উপ সম্পাদকীয়

জাতীয় উন্নয়ন ও প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গি

ক্বারী আব্দুল হাকিম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০১-২০১৮ ইং ০৩:১০:০১ | সংবাদটি ১১১ বার পঠিত

আমাদের দেশের সব মানুষই উন্নতি ও অগ্রগতি চায়। দেশটি সুখী সমৃদ্ধ হোক একথা সবারই কাম্য। দেশে যত দল ও পার্টি আছে সবাই বলে আমরা দেশটাকে সুখী সমৃদ্ধ ও উন্নত করে গড়ে তুলতে চাই। সরকার ও যা করেন দেশের উন্নয়নের জন্যই করেন। যত কর্মসূচী হাতে নেন যত প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন বিল পাশ করেন সবই দেশের উন্নতি সাধন ও জনগণের কল্যাণের জন্যই করে থাকেন। মোট কথা দেশ ও জাতির উন্নয়নের প্রশ্নে কারো কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু এর পরও উন্নতি লাভ তো দূরের কথা, আমরা দিন দিন অবনতির দিকেই ধাবিত হচ্ছি; আমাদের সমস্যা বাড়ছে, আমাদের দুর্গতি ও দুর্দশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু কেন আমাদের এই দশা? আসলে যারা আমাদের দেশের হর্তা-কর্তা তারা প্রথমে আধুনিক বিশ্বের দিকে দৃষ্টি পাত করে দেখেন।
পাশ্চাত্যের দেশগুলোর কথা ধরা যাক-আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইটালী, জার্মানী প্রভৃতি দেশগুলোই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বেশিই উন্নত ও প্রগতিশীল দেশ। তাদের দাপটেই আজ দুনিয়াটা চলছে। তা দেখে আমাদের দেশের প্রগতিবাদীরাও মনে করছেন যে, আমাদেরও উন্নতি, অগ্রগতি লাভ করতে হলে তাদের অনুসরণ করতে হবে, তাদের শিক্ষা-সাংস্কৃতিক অবলম্বন করতে হবে। তাদের তালে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তাদের রঙে রঙিন হতে হবে এবং বাস্তবে তাই করেছেন। দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য নিজেদের জাতীয় শিক্ষা, আদর্শ, সভ্যতা, ঈমান, আমল, ধর্মীয় অনুশাসন সবকিছু বিসর্জন দিয়ে পাশ্চাত্যের গুরুদের অনুসরণ করেছেন।
দেশবাসীকে অনুসরণের সবক দিচ্ছেন যার ফলে আজ আমাদের দেশের সংখ্যাগুরু মানুষ আচার-আচরণ, চাল-চলন, ফ্যাশনসহ সর্ব ক্ষেত্রেই পাশ্চাত্যের দিকে অতি আন্তরিকতার সাথে তাদের অনুসরণ করে চলেছেন। শুধু তাই নয় পাশ্চাত্যের শিক্ষাকে জাতীয় শিক্ষা হিসাবে বহু আগেই গ্রহণ করেছেন। শুধু তাই নয়, সুদের ব্যবসাকে বৈধতারও সনদ দিয়েছেন। মোট কথা দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য পাশ্চাত্যের অনুসরণ করতে কোনো ত্রুটি করছেন না। কিন্তু তা সত্বেও যখন তারা দেখেন যে, বাঞ্চিত উন্নতি ও প্রগতি তো হাসিল হচ্ছে না বরং দিন দিন অবনতি-দুর্গতি-অশান্তি ও দুর্যোগই বাড়ছে, তখন তারা চিন্তা করেন যে পাশ্চাত্যের সাথে আমাদের পার্থক্যটা কোথায়? তারা দিন দিন উন্নতির দিকে অগ্রগামী হচ্ছে, আর তাদের অনুসরণ করে আমরা দিন দিন অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। তারা চিন্তা করে দেখেন পার্থক্য এখানেই যে, আমাদের দেশে ধর্মীয় শিক্ষা কিছুটা বাকি রয়েছে। এখনও কিছু মসজিদ-মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার আলো মিট মিট করে বিকিরণ হচ্ছে। এখনও কিছু আলেম-উলামা ও নামাজী মুসলমান বাকি রয়েছেন তাই তারা বলেন ধর্মই আমাদের প্রগতির প্রধান অন্তরায়। কখনও তারা বলেন, মৌলবাদীদের উৎখাত না করলে আমাদের উন্নতি সাধন হবে না। আবার কখনও তারা বলেন, এই মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোই আমাদের অবনতির মূল কারণ। তাই আজ তারা স্বয়ং মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। এদের দ্বারা কখনও সভ্যতার নামে, কখনও দরিদ্রতার নামে, ইসলামকে নির্মূল করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
১৯৭১ সালে যখন দেশ স্বাধীন হয় তখন এদেশে নৈতিক শিক্ষার প্রভাব যতটুকু ছিল, আজ ততটুকু নেই। এখন মানুষের মধ্যে ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি, ধর্মীয় প্রেরণা যতটুকু ছিল আজ আর ততটুকু অবশিষ্ট নাই। পক্ষান্তরে তখন আমাদের দেশে পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সভ্যতার প্রভাব যতটুকু ছিল এখন তার চেয়ে অত্যন্ত বেশি। নাস্তিকতা, আধুনিকতা, ধর্মহীনতা, ধর্মদ্রোহীতা, বিজাতীয় অনুকরণ দিন দিন প্রবল হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশের এনজিও’র আগমন শুরু হয়েছে ৭০ সাল থেকে, তারাও আমাদের দেশকে উন্নত করার জন্য আমাদের দরিদ্রতা বিমোচনের জন্য আমাদের সেবার জন্য কাজ করে যাচ্ছে নিরলস ভাবে। তারা বৎসরে প্রায় দু’হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে আমাদের দরিদ্রতা বিমোচনের জন্য। এতদ সত্বেও আমাদের দেশ কি তাদের মত হয়েছে উন্নত? আমাদের দেশে কি দরিদ্রতা কমেছে? বাস্তব ও নিরপেক্ষ ভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে দরিদ্রতার হার কয়েক গুণ বেড়েছে। পারিবারিক জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে অশান্তি, অনিয়ম, হাহাকার, দুর্ভিক্ষ, রাহাজানি বেড়েই চলেছে। এখন প্রশ্ন হলো উন্নতি ও অগ্রগতির এত আয়োজন সত্বেও আমাদের অবস্থা এরূপ কেন? তবে কোথায় আমাদের সমস্যা? আমাদের এ বিড়ম্বনার কারণ কি? এসব কথা কি তলিয়ে দেখছেন বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিবাদীরা। এতে একথা পরিস্কার প্রমাণিত হলো যে, ধর্ম আমাদের অবনতির কারণ নয়, বরং ধর্মকে বর্জন ও পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণই আমাদের অবনতি ও দুর্গতির মূল কারণ।
এখন আসুন জাতীয় জীবনে এ দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আমাদের উন্নতি ও অগ্রগতির আসল উৎস কি? প্রথমে বোঝা প্রয়োজন যে এক লাঠি দিয়ে সবাইকে হাঁকানো যায় না। এইভাবে একই মৌসুমে সব ধরণের ফসল ফলে না। বরং প্রত্যেক ফসলের জন্য স্ব-স্ব প্রাকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মৌসুমের প্রয়োজন। ঠিক তদ্রুপ দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য একই নিয়ম পদ্ধতি, একই ব্যবস্থাপত্র যথেষ্ট নয়। বরং প্রত্যেক জাতির জন্য পৃথক পৃথক প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের অনুকূল নিয়ম পদ্ধতির প্রয়োজন। তাই বলছিলাম খৃষ্টান এবং মুসলমান আলাদা-আলাদা দুটি জাতি, উভয়ের মেজাজ, প্রকৃতি, জাতীয় বৈশিষ্ট্য এক নয় বরং সম্পূর্ণ পৃথক পৃথক, তাই উভয় জাতিকে একই আইন দ্বারা শাসন করা যাবে না। একই লাঠি দ্বারা হাঁকানো যাবে না। একই ঔষধের দ্বারা উভয়ের রোগ নিরাময় হবে না। সুতরাং যে নিয়ম পদ্ধতিতে খৃষ্টানদের উন্নতি ও অগ্রগতি হবে, সেই নিয়ম পদ্ধতি অনুসরণ করলে আমাদের উন্নতি ও অগ্রগতি হবে না। হওয়া সম্ভবও নয়। তাই আমাদের উন্নতির জন্য পাশ্চাত্যের মুখাপেক্ষী হওয়া এবং তাদের অনুসরণ করাই আমাদের সব চেয়ে বড় ভুল। এখানেই আমাদের গলদ এটাই আমাদের বিড়ম্বনা ও অবনতির মূল কারণ। মুসলমানদের কল্যাণ ও উন্নতির জন্য খৃষ্টানদের অনুসরণ করা চরম বোকামী বৈ আর কিছু নয়। আমরা মুসলমান জাতি বিশ্বের সেরা জাতি আমাদের স্বতন্ত্র জাতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতি-আদর্শ এবং জাতীয় কৃষ্টি রয়েছে।
সুতরাং আমাদের জাতীয় শিক্ষা ও আদর্শের ভিত্তিতেই উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করতে হবে। কোরআন হাদিসই আমাদের জাতীয় উন্নতি ও কল্যাণের পন্থা পরিস্কার বলে দিয়েছে। অতএব যখন আমরা কোরআন হাদিস তথা হুজুর (সাঃ) এর সুন্দর শিক্ষা আদর্শের আলোকে জীবন পরিচালনা করতে পারব, একমাত্র তখনই আমরা উন্নতি ও অগ্রগতির চেহারা দেখতে পাবো। প্রত্যেক জাতি তার জাতীয় বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রেখে জাতীয় শিক্ষা আদর্শের আলোকে উন্নতি লাভ করবে। এটাই ইতিহাসের অমোঘ নীতি, সুতরাং উন্নতি ও অগ্রগতির সবক হাসিল করতে হলে, আমাদেরকে আমাদের অতীত ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। প্রথম যুগের মুসলমানগণ কোন হাতিয়ারের বদৌলতে দুনিয়ার বুকে উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহন করেছিলেন। প্রথম যুগের মরু পথচারী বেদুইন আরববাসী যাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত সভ্যতার তালিকায় ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যাবেনা, তারা মাত্র তেইশটি বছরের স্বল্প অবসরে কেমন করে জাতীয় জীবনের পথ পরিবর্তন করলো। কিরূপ তারা প্রভাব বিস্তার করলো বিশ্ববাসীর বুকে। কেমন করে পরাজয় করলো তারা রোম পারস্যের মত মহা শক্তিকে। ইতিহাস সাক্ষী তাহা একমাত্র কোরআন হাদিসকে গ্রহণ ও বরণ করেই প্রিয় নবী (সাঃ) এর শিক্ষা ও আদর্শকে অবলম্বন করার বদৌলতেই। আজ আমাদের মধ্যে সেই কোরআন সেই হাদিস বিদ্যমান, আমরা তা অবলম্বন করে উন্নতি লাভ করতে পারবো না কেন? ইতিহাস সাক্ষী যতদিন মুসলমানগণ ইসলামের সত্যিকার শিক্ষা, সভ্যতা ও আদর্শকে আঁকড়ে ধরেছিল, ততদিন পর্যন্ত দুনিয়ার কর্তৃত্ব শান-শওকত, মান-সম্মান, উন্নতি-অগ্রগতি, সবকিছুই তাদের অধিকারে ছিল, মুসলমানদের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভেটো দেওয়ার মত সাহস কারো ছিল না। কেননা ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শের মধ্যে এমন অলৌকিক প্রভাব বিদ্যমান, ইহাকে যে আঁকড়ে ধরবে তাকে অন্যান্যরা শ্রদ্ধা ও ভয় না করে পারে না। যতদিন পর্যন্ত মুসলমান কোরআন ও হাদিসের সত্যটিকে উপলব্ধি করতে পারবে না ততদিন যতই প্রগতির দুহাই দিক না কেন এ দুঃখ-দুর্দশার সমাপ্তি কখনও ঘটবে না। তাই বলছি মুসলমান যদি সত্যিকারের মান-মর্যাদা হাসিল করতে চায় যদি বর্তমান দুঃখ দুর্গতি লাঘব করে উন্নতির চেহারা দেখতে চায়, তবে গ্র্যান্টি সহকারে বলতে পারব সেই চৌদ্দশত বছরের ইসলামের সুন্দর শিক্ষা তথা কোরআন হাদিস ও হুজুর (সাঃ)-এর আদর্শের উপর কঠোরভাবে চলতে হবে। ইসলামের আদর্শের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এ ছাড়া মুসলমানদের উন্নতির কোনো বিকল্প নেই। যদি আমার এ বক্তব্য দেশের প্রগতিবাদীদের রুচিসম্মত না হয় তা হলে একটা বার পরীক্ষা করে দেখুন।
লেখক : শিক্ষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভেজাল প্রতিরোধে প্রয়োজন আইনের বাস্তবায়ন
  • পদ্মার সর্বনাশা ভাঙন রোধ প্রসঙ্গে
  • ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ
  • ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • দেশীয় চ্যানেল দর্শক হারাচ্ছে কেন?
  • বিশ্ব বরেণ্যদের রম্য উপাখ্যান
  • আশুরা ও কারবালার চেতনা
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী
  • অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব
  • শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা
  • প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • Developed by: Sparkle IT