়ছিনা। আমাদেরওতো উচিত তাকে সঙ্গ দেওয়া, তার সাথে যে কোন একটি বই নিয়ে পড়া।
আমরা অনেক সময় বলি বর্তমানে ছেলে-মেয়েদের লজ্জা সরম নেই। আসুননা দেখি এই বেহায়াপনার জন্য দায়ী কে? একজন পিতা-মাতা বা পরিবারের কেউ যখন টিভি দেখতে বসে তখন কি সবসময় এমন নাটক বা ছায়াছবি দেখানো হয় যা পরিবারের সবাই দেখার উপযোগী? উত্তর অবশ্যই নেতিবাচক হবে। তাই তেতুল গাছ লাগিয়ে মিষ্টি ফলের আশা করা কি পাগলামী নয়?
আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, বর্তমান শিশুরা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে কম্পিউটার বা মোবাইল গেইমে আসক্ত। গেইমগুলোতে সৃজনশীলতা ও চিন্তার বিকাশ অনুপস্থিত। সাধারণত মারামারি, আক্রমণ, আহত নিহত ইত্যাদিই প্রতিপাদ্য বিষয়। এগুলো শিশুদেরকে মানবতা বিপরীতে হিং¯্রতা শিক্ষা দেয়। পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তো রয়েছেই। আমরা যদি এই আসক্তির লাগাম টেনে ধরতে না পারি। তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের জাতীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। তাই আসুন আমরা প্রতিটি শিশুকে ভালোবাসি, তাকে মানুষ করার জন্য সবাই শিক্ষকের ভূমিকা পালন করি।




বনভোজন
আফতাব চৌধুরী
এখন বনভোজনের সময়। বনভোজনের স্থান নির্বাচন নিয়ে চলছে রীতিমতো শলাপরামর্শ। বিভিন্ন পিকনিক পার্টি বিভিন্ন ব্যানার নিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটছে তার স্বরে চিৎকার করে। ব্যানারে ব্যানারে কত না শ্লোগান। কত হাই ডেসিবেলের শব্দবাজি চলছে এই পিকনিকের নামে। চলছে গাড়িতে গাড়িতে তীব্র প্রতিযোগিতা।
প্রতি বছর পিকনিক পার্টির গাড়ি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে কত প্রাণ যে অকালে ঝরে পড়ে, তবু হুঁশ হয় না সংশ্লিষ্ট পিকনিক পার্টির। হুঁশ হয় না প্রশাসনেরও। পিকনিক স্পট নিয়েও বিভিন্ন দলের মধ্যে বচসা এবং শেষমেশ মারামারির মতো অবাঞ্ছিত ঘটনাও ঘটে থাকে। কাকে টেক্কা দিয়ে কে আগে যাবে, এ-নিয়েও চলে রীতিমতো প্রতিযোগিতা।
পিকনিক পার্টির সঙ্গে পথ চলতি মানুষের ঠেলাধাক্কার খবর প্রায়ই শোনা যায়। হাট-বাজার গরম করেই এরা চলে। বেশিরভাগ পিকনিক পার্টি মানে না কোনো নিয়ম-শৃংখলা। সহজেই জামার আস্তিন গুটাতে অভ্যস্ত এরা। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু প্রশাসনিক নির্লিপ্ততা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ একটি বিষয়কে গুরুতর করে তোলে। প্রশাসনের সময়োচিত নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ যে কোনো অবাঞ্ছিত ঘটনাকে তাৎক্ষণিকভাবে মীমাংসা করে দিতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, পিকনিক স্পটগুলোতে কিন্তু পুলিশি টহলের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। তা ছাড়া, দূরন্ত গতিতে মাইকে ভীষণ শব্দ করে চলা পিকনিক পার্টির গাড়িগুলোর লাগাম ধরার মতো কোনো ব্যবস্থাও পুলিশ কিংবা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয় না। তারুণ্যের প্রাবল্যে হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হয়ে যে সকল ছেলে-মেয়ে অবাধে বেলেল্লাপনায় মত্ত হয়, সুরাসক্ত হয়, তাদের দিশা দেখাবার মতো কোনো মুরব্বিও সঙ্গে থাকেন না। ফলে, ঘটে অবাঞ্ছিত সব ঘটনাবলি।
পিকনিক-এ যেতে কাউকে তো আর বাধা দেওয়া যায় না। কিন্তু, প্রতিটি পরিবার থেকে যদি সংশ্লিষ্টদের কড়াভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয় এবং সঙ্গে থাকে পুলিশের কড়া নজরদারি, তাহলে অনেক দুর্ঘটনা এবং অবাঞ্ছিত, অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা প্রতিহত করা যেতে পারে। পিকনিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় তদন্তক্রমে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি প্রদান করতে পারেন। তবে, প্রতিটি পিকনিক পার্টির অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে একেকজন জামিনদারের জিম্মায় তাদেরকে দিতে হবে। সেই জিম্মাদার নিজে অথবা তাঁর প্রতিনিধি পর্যবেক্ষণ করবেন যাতে সংশ্লিষ্ট পিকনিক পার্টি ঘন্টায় নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে বেশি গতি তুলতে না পারে, অযথা কারো সঙ্গে মারামারিতে যাতে লিপ্ত না-হয়, শালীনতা যাতে বজায় থাকে, মদ্যপানসহ অন্যান্য অসামাজিক কাজে যাতে দলের কোনো সদস্য লিপ্ত না-হয়, পিকনিক স্পটটি ছেড়ে চলে আসার সময় যাতে পারতপক্ষে পরিচ্ছন্ন করে আসা হয় ইত্যাদি।
পিকনিক স্পটগুলো জেলা প্রশাসনের পক্ষে আগেভাগেই জানিয়ে দেওয়া উচিত। অর্থাৎ জেলার ভেতরের এবং বাইরের পিকনিক স্পটগুলোর একটি তালিকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে তৈরি করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ, কোনো কোনো পিকনিক পার্টির ওপর স্থানীয় দুর্বৃত্তরা ঝাঁপিয়ে পড়ে পিকনিক দলের সদস্যদের যথাসর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়ারও ঘটনা ঘটে থাকে। ফলে, বনভোজন নিয়ে অভিভাবকবৃন্দসহ জেলা প্রশাসনকেও নতুন করে ভাবতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT