ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০১-২০১৮ ইং ২৩:০৬:৩৫ | সংবাদটি ১১০ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
এদিকে অধিকাংশ ফ্রি রেশন কার্ড বেহাত হয়ে গেছে। মহাজনরূপী সচ্ছল সুযোগ সন্ধানীরা অভাবী, অসুবিধা গ্রস্ত, রোগ-শোকে অসহায় এই লোকদের রেশন কার্ডগুলো হাওলাত কর্জ আর বন্ধকের নামে হাতিয়ে নিয়েছে। তারাই এখন ফ্রি রেশন গ্রহীতা। রেশন নেই, জমি নেই, রুজি-রোজগারও নেই, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা অনুপস্থিত, অসহায় ও দারিদ্র্য জর্জরিত এই গুচ্ছ গ্রামবাসীরা এখন নিরুপায়। তাদের এই মানবেতর জিম্মিদশার কোন প্রতিকারও লক্ষণীয় নয়। তাদের কোন আশাভরসা আর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও কল্পনীয় নয়। এরূপ বাঁচা-মরার প্রশ্নে তাদের মাঝে কোনো আন্দোলন আর আলোড়নও নেই। এই প্রশ্নে সরকার, দেশ ও জাতি সবাই নীরব। বিষয়টি দুঃখজনক। তবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এ লোকজনের ভোটগুলো পাওয়ার প্রয়োজন হবে। সেই প্রয়োজনেই রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা, সপক্ষের বা বিপক্ষের ব্যর্থ প্রতিশ্রুতির মিঠাকথা নিয়ে হাজির হবেন এবং তাতে আবার এই বঞ্চিত ভোটাররা আরেক দফা মিথ্যা আশায় আশান্বিত হবার সুযোগ পাবেন। দল আর প্রার্থীরা তো সেই আগের তারাই, যারা জয়ী হয়েছেন, ক্ষমতা ভোগ করেছেন, কিন্তু এই অভাগা ভোটারদের ভাগ্যের পরিবর্তনে তারা কেউ উল্লেখযোগ্য কিছু করেননি। একথা বলে ঐ ক্ষমতাশালীদের বিরাগভাজন হওয়ারও সাহস এই হতভাগ্যদের নেই। এরা ভোটার হিসেবেও জিম্মি। উদাহরণ রূপে বলা যায়-দীঘিনালা উপজেলার গুচ্ছগ্রাম কবাখালী জামতলী, রসিকনগর, বোয়ালখালী, পাবলাখালী, সোহানপুর ইত্যাদি এলাকার ৯৪৫টি গুচ্ছগ্রামবাসী পরিবারের মধ্যে ৫১২টি পরিবারেরই কোন রেশন কার্ড ও গৃহসংস্থান নেই। বাকি ৪৩২টি পরিবারের ২২২টি কার্ডই হাতছাড়া। তারা তাদের মূল রেশন কার্ড ও গৃহ সংস্থানধারী বাপ-দাদাদের উপর বোঝা। এই পাড়াগুলোর অনেক রেশন কার্ড স্থানীয় মহাজন, মাতবর, দোকানদার, ফড়িয়া ইত্যাদি সুযোগ সন্ধানী লোভী লোকদের হাতে বন্ধক অথবা ঋণের দায়ে আটকে আছে। এখন ঐ ফ্রি রেশন ওরাই খায়। ফ্রি রেশনের মূল্যে কবে ঐ ঋণ বা বন্ধকীয় দায় শোধ হয়ে গেছে, তবু ঐ রেশন কার্ডগুলো মুক্ত হয়নি। ঋণ আর বন্ধকও বহাল আছে। মাতবর ও মহাজন চরিত্রের লোকেরা রেশন কার্ড হাতিয়ে নিয়ে বহুদিন যাবৎ ফ্রি রেশন ভোগ করছে। বর্ণিত ৭৩ জন কার্ড শিকারীদের ৩১ জনই হিন্দু, ২২ জন বড়–য়া, আর ২০ জন মুসলমান। ব্যবসা, চাকুরি কৃষি ইত্যাদি পেশায় তাদের সবাই জড়িত। তাদের অনেকের পাকা বাড়িঘর, দোকান ও কৃষি খামার আছে। পরিবারের কোনো কোনো সদস্য দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পেশায়ও নিয়োজিত। আদি পুরাতন বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে উপজাতীয়দের সাথেও তাদের সম্পর্ক ভালো। তবে ভুক্তভোগী সেটেলারদের বক্তব্যে প্রকাশ শতকরা পঞ্চাশ থেকে ষাট ভাগ রেশন কার্ডই অসেটেলার মহাজন শ্রেণির লোকেরা হাতিয়ে নিয়ে আটকে রেখেছে। প্রতি মাসে তারাই ঐ ফ্রি রেশন তুলেও ভোগ করে। এই অপ্রিয় বিষয়টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অজানা হয়। তবে কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন না। তাদের এই নীরবতা রহস্যজনক। ইচ্ছা করলে রেশন উঠাবার সময় ঐ বেআইনী রেশন কার্ডধারীদের পাকড়াও করা যায় এবং ঐ কার্ডগুলো জব্দ করে তা মূল মালিকদের ফিরিয়ে দেয়াও সম্ভব। কিন্তু কে এই ঝামেলা করে? সেটেলাররা অসংগঠিত, অসচেতন। দিন রাত ভাত কাপড়ের চাহিদা মিটাতে প্রাণান্তকর ভাবে ব্যস্ত। সরকারি কর্তৃপক্ষের গায়ে পড়ে ঝামেলা বাড়াবার তাগিদ ও ফুরসৎ নেই। সুতরাং বিনা ধারায় এই ফ্রি রেশনের লুটপাট চলছে। গুচ্ছ গ্রামবাসী সেটেলাররাও ধুঁকে ধুঁকে কালাতিপাত করছে। এই রেশন লোপাট ও পুনর্বাসন সংকট একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি। এর সুরাহা হবে কিনা কেউ জানে না।
এই প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় খাগড়াছড়ির জেলাপ্রশাসক বর্নীত রেশন কার্ডগুলো জব্দ করে নিয়েছেন। তাতেও ভূক্ত ভোগিরা উদ্বিগ্ন।
বিষয়টি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার, মৌলিক চাহিদা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক গুরুতর ব্যাপার। কিন্তু কে এই অভিযোগের পক্ষে সক্রিয় হয়? এ ব্যাপারে কারো যেন কোনো দায় নেই। প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, আইন ও বিচার বিভাগ, মানবাধিকার সংস্থা এবং আইনজীবী/ পেশাজীবীদের সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ উত্থাপিত হোক সে অপেক্ষায় আছেন। আর ভুক্তভোগী নেংটি বাঙালিরাও আশা করছে; কর্তৃপক্ষীয়ভাবে একটা কিছু সুরাহা নিশ্চয় হবে। এই অপেক্ষার পালা কখন শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারে না।
পাহাড়িরাও বিভ্রান্ত। নেতৃপর্যায় থেকে তাদের বুঝান হচ্ছে, এই গোটা পর্বতাঞ্চল আদিকাল থেকেই তাদের দখলভুক্ত ভূমি। এখানে বাঙালি আবাসন গড়াই হলো উপজাতীয় দখলাধিকার হরণ। এটি অব্যাহত থাকলে তদ্বারা ধীরে ধীরে পাহাড়ীরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। তারা বাঙালি সংখ্যাধিক্যের মাঝে হারিয়ে যাবে। তখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করাই হবে দায়। তাই উপজাতীয় আধিপত্য রক্ষার আন্দোলন, তাদের বাঁচামরারই আন্দোলন। এর কোন বিকল্প নেই। বাঙালি গ্রহণ মানে উপজাতিদের আত্মহত্যা। বাঙালি আবাসন প্রতিরোধ আন্দোলনকে জোরদার ও ভয়ংকর করার উপায় হলো সশস্ত্র প্রতিরোধ। তাছাড়া ক্ষুদ্র নিরীহ এই পাহাড়ী জাতির দাবির প্রতি সমর্থন আদায় সম্ভব নয়।
পাহাড়ী সমাজে এই প্রচারণা এ পর্যন্ত সফল হয়েছে। এর প্রথম সুফল হলো পুরাতন বিধি ব্যবস্থাসহ উপজাতীয় শাসন বহাল আছে। দ্বিতীয় সুফল হলো, উপজাতি শাসিত জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী পরিষদেও ভাগ লাভ নিশ্চিত হয়েছে। শেষ সুফল হলো বাঙালি অনুপ্রবেশ ¯্রােত থেমে গেছে।
বিপরীত রাষ্ট্র ও বাঙালি পক্ষের যুক্তি প্রদর্শন ও জনমত গঠনের প্রবণতা একেবারে অনুপস্থিত। এ পক্ষের যুক্তি হতে পারে, বাংলাদেশ পাহাড়ি বাঙালি সবার জাতীয় স্বদেশভূমি। এখানে আঞ্চলিক ও গোষ্ঠীগত আধিপত্য স্বীকার করা মানে বিচ্ছিন্নতাকে প্রশ্রয় দেয়া। একদেশ ও একজাতি হয়ে থাকার উপায় হলো সহিষ্ণুতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সমানাধিকার, মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার সবার প্রাপ্য। ক্ষুদ্র ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর সমান পর্যায়ে উন্নয়ন না ঘটা পর্যন্ত, তাদের অগ্রাধিকারের মেয়াদ ভিত্তিক বিশেষ সুযোগ দানের মঞ্জুরি, বাংলাদেশ সংবিধানের বিধান নং- ২৮ (৪) ধারায় সন্নিবেশিত আছে। তার আওতায় ব্যবস্থা গ্রহণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই সাংবিধানিক ব্যবস্থায় দেশ ও জাতির উদ্বুদ্ধ করাই উপজাতীয় রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত। এর বিপরীতে সশস্ত্র বিদ্রোহ হলো চরম হটকারিতা। শান্তি-শৃঙ্খলা ও অখ-তা রক্ষার প্রয়োজনে এই হটকারিতা দমন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এর বিকল্প হলো অস্ত্র ত্যাগ, বাড়াবাড়ি পরিহার, শান্তি অবলম্বন ও আনুগত্য। রাষ্ট্রের পক্ষেও কঠোরতা বর্জনীয়। তবে উপজাতীয় বাড়াবাড়ির বড় জবাব হলো তারা এ দেশের আদি ও স্থায়ী বাসিন্দা নয়, বহিরাগত শরণার্থী বংশধর। এ কারণে ব্রিটিশ আমলে তাদের ভোটাধিকার ছিলো না। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT