ধর্ম ও জীবন

ইলমে হাদীসের খেদমতে আল্লামা গহরপুরী

মাওলানা শাহ আশরাফ আলী মিয়াজানী প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০১-২০১৮ ইং ০০:৩০:০৬ | সংবাদটি ৩৬৪ বার পঠিত

বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী পুণ্যভূমি সিলেট, পীর আউলিয়া ও উলামায়ে কেরামের পদ ধূলিতে ধন্য। ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত এ সিলেট ভূমিতে শুয়ে আছেন জানা অজানা আরো অনেক পীর মাশায়েখ। তাঁদেরই একজন ইমামুল মুহাদ্দিছীন হযরত আল্লামা হাফিজ নুরুদ্দীন আহমদ গহরপুরী (র.)।
আমার ছাত্র জীবনের শুরুতে, ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে যে সমস্ত বুজুর্গ আলেম সাহেবানদেরকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন হযরত গহরপুরী (রঃ)।
১৯৭৪ সনের কথা। আমি তখন বিশ্বনাথ মাদানীয়ায় ছাফেলা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আমাদের এলাকার পল্লি কবি মরহুম ক্বারী আহমদ আলী সাহেবের গ্রাম দুর্যাকাপন মসজিদ প্রাঙ্গনে এক ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। হযরত গহরপুরী (র.) মাহফিলের প্রধান আকর্ষণ। হযরত ক্বারী আহমদ আলী সাহেব আমাকে দায়িত্ব দিয়ে ছিলেন হুজুরকে বিশ্বনাথ থেকে দুর্যাকাপন নৌকাযোগে নিয়ে যাবার জন্য, তখন ছিল বর্ষাকাল, নৌকা একমাত্র সম্বল। মাদ্রাসা ছুটির পর আছর থেকে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত দফতরে বসে বসে হুজুরের অপেক্ষা করছি। হুজুর আসেন নাই। মাগরিবের নামায শেষে সাথী আরেক ছাত্রের সাথে খুশ গল্পে মগ্ন হয়ে আছি। হঠাৎ আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ ধ্বনীতে হতচকিত হয়ে পড়ি। পিছনের দিকে তাকাতেই দেখি গহরপুরী হুজুর শিয়রের পাশে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছেন এখানে দুর্যাকাপনের কেউ আছেন নি ভাই? সাথে সাথে আমি বলে উঠি; হুজুর আমি নিয়ে যাব। জিজ্ঞেস করলেন নৌকা আছে? বললাম জ্বি হুজুর ঘাটে নৌকা আছে। বললেন চলো, যেই কথা সেই কাজ, হযরতকে নিয়ে নৌকা ঘাটে গিয়ে একটি নৌকা চেয়ে দুর্যাকাপনের দিকে রওয়ানা দিলাম। রাস্তায় হযরতের পা দাবাতে চাইলে হযরত আপত্তি জানালেন। বললেন ভাই আমার এসবের প্রয়োজন নেই। তদুপরী আমি নাছুড় বান্দা হিসেবে হযরত হাঠুর নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত দাবানোর অনুমতি দান করলেন। নৌকা ধীর গতিতে চলছে আর হুজুর আমার নাম গ্রাম ইত্যাদি জিজ্ঞেস করছেন। আমি পিতৃহারা মাতৃহারা হওয়াতেই হুজুর চমকে যান। অত্যন্ত সদয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, তোমার আর কে  আছে? বললাম এক ছোট বোন ব্যতিত আর কেউ নেই। আবার জিজ্ঞেস করলেন এখন কি পড়তেছ? বললাম মুতাঃ ২য় বর্ষে। এর পরে কয়েকটি প্রশ্ন করলে আমি যথাযত উত্তর দেই। এতে হুজুর খুবই খুশি হন। হুজুর বললেন বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে গহরপুর চলে আস। তুমি যতদিন গহরপুর থাকবে ততদিন আমার বাড়ীতে থাকবে। তোমার লেখা পড়ার খরচ আমি বহন করব, ঠিক আছে? আমি সুবোধ বালকের ন্যায় মাথা নেড়ে বললাম জ্বি হুজুর। সেই থেকে হযরত যেন আমার আত্মাকে খরিদ করে ফেলেছেন। চরম দুর্ভাগ্য হলেও পরম সত্য কথা হলো অনেক চেষ্টা তদবিরের পরও আমি বিশ্বনাথ থেকে বিদায় নিতে পারিনি। বিশ্বনাথ মাদানীয়ার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদ হযরত মাওলানা শায়খ আশরাফ আলী বিশ্বনাথী ও তৎকালীন নাযিমে তালিমাত হযরত মাওলানা ছাদিকুর রহমান শ্রীমঙ্গলী হুজুর কোন অবস্থায় আমাকে বিদায় দিতে চাননি। পরপর ৩/৪ বৎসর এ ব্যর্থ চেষ্টার পর আমার গহরপুর পড়ার মূহ ধীরে ধীরে স্থিমীত হয়ে আসে। ফলে জীবনে আর গহরপুর মাদ্রাসায় পড়ার সুযোগ আমার হয়নি। তারপরও হুজুরের প্রতি ভক্তির আমার এতটুকুও কমতি আসেনি। মনকে প্রবোধ দিয়ে থাকি আমি ক্ষণিকের জন্য হলেও নৌকায় হুজুরের শিষ্যত্বের সুযোগ পেয়েছি বলে। শুনেছি অনেক অসহায় অনাথ এতিম তালাবা হুজুরের বাড়ীতে থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা পেয়ে দ্বীনি শিক্ষা লাভ করেছেন।
হুজুরের গোটা জীবনই অনাড়ম্বর আমিত্বহীন। তাঁর সরল জীবন যাপনের কথা কিংবদন্তীতূল্য ও সর্বজন বিদিত। খাবার দাবার, পোষাক পরিচ্ছদ, বিছানা বালিশ, চলা ফিরা সবই যেন তাঁর করায়ত্ব। যখন যেমন তখন তেমন ব্যবস্থাকে মানিয়ে নিতে একটুও বেগ পেতে হত না। ক) আমার ছাত্র জীবনের একটি ঘটনা, বিশ্বনাথ থেকে বাসে চড়ে সিলেট যাব, বাসে উঠতেই দেখি হযরত গহরপুরী হুজুর একটি লুঙ্গি বগল দাবা করে দাঁড়িয়ে আছেন। যাত্রীরা হয়ত অনেকেই লক্ষ্য করেননি। আর যারা লক্ষ্য করেছেন তারা হয়ত দুর্ভাগ্য বশতঃ হযরতকে চিনতে পারেন নি। আলাইকা সালাইকার পরই হুজুরকে জিজ্ঞেস করি, কোত্থেকে আসছেন? বললেন সৈয়দপুর থেকে। তখন জগন্নাথপুর থেকে বিশ্বনাথ বাসচলাচলের ব্যবস্থা ছিল না। সম্ভবত নৌকা যোগে হুজুর বিশ্বনাথ এসেছেন, অথবা পাঁয়ে হেঁটে আসাও তাঁর জন্য অসম্ভব ছিল না। হযরতকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখে আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি। হযরতের পরিচয় দিয়ে এক যাত্রীকে তার সিট থেকে উঠাবার চেষ্টা করতেই হুজুর আমাকে বারণ করলেন। কিন্তু সৌভাগ্য বান যাত্রির পিড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত হুজুর সিটে বসতে বাধ্য হলেন।
জগন্নাথপুর থানার ভবের বাজারস্থ জামেয়া ইমদাদিয়া ভবের বাজার মাদ্রাসার দীর্ঘদিনের প্রিন্সিপাল আলহাজ্ব হযরত মাওলানা শায়খ আকবর আলী সাহেব গহরপুরী হুজুরের আলোচনা প্রসঙ্গে আমাকে বলেন, একবার ফজরের আযানের মুহুর্তে মসজিদের বারান্দায় দেখি এক ব্যক্তি রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে আছেন। নিকটে যেতেই তাঁর আক্কেল গুড়–ম, উনিতো আমাদের গহরপুরী হুজুর! অবাক বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন হুজুর আমরা এখানে থাকা অবস্থায় আপনি এত কষ্টের কারণ কি? আমরা তো আপনার খাদেম হিসেবে সুযোগ নিতে পারতাম। জবাবে হুজুর বলেন ভাই! রাত্রি অধিক হওয়ায় সৈয়দপুর যাওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্বেও যাইনি। এবং এ নিশি রাতে নিজের আরামের জন্য কারও ঘুম হারাম করতে চাইনি। অথচ অত্র এলাকায় হুজুরের এমনও ভক্ত রয়েছেন। তারা যে কোন মুহুর্তে হুজুরকে পেলে গনিমতই মনে করতেন।
২০০১ ইংরেজী শনে হজ্জের প্রাক্কালে আমি কাবা শরীফ সংলগ্ন শামিয়াতে গিয়ে উঠি। ২/১ দিন পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম হযরত গহরপুরী হুজুর মিছফালাতে আছেন যা কাবা শরীফ থেকে অপেক্ষাকৃত খানিকটা দূরে অবস্থিত। বুরাইয়া (ছাতক) নিবাসী মরহুম হযরত মাওলানা জিয়াউল ইসলাম সাহেবের হোটেলে আমাদের সিলেটের স্থানীয় উলামায়ে কেরামের সমাগম থাকে। তিনি তখনকার একজন সুপরিচিত হোটেল ব্যবসায়ী হওয়ার সুবাদে এবং সকল বুজুর্গ উলামায়ে কেরামের সাথে শ্রদ্ধার সম্পর্কের ফলে অনেকেই সেখানে তাশরীফ নেন। হযরত গহরপুরী হুজুর তাঁর শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদ তাই তাঁকে তিনি যেন আগলেই রেখেছেন। আমরা ক’জন হুজুরকে দেখার জন্য সেখানে যাই, পুরানো জির্ণশির্ণ দালানের সরু সিঁড়ি বেয়ে ৩ তলায় উঠে এক নিঝুম আবছা অন্ধকার রুমের একপাশে শায়িত অবস্থায় হুজুরকে পাই। সালাম মুসাফাহার পর আমাদের হোটেলে চলে আসার আমন্ত্রণ জানালাম। উল্লেখ্য আমাদের শামিয়ার হোটেলটি অত্যন্ত উন্নত মানের লিফট কার্পেট বিছানা বালিশসহ সবই যেন নতুনত্বের ছাফ প্রকাশ করছিল। সাথে সাথে কাবা শরীফের একেবারে নিকটবর্তী ছিল বিধায় এসব বিবেচনায় রেখে হুজুরকে আমন্ত্রণ জানাই। হুজুর আমাদের কথা শুনে বললেন। ঠিক আছে ভাই এক জায়গায় থাকলেই হয়, আল্লাহর বাড়ি সবই সমান। একটু কষ্ট হলে আর কি হবে, এখানে যখন উঠে গেছি তাই এখানেই থাকি। হুজুরের এ নির্মোহ জৌলুসহীন ভাব এবং ধৈর্য্যরে পাহাড় দেখে আমরা বিস্মিত না হয়ে পারিনি। পরে দোয়া চেয়ে হুজুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি এবং পথিমধ্যে হযরতের এহেন ত্যাগ ও নির্মোহতার কথা একে অন্যে বলাবলি করতে থাকি।
অনেক সময় দেখা গেছে হুজুরের সম্মুখে কেহ সুন্দর সুললিত কণ্ঠে ও বিশুদ্ধ ভাবে তেলাওয়াত করলে হুজুর তন্ময় হয়ে শুনতেন এবং পরক্ষণে তাকে নিজ হাতে পুরস্কৃত করে উৎসাহ প্রদান করতেন। এরূপ কোন নবীন আলেম বক্তৃতা দিলে যদি হুজুরের মনঃপুত হত তাহলে তাকেও উৎসাহ প্রদান করা এবং উপস্থিত মাহফিলে পরবর্তীতে তাঁর প্রশংসা করা হুজুরের যেন অভ্যাসেই পরিণত হয়েছিল।
জামেয়া মদীনাতুল উলূম খাসদবীর সিলেট এ আমি যখন অধ্যাপনারত ছিলাম। তখন শিক্ষা সচিবের দায়িত্বের সাথে মসজিদের পেশ ইমামের ও খতিবের দায়িত্ব ছিল। হযরত গহরপুরী হুজুর উক্ত জামেয়ার মুহতামিম থাকার সুবাদে মাঝে মধ্যে তথায় তাশরীফ নিতেন। প্রয়োজন বোধে তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হত। এরূপ এক শুক্রবার জুমার অনেক পূর্বেই হুজুর মাদ্রাসায় গিয়ে উপস্থিত। আমি ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম হযরত মাওলানা আব্দুল আজিজ দয়ামিরী সাহেবের নিকট গিয়ে বললাম। আজতো গহরপুরী হুজুর বয়ান রাখবেন ও নামাজে ইমামতি করবেন। তিনি বললেন দেখা যাক হুজুর কি করেন। তবে আপনি প্রথমে বয়ান শুরু করেন, পরে আমি সুযোগ করে হুজুরকে নিয়ে আসব। তাঁর কথা মাফিক নির্ধারিত সময়েই আমি মসজিদে গিয়ে গহরপুরী হুজুরের আগমন সংবাদসহ বয়ান শুরু করি ও তাঁর আগমনের প্রতিক্ষায় থাকাবস্থায় কথাবার্তা চালিয়ে যাই। ১টার প্রায় বিশ মিনিট পূর্বে যখন গহরপুরী হুজুর মসজিদে আগমন করেন তখনই হুজুরের কথা বলে আমি মিম্বর থেকে নেমে পড়তে উদ্যত হই। এমনি মুহুর্তে হুজুর কড়া ভাষায় বলতে থাকেন, না আপনি বয়ান চালিয়ে যান। আমি বয়ান রাখবো না, হুজুর সামনের সফের একেবারে বামপার্শে বসে পড়েন। আমিসহ অনেকেই মিম্বরের সামনে আসার আমন্ত্রণ জানানোর পরও সামনে আসেননি। আমি বাধ্য হয়ে আমার বয়ান অব্যাহত রাখি। পরে খুতবা ও নামাজের সময় অনুরোধ করার পরও সায় দেননি। এমতাবস্থায় আমি অধমকেই সব কাজ আদায় করতে হল। নামাজ শেষে যখন হুজুরের সম্মুখে গেলাম তখন হুজুর আমাকে দেখেই বললেন আমাদেরকে দেখলেই যদি মিম্বর ছাড়তে হয় তাহলে এমিম্বরের উপযুক্ত কি কাউকে পাওয়া যাবে? এসময় হুজুরের মুখে স্মীত হাসির রেখা ফুটে উঠে, আমার দারুস সালামের সাত বৎসর জিন্দেগীতে এরূপ একাধিক ঘটনার স্বাক্ষী আমি নিজেই। আমি তখন বুঝতে পারলাম আমাকে উৎসাহ দান করাই ছিল হুজুরের একমাত্র লক্ষ্য।
হযরত মুহাদ্দিছে গহরপুরী (র.) ২৬ শে এপ্রিল ২০০৫ ইংরেজি বিকেল ৪ ঘটিকায় ইন্তেকাল ফরমান। মুহুর্তেই তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সর্বস্তরের ভক্ত বৃন্দ এবং বিশিষ্ট আলেম উলামাসহ দেশের আনাচে-কানাচে থেকে হযরতকে একনজর দেখার জন্য ছুটে আসতে থাকেন। যা পরদিন দাফনের পর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ঢাকা সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরামের আগমন জানান দিচ্ছিল হযরতের মূল্যায়নের কথা। সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চল গহরপুরের মত এক নিভৃত পল্লী এলাকায় এত মানুষের সমাগম জীবনে কেউ কল্পনাই করেনি। লাখো লাখো মানুষের উপস্থিতিতে হযরতের জানাযা দেখে, অনেকেই বলতে শুনেছি বৃহত্তর সিলেটে এত বড় জানাযা আর কারও হয়নি। অনেকেই কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন আর অনেকেই বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে হা হুতাশ করেছেন। হযরত আজীবন যেভাবে সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন, পরপারে যাত্রার মুহুর্তে ও সর্বস্তরের মুসলিম জনতার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মাওলায়ে হাকিকীর দরবারে গমন করেন। আল্লাহ পাক হযরতের ফয়জে সকলকে যেন আজীবন ধন্য রাখেন-আমীন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT