পাঁচ মিশালী

সাব্বির চৌধুরীর অন্তিম যাত্রায়

মসিহ্ মালিক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০১-২০১৮ ইং ০০:২১:৩৮ | সংবাদটি ১৫৩ বার পঠিত

খালা, ফুপু ও মামা-চাচাদের সাথে সকলের অনেক আত্মিক সম্পর্ক থাকে। সেটা ছোটবেলা থেকেই জন্মাতে থাকে। বিশেষ করে মামা, খালাদের সাথে এক মধুময় সম্পর্ক গড়ে উঠে। সেই মায়াময় সম্পর্কের মাধুর্য্যে জীবন আনন্দঘন হয়নি এমন কেউ আছেন কি? আমার মনে হয় খালা-মামা, ফুফু-চাচা থাকলেই এটা হবেই হবে। আমার ছোটমামা, সিলেটে আমরা বলি হুরুমামা, সাব্বির চৌধুরী সদ্য প্রয়াত। ৭ জানুয়ারী সকাল ৯টা নাগাদ ঢাকায় মোবাইল ফোনে খালাতো ভাই মওলুদ প্রথম জানালো মামার তিরোধানের কথা। তারপর একে একে অনেকেই সেটা জানালো। আমার অনেক দুর সম্পর্কের আত্মীয়রাও  জিজ্ঞেস করলো-আমি কি মামার প্রয়ানের কথা জেনেছি কিনা? তাৎক্ষণিকভাবেই হুরুমামার সাথে আমার শৈশব ও যৌবনের শত স্মৃতিতে চলে গেলাম-তারই কিছু কথা বলব এখানে। স্মৃতিময় মুহূর্ত ও ঘটনাগুলি শুধুই মনের মণিকোঠায় উকি মারতে শুরু করলো যেন।
মামা এমসি কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেছিলেন সম্ভবত ১৯৬৬ সালে। আমি তখন সিলেট পাইলট হাই স্কুলে নি¤œ মাধ্যমিক ক্লাসে পড়ি। কলেজ থেকে যাবার সময় প্রায়শই আমাদের বাসা পরতাবগড় হাউস মিরাবাজারে আমার মায়ের সাথে দেখা করতেন। ভালভাবেই ডিগ্রী পাশ করেছিলেন তিনি। তারপর পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে প্রবেশ পরীক্ষা দিয়েই সেখানে জায়গা পেলেন। কদিনের মধ্যেই পিএএফ রিসালপুরে জিডিপি পাইলট শিক্ষানবিশ হয়ে যোগ দিলেন। তার সাথী আরেকজন ছিলেন প্রয়াত স্কোয়াড্রন লিডার শওকত জাহান চৌধুরী। আমাদের আরেক মামা। হুরুমামা ও তিনি একই সাথে রিসালপুর গেলেন। সিলেট রেলষ্টেশনে এক আনন্দ দুঃখের মাঝে তাদের আমরা রাতের ট্রেনে তুলে দিই। মনে পড়ে আমার চিকিৎসক বাবা তার শ্যালকের এই অর্জনে কত যে আনন্দে ভাসমান ছিলেন। বিশেষ করে আব্বা হুরুমামাকে নিয়ে অনেক স্বপ্নের ডানা মেলতে শুরু করলেন। আমরাও মামার এই অর্জনে পরম স্বপ্নময় আগামীর কথা ভাবতে বসলাম-বুঝে না বুঝেই।
মাস কয়েক পর আমার নানাবাড়ীতে আমরা সপরিবারে মায়ের নাইওরে গেলাম। মনে পড়ে দিন ৭ এক হয়তোবা থেকে ছিলাম। আমরা খেলাধূলায় মত্ত থেকে নানাবাড়ীর আনন্দে বিভোর ছিলাম। সমবয়সী কাজিন ও মামাদের সাথে। হঠাৎ দেখা গেল নানাবাড়ীর ১০০ গজের মধ্যে নয়াবাজারে ত্রিমুখীতে মামার মতো কেউ রিকসা করে চলে আসছেন। আমরা এগুলাম। সত্যি তিনি রিসালপুর থেকে জিডিপি ক্যাডেটশীপ ছেড়ে চলে এসছেন। শুনে আমার আব্বাতো চরম হতাশ। তার সাম্প্রতিক বুনন করা স্বপ্নের মহাপ্রয়ানে হুরুমামার চেয়ে তিনিই যেন দুঃখ ও শোকে হতবিহবল হয়ে গেছেন। হতবাক হয়ে আব্বা কোন কথাই বলছিলেন না। কি ভেবে রেখেছেন-কিইবা হতে যাচ্ছে-কিছুর হিসাব মিলছেনা যেন।
যাক মামা নানাবাড়ীতে আসলেন। তিনি কিন্তু কোন ব্যাগ ছাড়াই খালি হাতে বাড়ীতে ফিরলেন। প্রশ্ন করতেই তিনি জানালেন-কে যেন এক জনকে তিনি তার সকল সার্টিফিকেট সহ কাপড় চোপড়ের ব্যাগ ইত্যাদি দেখভাল করার কথা বলে আখাউড়া স্টেশনে নেমে গিয়েছিলেন। পরে ফিরে ট্রেনে উঠলেই আর সেই লোককে পাননি। যাক ওইসব ব্যাগে মামার শিক্ষাগত নথিপত্রও ছিল। তাই সবাই অনেক উৎকন্ঠায় পড়লেন। অবস্থাতো অতি দুঃখময় সবাই আরও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। সার্টিফিকেট হারানোর কথা শুনে তো আর শোকাহত। সবাই যেন ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পড়লো। ২/৪ দিন কাটলো ওমনিতেই। হঠাৎ ডাকপিয়ন মামার নামে একটি পার্সেল নিয়ে পৌঁছালো। ওটাতেই মামার সার্টিফিকেটগুলি ছিল। আমরা সবাই হাসাহাসি করলাম-না বুঝেই বড়দের হাসি মশকরা দেখে। আমার আব্বার দুঃশিন্তা কিন্তু শেষ হলো না। অর্থাৎ শ্যালককে নিয়ে তার স্বপ্নের আগামীর সমাধি রচিত হবার ফলে তার দুঃখবোধ যেন জেগেই রইল। সদা সকলকে ভাল দেখতে চাওয়া মানুষটি আবার জীবনবোধে এটি একটি বৈশিষ্ট ছিল বৈকি।
কদিনের মধ্যেই আমরা মামাকে চাকুরীর খোঁজ করতে দেখলাম। তিনি ফার্মাদেশ নামের একটি ঔষধ কোম্পানীতে বিক্রয় সেবার ব্রতে তখন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে যোগ দিলেন। তিনি কিন্তু খুশীই ছিলেন। মাসান্তে মামা প্রথম বেতন পেলেন। সিলেটের মিরাবাজার ছিল আমাদের পাড়া। মামা তার পোশাক পরিচ্ছদের ব্যাপারে সৌখিন ছিলেন তখন। আমিন টেইলার্সে বেশ কয়েকটি শার্ট ও পেন্টের অর্ডার দিলেন তার নিজের জন্য। আমাকে ডেকে সেই ১৯৬৭ সালে একটি পেন্ট ও ইউনিয়ন শার্টের অর্ডার দিলেন। যখনই আমাদের বাসায় আসতেন-মূলত ভাগিনা আমার খবর নিতেই আসতেন। কিছু বখশিস দিয়ে যেতেন। সিলেট পাইলট স্কুলের এস.এস.সির পরীক্ষাস্থল তখন রাজা জি সি স্কুলে ছিল। আমারও তাই হলো। সকাল বিকাল তখন (১৯৬৯) পরীক্ষা হতো। এক সপ্তাহেই পরীক্ষা শেষ। মামা একটি রিকসা আমার জন্য রিজার্ভ করে রেখেছিলেন। স্কুলে পরীক্ষার সময় চলমানভাবেই আমার পরীক্ষার খবর রেখেছিলেন। আমার মা ও বাবার কাজ তিনিই করছিলেন পরম যতেœ ও মায়াজালের টানে।
মামা থাকতেন আগপাড়ার এক বাসায়। সকলেই যারা ঐ বাসায় থাকতেন তারা ছিলেন-মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। মনে পড়ে ওয়াইথ, এসকেএফ, গ্লাক্সোর মতো কোম্পানীর সিলেট প্রতিনিধিরা ঐ বাসায় মামার সাথে বাস করতেন। তারা সকলেই আমাকে ভাগিনার মতো ¯েœহের বাঁধনে বেধেছিলেন। মামার সাথে বাহাস বা বচসা হয়নি এমন কিন্তু নয়। তবে সর্বোতভাবে তার মায়াময় খেয়াল ও আদরের কথা বেশী মনে পড়ছে তার চলে যাওয়ার পর। বেঁচে থাকতে আমরা তা মনে করিনা। অথচ সেটাই করার কথা।
১৯৬৭ থেকে ১৯৭৭ সাল অর্থাৎ রোজগারে হুরুমামার প্রথম ১০ বছর নানা বেঁচেছিলেন। ছোট ছেলের তার বাবার প্রতি নিবেদিত প্রাণ, একনিষ্ঠতা আমাকে অনেক শিখিয়েছে। অবশ্য তার কিয়দাংশও আমি পেয়েছি কি না-জানিনা। কারণ আমার বাবা ১৯৮০ সালেই ৫৪ বছর বয়সে আমি রোজগেরে হবার আগেই পরপারে চলে গেছেন। একবার আমার বিয়ের পরপর ১৯৮৫ সালের কথা। শ্বশুরকূলের ভ্রাতা স্থরের এক আপনজনকে ঢাকা কলেজের সামনে থেকে এরশাদীয় বাহিনী ধরে নিয়ে হাজতে পাঠায়-তারপর কারান্তরালে। সন্ধ্যায় তার বাসায় না ফিরা  হলে আমরা দুঃখে যবুথবু। মামা আমার সাথে ঢাকার কয়েকটি থানায় ২/৩ দিন ধরে তার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। বিপদে কেউ পড়বে মামার নজরে আসলে তাকে সাহায্যের জন্য উঠে পড়ে লাগবেন এটাই তার সহজাত প্রবৃত্তি ছিল। অতি সম্প্রতি আমার মেয়ের বিয়েতে মামা না আসতে পেরে মোবাইল ফোনে অনেক দুঃখবোধ প্রকাশ করেছেন।    
এই তো গেলবার তিনি হজ্জ¦ করে এসেছিলেন। মনে হয় মহান আল্লাহ তাকে সেজন্যই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তার ২ ছেলে যুক্তরাজ্য ও মার্কিন মুল্লুকে ট্রাম্পের দেশে প্রবাসী। সিলেটের মিতালী আবাসিক এলাকায় তার নিজের বাসা। আমার নানাবাড়ী রনকেলীর খ্যাতিমান বাড়ি, বড়বাড়ি। নানা মরহুম মৌলভী আব্দুল হাই চৌধুরী (আতই মিয়া) জমিদার পরিবারের সন্তান। তার জীবদ্দশায় উত্তর পুরুষেরা কাজ করে জীবিকা অর্জনের প্রয়োজনে বিশ্ব জোড়ে ছড়িয়ে পড়েন। রনকেলী বড়বাড়ী এক মধুময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ধারক। অনেক উচ্চতার সেই মূল বাড়ীতে উঠতে ৫টি স্থর পেরুতে অনেক সংখ্যক সিড়ি বেয়ে যেতে হয়। খুব অল্প সংখ্যক হাতে গুনা বাড়ী বৃহত্তর সিলেটে এমন আছে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।
মামা বয়সের পরিপক্কতা বা প্রবীণতার আগেই কাজের ধারা থেকে সরে এসেছিলেন। পাখি শিকার ছিল তার নেশা। বিগত বছরগুলিতে তিনি সিলেটের বাসায় ও গ্রামের বাড়ীতে সপ্তাহান্তে ফ্রি ঔষধ বিতরণ কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তার জানাজা গ্রামের ঈদগাহ মাঠে হলো-৭ জানুয়ারী বাদ মাগরিব। শীতের প্রকোপ ভেদ করে তার মায়ার টানে অনেক লোকজন জানাজায় শরীক ছিলেন। কাছের মানুষ হয়ে নয় শুধু বরং ভাগ্নেদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজোষ্ঠ্য হবার সুবাদে তাকে অনেক দেখার ও বুঝার সুযোগ হয়ে ছিল। পরপারে যাত্রায় সকলেই আমরা যাত্রী। শুধুই প্রতীক্ষা ¯্রস্টার ডাকের। তারপর সেখানে পৌছালে কি হবে তা সকলেরই অজানা। গরীবদের ও আত্মীয়-স্বজনদের চাহিদার বা সহায়তার ডাকে তিনি সদাই ছিলেন অন্তপ্রাণ ও সচেষ্ট। তার কাছ থেকে অনেক ভালো শিক্ষা পেয়েছি। বয়সের সাথে সাথে আমাদের স্বকীয়তা বেড়ে গিয়ে প্রত্যেকে আপন মহিমায় নিজের মতো জীবনপাত করে থাকি। আমি ও মামা ব্যতিক্রম নই। তবে আমি নিশ্চিত সাব্বির চৌধুরী পরকালে অনেক ভাল থাকবেন। মহান আল্øাহ সুবহানাল্লাহুতালা তাকে ভালই রাখবেন মনে করি।
লেখক : চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT