সাহিত্য

নৃপেন্দ্রলাল দাশ : কবিতা যার মাতৃভাষা

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০১-২০১৮ ইং ০৩:১৩:২৭ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত


আমরা জানি, বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি ইত্যাদি হয় মাতৃ কিংবা রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু কবিতাকে নিজের মাতৃভাষা বলে দাবি করার সাহস ক’জনের আছে? এখানেই কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ অন্যদের থেকে পৃথক। তিনি বলছেন, ‘কবিতা আমার মাতৃভাষা/ বলে কেউ আমার ভাষা বুঝে না।/ সত্যি কি তাই?/ জানতে চাই/ মবনু ভাই।’(৬ জুলাই ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে কবি তাঁর ‘কবিতাসমগ্র প্রথমখ-’ আমার হাতে দিতে গিয়ে এ কথাটি লিখে দিয়েছিলেন)।
কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ ছাড়া আর কোন বাঙালি কিংবা বিশ্বকবি এমনটি দাবি করেছেন কিনা, আমার জানা নেই। যে কবি কবিতাকে তাঁর মাতৃভাষা মনে করেন, তাঁকে আমরা কবিতাপ্রেমিকেরা শ্রদ্ধা জানাই।
বাংলা কবিতায় ষাটের দশক একটি আলোকিত এবং আলোচিত সময়। এই সময়ের কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের গন্ধর্বপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ ¯œাতকোত্তর হন। কর্মজীবনে সরকারি কলেজের ‘প্রফেসর’ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সার্বক্ষণিক লেখক তিনি। কবিতা তাঁর সাধনার ক্ষেত্র হলেও ছড়া, প্রবন্ধ, ভ্রমণ, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, ধর্ম, দর্শন, কলাম ইত্যাদি সবদিকেই তাঁর অনেক কাজ রয়েছে। কবিতার বইসহ এইসব বিষয়ে প্রকাশিত তাঁর ছোটো-বড়ো বইয়ের সংখ্যা ষাটের মতো হবে। আজ আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর কবিতা।
কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর বারোটি কবিতা নিয়ে প্রথম কবিতার বই ‘রম্যাণি রুচিরা’ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে সিলেট থেকে প্রকাশিত হয়। এতে ‘রম্যাণি-রুচিরা’ শিরোনামের কবিতা ছাড়াও আরও রয়েছে ‘তোমার উপমা’, ‘একটি আত্মজীবনীর ভাষ্য’, ‘আমি তো অমিতচারী’, ‘বেত্রবতী, তোমাকে’, ‘মুক্তি নেই’, ‘প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট’, ‘চিরকুট’, ‘একটি চিঠির ভগ্নাংশ’, ‘বরাঙ্গনা বাংলা : আকাক্সিক্ষত বেলাভূমি’, ‘অম্বিষ্টা অন্তহীনা’, ‘আর্তধ্বনি মালা’ শিরোনামের কবিতাগুলো। প্রথম বইয়ের কবিতাগুলোতেই কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ তাঁর পরিশীলিত কাব্যবোধ আর রোমান্টিকতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছিলেন বলে আমাদের কবিতার পাঠকদের স্বীকার করতে হবে। বইয়ের নামকরণেই তিনি ধারণ করেছিলেন শিল্প এবং সুন্দরকে। ‘রম্যাণি’ শব্দের অর্থ হলো-সুন্দর, আর ‘রুচিরা’ হলো সংস্কৃতিক একটি ছন্দের নাম, যা কোমলগান্ধার রসের অমরাবতীকে ডেকে আনে। নৃপেন্দ্রলাল দাশ ঐতিহ্য, ধর্ম, দর্শন এবং নৈসর্গ- সচেতন একজন প্রেমিক কবি। কবিতায় তিনি যেমন ভোলেন না নিজের ধর্ম বিশ্বাসের কথা, তেমনি  ভোলেন না এই বাঙলার ছয় ঋতুর নৈসর্গ এবং অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের কথা। তিনি অকপটে বলে যান, ‘বেত্রবতী তুমি এক অভিজাত হোটেলের নাম/ যেখানে উদ্দাম/ ভোগায়ত জীবনের সকল বাসনা/ মসজিদ, মন্দির কিংবা গির্জার নিরুদ্ধ প্রার্থনা।’ (বেত্রবতী, তোমাকে)। কিংবা ‘জালালী কবুতরের ডানায় কালো কালো ঢেউ / তোমার বেণির অতলের ইতিকথা/ একরাশ কমলালেবুর গোলাপী গ-ের/ এনেছি বহতা।’ (একটি চিঠির ভগ্নাংশ)। অথবা ‘সঙ্গীতের শরাঘাতে আমি যদি শব হয়ে যাই/ তুমি যেন দীপ্র হও; কফিনে কামের মাধবী/ এই বলে প্রাক-পুরাণিক সাম্পান ভাসাই/ এইটুকু দাবি।’ (রম্যাণি-রুচিরা)।
বাইশটি কবিতা নিয়ে কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর দ্বিতীয় কবিতার বই ‘অনিহার অন্ধকারে আমি’ ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এই বইতে একাত্তরের স্মৃতিতে রচিত কবিতা ‘জগতজ্যোতির শব’ অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। এই কবিতা শেষ হয়েছে একটি প্রশ্নের মধ্যে-‘ইতিহাস বুকের বোতাম খুলে কোন মোহন জগত দ্যাখালো/ তাকে- জানতে বড্ড ইচ্ছে কোরছে।’ এই বইতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আরেকটি চমৎকার কবিতা রয়েছে ‘একটি কাব্যনাটকের বিক্ষিপ্ত দৃশ্য’ শিরোনামে। এই কাব্যনাটকের নায়ক মুক্তিযোদ্ধা শাহেদ ও নায়িকা ধর্ষিতা রোকসানা। এই কবিতায় শাহেদ একমুঠো মাটি হাতে নিয়ে তাতে রোকসানার ক্ষরিত রক্ত লাগিয়ে গভীর উত্তেজনায় বলে ওঠে, ‘রাঙামাটি আমার স্বদেশ, কখনো/ ফ্যাকাশে হতে দেবো না।’ একুশের ভাষা-আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতিতে এই বইতে রয়েছে, ‘একুশের রক্তে’ শিরোনামের কবিতা। এই বইয়ের বেশিরভাগ কবিতাই দেশাত্মবোধক। যেমন, স্বাধীনতা না এলে কী কী সমস্যা হতো, সেই চিত্রে ‘তুমি না এলে’, বাংলার স্বাধীনতাপূর্ব উনসত্তরের রাজনৈতিক উত্তেজনার সচিত্র প্রতিবেদন ‘মা আমার’। এছাড়াও এই গ্রন্থে রয়েছে ‘নিরবধি অসুখ আমাকে ঘিরে’, ‘সনাতন দুঃখবোধ’, ‘ধ্বংসের মুখোমুখি’, ‘মালবিকা দে’, ‘পরিব্রাজক’, ‘লাল সিগন্যাল’, ‘নারী নিসর্গ নিরালোক’, ‘না, ও পথে যাবো না আর’, ‘নৃপেন দাশের মাংসের কাবাব’, ‘আত্মজৈবনিক জলছবি’, ‘ইচ্ছা’, ‘ক্যাকটাস এবং’, ‘ভারবীর সংলাপ-১’, ‘ভারবীর সংলাপ-২’, ‘সঙ্গ ও নিসঙ্গতা’, ‘কম্পোজিসন’, ‘অগ্রজের আদেশ’ ইত্যাদি শিরোনামের কবিতাগুলোতে আমরা দেখতে পাই এই বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ের ইশারা-ইঙ্গিত কিংবা সরাসরি কথা।
চৌদ্দটি সনেট নিয়ে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর ‘ বৈশালীর প্রতি সনেটগুচ্ছ’ বইখানা। এতে লিরিকের ঢেউ-এ একজন ব্যর্থ প্রেমিকের কষ্টকে মূর্ত করে তুলতে চেষ্টা করেছেন কবি। এই বইয়ের সনেটগুলোতে কবি আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ (প্রকাশকাল ১৯৭৩)-এর কিছুটা ছায়া কবিতার পাঠকেরা অনুভব করতে পারেন। এই বইয়ের সনেটগুলোতে কবি অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে ধারণ করে সনেটের রূপকল্প এবং গাণিতিক বিন্যাস ঘটিয়েছেন।
১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর ‘দাঁড়াও দুঃখ’ মহাভারতের বনপর্ব থেকে নেয়া একটি কাহিনীর অবলম্বনে রচিত কাব্যনাটক। এই বই অনুভব দিয়ে যায় অতীতের চরিত্রগুলো সময়ের দেয়াল ডিঙিয়ে আধুনিক মানসতা লাভের কাকুতি করছে। বইয়ের ভূমিকায় কবির দেওয়া তথ্যানুসারে তা ইতোমধ্যে শ্রীমঙ্গলের মহাবিদ্যালয় মিলনায়তনে মঞ্চায়নও হয়েছে।
বিশটি কবিতা নিয়ে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর ‘নির্বাচিত কবিতা’র বই। এতে ‘দাও আগুনের ফুল’ কবিতাটি মহাভারতের লেখক দেবব্যাসের জন্ম কাহিনির একটি মুহূর্তকে অবলম্বন করে রচিত কাব্যনাটক। কবি নিজেই ভূমিকায় এই কবিতার উদ্দেশ্য স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘অনার্য মৎসগন্ধার কাছে কী করে আর্য পরাশর হৃদয় মেলে ধরেছিলেন তার মধ্যে শ্রেণিসংঘাত ও নাট্য-সংঘাতকে আবর্ত মুখর করাই ছিলো আমার উদ্দেশ্য।’ ‘গালিব আমার গালিব’ কবি শামসুর রাহমানকে এবং ‘নীল তমসুক’ কবি দিলওয়ারকে নিবেদিত কবিতা। এই বইতে হাসন রাজার সঙ্গে সংলাপ’ মজাদার একটি কবিতা। এতে কবি হাসন রাজার ‘ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার’ গানের মজা করে উত্তর দিয়েছেন কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ। এ ছাড়াও নির্বাচিত কবিতা’র বইতে রয়েছে ‘রেশনে আছো রমণেও আছো’, ‘উপদেশের বিরুদ্ধে’, ‘গন্তব্যে মোহিনীছায়া শত্রুর’, ‘হে সময়, হে সুনীল শত্রু’, ‘জলবন্দী একজন’, ‘ বৈশালীর জন্য স্বাগত ভাষণ’, ‘শুধু একজন’, ‘তোমার নিসর্গে যাবো’, ‘গ্রুপ ফটো’, ‘একুশের ছড়া’, ‘ কেন এই বেঁচেবর্তে থাকা’, ‘এভাবে ধ্বংস করা চাই’, ‘চা-করচা’, রক্তে আমার রুবাই’, ‘প্রেম’, ‘শ্রীমঙ্গল’ ইত্যাদি শিরোনামের কবিতা।
প্রায় সাড়ে পাঁচ শ লাইনের একটি কবিতা দিয়ে কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর আত্মজৈবনিক কবিতা ‘এক ফর্মা ইচ্ছাপত্র’ ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এতে ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন চিত্র যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি স্থান পেয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ও।
‘মৃত্যুফানুস’, ‘রব্বানী, আমার নিজস্ব তর্জা’, ‘মমতাজ’, ‘শিলচর’, ‘বরাকের জলে ভাসে আমার এ্যন্টেনা’, ‘রক্তে আমার রুবাই’, ‘দুঃখী গজারমাছ’, ‘গৃহস্থালির ঘরানা, অথচ’, ‘মালবিকা দে’, ‘এখন’, ‘টেরাকোটা’, ‘দাও দুঃখ দাও মৃত’, ‘বাংলা’, ‘এলিজি’, ‘দুঃখের মাঝে আগুন’ এই পনেরোটি কবিতা নিয়ে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর ‘রব্বানী, আমার নিজস্ব তর্জা’ বইটি।
‘নুরজাহান’, ‘একজন বন্ধুকে’ ‘রামায়ন’, ‘সাতটি ফানুস’, ‘চা-স্তোত্র’, ‘মাসিমা, সুহাসিনী দাস’, ‘পারিবারিক চিত্রগুচ্ছ’, ‘ভেঙে যাই তাবৎ ঘরানা’, ‘ক্লান্ত কলম্বাস’, ‘আমার যেটুকু সাধা’, ‘আত্মসূক্ত’, ‘দাও অমৃত’, ‘একাত্তরের কাব্য’, ‘সম্পর্ক’, ‘সাবিত্রী’ এই পনেরোটি কবিতা নিয়ে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর ‘এই নশ্বরতা চাই’ কবিতার বই।
কবিতায় পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের সিলেট অঞ্চলের কবিতাচর্চা নিয়ে যদি আলোচনা করতে হয়, তাহলে প্রথমে যে তিনজন কবিকে স্মরণ করতে হবে তাদের প্রথমে নাম চলে আসে গণমানুষের কবি দিলওয়ার-এর কথা, দ্বিতীয় কল্যাণব্রতের কবি আফজাল চৌধুরী, অতঃপর অবশ্যই বলতে হবে কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ-এর নাম। এই সময়ের বাংলা সাহিত্যে এই তিন কবি সিলেটের প্রতিনিধিত্ব সফলভাবে করেছেন বলে আমরা মনে করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT