উপ সম্পাদকীয়

সামরিক সহায়তা স্থগিত ও পাক-মার্কিন সম্পর্ক

এডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০১-২০১৮ ইং ০৩:১৭:০২ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

পাকিস্তানে, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বপ্রকার সামরিক সাহায্য বন্ধের ঘোষণায় পাক-মার্কিন দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছরের বন্ধুত্ব ও মিত্রতা মুখ থুবড়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোতে চলছে পাক-মার্কিন সম্পর্কের ভবিষ্যত পরিণতি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
গত আগস্ট ২০১৭ সালে দক্ষিণ এশিয়া ও আফগানিস্তান সংক্রান্ত মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি ঘোষণার প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বলে মন্তব্য করেছিলেন যে, আমরা পাকিস্তানকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়ে যাচ্ছি। অথচ পাকিস্তান সন্ত্রাসী জঙ্গিঁগোষ্ঠীকে আশ্রয় ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে, যে সন্ত্রাসী জঙ্গিঁগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমেরিকা লড়াই করে চলেছে। তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে সভ্যতা, ওয়ার্ল্ড অর্ডার ও শান্তি স্বপক্ষে পাকিস্তানের অঙ্গীঁকার পূরণ করার।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়ার নীতির আলোকেই প্রেসিডেন্ট গত ৬ জানুয়ারি ২০১৮ সালের এক ঘোষণায় পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছেন এই কারণে যে, পাকিস্তান আফগানিস্তানের জঙ্গিঁগোষ্ঠী তালেবান এবং এ সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট পাকিস্তান ভিত্তিক হাক্কানী নেটওয়ার্ক নামক জঙ্গিঁগোষ্ঠীকে অর্থ, অস্ত্র এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছে, যা আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব জঙ্গিঁরা মার্কিন সেনা ও নাগরিকদের ওপর হামলা করে প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি করে চলেছে। তাই পাকিস্তান একদিকে আমেরিকান সাহায্য নিয়ে চলেছে এবং অন্য দিকে, আমেরিকানসহ বিশ্ব সভ্যতার শত্রু মৌলবাদী জঙ্গিঁগোষ্ঠীদের সাহায্য করায় পাকিস্তানের ভূমিকাকে ‘ডাবল স্ট্যানডার্ড’ ভূমিকা বলে অভিহিত করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তান হলো এসব জঙ্গিঁগোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয় স্থল। একারণে ট্রাম্প প্রশাসন সর্বপ্রকার সামরিক সাহায্য প্রদান স্থগিত করে বলেছেন, যতদিন সশস্ত্র জঙ্গিঁদের সহায়তা দেওয়া পাকিস্তান বন্ধ না করবে ততদিন সাহায্য প্রদান বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়টি স্থায়ী নয় সাময়িক বলে ঘোষণা করেছে মার্কিন প্রশাসন। অর্থাৎ আফগানিস্তানের তালেবান জঙ্গিঁগোষ্ঠী এবং পাকিস্তানের মধ্যেকার হাক্কানি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে পাকিস্তান কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে বলে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে।
কী পরিমাণ সাহায্য প্রদান স্থগিত করা হয়েছে সেটি নিশ্চিত করে বলা না গেলেও বা তা স্পষ্ট না হলেও ৯০০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের সামরিক সাহায্য স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে মিলিটারী সরঞ্জামাদি এবং প্রশিক্ষণে ২২৫ মিলিয়ন ডলার,-যাহা বৈদেশিক সামরিক অর্থায়ন তহবিলের অর্ন্তর্গত এবং জোট সহায়তা সংক্রান্ত অর্থ তহবিলের ৭০০ ডলার, যার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের জন্য পাকিস্তানকে অর্থ দিয়ে থাকে। জোট সহায়তা সংক্রান্ত অর্থ মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের আওতায় এবং এ সংক্রান্ত পুরো সহায়তা স্থগিত করা হয়েছে।
এক টুইট বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বলে মন্তব্য করেছেন যে, মার্কিনীরা গত ১৫ বছরে বোকার মতো পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার অর্থ দিয়েছে, যা কোনো কাজে আসেনি। উল্লেখ্য যে, নাইন ইলেভেনের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান সন্ত্রাস বিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জোটে অর্ন্তভুক্ত হয়েছিলো এবং তখন থেকে প্রতিবছর ১.৩ বিলিয়ন ডলার হিসেবে বাৎসরিক অর্থ সহায়তা পেয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপম্যান্ট এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী কেবল ২০১৬ সালেই পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭৭৮ মিলিয়ন অর্থ সহায়তা পেয়েছে। এর ৩৫% শতাংশ দেওয়া হয়েছে সামরিক খাতে এবং বাকীটা অর্থনৈতিক উন্নয়ন খাতে দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, পাকিস্তানকে এতো অর্থকরি সহায়তা দেওয়া সত্বেও মার্কিনীদের স্বার্থের বিপরীতে এবং সর্বোপরি বিশ্ব শান্তির জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টিকারী জঙ্গিঁ সন্ত্রাসীদের অর্থ, অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং এমনকি সন্ত্রাসী জঙ্গিঁদের পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি চরম  অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে পাকিস্তান। মার্কিন অর্থ সহায়তার অপব্যবহার করে চলেছে দেশটি। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীসমূহ এবং আন্ত:বাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা (আইএসআই) আফগান তালেবান এবং পাকিস্তানের হাক্কানী নেটওয়ার্কসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী জঙ্গিঁগোষ্ঠীকে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ায় আফগানিস্তানে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের অবসান হচ্ছে না। বরং সন্ত্রাসীরা নব শক্তিতে বলিয়ান হয়ে বার বার আমেরিকানদের হত্যা করে চলেছে এবং নানা স্থাপনায় আক্রমণ  ও হামলা চালিয়ে যেতে পারছে জঙ্গিঁগোষ্ঠী। অথচ পাকিস্তান ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত সন্ত্রাস বিরোধী জোটের অংশীদারী হিসাবে আফগানিস্তানের সন্ত্রাসী জঙ্গিঁগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে এবং এখনো সেই জোটে আছে।
পাকিস্তান দ্বৈত ভূমিকা পালন করে চলেছে বলে অভিযোগ এনেছে মার্কিন প্রশাসন এবং পাকিস্তান এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও দেশটি যে দ্বৈত ভূমিকাই পালন করছে তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি মার্কিন প্রশাসনের। তবে পাকিস্তান কেন দ্বিমুখি নীতিতে চলছে সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে এবং তার ব্যাখ্যাও দাঁড় করানো হয়েছে। রাজনীতি ও স্ট্র্যাটেজি বিশ্লেষকরা মনে করেন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টি ছাড়াও পাকিস্তানের সামনে রয়েছে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা, ভূ রাজনৈতিক অবস্থান ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি এবং ভারতের ভূমিকা ও অবস্থান। বিশেষ করে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে ভারত একটি ফ্যাক্টর এবং পাকিস্তানের চির প্রতিদ্বন্দ্বি প্রধান শত্রু দেশ হিসেবে  ও ভারত পাকিস্তানীদের নিকট চিহ্নিত হয়ে আছে সেই ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকেই। কাজেই ভারত যখন পাকিস্তানের নিকট প্রতিবেশী আফগানিস্তানে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে তখন ভারতের প্রভাব ঠেকানোর জন্য পাকিস্তান বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করবে, এটাই স্বাভাবিক।
পাকিস্তানের সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তারা তাই প্রকাশ্যেই বলে থাকেন, আফগানিস্তানে পাকিস্তানের স্বার্থ সুবিদিত এবং  অব্যাহত ভাবে সেটি বিদ্যমান আছে। এরূপ অবস্থায় ভারত যখন পাকিস্তানের স্বার্থের পরিপন্থী ভূমিকায় আফগানিস্তানে অব্যাহত ভাবে প্রভাব বৃদ্ধি করার চেষ্টা চালিয়ে যায়, সেক্ষেত্রে পাকিস্তান তা মোকাবেলা করার চেষ্টা করবেই। আর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আফগানিস্তানে পাকিস্তানের স্বার্থ অত্যন্ত গভীর এবং সে কারণে ভারতের ভূমিকা সীমিত পর্যায়ে রাখার জন্য পাকিস্তান চেষ্টা করবেই।
আফগানিস্তানে ভারতের জোরদার উপস্থিতি পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থ এবং নিরাপত্তার জন্য ও হুমকি বলেই মনে করে পাকিস্তান। দেশটির বড় ভয় হলো, যদি দিল্লী আফগানিস্তানে শক্ত অবস্থান নিতে সক্ষম হয় তবে একটা পর্যায়ে পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নবাদী বালুচদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে পাকিস্তানের ভাংগন ত্বরান্বিত করতে পারে। এছাড়া, চীন-পাকিস্তান মিলে অর্থনৈতিক কড়িডর নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিকল্পনা রয়েছে এবং আফগান সীমান্তের পাশ দিয়ে বেলুচিস্তানের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ট্রেড রুট-সেটি গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে তা ও হুমকির মধ্যে পড়বে। অথচ, অর্থনৈতিক কড়িডর নির্মাণ, গোয়াদ গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য চীন ইতিমধ্যেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ফেলেছে। এই কড়িডর থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসবে বলে প্রত্যাশা করছে পাকিস্তান। ভারতের প্রভাব বৃদ্ধির ফলে এসব প্রকল্পের চরম ক্ষতি হওয়ার আশংকা পাকিস্তানের রয়েছে। তাছাড়া, আফগানিস্তানের অবস্থানটা হলো হাইলি জিও স্ট্র্যাটেজিক অঞ্চলে, যে কারণে এখানে পাকিস্তানের কোর স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বিদ্যমান। এসব স্বার্থগত কারণেই ভারতকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য মূলত; পাকিস্তান আফগান সন্ত্রাসী জঙ্গিঁগোষ্ঠীর প্রতি তাদের সহযোগিতা ও সাহায্য অব্যাহত রেখেছে। এমনকী, আফগানিস্তানের স্থানীয় ট্রাইবাল ও ধর্মীয় মিলিট্যান্টদের ও সহযোগিতা করে আফগানিস্তানে অস্থিতিশীল অবস্থা জিইয়ে রাখছে পাকিস্তান।
এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালে কাবুলের সাথে স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে ভারত আফগানিস্তানে তার প্রভাব বলয় বৃদ্ধি করে এবং আফগানিস্তানের চার হাজার সৈনিকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে এবং দেশটিকে সেকেন্ড হ্যান্ড এ্যাটাক হেলিকপ্টার দিয়েছে আফগান ন্যাশনাল সিকিউরিটি ফোর্সকে। আফগানিস্তানে ভারতের এই শক্তিশালী অবস্থান, আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি পরিণামে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে বলে পাকিস্তানী প্রশাসন মনে করে। তাই আফগানিস্তানের ভেতরে ভারতের অবস্থান দুর্বল করার কৌশল হিসেবেই জঙ্গি গোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান।
পাকিস্তান এখন কী করতে পারে? আমেরিকার ইচ্ছানুযায়ী আফগন তালেবান, হাক্কারী নেটওয়ার্কসহ জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জোরদার অবস্থান গ্রহণ করবে? নাকি বিকল্প উপায়ে আমেরিকার সামরিক সহায়তা বন্ধের প্রতিক্রিয়া দেখাবে। যদি বিকল্প পথেই পাকিস্তান হাঁটা শুরু করে তবে আমেরিকা কী পদক্ষেপ নিতে পারে। (১) পাকিস্তানের সাথে চলমান ৭০ বছরের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করতে পারে। (২) পাকিস্তানের ভেতরে থাকা জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা আরো তীব্র করতে পারে। পাকিস্তানের সেসব সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, আমেরিকার বিবেচনায় যারা সরাসরি জঙ্গি গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত এবং ৩। পাকিস্তানকে ‘স্টেট স্পন্সর অব টেরর’ রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করতে পারে।
আমেরিকা যদি এখনই ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করে সেক্ষেত্রে পাকিস্তান তার পররাষ্ট্র এবং জাতীয় নিরাপত্তা নীতি কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে এবং আমেরিকার পরিবর্তে চীন এবং রাশিয়ার সাথে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। একই সাথে আফগান সীমান্তে অপর রাষ্ট্র আমেরিকার অন্যতম প্রধান শত্রু ইরানের সাথে পাকিস্তান স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিবে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রফেসর হাসান আসকারী মনে করেন, সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অর্থ বরাদ্দ স্থগিত করার ফলে পাকিস্তানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুসিয়াল প্রভাব কমে আসবে এবং পাকিস্তান অন্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার জন্য এগিয়ে যাবে। আর লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর মিঃ হ্যারস প্যান্ট বলেই ফেলেছেন, আমেরিকার অর্থ আসা বন্ধ হলে শূন্যস্থান পূরণ করে দেবে চীন।
পাকিস্তান আর কী পদক্ষেপ নিতে পারে? পাকিস্তানের ওপর দিয়ে প্রবাহিত আফগানমুখি সরবরাহ লাইন আমেরিকানদের পণ্য বন্ধ করে দিতে পারে। একই সাথে পাকিস্তানের এয়ারঘাঁটিগুলোও আমেরিকান সামরিক বিমানগুলোর ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। ফলে আফগানিস্তানে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে, গ্রাউন্ড লাইন অব কম্যুনিকেশন নামে খ্যাত সরবরাহ লাইন স্থগিত বা বন্ধ করে দিলে ন্যাটো বাহিনী বেকায়দায় পড়ে যাবে। আফগানিস্তান একটি ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। পাকিস্তানের খাইবার পাস দিয়ে ন্যাটোর সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্র গুলোবারুদ ইত্যাদি সরবরাহ করা অত্যন্ত সহজ এবং ব্যয় ও তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, আফগানিস্তান যাতায়াতের জন্য বিকল্প একটি সরবরাহ লাইন হলো নর্দার্ন লাইন, যেটি তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান এবং তাজিকিস্তানের মাটি ছুঁয়ে আফগানিস্তানে গিয়েছে। যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহ করার জন্য এই গ্রাউন্ড লাইন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ২০১২ সালে পাকিস্তান তাদের গ্রাউন্ড লাইন বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন ন্যাটো বাহিনী বিকল্প নর্দার্ন লাইনটি ব্যবহার করেছিলো। তখন ন্যাটো বাহিনীর দ্বারা এই লাইন ব্যবহারের জন্য মাসিক ব্যয় পড়েছিলো ১০৪ মিলিয়ন। অথচ পাকিস্তানের খাইবার লাইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাসিক খরচ পড়ে মাত্র ১৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিকল্প লাইন বিরাট ব্যয়বহুল। পাকিস্তান আর কি করতে পারে? যুদ্ধক্ষেত্রে সফলতার জন্য প্রয়োজন হলো গোয়েন্দা তথ্য। পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনী ন্যাটো বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে জঙ্গি নেটওয়ার্ক বিরোধী যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এখন পাকিস্তান গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করা যদি বন্ধ করে দেয় তাহলে ন্যাটো বাহিনী জঙ্গি বিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে যাবে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা ও পাকিস্তান পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। কোনো এক পক্ষ সহসাই অন্যপক্ষকে ত্যাগ করতে পারবে না। তাসত্ত্বেও ইউএস ইন্সটিটিউট অব পিস এর পাকিস্তানে কর্মরত নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুয়ীদ ইউসুফ মনে করেন, পাক-মার্কিন সম্পর্কের ৭০ বছরের মধ্যে বর্তমানের ন্যায় গুরুতর বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে আর কখনো পড়েনি দেশ দুটি। সম্পর্ক এখন তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এখনো মনে করেন, আমেরিকা ও পাকিস্তানী কর্তৃক্ষ চাইবে না মৈত্রী ভেঙ্গে যাক এবং পাকিস্তান অস্থিতিশীল হয়ে উঠুক এটিও আমেরিকা চাইবে না। কারণ, পাকিস্তান অস্থিতিশীল হলে পড়ে পারমাণবিক অস্ত্র এবং এই অস্ত্র তৈরির উপাদানগুলো জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে এবং এক্ষেত্রে, জঙ্গিদের ভিত্তি মজবুত হবে এবং ফলে বিশ্ব নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। কাজেই এ ধরনের ঝুঁকি আমেরিকা নেবে বলে মনে হয় না।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • অরিত্রী : অস্তমিত এক সূর্যের নাম
  • স্বপ্নহীন স্বপ্নের তরী
  • মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান
  • নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?
  • Developed by: Sparkle IT