উপ সম্পাদকীয়

আসুন শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই

ড. উম্মে বুশরা সুমনা প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০১-২০১৮ ইং ০৩:১৭:২১ | সংবাদটি ১১১ বার পঠিত

ছনের ঘরের ফাঁক-ফোকর দিয়ে হু হু করে তিস্তা নদীর বাতাস ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। হাড় কাঁপানো বাতাস, মাথা বের করে রাখাও কষ্টকর। ছেঁড়া কাঁথাটা দিয়ে চারজন কোনোমতে নিজেদের বাঁচাতে চেষ্টা করে। ছোট বাচ্চাটা প্রস্রাব করে দেয়। কাঁথার একপাশ ভিজে যায়। বাচ্চাটার ঠান্ডা লেগে শ্বাসকষ্টের মত অবস্থা। ছয় মাস বয়স, দিনে দশ-বারোবার প্রস্রাব করে। যে কয়েকটা কাপড় ছিল, সবকটাই ভিজিয়ে ফেলেছে। দু’দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। কাপড় শুকাবে কিভাবে? চার বছর আগে এমন প্রকোপ শীতের রাতে প্রথম বাচ্চাটা ঠান্ডায় মারা গিয়েছিল। এটাও কি চলে যাবে?
আমেনা বেগমের বুকটা নদীর বাতাসের মতই হু হু করে উঠে। বাচ্চাটার জন্য যদি একটা গরম জামা কেউ দিত! একটা গরম কম্বল যদি সে পেত। মনে মনে তিনি দোয়া করতে থাকেন যদি বড়লোকেরা একটু সাহায্যের হাত বাড়াত।
এবারের শীত জাঁকিয়ে নেমেছে। তাপমাত্রা কমতে কমতে একেবারে ৫ ডিগ্রির নিচে নেমে গেছে। ইতোমধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের প্রকোপ সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। কোনো কোনো জেলায় তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেছে এমন সংবাদও গণমাধ্যমে এসেছে।  দরিদ্র মানুষেরা এই ঠান্ডায় চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছে। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে শিশু আর বৃদ্ধ মানুষেরা। উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু শিশু ঠান্ডাজনিত রোগে ইতোমধ্যে মারাও গেছে, অনেক শিশু শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি আর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। দরিদ্র মানুষদের না আছে চিকিত্সার অর্থ আর না আছে গরম কাপড় কেনার অর্থ। দিন আনে দিন খায় দরিদ্র মানুষদের শীতকালে কাজ করার সুযোগও কমে গেছে। অর্থকষ্ট আর শীতের কষ্ট একাকার হয়ে জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচের এই মানুষদের জন্য তাই আনন্দের পৌষ মাস হয়ে যায় অভিশাপ আর আতঙ্কের মাস।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন কোটি ৯৩ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে, আর অতিদারিদ্র্যের মধ্যে প্রায় দুই কোটি আট লাখ মানুষ বসবাস করে। মূলত গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে থাকে। মূলত বস্তিতে ও ভাসমানভাবে বিভিন্ন এলাকায় দরিদ্র এসব মানুষের বাস যারা সবাই শীতার্ত।                                                                                                                                                                                                             
ক’দিন আগেও শীতের লেশমাত্র ছিল না। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায় এবারের শীত তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর জন্য দায়ী আমরাই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন জঙ্গল উজাড়, নির্বিচারে গাছ কাটা, কল-কারখানার বর্জ্য পানিতে ফেলা, বিষাক্ত ধোঁয়া, ফ্রিজ-এসির সিএফসি গ্যাস সব কিছুই আবহাওয়া পরিবর্তনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে।
সাধারণ মানুষের জীবন সংশয় দিন দিন বাড়ছেই। গৃহহারা ছিন্নমূল মানুষ কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তীব্র শীত অনেক সময় মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে হাজির হয়েছে। কারণ তাদের কাছে পুষ্টিকর খাবার কিংবা গরম কাপড় কোনোটাই নেই। যা আছে তা দিয়ে শীতের তীব্রতা ঠেকানোর মতো নয়।
অথচ এ সমাজের ভোগবাদী মানুষেরা নিশ্চিন্তে পৌষের আনন্দ উপভোগ করছেন। শীতের নতুন গরম জামা কিনতে মার্কেটে ঘোরাঘুরি, বাচ্চাদের স্কুল ছুটির অবকাশে বহু অর্থ ব্যয়ে বাহিরে ঘুরতে যাবার ধুম, পিঠে মেলার আয়োজন, পিকনিক পার্টি, শীতের অতিথি পাখি দেখার আয়োজন, কফি হাউজ আর রেস্টুরেন্টের ধোঁয়া উঠা গরম কফি পান, পৌষ মেলা, জমজমাট উইন্টার কনসার্ট কোনো কিছুই থেমে নেই। যখন দরিদ্র পিতার সন্তানেরা একটা শীতের পোশাকের অভাবে কষ্ট পায়, তখন আমাদের সভ্য সমাজের সন্তানেরা নতুন মডেলের শীতের পোশাক কিনতে বের হয়। যখন স্কুল ছুটির আনন্দে তারা ঘুরতে বের হয়, তখন এই শিশু খড়কুটো সংগ্রহ করে আগুন দিয়ে শীত নিবারণের আনন্দ খুঁজে বেড়ায়। অথচ এইসব হতদরিদ্র শিশুকে আমাদের সন্তানদের মতই ভালোবাসা উচিত। এদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবে না। সামাজিক জীব হিসেবে, মানুষ হিসেবে আমাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। শীতার্ত মানুষদের কষ্ট উপলব্ধি করতে হবে।
আসুন আমরা ভোগ-বিলাস আর বিনোদনগুলোতে ছাড় দিয়ে সেই টাকাটা তাদের উষ্ণতার জন্য দান করি। উষ্ণতা ভাগাভাগির মাধ্যমে শীতের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করি। তাদের শুষ্ক মুখে গরম জামা পাবার এক চিলতে আনন্দের হাসি ফুটিয়ে তুলি।
লেখক : অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • অরিত্রী : অস্তমিত এক সূর্যের নাম
  • স্বপ্নহীন স্বপ্নের তরী
  • মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান
  • নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?
  • ফেসবুক আসক্তি
  • কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পৌরসভা প্রসঙ্গে
  • শিক্ষার্থীদের শাস্তি এবং অরিত্রী প্রসঙ্গ
  • রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ শিল্প টিকিয়ে রাখা ও উন্নয়ন জরুরি
  • হাফিজ মোবাশ্বির আলী
  • Developed by: Sparkle IT