পাঁচ মিশালী

হজ্ব ব্যবস্থাপনায় কিছু অসঙ্গতি প্রসঙ্গে

চঞ্চল মাহমুদ ফুলর প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০১-২০১৮ ইং ২৩:৪৯:০০ | সংবাদটি ১৫৬ বার পঠিত

হজ্ব ইসলাম ধর্মের মূল ৫টি স্তম্ভের ১টি। ইসলামে ক্বালেমা, নামাজ, রোজা ও যাক্বাতের পরেই হজ্বের স্থান। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে যারা সামর্থবান, তাঁদের উপর হজ্ব পালন করা ফরজ। প্রতি বছরের ১০ জিলহ্জ পবিত্র হজ্বব্রত পালনের জন্য বিশ্বের সকল প্রান্তের মুসলমান নর-নারীরা সৌদি আরবের মক্কা নগরিতে জমায়েত হয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে হজ্ব পালনকারীদের বেশ কিছুদিন মক্কা ও মদিনায় অবস্থান করতে হয়। সে জন্য তাদের পূর্বে ভাড়া করা বাসা ও আবাসিক হোটেলের উপর নির্ভর করতে হয়।
হজ্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আছে, যেগুলো বাধ্যতামূলক পালনীয়। এর মধ্যে শারীরিক পবিত্রতা অন্যতম। এই বিষয়ে প্রত্যেক হজ্ব পালনকারীকে খুবই সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু ইদানিং ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটির কারণে এর ব্যত্যয় ঘটছে। যা নিয়ে হাজীদের মধ্যে কিছুটা অসন্তুষ্টি ও অস্বস্তি বিরাজ করছে। অনেক হাজী তো এ নিয়ে বেশ সংশয়ও প্রকাশ করেছেন। চলতি ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে হজ্ব পালনকারী কয়েকজন হাজী পবিত্র হজ্বব্রত পালন করতে গিয়ে পবিত্রতা রক্ষার বিষয়ে যে বেশ অস্তস্তিতে ছিলেন, তার বর্ণনা দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবগতির জন্য তা উল্লেখ করছি।
সিলেট নগরীর উপশহরের বাসিন্দা মিছবাহ তালুকদার ২০১৭ সালে পবিত্র হজ্বব্রত পালন করতে গিয়েছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন তরুণ ব্যবসায়ী হাজী নাজমুল হোসেন জুয়েলসহ পরিচিত আরো অনেকেই। বিগত বছরে হজ্ব পালনকালে তাঁরা যে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, তার বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিকার চাওয়ার মতো কোন কর্তৃপক্ষ না পাওয়ায় মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর বিতৃষ্ণা নিয়েই দেশে ফিরে এসেছেন। এবারে হজ্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরা বেশ অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। কারণ তাঁদের সন্দেহ ছিল, হজ্বের অন্যতম শারীরিক পবিত্রতা রক্ষায় তাঁরা সক্ষম হচ্ছেন কি না। ইদানিংকালে পশ্চিমা বিশ্ব অর্থাৎ ইউরোপ-আমেরিকার আদলে সৌদি আরবের মক্কা-মদিনার প্রত্যেকটি হোটেল ও বাসা-বাড়ির বাথরুমে হাই-কমোড প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যা ব্যবহারের মাধ্যমে মুসলমানদের পরিপূর্ণ পবিত্রতা রক্ষা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনেকেই প্রথাগতভাবে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব এবং হাই-কমোডে পায়খানার কাজ সেরে থাকেন। পবিত্রতার বিষয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই। তাই তারা এসবের ধার ধারেন না। কিন্তু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ মুসলমানদের সার্বক্ষণিকভাবেই পবিত্র থাকার জন্য বার বার আল-কোরআন বা আল-হাদীসে নির্দেশনা এসেছে। বিশেষ করে প্রতিদিনকার ৫ ওয়াক্ত নামাজে শরীর ও কাপড় পবিত্র রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে দৃঢ়ভাবে। আর হজ্বের ক্ষেত্রে তো এর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ সৌদি আরবের বাইরে থেকে যে সব মুসলমান হজ্ব করতে যান, তাদের কাছে মক্কা ও মদিনা নগরী খুবই পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তাই হজ্বব্রত পালনকালে যাতে কোন প্রকার অপবিত্রতা না হয়, সেদিকে হাজীরা থাকেন খুবই সতর্ক। অথচ হাই-কমোডের কারণে অনেক হাজী মনে করেন, তারা পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করতে পারছেন না।
এদিকে, কোন কোন হাজী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁদের মনে হচ্ছে, পশ্চিমা প্রভাব বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাহচর্য্যে সৌদি হজ্ব নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রভাবিত হচ্ছেন। এ কারণে পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার হোটেল এবং হাজীদের ভাড়া প্রদানের নিমিত্বে নির্ধারিত বাড়িগুলোতে মুসলমানদের ব্যবহার্য লো-কমোড-এর পরিবর্তে হাই-কমোড প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলেন, হাজীদের মধ্যে কেউ অসুস্থ থাকলে হাই-কমোড ব্যবহার করা যেতে পারে। এ কারণে হাজীদের দাবী, হাই-কমোড থাকুক-কোন অসুবিধা নেই। তবে হাই-কমোডের পাশাপাশি প্রতিটি বাথরুমে লো-কমোডও রাখা হউক। তাতে টয়লেট ব্যবহারে হাজীদের সুবিধা হবে। যার যেটি প্রয়োজন, তা ব্যবহার সহজতর হবে। বিষয়টি সম্পর্কে সৌদি সরকারের হজ্ব মন্ত্রণালয় বা হজ্ব কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ হজ্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এর সুরাহা কামনা করেছেন। তারা বলেন, সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী রাষ্ট্র। আয়তনেও অনেক বড়। সে তুলনায় লোকসংখ্যা তেমন বেশী নয়। তাই মক্কা ও মদিনায় হাজীদের জন্য নির্ধারিত বাড়ি ও হোটেলগুলোর বাথরুমের আয়তন বৃদ্ধি করে একই সাথে হাই-কমোড ও লো-কমোড প্রতিস্থাপনে তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি সম্পর্কে সৌদি কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন ভুক্তভোগী হাজীরা।
বাড়ি ও হোটেলগুলোর পাশাপাশি হজ্ব সম্পাদনের অন্যতম স্থান ময়দান-এ আরাফাত, মুজদালেফা ও মিনা। এসব এলাকায় যখন হাজীরা অবস্থান করে থাকেন, তখন তাদের প্র¯্রাব-পায়খানার জন্য মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই ঘন্টার আগে সুযোগ পাওয়া যায় না। পেটের পীড়াসহ শারীরিক কোন অসুখ-বিসুখ থাকলে হাজীদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। কয়েক লাখ হাজীর জন্য যে পরিমান বাথরুম-টয়লেট থাকার কথা, সে পরিমান না থাকায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রেও অনিচ্ছা থাকা সত্বেও অনেক হাজীকে পবিত্রতার ব্যাপারে কিছুটা ছাড় দিতে হয়। যা কোন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাম্য হতে পারে না। কর্তৃপক্ষ নজর দিলে হয়তো এ সমস্যাও অদূর ভবিষ্যতে আর থাকবে না। ভুক্তভোগী সাধারণ হাজীরা মনে করেন, প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, ধনাঢ্য রাষ্ট্র সৌদি আরব সরকার শিগগিরই হাজীদের দুর্ভোগ লাঘবে কিছুটা তৎপর হবেন এবং দ্রুততার সাথে সঠিক পদক্ষেপ নেবেন। কারণ, এসব ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে তেমন বড় কোন বিষয় নয়। আর অর্থ-বিত্তে এবং ভূ-সম্পদে এসব সমাধানের সুযোগও রয়েছে রাষ্ট্রটির।
হজ্বযাত্রীদের বিড়ম্বনার আরো একটি নাম ‘বাংলাদেশ বিমান’। যাত্রী সাধারণের সাথে বিমানের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দৌরাত্মের কথা কমবেশী দেশবাসীর জানা। কিন্তু খোদ আল্লাহর ঘরের মেহমানদের প্রতি তাদের অনৈতিক ও নির্দয় আচরণ যাত্রীদের মারাত্মক ব্যথিত করে। যাওয়ার সময় তো নানামুখী সমস্যা আর কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই রওয়ানা করতে হয়। বিমানের সিট খালি যাবে, কিন্তু বখরা না দিলে যাত্রীদের নামে টিকিট ইস্যু হয় না। এ অবস্থা চলে আসছে বিমানের শুরু থেকেই। আর কতকাল যে চলবে, তা আল্লাহ্ মালুম! তবে হাজীদের সাথে তাদের দুর্ব্যবহার সহ্য করার নয়। হজ্ব যাত্রীদের ক্ষেত্রে বিমানের নিয়ম অনুযায়ী জনপ্রতি ৩০ কেজি করে মালামাল বহন করা যাবে। যাওয়ার সময় হজ্বযাত্রীদের সাথে তেমন দ্রব্যাদি থাকে না। কিন্তু আসার সময় স্বাভাবিকভাবেই হাজীরা কিছু জিনিসপত্র নিয়ে আসেন। পরিস্থিতি এই দাঁড়ালে বিমানকর্মীদের হয়ে যায় ‘পোয়াবারো’। অহেতুক ৩০ কেজির বেশী মালামালের দোহাই দিয়ে যেমন সৌদি আরবের জেদ্দা বিমানবন্দরে কর্মরত বাংলাদেশ বিমানের কাষ্টম কর্মীরা হাজীদের হয়রানী করে, তারচেয়েও বেশী হয়রানীর শিকার হন ঢাকাস্থ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিমান কর্মীরা হাজীদের ‘হেন করেঙ্গা-তেন করেঙ্গা’ মার্কা ভয় দেখিয়ে সরাসরি উৎকোচ দাবি করে। ক্ষেত্রবিশেষে উৎকোচের পরিমান সৌদি মুদ্রায় ১০০ রিয়ালের উপরেও হয়ে যায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে হাজীরা বলেছেন, ‘দেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক সরকার হজ্বযাত্রীদের প্রতি আন্তরিক থাকলেও শুধুমাত্র বিমান কর্মীদের দৌরাত্মে যাত্রী সাধারণ অতীষ্ঠ। আমরা এ অবস্থার অবসান চাই। বিমানের দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারিদের চিহ্নিত করে তাদের অপসারণের পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। বিমানকে আন্তর্জাতিক পরিসরে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে নিতে দুর্নীতিমুক্তকরণ সময়ের দাবি।’
উপরে উল্লেখিত হজ্ব ব্যবস্থাপনায় সৌদি হজ্ব কর্তৃপক্ষের অনিচ্ছাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতির ত্রুটি এবং বাংলাদেশ বিমানের অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে উভয় দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিকতার সাথে বলিষ্ট পদক্ষেপ নেবেন এ প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT