ধর্ম ও জীবন

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবীর অঙ্গীকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০১-২০১৮ ইং ০০:৩৪:০৪ | সংবাদটি ৫৫ বার পঠিত

মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাব ঘটে আরব দেশে এক বেদুঈন অঞ্চলে, যেখানে অতীতে কখনো নগর জীবনের নান্দনিকতা ও সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি। এখানকার জাহিলী পরিবেশ দ্বারা পরিবেষ্ঠিত সমাজে জাহিলিয়্যাত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। মহানবী (সা.) এর আগমনের সমসাময়িককালে মক্কার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ছিল আবু জাহল, আবু লাহাব, উতবাহ, শায়বাহ প্রমুখের হাতে। মানবাধিকার সম্পর্কে তাদের স্বচ্ছ ধারণা ছিল না বলে প্রতিনিয়ত তাদের হাতে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত ও পর্যুদস্ত হচ্ছিল। এমনি এক বৈরী পরিবেশে আবির্ভূত হওয়ার পর মহানবী (সা.) লক্ষ করেন যে, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বহু সন্তান পিতৃহারা হয়, অগণিত নারী হয় স্বামী কিংবা পুত্রহারা। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয় এই যুদ্ধ-বিগ্রহে। অসহায়-দুস্থ-দুর্গত লোকজন বঞ্চিত হয় তাদের প্রাপ্য অধিকার হতে, ইয়াতীম-নিঃস্ব বিধবাও বঞ্চিত হয় তাদের ন্যায্য পাওনা হতে। অত্যাচারীদের দোর্দন্ড প্রতাপ দুর্বল অসহায় লোকদের সদা সন্ত্রস্ত করে রাখে। সুতরাং এই বিপর্যয়কর অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য মাত্র ১৭ বছর বয়সে মহানবী (সা.) মানবাধিকারের কতিপয় ধারা সংযোজনপূর্বক ‘হিলফুল ফুযুল’ গঠন করেন, যার মূল বক্তব্য ছিল-সমাজ হতে অশান্তি দূর করা, পথিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভাবগ্রস্তদের সাহায্য-সহযোগিতা করা, মজলুমের সাহায্যে এগিয়ে আসা এবং কোন অত্যাচারীকে মক্কায় আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়া।
হিজরতের অব্যবহিত পূর্বে মহানবী (সা.) হজ উপলক্ষে ইয়াছরিব হতে মক্কায় আগত খাযরাজ গোত্রীয় লোকদের আল-আকাবা নামক স্থানে যে বায়আত বা আনুগত্যের শপথ করান তাতে মানবাধিকারের মৌলিক কতিপয় ধারা লক্ষ্য করা যায়। মহানবী (সা.) বলেন ‘তোমরা আমার হাতে এ বিষয়ে আনুগত্যের শপথ (বায়আত) কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যেনা-ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, কারো বিরুদ্ধে মনগড়া কোন মিথ্যা অপবাদ দিবে না’। মহানবী (সা.)-এর উক্ত বাণীতে ধর্ম পালনের অধিকার, সম্পদের অধিকার মান-মর্যাদাও সম্ভ্রমের অধিকার এবং জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়। ৬২২ খ্রি. মহানবী (সা.) যখন মক্কা হতে ইয়াছরিব তথা মদীনায় হিজরত করেন তখন মদীনায় তিন শ্রেণীর জনগোষ্ঠী বাস করতোÑএক: একনিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়, দুই : মদীনার আদি মুশরিক তথা পৌত্তলিক সম্প্রদায় এবং তিন : মদীনার ইয়াহুদী সম্প্রদায়।
এ ধরনের একটি বহু জাতিক ও বহু ধর্মভিত্তিক অঞ্চলে হিজরত করে মদীনার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রধান হিসাবে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে মহানবী (সা.) হিজরতের প্রথম বর্ষে একটি লিখিত সনদ জারি করেন। ইতিহাসে এটি ‘মদীনা সনদ’ নামে প্রসিদ্ধ। আরবী ভাষায় জারিকৃত এই সনদে ৫৩টি ধারা বিদ্যমান ছিল, যার অনেকগুলো ধারাই ছিল মানবাধিকার বিষয়ক। এতে উল্লেখ করা হয় যে, মদীনায় বসবাসকারী সকল ইয়াহুদী এবং ইয়াছরিব ও কুরাইশের সকল মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি স্বতন্ত্র জাতি এবং সকলে সমান নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ভোগ করবে। পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকবে এবং কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যাবে না, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে প্রচলিত প্রথা ও ন্যায়বিচার মোতাবেক রক্তপণ আদায় করতে হবে, কেউ বন্দী হলে ন্যায়বিচার মোতাবেক তাকে মুক্ত করতে হবে, দুর্বল ও অসহায়কে আশ্রয় দেয়া হবে এবং সর্বতোভাবে তাদের রক্ষা করা হবে, ঋণগ্রস্তদের ঋণের বোঝা লাঘব করা হবে, অত্যাচারী, পাপিষ্ঠ এবং সমাজে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সকলে অবস্থান গ্রহণ করবে, তারা কারো সন্তান কিংবা নিকটাত্মীয় হলেও। কোন অন্যায়কারীকে সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না এবং কোন প্রকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। কেউ কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, মহানবী (সা.) এর পূর্বানুমতি গ্রহণ ব্যতীত কেউ যুদ্ধে জড়িত হতে পারবে না, একজনের অপকর্মের জন্য অন্যজনকে দায়ী করা যাবে না, ইয়াহুদীদের মিত্ররাও সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে, বহিঃশত্রু দ্বারা মদীনা আক্রান্ত হলে একে রক্ষা করার জন্য সকলে সম্মিলিত প্রয়াস চালাবে।
বিদায় হজে প্রদত্ত মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত। কোন আন্দোলন কিংবা সংগ্রামের মুখে নয়, কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করে নয়, সম্পূর্ণ নবুওয়তী দায়িত্ব ও কর্তব্যের খাতিরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদত্ত এই ভাষণে তিনি মানবাধিকার বিষয়ে যে সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখেন তা অবিস্মরণীয়। তিনি বলেন, ‘আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর তোমাদের নিকট পবিত্র অনুরূপভাবে তোমাদের জীবন এবং সম্পদ ও পবিত্র।’
রাসূল (সা.) আরো বলেন, ‘কারো নিকট কোন সম্পদ গচ্ছিত থাকলে তা প্রকৃত মালিকের নিকট অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। জাহিলী যুগের সমস্ত সুদ প্রথা রহিত করা হল, কিন্তু মূলধন ফেরত পাবে।’ ‘জাহিলী যুগের সকল রক্তের প্রতিশোধ রহিত করা হল।’ ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড আর অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যার শাস্তি হল একশত উট রক্তপণ আদায়। মহানবী (সা.) কর্তৃক মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং (১৯৪৮)-এর ৩, ৬ ও ১৭নং অনুচ্ছেদে এবং সংবিধানের ৩২, ৪২, ৪২ (১)নং অনুচ্ছেদেও স্থান পেয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার রয়েছে। আবার তোমাদের উপরও তোমাদের স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হল তোমাদের বিছানায় তোমরা ছাড়া অন্য কেউ যেন না যায় এবং তারা যেন কোন অশ্লীল কাজ সম্পাদনা না করে; তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর নির্দেশে তাদের সাথে দাম্পত্যের সম্পর্ক স্থাপন করে তাদেরকে নিজেদের জন্য বৈধ করেছ। স্বামী-স্ত্রীর মানবাধিকার বিষয়টি জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপবষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং এর ১৬নং অনুচ্ছেদে এবং ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়াবহবহঃ ড়ভ ঈরারষ ধহফ চড়ষরঃরপধষ জরমযঃং (ওঈঈচজ)-এর ২৩নং অনুচ্ছেদ স্থান লাভ করে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সীমারেখা নির্ধারণ করে মহানবী (সা.) বলেন ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। আর মুসলিম জাতি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। অতএব, পারস্পরিক সম্মতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীত কোন মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা বৈধ নয়’। মহানবী (সা.) আরো বলেন, ‘তোমাদের রব এক এবং তোমাদের পিতা এক।
সকলকে আদম থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। এভাবে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধকে অনেক ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে। ঋুুবব বলেন, ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা কেবল প্রচার-প্রোপাগান্ডার মধ্যেই সীমিত নয়; বাস্তব জীবনেও তা অনুসরণের তাগিত দেয়া হয়। বস্তুত ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ইসলামের চিরন্তন সোনালী অধ্যায়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংগ। জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং-এর ১নং অনুচ্ছেদে মানুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বসূলভ আচরণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
রাসূল (সা.) প্রবর্তিত ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিকে ‘ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে নাÑএ শর্তে রাজনৈতিক আশ্রয় ও নাগরিকত্বের অধিকার দেয়া হয়েছে। মক্কা থেকে হিজরতকারী মুহাজির জনগণকে মদীনায় আশ্রয় ও নাগরিকত্ব প্রদানসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে ইসলামী রাষ্ট্র আশ্রয়প্রার্থীদের মৌলিক চাহিদা পূরণার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ করে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলার প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেয়। নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক আচরণ থেকে মুক্তি লাভের অধিকার : শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোন ব্যক্তিকে শারীরিক-মানসিক শাস্তিদান বা তাকে কষ্ট দেয়াকে রাসূল (সা.) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৃত মুসলমান হচ্ছে সেই ব্যক্তি যার কথা বা হাত থেকে মুসলমানগণ নিরাপদ থাকবে। এমনকি এক্ষেত্রে অমুসলিম নাগরিকগণের অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত দৃঢ়তায় তিনি বলেছেনÑ‘মনে রেখো! যদি কোন মুসলমান অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তার উপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেয় অথবা তার কোন বস্তু জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয় তাহলে কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর আদালতে তার বিরুদ্ধে অমুসলিম নাগরিকের পক্ষ অবলম্বন করব।’ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার অধিকার দিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন- ‘অমুসলিমদের জীবন আমাদের জীবনের এবং তাদের সম্পদ আমাদের সম্পদের মতোই। তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, জীবনের নিরাপত্তা, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি অধিকার ইসলাম স্বীকার করে। মদীনা সনদ অমুসলিমদের মদীনায় বসবাসের অধিকার দিয়েছিল। এমনকি, তাদের একটি অংশ বিশ্বাসঘাতকতা করা সত্ত্বেও বাকি অংশের প্রতি অন্যায় আচরণ করা হয়নি। ইসলাম একজন অমুসলিম শ্রমিককে একজন মুসলিম শ্রমিকের মতই সুযোগ-সুবিধা দেয়।
বর্তমানে জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং-এর উপস্থিতি সত্ত্বেও এর উপস্থিতি সত্ত্বেও বিশ্বের প্রায় ছয়শ কোটিরও অধিক মানুষ আজ চরম ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, বেকারত্ব, নাগরিক অধিকার দলন, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ইত্যাদির যাতাকলে পিষ্ঠ হচ্ছে। দেশে-দেশে জনপদে আজ ঐক্যবিধ্বংসী সন্ত্রাস, হত্যা-রাহাজানি, মারামারি-হানাহানি, নৈরাজ্য, যুদ্ধের বিভীষিকা, তথাকথিত মানবাধিকারে ধ্বজাধারীদের ব্যবহার মানবতাবিধ্বংসী কল্যাণ, মুক্তি ও সফলতা সর্বজনীনভাবে নিশ্চিত করতে পারে। ইসলামের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার আলোকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব বিনির্মাণের পথে ঐক্যবদ্ধ ঈমানী প্রতিজ্ঞা-প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হবে বিশ্বের প্রতিটি বনী আদমের মানবাধিকার ততো তাড়াতাড়ি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT