শিশু মেলা

মহাকাশ ভ্রমণের লিফট

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০১-২০১৮ ইং ০০:২৪:২৯ | সংবাদটি ২৪ বার পঠিত

বিজ্ঞানী মোখলেস একজন আশাবাদী মানুষ। আশা নিয়ে বেঁচে থাকা তার স্বভাব। কোনো বিষয় নিয়ে তিনি হতাশ হন না। সবসময় তিনি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখতে তিনি বড় ভালোবাসেন। লোকের মতো তিনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নগুলো দেখেন না। তিনি স্বপ্ন দেখেন জেগে জেগে। তার এই স্বপ্নগুলো তাকে ঠিকমতো ঘুমুতে দেয় না। ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। তবু তিনি স্বপ্ন দেখে যান। তিনি মনে করেন, জগতে বিজ্ঞানের যত সাফল্য সবই কারও না কারও স্বপ্ন দেখার ফল। তাই তিনিও আপনমনে স্বপ্ন দেখে যান। তার বিশ্বাস, কোনো এক দূর ভবিষ্যতে তার স্বপ্নগুলো একদিন সত্যি হবেই হবে।   
তিনি স্বপ্ন দেখেন, মানুষ চাঁদে গিয়ে বসতি স্থাপন করে ফেলেছে। চাঁদের সাথে লিফটের মতো আশ্চর্য এক যন্ত্র স্থাপন করে মানুষ মুহূর্তে বোতাম চেপে যাওয়া-আসা শুরু করে দিয়েছে। স্বপ্ন দেখেন, চাঁদের মতো অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহেও মানুষ ওই লিফট যন্ত্রের সাহায্যে গমনাগমন শুরু করে দিয়েছে। তার স্বপ্নের বিবরণ শুনে মানুষ শুধু হাসাহাসি করেন। তার সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেন। কিন্তু বিজ্ঞানী মোখলেস একজন দৃঢ়চেতা মানুষ। লোকের সামান্য ঠাট্টা-বিদ্রুপে তিনি দমে যাওয়ার পাত্র নন।
আজকাল কেউ কেউ বিজ্ঞানী মোখলেসকে পাগলও ভাবতে শুরু করেছেন। তাকে দেখলেই ইশারা করে বলবেন, ওই যে এল পাগল মোখলেস। লোকের কথা তিনি কোনো সময় নিজের কানে শুনতে পান। কোনো সময় আবার শুনতে পান না। যখন শুনতে পান তখন মুখ টিপে শুধু হাসেন। আর বিড়বিড় করে বলেন, আমি তো কিছু একটা কাজ করছি। তোমরা তো কোনো কিছু কর না। তোমরা শুধু খাও আর বাথরুম ভর। আমাকে তোমরা পাগল বল আর যা-ই বল না কেন, আমি তবু কিছু একটা করছি। দূর আগামীর স্বপ্ন দেখছি।
বিজ্ঞানী মোখলেসের দুই কন্যা। একজনের নাম অণু। অন্যজনের নাম পরমাণু। অণু বড়। পরমাণু ছোট। অণু-পরমাণু ভারি দুষ্টু। ভারি চঞ্চল। ওদের এমন দুরন্তপনা দেখে লোকে বলে, পাগলের মেয়েরা তো পাগলই হয়। নইলে ওরা এত দুষ্টু, এত চঞ্চল হবে কেন?
লোকের কথায় বিজ্ঞানী মোখলেস কান দেন না। তিনি মনে করেন, জগত ভরা গরু ছাগল আর ভেড়ার পাল। এরা মানুষের রূপ ধরে মানব সমাজে বসবাস করছে। এদের কাজই হল ঘাস খাওয়া আর জাবর কাটা। তাই এরা জাবর কাটে আর অন্যের সমালোচনা করে। অন্যের বিষয়ে নাক গলায়।
বিজ্ঞানী মোখলেস সেদিন অণু-পরমাণুকে নিয়ে গল্প করতে বসলেন। আমাদের এই পৃথিবীটা সৌরজগতের একটি গ্রহ। তোদের জানা আছে, এমন গ্রহ সৌরজগতে আরও অনেক রয়েছে। সে সকল গ্রহ নিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়তই গবেষণা করে চলেছেন। ইতোমধ্যে মানুষ চাঁদে গমন করতে সক্ষম হয়েছে। আমার বিশ্বাস, বাকি গ্রহগুলোতেও মানুষ একদিন পদধুলি ফেলতে সক্ষম হবে। তোদের কী মনে হয়? মানুষ চাঁদের মতো অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহে যেতে পারবে তো?
বাবার কথার জবাবে অণু বলল, অবশ্যই পারবে বাবা। মানুষ যখন চাঁদে গেছে! বড় হয়ে আমিও একদিন চাঁদে যাব বাবা। আর কেউ যাক বা না যাক। আমি ঠিকই চাঁদে যাব।
মেয়ের কথা শুনে বাবা হাসেন। হেসে হেসে বলেন, এই তো বিজ্ঞানী মোখলেসের মেয়ের মতো কথা। আল্লাহতায়ালা তোর আশা পূরণ করুক।
বাবার কথা শুনে ছোট মেয়ে পরমাণু ভাবল, বাবা তো দেখি অণু আপুর অনেক প্রশংসা করে ফেলেছেন। আমার প্রশংসা করছেন না তিনি। পরে সেও বাবাকে খুশি করতে বলল, বাবা! আপু চাঁদে গেলে আমি বুধ গ্রহে যাব।
পরমাণুর কথা শুনে বিজ্ঞানী মোখলেস আরও খুশি হলেন। খুশি হয়ে তিনি বললেন, আল্লাহতায়ালা তোর বাসনাও পূরণ করুক মা।
অণু তখন পরমাণুকে উদ্দেশ্য করে বলল, তুই বুধ গ্রহে গেলে আমি যাব শুক্র গ্রহে।
সাথে সাথে পরমাণুও বলল, তুমি শুক্র গ্রহে গেলে আমি যাব মঙ্গল গ্রহে।
অণু বলল, আমি তাহলে যাব বৃহস্পতি গ্রহে।
পরমাণু বলল, আমি যাব শনি গ্রহে।
অণু আবার বলল, আমি তাহলে যাব ইউরেনাস গ্রহে।
পরমাণু বলল, আমি যাব নেপচুনে।
অণু বলল, আমি যাব প্লুটোতে।
পরমাণু বলল, আমি যাব এক্স গ্রহে।
অণু আবার বলল, আমি তবে যাব ভলকান গ্রহে।
অণু ভলকান গ্রহে যাবে শুনে পরমাণু একেবারে চুপ হয়ে গেল। কারণ তার আর কোনো কিছু বলার নেই। তাই সে সহসা কান্না জুড়ে দিল। পরমাণু কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল, আপু ভলকানে গেলে আমি কোথায় যাব বাবা? আমার তো যাওয়ার জায়গা নেই।
মেয়ের অসহায়ত্ব বুঝতে পেরে বাবা বলেন, সে কী কথা রে মা? এত বড় মহাকাশ! সেই মহাকাশে লক্ষ-কোটি নক্ষত্র রয়েছে! আর তুই কিনা বলছিস তোর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। কেন রে মাÑসূর্য আছে না। বল্ না তুই সূর্যে গমন করবি।
বাবার মুখে আশার কথা শুনে পরমাণুর মুখে হাসি ফুটল। হেসে হেসে সে বলল, ওহ্ বাবা তাই তো! সূর্যের কথা তো আমার মনেই ছিল না।
বলে পরমাণু খুশিতে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। অণুও বাবার বুকে মাথা রাখল।
মেয়েদের নিয়ে বিজ্ঞানী মোখলেস প্রায়ই এমন গল্পে মেতে উঠেন। গল্প শুনতে শুনতে মেয়েরা ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যায়। বাবার গল্প শুনে কখনও তারা অবাক হয়ে ভাবে, তাদের বাবা কতই না জ্ঞানী! কত কিছুই না তিনি জানেন।
সেদিন বিজ্ঞানী মোখলেসের জীবনে বিরাট এক ঘটনা ঘটে গেল। তার মনে হতে লাগল আজ ছুটির দিন। অফিস বন্ধ। ভেবে মেয়েদের নিয়ে তিনি বেড়াতে বের হলেন। হাঁটি হাঁটি পা পা করে তারা অনেকদূর গেলেন। অনেকক্ষণ হাঁটার পর তারা একটি পার্কের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কী মনে করে যেন বিজ্ঞানী মোখলেস পার্কের ভেতর গিয়ে প্রবেশ করলেন। অণু ও পরমাণু বাবার দুহাত চেপে ধরে হাঁটতে থাকে।
অপূর্ব একটি পার্ক! পার্কে বিচিত্র সব ফুলের গাছ। গাছে গাছে ফুল ফুটে আছে। হাজারও পাখি কিচিরমিচির গান করে এগাছ থেকে ওগাছে ওড়াউড়ি করছে। ওসব দেখতে দেখতে তারা যেখানে এসে থামল, ওটা একটা মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র। কী মনে করে যেন বিজ্ঞানী মোখলেস গবেষণা কেন্দ্রের ভেতর ঢুকে গেলেন। মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের ভেতর কিছু সময় হাঁটার পর তিনি একটি নেমপ্লেট দেখতে পেলেন। নেমপ্লেটে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘মহাকাশ ভ্রমণের লিফট’। লেখাটি পড়ে তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন। বিড়বিড় করে তিনি বললেন, মহাকাশ ভ্রমণের লিফট তাহলে তৈরি হয়ে গেছে! ভারি আশ্চর্য তো!
মেয়েদের নিয়ে তিনি লিফটের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর উর্ধ্ব গমনের বোতাম চাপলেন। বোতাম চাপার সাথে সাথে লিফটের দরজা খুলে গেল। লিফটের ভেতর বেশ কয়েকটি চেয়ার পাতানো। আরামদায়ক গদি চেয়ার। বিজ্ঞানী মোখলেস মেয়েদের হাত ধরে লিফটের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। লিফটে কোনো লিফটম্যান নেই। তার মানে নিজেদেরই সব কাজ করতে হবে। তিনি তাকিয়ে দেখলেন, লিফটের দেয়ালে ডানপাশে বেশ কয়েকটি বোতাম। বোতামের গায়ে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছেÑবুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো, এক্স ও ভলকান।
বিজ্ঞানী মোখলেস বুঝতে পারলেন, বোতামগুলো হল ওই সকল গ্রহে যাওয়ার চাবি। তার মানে বোতাম চাপলেই লিফট তাদের নির্দিষ্ট গ্রহে নিয়ে যাবে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, ভালোই তো হল। আমার মেয়ে দুটির গ্রহ-উপগ্রহে বেড়ানোর বড় শখ। এখন মেয়েদের নিয়ে আমি এক এক করে সবকটি গ্রহে ভ্রমণ করব।
বিজ্ঞানী মোখলেস মেয়েদের মুখপানে তাকিয়ে দেখলেন, উপগ্রহে বেড়ানোর সুযোগ পেয়ে তারাও খুশিতে কুটিকুটি। মেয়েদের আনন্দ দেখে তার মন ভরে গেল। মনে মনে তিনি ভাবলেন, প্রথমে চাঁদকে দিয়েই ভ্রমণ শুরু করা যাক। কারণ এতদিন আমার মেয়ে দুটি চাঁদকে মিছেমিছি মামা ডেকে এসেছে। অথচ মানুষের মামা হওয়ার কোনো যোগ্যতাই চাঁদের নেই। এটা তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। ভেবে তিনি চাঁদে গমনের বোতামটি প্রথমে চাপলেন।
বোতাম চাপার বেশ কিছু সময় পর তার চোখেমুখে একপসর তীব্র আলো এসে পড়লো। বিজ্ঞানী মোখলেস ভাবলেন, তারা নিশ্চয়ই এতক্ষণে চাঁদে পৌঁছে গেছেন। নইলে এত আলো আসবে কোথা থেকে? তীব্র আলোর জন্য বিজ্ঞানী মোখলেস ঠিকমতো চোখ মেলে তাকাতে পারছেন না। পরে যখন স্বাভাবিক হলেন, তিনি তাকিয়ে দেখলেন আলো ঝলমলে সোনালি সকাল। তার ছোট মেয়ে পরমাণু এসে ঘরের জানালা খুলে দিতেই সূর্যের একপসর আলো এসে তার চোখেমুখে পড়ল। আলোর পরশ পেয়ে তিনি সহসা জেগে উঠেছেন। ঘুম থেকে জেগে তিনি রীতিমতো তাজ্জব হয়ে গেলেন। মনে মনে তিনি ভাবলেন, এমনও কখনও স্বপ্ন হয় নাকি? জীবনে এই প্রথম ঘুমিয়ে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখলাম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT