ধর্ম ও জীবন

পাপ থেকে বেঁচে থাকার উপায়

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০১-২০১৮ ইং ০০:৩২:২১ | সংবাদটি ৩৩৭ বার পঠিত

বিশুদ্ধ বা খাঁটি তওবা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তির প্রথম ধাপ। এই তওবা মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে দেয়। তার জীবন বদলে দেয়। কিছু চিন্তা, কিছু কাজ মানুষকে তাতে অটল থাকার হিম্মত যোগায়।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহ.) সম্পর্কে জানেনা এমন লোক মুসলিম জাহানে খুঁজে মেলা ভার। আল্লাহর ভয় ও পরকালীন যাত্রার প্রস্তুতি তাকে করে রেখেছিল সদা পেরেশান। পরকালীন সম্পদ সংগ্রহে ছিল তার নিরন্তর প্রচেষ্টা। পরকালীন প্রস্তুতির খোরাক সংগ্রহে ছুটে বেড়াতেন দিক দিগন্তে। চেষ্টা করতেন আল্লাহ ওয়ালাদের সান্নিধ্য নিতে। কোরআন অবশ্যই পথ দেখায়। আল্লাহ ওয়ালাগণ কোরআন হাদিস অনুসরণের মাধ্যমেই আল্লাহকে পেয়েছেন। তবে পৃথিবীর বেশীরভাগ মুমিনই কোরআন ওয়ালাদের আহবানে ও সংস্পর্শে এসেই ইমানদার হয়েছে।
একদিন আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহ.) মনস্থির করলেন যে, তিনি বাহলুল (রাহ.) এর সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং তার নিকট থেকে কিভাবে গুনাহ থেকে ও নাফসের খাহেশাত থেকে বেঁেচ থাকা যায় তার উপদেশ নিবেন। লোকমুখে জানতে পারলেন যে বাহলুল (রাহ.) মরুভূমিতে আছেন। তাই আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (রাহ.) মরুভূমির দিকে চললেন। মরুভূমিতে অনেক খোঁজাখুজি করে এক জায়গায় গিয়ে দেখতে পেলেন যে বাহলুল (রাহ.) খালি পায়ে খালি মাথায় ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ বলছেন। তিনি কাছে গিয়ে সালাম দিলেন। বাহলুল (রাহ.)ও সালামের জবাব দিলেন। এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহ.) বাহলুল (রাহ.) কে লক্ষ্য করে বললেন হে শায়খ, আমি আপনার নিকট থেকে গুনাহ ও নফসের চাহিদা থেকে বাঁচার জন্য কিছু উপদেশ নিতে এসেছি, দয়া করে আমাকে কিছু উপদেশ দিন। বাহলুল (রাহ.) বললেন ভাই আমি নিজেই অপারগ। আমি নিজেই তা নিয়ে ব্যস্ত। আমি নিজেই পেরেশান। তাছাড়া মানুষ আমাকে পাগল বলে জানে। পাগলের কাছে জ্ঞানের কথা কিভাবে আশা করতে পার? এর চেয়ে বরং তুমি কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে তালাশ কর, সে হয়তো তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহ.) বুকের মধ্যে হাত রেখে বাহলুল (রাহ.) কে বললেন, জি, এই জন্যই তো এই অযোগ্য আপনার সান্নিধ্যে এসেছে। কারণ সত্য কথা বলার সাহস সুস্থ্য ব্যক্তিরা অনেক সময় করতে পারেনা, পাগলরা সত্য বলতে কাউকেই ভয় পায়না।  বাহলুল (রাহ.) তার কথার কোন উত্তর দিলেন না। চুপ করে রইলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহ.) বিনয়ের সাথে তাকে উপদেশ দানের জন্য অনুরোধ করতে থাকলেন। অনেক অনুরোধের পর এক পর্যায়ে বাহলুলকে রাজি করালেন। তখন বাহলুল বললেন, আমি তোমাকে চারটি শর্ত দেব, এই চারটি শর্ত পূরণ করতে পারলে তুমি গুনাহ থেকে বেঁচে যেতে এবং পরকালীন মুক্তির সঠিক পথ পেতে পার।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক বললেন, আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচার, গুনাহ থেকে বাঁচার, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের যে বাসনা আমি আমার হৃদয়ে লালন করছি। আর এই কামনা আমার দিন দিন তীব্র তীব্রতর হচ্ছে। এই বাসনা পূরণের জন্য চারটি কেন, হাজারো শর্ত দিলেও আমি কুষ্ঠিত হবনা। দয়া করে আমাকে শর্তগুলো বলুন।
বাহলুল (রাহ.) বললেন শোন :
প্রথম শর্ত : যখন তুমি গুনাহ করবে বা আল্লাহর নাফরমানী করবে, তখন তাঁর দেওয়া রিজিক তুমি বর্জন করবে। তাঁর দেওয়া রিজিক তুমি আহার করবেনা। তাঁর দেওয়া রিজিক দিয়ে তুমি তোমার উদর পূর্তি করবেনা।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহ.) বললেন, হযরত, এটা কি করে সম্ভব যে, মানুষ তাঁর দেওয়া রিজিক না খেয়ে থাকতে পারবে? মানুষ না খেয়ে বাঁচবে কি করে?
বাহলুল বললেন, তাহলে তুমি তো বুঝতে পারছ। তোমার বিবেক কি বলে যে, যার দেওয়া রিজিক তুমি খাবে, যা না খেলে তুমি কোনভাবেই চলতে পারবেনা, আবার তারই নিমকহারামী করবে? আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক বললেন, হযরত আপনি সত্য বলেছেন। তারপর বলুন।
দ্বিতীয় শর্ত : যখন তুমি গুনাহ করতে চাইবে তখন তুমি আল্লাহর জমিন থেকে বের হয়ে যাবে। কারণ দুনিয়া শুধু আল্লাহর অনুগত বান্দারাই বসবাসের হকদার। তুমি কি জোর করে অনধিকার চর্চা করবে? আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক চিৎকার করে উঠলেন আর বললেন, হযরত এটা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। আল্লাহর জমিন ছাড়া আর কোন জায়গা কি আছে যে যাওয়া যায়, থাকা যায়, বসবাস করা যায়? যেখানে গিয়ে অন্যায় করবে? এমন দুঃসাহস দেখানোর সাহস বা শক্তি কার আছে?
বাহলুল (রাহ.) বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, তুমি কেন কান্না করছ? তুমি এতো পেরেশান কেন? তোমার কি সামান্যতম বিবেক, ইনসাফ নেই? তুমি যার জমিনে থাকবে, যার দেওয়া রিজিক খেয়ে জীবন বাঁচাবে আবার তাঁরই নাফরমানী করবে? কোন সুস্থ্য মানুষ কি তা করতে পারে? সামান্যতম জ্ঞান যার আছে সে কি একাজ করতে পারে?
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক বললেন, হযরত আপনি নিঃসন্দেহে সত্য বলেছেন। তৃতীয় শর্তটি বলুন।
তৃতীয় শর্ত : হে আব্দূল্লাহ ইবনে মুবারক যখন তুমি গুনাহ করার ইচ্ছা করবে, তোমার নাফস গুনাহ করার খাহেস করবে, তখন তুমি এমন জায়গায় চলে যাবে যেখানে তোমাকে আল্লাহ তায়ালা দেখবেন না। তোমার অবস্থা তার নজরের বাইরে থাকবে। তিনি তোমার অবস্থা জানবেন না। তুমি যদি পৃথিবীর কোথাও এমন জায়গা খুঁজে পাও তাহলে পাপ করার জন্য তুমি সেখানে হিজরত কর। এর সেখানে গিয়ে তোমার মনে যা চায় তাই করো।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক খুবই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন, বললেন, হযরত এটাতো আরো কঠিন শর্ত। আকাশ পৃথিবীর সব কিছুই আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টি সীমার মধ্যে। তাঁর নিকট সবকিছুই স্পষ্ট। তাঁর দৃষ্টি সীমার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। তিনি সবকিছু জানেন, দেখেন। সুতরাং এমন জায়গা কোনভাবেই পাওয়া যাবেনা। যেখানে আল্লাহ তায়ালা দেখবেন না, খবর জানবেন না।
বাহলুল বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, যখন তুমি জান যে আল্লাহ তায়ালা সবকিছু জানেন, দেখেন, খবর রাখেন। তাহলো কোন আকলদার বান্দা কি এই চিন্তা করতে পারে, যার জমিনে থাকবে, যার রিজিক খেয়ে বাঁচবে আবার তাঁর সামনেই তাঁর নাফরমানী করবে? তাঁর আদেশ, নিষেধ লঙ্ঘন করবে?  
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক নিজেকে খুবই অযোগ্য, হীন মনে করলেন। নিজেকে খুবই অপরাধী মনে করে অনুশোচনায় ভেঙ্গে পড়লেন আর বললেন, হে হযরত, আমার আর বলার কিছু নেই এবার চতুর্থ শর্তটি বলুন ।
চতুর্থ শর্ত : আল্লাহর আদেশে যখন আজরাইল তোমার নিকট তোমার রূহ কবজ করতে আসবেন, তখন তুমি মালাকুল মউতকে বলবে হে ভাই, তুমি একটু অপেক্ষা করো। আমি আমার প্রিয়জনদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে আসি, পরকালের জন্য আমার এখনো পাথেয় সংগ্রহ করার বাকী, কিছু পাথেয় সংগ্রহ করে নিয়ে আসি, যা নাজাতের কারণ হবে। তুমি আরো পরে আমার জান কবজ করতে এসো।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক বললেন, হযরত, মালাকুল মউত যখন হাজির হয়ে যায় তখন কাউকেই সময় দেয়না। এটা তো খুবই কঠিন শর্ত।
বাহলুল বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, তুমি তো জ্ঞানী। তুমি এই পাগলের কথা শোনো। যখন তুমি জান যে মালাকুল মউত থেকে কেউ রেহাই পায়না। মালাকুল মউত হাজির হলে কাউকে শ্বাস ফেলারও সময় দেয়না। হে আল্লাহর বান্দা, তোমার ঘুম কখন ভাঙ্গবে? এই গাফলতির ঘুম থেকে কখন তুমি জাগকে? তুমি সাবধান হও। দুনিয়ার পেরেশানী তুমি ত্যাগ করো। তুমি আখেরাতের চিন্তায় রত হও। তোমার দুনিয়ার জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। আখেরাতের লম্বা সফর তোমার সামনে অপেক্ষমান। তুমি যেই কাজ, যেই আমল করতে চাও আজকেই করে ফেল। আগামীকালের জন্য বাকী রেখোনা। হতে পারে আজই তোমার শেষ দিন, আগামী কাল তুমি থাকবেনা। যেই সময় তোমার হাতে আছে তাকে মূল্যবান মনে করো। আজকের ভাল আমলই তোমার আখেরাতের পাথেয়। এমন যেন না হয় আজকের আমলের জন্য তোমাকে কালকে আফসোস করতে হয়, পেরেশান হতে হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহ.) মাথা ঝুঁকিয়ে ফেললেন। তার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তার পেরেশানী বেড়ে গেল।
বাহলুল (রাহ.) বললেন, হে আল্লাহর বান্দা। তুমি চুপসে গেলে কেন? তুমি তো আমাকে নসিহত করতে বলেছ।  তুমি মাথা নিচু করেছ কেন? ভয় তোমাকে কেন কাবু করে ফেলল? তোমাকে যখন হাশরের দিন তোমার অর্জিত পাপের কথা জিজ্ঞাসা করা হবে, তখন তুমি কি জবাব দিবে? এ জন্য দুনিয়াতেই তোমার হিসাব পরিস্কার রাখ। তোমার হিসাবের খাতায় যেন কোন পাপ না থাকে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক নিচু মাথা উঠিয়ে বললেন, হে হযরত আপনি ঠিক বলেছেন। আমি আপনার নসিহত মনযোগ দিয়ে শুনছি। আমি এগুলোকে আমার পাথেয় বানিয়ে নেব। লোকেরা আপনাকে পাগল বলে, আপনি পাগল নন। আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) এর পাগল।
এই কথা শুনে বাহলুল (রাহ.) তালি দেয়া বিছানা উঠালেন এবং এই বলে চলতে লাগলেন যে, বান্দার কর্তব্য হল সে যা কিছু করে তা যেন আল্লাহর আদেশে হয়। আর সে যা বলে বা শোনে তাও যেন আল্লাহর আদেশে হয়।
উপরোক্ত ঘটনার আলোকে আমরা যদি উল্লেখিত চারটি শর্ত স্মরণ রাখতে পারি ও মানতে পারি । তাহলে পাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং পরকালীন পাথেয় সংগ্রহ করা আমাদের জন্য খুবই সহজ হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন ॥

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT