শিশু মেলা

সন্ধি

ধীরেন্দ্র কুমার দেবনাথ শ্যামল প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০১-২০১৮ ইং ২৩:৪৫:২৮ | সংবাদটি ১৪৬ বার পঠিত


রাজার একটি মাত্র মেয়ে। মেয়েকে রাজা ভীষণ ভালোবাসেন। মেয়ে যে বায়না ধরে রাজা তাহা পূরণ করে দেন। মেয়েই সব। আহ্লাদি মেয়ে। কোনো কিছু না চাইতেই পেয়ে যায়। রাজা যেখানেই বেড়াতে যান, মেয়ে সাথেই থাকে। শিকারে গেলেও মেয়েকে সাথে নেন।  
মেয়ে একবার বায়না ধরল ময়না পাখি কিনে দিতে হবে। পোষ মানাবে সে। কি আর করা অনেক খোঁজাখুঁজি করে ময়না পাখি জোগাড় করা হলো। ময়না পাখি এখন রাজকন্যার সঙ্গি সাথী। শয়নে স্বপনে যেন ময়না পাখি। এদিকে ময়না পাখিও যেন রাজকন্যা ছাড়া কিছু বুঝে না। রাজকন্যা ব্যতিত অন্য কেহ খাবার দিলে ময়না খাবার গ্রহণ করে না। আস্তে আস্তে ময়না পাখি পোষ মানতে শিখে। একটু আধটু কথা বলতেও পারে। মাঝে মাঝে রাজকন্যা ও ময়না পাখির মধ্যে মান অভিমানও চলে। রাজকন্যা খাঁচার পাশে দাঁড়িয়ে ছড়া কাটে-
রাগ করো না ময়নাপাখি
সোনার বাটিতে দুধ দেব
দুধের সাথে কলা দেব
মান ভাঙানোর কড়ি দেব।
ময়না পাখিও সাথে সাথে ছড়া কাটে-
মিষ্টি মেয়ে রাজকন্যা
তোমার সাথে রাগ করবো না
আমি তুমি দু’জনা
এক সাথে খেলবো সোনা।
ময়না পাখি ও রাজকন্যার এভাবেই দিনপাত অতিবাহিত হচ্ছে।
রাজা মহাশয় হরিণ শিকারে যাবেন। রাজকন্যা শুনে বলল, বাবা, আমি ও ময়না পাখি তোমার সাথে হরিণ শিকারে যাবো। রাজা মহাশয় অমত করতে পারলেন না। দিনক্ষণ দেখে পাত্র মিত্র নিয়ে রাজা হরিণ শিকারে রওয়ানা হলেন। রাজকন্যা ও ময়না পাখিতো সাথে আছেই। ময়না পাখি ছড়া কাটে-
যাচ্ছি মোরা শিকারে
আনব হরিণ ধরে ধরে
খাইব হরিণ মিলেমিশে
হাত তালি দেও সবাই হেঁসে।
হই হুল্লোড় দিয়ে রাজা মহাশয় শিকারে রওয়ানা হলেন। গাঁও-গেরাম বন-জঙ্গল পেরিয়ে গভীর অরণ্যে শিকারের জন্য প্রবেশ করেন। শিকার করতে গিয়ে রাস্তা ভুলে গেলেন রাজামশায়ের দল। অনেক খোঁজখুঁজির পরর পথের সন্ধান পাওয়া গেল না। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ময়না পাখি ছড়া কাটতে লাগলো-
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো বেলা গেল ঐ
সবে মিলে তাঁবু ঘেড়ে একত্রিত হই।
তাঁবু কাটিয়ে সবাই একত্রিত হয়ে গল্প গুজব করতে লাগল। হঠাৎ দক্ষিণ আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখা গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড় শুরু হলো। কি ভীষণ ঝড়। সবকিছু লন্ডখন্ড হয়ে গেল। তাঁবুর কোনো চিহ্নই দেখা গেল না। প্রায় কয়েক ঘন্টা পর ঝড় থামল। ঝড়ে সবকিছু শেষ, কোথাও খুঁজে রাজকন্যা ও ময়না পাখিকে পাওয়া গেল না। অনেক খোঁজাখুঁজি হলো। কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি। কাঁদিতে কাঁদিতে রাজা মহাশয় বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন।
এদিকে রাজকন্যাও কাঁদতে কাঁদতে অস্থির। অতি আদরের প্রিয় ময়না পাখিটিও মারা গেল। গভীর অরণ্যের মধ্যে কোথায় যাবে। বসে বসে কাঁদছে আর কাঁদছে।
অরণ্যের পাশের গ্রামে বাস করে এক কাঠুরে। বনে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে। বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়ে সংসার চালায় কাঠুরে। বনের ভেতর রাজকন্যাকে দেখে কাঠুরে ভয় পেয়ে গেল। মনে মনে ভাবতে লাগল কোনো ভুত পেতœী এলো নাকি। আগে তো এরকম দেখিনি এক পা এগুলে দু’পা পিছনে আসে। এভাবে ইতস্তত করতে করতে বুকে সাহস নিয়ে কাঠুরে এগিয়ে গেল। মা, তুমি কে গো, রাজকন্যা বলল, আমি রাজার মেয়ে। কাঠুরের কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করে রাজকন্যা। ঝড়ে সবকিছু লন্ডভন্ড করেছে। সঙ্গী, সাথী কাউকে পাচ্ছি না। ঝড়ে ময়না পাখিটিও মারা গেছে। কাঠুরিয়া জানতে চাইল তুমি আমার সাথে যাবে মা।
যাবো, যাবো,
কাঠুরিয়া ও রাজকন্যা বাড়ি গেল।
কাঠুরিয়া বন থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায়। এভাবে কয়েক দিন অতিবাহিত হলো।
একদিন রাজকন্যা বললো, বন থেকে আমার জন্য তাল পাতা আনবেন। আমি পাখা বানাতে জানি। কাঠের সাথে পাকাও আপনি বিক্রি করবেন। কাঠুরিয়া বন থেকে কাঠ কাটার সময় তালপাতা নিয়ে আসে। তালপাতা দিয়ে রাজকন্যা পাখা তৈরি করে। কাঠ বিক্রির সাথে সাথে পাখাও বিক্রি হতে লাগল। এতে করে কাঠুরের আর্থিক উপার্জন ভালই হচ্ছে।
রাজকন্যা এখন নকশী পাখা তৈরি করে। নকশী পাখার চাহিদা খুবই বেশি। দিনপাত ভালোই যাচ্ছে কাঠুরিয়ার।
একদিন ঐ এলাকার রাজকুমার বাজার দিয়ে যাচ্ছিলেন, কাঠুরের নকশী পাখা দেখে পছন্দ হয়ে গেলে একটি নকশী পাখা কিনে নেয়। প্রত্যেহ রাজকুমার কাঠুরের কাছ থেকে নকশী পাখা ক্রয় করেন।  
রাজকুমার কাঠুরিয়াকে জিজ্ঞাস করেন-
এত সুন্দর পাখা কে তৈরি করে।
আমার মেয়ে।
আমি, আপনার মেয়েকে দেখতে চাই।
রাজকুমারের হুকুম, মানতেই হবে।
আগামীকল্য আমার সাথে যাবেন। পরদিন রাজকুমার কাঠুরিয়ার বাড়ি যান। রাজকন্যাকে দেখে রাজকুমারের পছন্দ হয়ে যায়। রাজকন্যাও রাজকুমারকে দেখে পছন্দ হয়। তবে রাজকন্যা পরিচয় দেয় নাই। কাঠুরিয়ার মেয়ে বলে জানান।  
এভাবে রাজকুমার প্রতিদিন কাঠুরিয়ার বাড়ি যাওয়া আসা করে।
দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাজকুমার জেনে কাঠুরিয়াও কোন কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না।
জানো, দক্ষিণ পাঠ রাজার সাথে আমাদের রাজ্যের সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়া বিবাদ হচ্ছে। কিছুতেই মিমাংসা হচ্ছে না। দক্ষিণ পাঠ রাজা যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। আমাদের রাজাও যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী দশ তারিখ যুদ্ধ হবে। আমাদের জন্য আশীর্ব্বাদ করো যেন যুদ্ধে জয়ী হতে পারি।
রাজকুমার চলে যাওয়ার পর রাজকুমারী ভাবছে কী? আমার বাবার সাথে যুদ্ধ। যুদ্ধের দিন যেতে হবে। আমি কিছু করতে পারি কিনা। রাজকুমারী কাঠুরিয়াকে বলল যুদ্ধের দিন আমাকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যেতে হবে। তাই হবে মা।
মাঠের দুই প্রান্তে দুই রাজার তাঁবু কাঠানো হয়েছে। দুই শিবিরেই যুদ্ধের ডামাডুল বাজছে। কাঠুরিয়া ও রাজকন্যা যুদ্ধক্ষেত্রে যায়। এ তাঁবু দেখে অন্য তাঁবুতে রওয়ানা হয়। রাজকুমার রাজকন্যাকে চিনে ফেলে। সে ছদ্ম বেশ ধারণ করে পিছে পিছে এগিয়ে চলেছে।
রাজকন্যা অন্য শিবিরে গিয়ে রাজাকে দেখে চিনতে পারে। রাজার কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করে। বাবা মেয়ের সেকি কান্না। কাঠুরিয়া অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। রাজকুমার সব দূরে দাঁড়িয়ে অবলোকন করছে। তার ছদ্ম বেশ খুলে রাজার কাছে পরিচয় দেয়। আমি আপনার মেয়েকে পছন্দ করি। আপনার মেয়েও আমাকে পছন্দ করে। আসুন আমরা সবাই মিলে সন্ধি করি।
আর নয় হিংসা বিবাদ
মিলে মিশে করি কাজ
সবুজ দেশ সবুজ ঘাস
বদলে দেব ঘুনেধরা সমাজ।
আমার বাবা যদি প্রস্তাবে রাজি না হোন। আমি আপনার পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করব।
দূত পাঠানো হলো, রাজা মহাশয় এলেন। কাঠুরিয়ার মুখে বিস্তারিত শুনে বললেন- মিয়া বিবি রাজি, ডেকে আনো কাজি।
আরোও বললেন, ওরে তুরা জয় ধ্বনি দে, জয় ধ্বনি দে।
মিলে মিশে করব কাজ
বাঁচবে মানুষ গরব সমাজ।
আসুন আমরা মিলে মিশে কাজ করি। আর নয় যুদ্ধ। শুভ কাজ যত তাড়াতাড়ি করা ভালো। যুদ্ধের পরিবর্তে ঢাকঢোল বাজিয়ে বিয়ের সাজ সম্পন্ন হলো। বর কনেকে আশীর্ব্বাদ দিয়ে বরণ করা হলো। পরবর্তীতে ওদের ওপর রাজ্যভার দিয়ে দুই রাজা তপস্যার জন্য বনে গমন করেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT