সাহিত্য

একগুচ্ছ লাল গোলাপ

ডা. এম এ সালাম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০১-২০১৮ ইং ০৩:১১:৪৫ | সংবাদটি ১৪ বার পঠিত

সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিয়েই থমকে দাঁড়ালো দারুন হ্যান্ডসাম এনামুল হাবিব। দেখলো, উপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে লাল শাড়ি পরা অসাধারণ সুন্দরী একটি মেয়ে। মেয়েটি শেষ ধাপে পা রেখে হাবিবের দিকে বড় বড় মায়াবী চোখ দুটি মেলে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিঃশব্দ চার চোখের রোমাঞ্চকর আলাপন চলল কিছুক্ষণ। চোখ যে মনের কথা বলে। বাক্যটি মিথ্যে নয়। ইতিমধ্যে ঢের মনের না-বলা কথা বলা হয়ে গেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো উভয়েই তাদের নিজ নিজ মনের গহনে আঁকা কাক্সিক্ষত মানুষটির সাক্ষাৎ পেয়ে গেছে। এবার মেয়েটি মুচকি হাসলো। হাবিবের মনে হলো মেঘের আড়াল থেকে হঠাৎ একফালি চাঁদ উঁকি দিয়ে গেল। নিঃশব্দ মিষ্টি হাসি এক অসাধারণ লাবণ্যের চ্ছটা হৃদয়টাকে ছুঁয়ে গেল। জড়তা কাটিয়ে এবার হাবিব হাত বাড়িয়ে বলল : হাই। আমি এনামুল হাবিব। তিনতলায় থাকি। নতুন ভাড়াটে। আপনি? মেয়েটি আবার হাসলো। মনে হলো জ্যোৎ¯œা ঝরে ঝরে পড়ছে। মায়াবী সরু ঠোটের ফাঁক দিয়ে পরিপাটি মুক্তাদানার মতো দাঁতগুলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। কি মায়াময় স্মৃতি। শেকহ্যান্ড করে বলল: হ্যালো, আমি সামিয়া আক্তার নীপা। এই পঁচতলা ভবনের মালিক ব্যারিস্টার আখতার হোসেন আমার বাবা। আমি তার একমাত্র সন্তান। হাবিব প্রফুল্লচিত্তে বলল: থ্যাংকস গড। অতি উত্তম। অতি উত্তম। পরম সৌভাগ্য আমার ঠিক জায়গায় বাসা নিয়েছি। আমি ইকোনমিক্স-এ অনার্সসহ মাস্টার্স করেছি। মাত্র চার মার্ক সর্ট থাকায় ফার্স্ট ক্লাস পাইনি। বর্তমানে আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক-এ অফিসার হিসাবে কর্মরত আছি। এখানে ক্যারিয়ার তৈরির যথেষ্ট সুবিধা আছে। বেতন ভাতা খুব ভালো। নেক্সস্ট প্রোমেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। নীপা এবার একটু শব্দ করে হেসে বলল: হাবিব সাহেব, আপনার পরিচয় পেয়ে খুশি হলাম। তা আপনার বায়োডাটা আমাকে দিচ্ছেন কেন? আমি কি আপনাকে ইন্টারভিউ এর জন্য ডেকেছি। হাবিব তড়িৎ জবাব দিল: দেখুন মিস নীপা। দিনকাল খুব খারাপ। ভদ্রলোকের ছদ্মাবরণে সন্ত্রাসী, জঙ্গিরা বাসা ভাড়া নিয়ে কতো আকাম-কুকাম করে বেড়াচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন এদেরকে ধরতে হিমশিম খাচ্ছে। তাই ভালো করে খুঁজ খবর না নিয়ে ভাড়া দেয়া উচিত নয়। কী, ঠিক বলিনি? নীপা আবার এক ঝলক হেসে বলল: হাবিব সাহেব আপনার সতর্কবাণীর জন্য ধন্যবাদ আপনি ঠিকই বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা আজকাল প্রায়ই ঘটছে। আমার খুশি লাগছে, আমাদের নতুন ভাড়াটে জঙ্গি নন, একজন সুদর্শন ব্যাংকার। হাবিব খুশ মেজাজে বলল: মিস নীপা, কমপ্লিমেন্টের জন্য ধন্যবাদ। তা আপনি স্টুডেন্ট? নীপা মিষ্টি হেসে জবাব দিল : আমি ঢাকা ভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যের একজন লেকচারার। আপনার সাথে পরিচয় হলো, আলাপ হলো, সময়টা কাটলো ভালো। সামনে আরো আলাপ হবে, বন্ধুত্ব জমবে। আমি ভার্সিটি যাচ্ছি, আসি; নীপা হনহন করে বেরিয়ে গেল। পেছনে রেখে গেল ড্রিমগার্ল, পারফিউম-এর মাতাল করা খোশবু।
ক্রমে নীপা- হাবিবের পরিচয় গাঢ় বন্ধুত্বে পরিণত হলো। সুযোগ-অবসরে একান্তে বসে আলাপচারিতায় সময় কাটায়। অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়ালো প্রতিদিন অন্তত একবার দেখা না হলে উভয়ের সুখনিদ্রা হয় না। মন-মগজ আচ্ছন্ন থাকে, কাজে কর্মে মন বসে না। একটা অজানা শূন্যতার চাপা ব্যথা অনুভূত হয়। কবে এই শূন্যতা দূর হবে, কে জানে। নীপা রোজ জানালা দিয়ে দেখে ব্যাংকের গাড়ী সকাল নয়টায় হাবিবকে নিয়ে যায় এবং বিকেল পাঁচটায় বাসায় দিয়ে যায়। কিন্তু আজ দু’দিন হলো গাড়ীও আসে না, হাবিবকেও দেখা যাচ্ছে না। ব্যাপার কি? তার বেডরুমে ঢুকে মোবাইল করল: হ্যালো হাবিব, তুমি কোথায়?’ ক্লান্তকন্ঠে হাবিব বলল: হাই নীপা, আমার ভিষণ জ্বর। দু’দিন হলো অফিসেও যেতে পারছি না। মনে হচ্ছে তোমাকে মোবাইল করার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছি।’ নীপা রুষ্টকন্ঠে বলল: চুপ কর। পাগলের প্রলাপ। এটা একটা কাজের কথা হলো, আমাকে মোবাইল করতেও তোমার কষ্ট হলো। তোমার আয়া কোথায়? ওকে দিয়েও খবরটা দিতে পারতে। ঠিক আছে, বাবা কোর্টে চলে গেলেই আমি আসছি।’ নীপার বকা খেয়ে হাবিব আবার ঘুমিয়ে পড়ল। হঠাৎ কপালে কোমল হাতের পরশ পেয়ে হাবিব চোখ মেলল। নীপার অসাধারণ নিঃশব্দ ¯িœগ্ধ হাসি। হাবিব নীপার হাতের উপর হাত রাখল। নীপার প্রথম সোহাগী পরশ। বল: নীপা লক্ষ্মীটি। আমাকে ক্ষমা কর। সত্যি আমার ভুল হয়ে গেছে। সবার আগে তোমাকে ফোন করা উচিত ছিল। নানীকে পাঠিয়েও তোমাকে খবরটা দিতে পারতাম। হঠাৎ জ্বর আসায় কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। নীপা এবার একটু শব্দ করে হেসে বলল: ঠিক আছে। ঠিক আছে। ক্ষমা তোমাকে চাইতে হবে না। আপনজন দোষ করলে ক্ষমা না করে উপায় আছে। এখন তো দেখলাম জ্বর নেই। তুমি সুস্থ হয়ে গেছ। কাল অফিসে যেতে পারবে।’ হাবিব প্রফুল্লচিত্তে বলল: হ্যাঁ নীপা, তোমার মায়াবী হাতের পরশ পেয়ে এবং মনছোঁয়া কথা শোনে সত্যি আমি সুস্থ হয়ে গেছি। কাল অবশ্যই ব্যাংকে যাব। ঈয়ার-এন্ডিং, প্রচুর কাজের চাপ। এই সময়ে সব ধরনের ছুটি বন্ধ থাকে। জিএম সাহেব খুব ভালো লোক, ভার্বাল অর্ডারে আমাকে তিন দিনের ছুটি মঞ্জুর করেছেন। আয়ার দিকে তাকিয়ে বলল: নানী তাড়াতাড়ি দু’কাপ ফার্স্টক্লাস চা এবং বনফুল বিস্কুট নিয়ে আস। আয়া তার দূর সম্পর্কের এক বয়স্ক মহিলা যিনি তার দেখভাল করেন। নীপা বলল: নানী দাঁড়াও। আমার সাথে এসো। আমি চা বানাবো। হাবিব একটু অপেক্ষা কর, আমি চা করে নিয়ে আসছি। ‘নীপা নানীর সাথে কিচেন-এ চলে গেল। ধবধবে ফর্সা শরীরে আকাশ-নীলা রঙের শেলওয়ার-কামিজে নীপাকে পরীর মতো দেখাচ্ছে। মুখশ্রী অতো মায়াবী, দেখামাত্র অ-কবিকে কবি বানিয়ে দেয়। হিল্লোলীত শরীর নিয়ে তার হাঁটার স্টাইল দেখলে কবি তার কলম রেখে হ্যাঁ করে নির্বাক তাকিয়ে থাকবে। হাবিব মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। চা খাওয়া শেষ হলে নীপা বলল: হাবিব ঠিক আছো তো? না-কি আমার বান্ধবী ডা. শারমিনকে ডাকবো ও মেডিকেল কলেজে মেডিসিনের লেকচারার। এফসিপিএস করেছে। প্রাকটিস খুব ভালো। ইতিমধ্যে বেশ নাম করেছে। বাঁধা দিয়ে হাবিব বলল: মেনি থ্যাংকস নীপা। তার আর দরকার হবে না। তুমিই তো আমার বড় ডাক্তার। দেখছ না, তুমি আসতেই আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছি। নীপা বলল, শুনে খুশী হলাম। কাল অফিসে যাবে কিন্তু। তবে কোনো প্রবলেম হলে আমাকে ফোন দিও। এখন আসি। হাবিব বিনয়ের সাথে বলল: আমার একটা ছ্টো আবদার আছে। নীপা মুচকি হেসে বলল: কি আবদার? হাবিব বলল: আমার কপালে একটা মায়াচুম্বন এঁকে দিয়ে যাবে না।’ জ্যোৎ¯œা ঝরা হাসি দিয়ে নীপা বলল: কেন নয়, অবশ্যই দেব।’ দু-হাত দিয়ে হাবিবের গাল চেপে ধরে কপালে একটি আদুরে চুম্বন এঁকে মোহনীয় হাসি দিয়ে বেরিয়ে গেল। হাবিবের মনে হলো নয়নকাড়া হাসি থেকে শুভ্র তুষারকণা ঝরে পড়ছে।
আজ নীপার জন্মদিন। দোতলায় হলরুমে ঘরোয়া পরিবেশে অনুষ্ঠান হচ্ছে। নীপার কলিগ, বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজন সবাই বিভিন্ন উপহার নিয়ে আসছেন। নীপা হাসিমুখে সবাইকে আপ্যায়ন করছে। এমন সময় গাঢ় কালো স্যুট, লাল টাই দারুন হ্যান্ডসাম টলফিগার স্মার্ট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হাবিব হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে হলে ঢুকল। সবাই এক নজর তাকে দেখল। নীপা মুক্তাছড়ানো হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে বলল: হাই হাবিব, ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম। তা অতো দেরি করলে কেন? ব্যাংকের চাকুরি, কাজের চাপ বেশি, তাই না?’ হাবিব হাসিমুখে বলল: না, ঠিক তা নয়। আসলে আমি একটু কনফিউসনে পড়ে গিয়েছিলাম। তোমার জন্মদিনে তোমাকে কি দিয়ে উয়িশ করব। এটা-ওটা, অনেক চিন্তা ভাবনা করে ঠিক করলাম তোমাকে এক গুচ্ছ লাল গোলাম দিয়ে উইস করব। নীপা সত্যি করে বলত আমার ভাবনা কি সঠিক?’নীপা নি:শব্দ হেসে বলল: হাবিব তোমার ভাবনা শতভাগ সঠিক। জগতের শ্রেষ্ঠ উহপার হচ্ছে এই পবিত্র লাল গোলাপ। এই গোলাপ সুন্দরের কথা বলে, ভালোবাসার কথা বলে, ¯িœগ্ধ মন-মানসিকতার কথা বলে, প্রেমের বন্ধনকে হৃদয়ের অন্ত:স্থলে স্থাপন করে। রবার্ট বার্নস তার এক কবিতায় বলেছেন। মাই লাভ ইজ এ রেড-রেড রোজ: হাবিব তোমার উপহার লাল গোলাপ আমার জীবনে একটি শ্রেষ্ঠ উপহার। আমি মুগ্ধ হয়েছি, অভিভূত হয়েছি। তোমাকে প্রাণঢালা অভিনন্দন: হাবিব মুগ্ধ নয়নে নীপার দিকে চেয়ে বলল: নীপা তুমি সুন্দর, তোমার মন সুন্দর, তুমি এক সুন্দরের সমষ্টি। আই উইস ইউ হ্যাপী বার্থ-ডে।
ডিনার শেষে ব্যারিস্টার আখতার হোসেন বললেন: নীপা একটু বস মা, তোর সাথে জরুরি কথা আছে। স্ত্রী ফাতেমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমিও এসো, একসাথে কথা বলি।’ নীপা এসে বাবার সামনের সোফায় বসে হাসিমুখে বলল: হ্যাঁ বাপি, এবার বল কি তোমার জরুরি কথা। ফাতেমা চৌধুরী হাতের কাজ শেষ করে স্বামীর পাশে এসে বসে হাসিমুখে বললেন, বাবা-মেয়েতে কি এমন জরুরি কথা আমিও একটু শেয়ার করি। ব্যারিস্টার সাহেব খোশ মেজাজে বললেন: অবকোর্স, শেয়ার তো তোমাকে করতেই হবে। তোমার বিজ্ঞ মতামত ছাড়া এ বাড়িতে কি কোনো কাজ হয়, না হয়েছে কোনোদিন, তুমিই বল। ফাতেমা চৌধুরী একটু শব্দ করে হেসে বললেন: মনে হচ্ছে খাঁটি মিল্কভিটা বাটার মারছ। তা আসল কথাটি বলেই ফেল। নীপা কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। বারিস্টার সাহেব বললেন: আমার বন্ধুর ছেলে জাফর হার্ভার্ডে পিএইচডি করে আগামী শুক্রবার দেশে ফিরছে। তোমরা তো তাকে ভালো করে চিনো, জানো। আমাদের বাড়িতে বহুবার এসেছে। নীপার সাথে তার পরিচয় বন্ধুত্ব আছে। ছেলেটি খুব ভালো, স্মার্ট, ন¤,্র ভদ্র এবং বিনয়ী। তবে গায়ের রঙ একটু শ্যামলা এবং সামান্য শর্ট। তার বাবার সাথে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা হয়েই আছে। ছেলেটি খুবই বিশ্বস্ত। আমি নীপাকে ওর হাতে তুলে দিতে চাই। মা নীপা এবার বলো তোমার কি অভিমত? নীপা একটি দীর্ঘ নি:শ্বাস ছেড়ে বলল: বাপি আমাকে ক্ষমা কর। জাফরকে আমি বিয়ে করতে পারব না। এটা আমার শেষ কথা। জীবনটা আমার, আমাকে আমার পছন্দ মতো বাঁচতে দাও। পরিচয়-বন্ধুত্ব এক জিনিস আর জীবন সাথী খুঁজে নেয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্ত। আমি যাকে পছন্দ করি, বিশ্বাস করি, ভালোবাসি তাকেই বিয়ে করব। পরিচয়-বন্ধুত্ব ক্ষণিকের কিন্তু বিয়ের বন্ধন সারা জীবনের। শুরুতেই এই সিদ্ধান্ত ভুল হলে সারাজীবন বিড়ম্বনা ছায়ার মতো পিছু পিছু হাঁটবে এবং সুন্দরকে অসুন্দরের চুরাবালিতে ডুবিয়ে মারবে আর এটা ঘটবে অর্থহীন আবেগ ও ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে। বাপি তুমি কোনো অপরাধ নিও না, আমি আমার মনের কথাটি অকপটে বললাম। দীর্ঘ নিরীক্ষার পর আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি। বিয়ে সাদিতে ভাবাবেগের কোনো স্থান নেই, নিবিড় দূরদর্শী সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। ফাতেমা চৌধুরী শান্ত কন্ঠে বললেন: নীপার চিন্তাধারা চমৎকার। আই ডু অ্যাপ্রেসিয়েট। তার বক্তব্যে মননশীলতা আছে, বাহুল্যের কোনো অবকাশ নেই। তাকে তার মতো জীবন সাজাতে দাও। কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। উই উইস টু সী হার হ্যাপী থ্রু আউট হোল লাইফ।
ব্যারিস্টার সাহেব এতোক্ষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে মা-মেয়ের কথাগুলো শুনছিলেন। এবার একটু নড়েচড়ে বসে বললেন: তোমাদের দুজনের চিন্তাধারা এক এবং অভিন্ন। সঙ্গত কারণেই বিবেচনার অপেক্ষা রাখে। তবে বলছিলাম কি, নীপা আমাদের একমাত্র সন্তান। বংশের প্রদীপ। সমোদয় ঐশ্বর্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী। তাই আমি চাচ্ছি এমন একটি যোগ্য, বিশ্বস্ত এবং সুদর্শন পাত্রের সাথে নীপার বিয়ে দিতে চাই যে আমার মেয়েকে সারাজীবন ভালোবাসবে এবং সমোদয় প্রোপার্টি আগলে রাখবে। তাই আমি সামগ্রিক বিবেচনায় জাফরকে বেছে নিয়েছি। একটি সুশিক্ষিত ভালো বংশের ছেলে। ওর বাবা আমার বাল্যবন্ধু। মা নীপা, তুই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা। তুর চিন্তা চেতনায় যথেষ্ট ম্যাচিউরিটি এসেছে। তোকে অতোসব কথা বুঝিয়ে বলার তো কোনো দরকার দেখি না। এবার বল তো মা, তুই জাফরকে কেন রিজেক্ট করিস? নীপা বাবার মুখের দিকে করুন নয়নে চেয়ে বলল: বাপি, এখানে অ্যাকসেপ্ট রিজেক্টের কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়, বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে পছন্দ-অপছন্দের, প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্ন। জাফরের সাথে পরিচয়-বন্ধুত্ব আছে ঠিকই কিন্তু ওকে ভালোবেসে বিয়ে করব এমনটা কস্মিনকালেও ভাবিনি। জাফর নি:সন্দেহে একজন যোগ্য পাত্র কিন্তু আমার চাওয়া-পাওয়ার সাথে কোনো মিল নেই। আমি দুঃখিত ওকে বিয়ে করতে পারব না। ব্যারিস্টার সাহেব এবার একটু রুঢ়কন্ঠে বললেন: আমি যদি জোর করে জাফরের সাথে তুকে বিয়ে দিয়ে দেই? আহত কন্ঠে নীপা বলল: বাপি, এমনটা তুমি করতেই পার কারণ, তুমি আমার বাবা। তোমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। কিন্তু এরপর যখন ‘নীপা’ বলে ডাকবে তখন ‘বাপি’ বলে জবাব দেয়ার এ বাড়িতে কেউ থাকবে না। তোমার মেয়েকে চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলবে। কান্নাজড়িত কন্ঠে ব্যারিস্টার সাহেব বললেন: তুই একি বলছিস মা। তুর মুখের পানে চেয়ে চেয়েই তো আমরা বেঁচে আছি। এ বাড়ির প্রতিটি অঙ্গনে অষ্টপ্রহর তুর দীপ্ত বিচরণ। প্রতিটি নিঃশ্বাসে তুর চঞ্চল অস্থিত্ব। ফাতেমা চৌধুরী স্বামীর কথা কেটে বললেন: দাঁড়াও। তুমি তো কেবল বলেই যাচ্ছ। একবারও কি জিজ্ঞাসা করেছে তার পছন্দের মানুষটি কে? সে কি চায়? পছন্দের জীবনসাথী খুঁজে নেয়া তার মৌলিক অধিকার। আমার মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপিকা, তার চিন্তা-চেতনা সমৃদ্ধ। আমি বিশ্বাস করি সে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেবে না। বিয়ে ক্ষণিকের ভালোবাসা নয়, সমস্ত জীবনের সুখ-শান্তির গ্যারান্টি। এসো, শোনি তার মনের কথা। তার পছন্দের ব্যক্তিটির কথা: ব্যারিস্টার সাহেব এবার ধীরকন্ঠে বললেন: ফাতেমা, তুমি ঠিক সময়ে সঠিক কথাটি বলেছ। তোমাকে ধন্যবাদ। নীপা, আমার মা-মণি, এবার বল জাফর তুর জীবনে আসুক, এটা তুর আদৌ কাম্য নয়। নি:সঙ্কোচে বল তুই কাকে বিয়ে করতে চাস? নীপা দৃঢ়কন্ঠে বলল: বাপি, আমি হাবিবকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। বিয়ে করলে হাবিবকেই করব। হাবিব একটা অসাধারণ প্রাণবন্ত মানুষ, বুদ্ধিদিপ্ত, শান্তশিষ্ট, মার্জিত, রুচিসম্পন্ন, বাস্তবস্বপ্নদ্রষ্টা, স্মার্ট, সুদর্শন পুরুষ। আমার স্বপ্ন ও ওর স্বপ্নের মাঝে দারুন ঐক্যতা। ওর মাঝে আমার প্রত্যাশার প্রদীপ জ্বলতে দেখেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওকে বিয়ে করে আমি সুখী হব। ব্যারিস্টার সাহেব গম্ভীর কন্ঠে বললেন: বেশ, তোমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শোনার জন্য চব্বিশ ঘন্টা সময় বেঁধে দিলাম।
পরদিন ডিনার শেষে ব্যারিস্টার সাহেব বললেন: তোমরা মন দিয়ে শোন, আমার একটা ঘোষণা আছে। ফাতেমা চৌধুরী ও নীপা দারুন উৎকন্ঠা নিয়ে ব্যারিস্টার সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি নিঃশব্দ একটু পায়চারী করে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলরেন: ফাতেমা, আমাদের নয়নের মণি নীপা হাবিবকে ভালোবাসে এবং ওকে বিয়ে করতে চায়? এ বিয়ে অবশ্যই হবে। আমি আজ হাবিবের সাথে দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী সপ্তাহে ওদের বিয়ে হবে। তবে শর্ত রেখেছি বিয়ের পর নীপাকে নিয়ে আমার বাড়িতে থাকতে হবে। অন্য কোথাও যেতে পারবে না। কারণ, নীপা আমাদের অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত। ওকে প্রতিদিন না দেখলে আমরা বাঁচব কি নিয়ে। নীপা হাউমাউ করে কেঁদে ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল: ও মাই সুইট বাপি, তুমি হাজার বছর বেঁচে থেকে- আমাকে এভাবে তোমার বুকে আঁকড়ে রাখো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT