শিশু মেলা

ডলি দ্য ডগ

সৈয়দ হেলালুল ইসলাম হেলাল প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০১-২০১৮ ইং ০০:২৫:০০ | সংবাদটি ১৯৫ বার পঠিত

যখন আমি খুব ছোট ছিলাম। আমাদের গরুর বাছুরকে জড়িয়ে ধরতাম। এরা দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি মায়াবী ছিল। একবার দু’দিন বয়সী এক বাছুরকে জড়িয়ে ধরার পর তার পাগল মা ভয়ঙ্কর ভাবে তেড়ে আসলো আমার দিকে। ভাগ্য ভালো ছিল আমার এক চাচা বিষয়টি খেয়াল করেছিলেন, ফলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে নিরাপদে সরিয়ে আনলেন। চাচা আমাকে বললেন-গাভীকে যদি কন্ট্রোল করতে না পারো তাহলে বাচ্ছা দেওয়ার পর সাতদিন পর্যন্ত তার বাছুরের কাছে যাবে না। কেননা মা গরুটি তখন পাগল থাকে।  
আমাদের বাড়িতে প্রচুর নেড়ি কুকুর দেখতাম। এরা কিছুদিন থাকার পর চলে যেত। তারা রান্নাঘর এবং বারান্দায় লাকড়ির নিচে আশ্রয় নিত। ঘরের উচ্ছিষ্ট খাবার বিশেষ করে মাংসের  হাড় আর মাছের কাঁটা তাদের প্রিয় খাবার ছিল। এগুলো পেলে এরা খুব মজা করে খেত, আমরা শুনতে পেতাম তারা এসব সুস্বাদু খাবার নিয়ে খুব ঝগড়া করছে।
আমার বাবা বিদেশে থাকাকালীন সময়ে আমার চাচাই ছিলেন আমাদের অভিভাবক। বাবা তো তখন ইংল্যান্ডের ইয়কশায়ারে থাকতেন। তিনি আমাদের দেখাশোনা করতেন। আমরা মসজিদে বা স্কুলে যাই কি না এসব খেয়াল করতেন। আমাদেরকে শৃঙ্খলা আর আয়ত্তের ভেতরে রাখতেন। গ্রামের খারাপ ছেলেদের সাথে খেলতে দিতেন না। তিনি বলতেন খারাপ ছেলেদের সাথে মেশার চেয়ে একা থাকাই ভালো। আমাদের একজন গৃহশিক্ষক ছিলেন। তিনি আমাদের সাথে থাকতেন। যিনি আমাদের পাশের এক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি করতেন।
তিনিই আমাদেরকে ইউনিসেফের পোলিও দিয়েছিলেন। আমার বাম হাতে এখনো টীকার ইনজেকশনের দাগ আছে। আমি এই গৃহ শিক্ষককে পছন্দ করতাম না কারণ টীকার কারণে আমার হাত থেকে সামান্য রক্ত বের হয়েছিল আর খানিকটা ব্যথাও  পেয়েছিলাম। যাই হোক, আমার আরেক চাচা ছিলেন যিনি আমাদের বাড়ি থেকে দুই মাইল দূরে থাকতেন। তার কাছে সুন্দর সুন্দর কুকুর ছানা ছিল।
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একটি কুকুর ছানা পছন্দ করে নিয়ে আসব। খুব সুন্দর একটি ছানা, কী মায়াবি! আর চমৎকার ! ¯্রষ্টার অপরূপ সৃষ্টি।  যেন তা আকাশ থেকে পড়েছে। তার গায়ের রঙ ছিল সাদার মধ্যে কালো আর পিঙ্গলবর্ণের  ছাপ। খুবই আকর্ষণীয়। আমরা ছানাটিকে বাড়িতে নিয়ে আসলাম। আমি বিছানার গিয়ে চিন্তা করতাম কখন রাত শেষ হবে। আর সকালে আমি কুকুর ছানাটিকে খাওয়াতে পারব।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে আলোচনা হতে লাগলো এই কুকুর ছানাটিকে কী নামে ডাকা যায়। আমি দেখতে খুব উজ্জ্বল রঙ্গের ছিলাম আর ভালো ইংরেজি জানতাম, তাই আমার চাচা আমাকে ইংরেজ বালক বলে ডাকতেন । ফলে আমিই প্রথমে বলে উঠলাম এইটা দেখতে যেহেতু পুতুল বা ডলের মতো তাই তাকে ডল নামেই ডাকা হোক।  হঠাৎ করে একজন বললো এইটা তো মেয়ে। তাকে ডলি নামেই ডাকা হোক। এই এ সুন্দর মেয়ে ছানাটির জন্য ডলিই হবে তার যথার্থ নাম।
আমাদের বাড়ির পাশেই দুই মিনিটের দূরত্বে ছিল প্রাইমারি স্কুল,  যেখানে আমি পড়তাম। আমি স্কুল থেকে এসে বই খাতা রেখেই ডলির কাছে চলে যেতাম। সব সময় আমার খেয়ালে থাকতো ডলি। কিছুদূর থেকে ডলি! ডলি! বলে চিৎকার করতাম।
ডলি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলো আর বুঝতে পারলো তার নাম ডলি। বাড়ির সবাই যখন ডলিকে ডাকতো, সে শুনতো এবং বুঝতো।
আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে ডলি খুব দায়িত্ববান ছিলো। সে আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ পোষা প্রাণী ছিল। রাতে বাড়ি পাহারা দিতো। যে কোন সন্দেহজনক পরিস্থিতি বুঝতো এবং ভয়ঙ্কর শব্দ করতো, যা আমাদের কাউকে না কাউকে জাগিয়ে তুলতো। সাধারণত আমার চাচা সবার আগে সাড়া দিতেন কেননা তিনি বাড়ির সামনের দিকে থাকতেন।
তখনকার দিনে টয়লেট থাকতো ঘরের বাহিরে। একটি টয়লেট ছিল বাড়ির সামনের দিকে পুকুর পাড়ে আর অন্যটি ছিল মূলবাড়িতে ঘরের পেছন দিকে, যেখানে মহিলা ও পরিবারের ছোটরা যেত। ফলে যখন আমরা রাতে টয়লেটে যেতাম, ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত ডলি আমাদেরকে পাহারা দিতো ।
ধীরে ধীরে এলাকার বদ ছেলেরা ডলির সাহসিকতা ও হিং¯্রতা সম্পর্কে জেনে গেল। তাই তারা ডলির আশেপাশে ভিড়ার চেষ্টা করলো না। তখনকার দিনে বদ ছেলেরা ছিঁচকে চোর ছিল। এরা কলা, লাউ, কুমড়া, নারকেল ইত্যাদি মৌসুমী ফল চুরি করে নিয়ে যেত। বিশেষ করে কলার ছড়ি চুরি করে নিয়ে যেতো। ডলি যখন থেকে পাহারা দিতে শুরু করলো, আমাদের আর কিছু চুরি হলো না।
গ্রামে সিঁদেল চোর ছিল, যারা সিদঁ কেটে ঘরে ঢুকতো এবং সব কিছু নিয়ে যেত। এমনকি সোনাদানা নগদ টাকা পয়সা ইত্যাদি নিয়ে যেত। প্রকৃতপক্ষে ডাকাতদের পরে এরাই ছিল ভয়ংকর দল। ডাকাতেরা দলবেঁধে বন্দুক ড্যাগার ইত্যাদি নিয়ে আসতো এবং সব লুট করে নিয়ে যেত। কখনো কখনো মানুষকে বেঁধে রাখতো এবং মারধর করতো, ডলির কারণে আমাদের কখনো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়নি।
একবার আমার মায়ের বিয়ের শাড়ী এবং স্বর্ণালঙ্কারসহ সব কিছু সিঁদেল চোরেরা নিয়ে গেল। কিন্তু যখন থেকে ডলি পাহারা দিতে শুরু করল আমরা নিরাপদ হয়ে গেলাম। চাচা সন্দেহ করতে লাগলেন গ্রামের দুষ্ট ছেলেরা যদি আবার ডলিকে বিষ খাইয়ে ফেলে। তাই তিনি ডলির অতিরিক্ত খাতির-যতœ নিতে শুরু করলেন। ডলিকে বুঝালেন, যেন বাইরের খাবার না খায় এবং ডলিকে বেশি বেশি করে বিকাল ও রাতের খাবার দিতে লাগলেন। সে যখন ছোট ছিল তখন দুধভাত খুব পছন্দ করত। ডলির অনেক বন্ধু হয়ে গেল। সামান্য কিছু শত্রুও ছিল। আমাদের সকল আত্মীয়-স্বজন ডলির খোঁজ খবর নিতো। সবাই জিজ্ঞেস করতো ডলি কেমন আছে?
যখন বাড়িতে মেহমান আসতো চা-নাস্তা সেরে তারা যদি ডলিকে না দেখতো, তবে জিজ্ঞেস করতো ডলি কোথায়। ডাক শুনে ডলি খুব ভদ্র ভাষায় জবাব দিতো।
ডলি এখন পুরোপুরি বড় হয়ে গেছে। খুবই বাধ্য আর পাক্কা টহলদাতা। সে সারা রাত পাহারা দেয় আর দিনে ঘুমায়।  স্কুলে আমার পিছু পিছু যেত। ডলির জনপ্রিয়তায় আমরা গর্ববোধ করতাম। আমার বাবা ডলির ব্যাপারে খুবই উৎসাহী ছিলেন। তিনি চিঠিতে তার কথা সব সময় লিখতেন ও খবর নিতেন। ডলি কেমন আছে? কতটুকু বড় হয়েছে? এসব জিজ্ঞেস করতেন। আর এভাবেই ডলি তার দায়িত্ব পালন করে গেল আর আমারাও তাকে নিয়ে বেশ আনন্দে ছিলাম। কিন্তু ১৯৭১ সালের মার্চে অজানা পরিস্থিতি তৈরি হলো। যুদ্ধ তখন সব কিছু তছনছ করে ফেলল।
বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল। তার নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। তখন পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগ পাশ করলো, যার নেতা ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন, কিন্তু তিনি সরকার গঠন করতে গিয়ে বাধা পেলেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে সুযোগ দিল না। শহর থেকে যুদ্ধ ধীরে ধীরে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমার মায়ের বাবার বাড়ি ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্রে শাহজালাল মাজারের পাশে। আমার মায়ের পরিবারের লোকজন মাজারের দেখাশোনা করত।
শহরের প্রত্যেকেই মসজিদে, স্কুলে আশ্রয় নিল এবং কেউ কেউ গ্রামে চলে আসলো। তারা ঘরবাড়ি ছেড়েছিল নিরাপত্তার জন্য। তখন পাকিস্তানি বিমান এসে এলোপাতাড়ি বোমা বর্ষণ করত যা কারোর জন্যই নিরাপদ ছিল না। গ্রাম শান্ত ও নিরাপদ থাকায় অনেক আত্মীয়-স্বজন এসে আমাদের সাথে থাকতে লাগলো। কিন্তু এখানেও দু’পক্ষের মানুষ ছিল এক পক্ষ পাকিস্তানি আর্মি এবং অন্যপক্ষ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধকারী, যাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা বলা হতো। আমার মা তার বোন ও পরিবারের জন্য ভয়ংকর রকমের চিন্তিত ছিলেন। যদিও তারা শাহজালাল মাজারে আশ্রয় নিয়েছিল। মাজার খুবই নিরাপদ জায়গা কিন্তু ধীরে ধীরে খাবারের সংকট দেখা দিল। তারপরও লোকেরা এখানে থেকে অপেক্ষা করতো কবে দেশ স্বাধীন হবে আর তারা বিজয়ের স্বাদ পাবে।
আমাদের গ্রামের প্রচুর মানুষ যুদ্ধে গেল। আমার এক চাচাতো ভাই কমান্ডার হিসাবে যোগ দিল। কিন্তু যুদ্ধের খোঁজখবর তেমন পাওয়া যেত না। তা ছিল খুবই দুষ্কর। খবর পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল বিবিসি ওয়ার্ল্ড নিউজ, ভয়েস অব আমেরিকা ও আকাশ বাণী। আমাদের একটি ছোট্ট রেডিও ছিল দুই ব্যান্ডের। আমার বাবা যুদ্ধের আগে শেষবার যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন তখন আমার মাকে তা উপহার দিয়েছিলেন। এইটা ছিল ফিলিপস কোম্পানির এবং এই রেডিওটাই ছিল সংবাদ পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ফলে লোকজন জড়োসড়ো হয়ে আমাদের বাড়িতে একত্রিত হতো এবং ৭ টার দিকে সবাই বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস শুনতো। আমরা ভয়েস অফ আমেরিকা ও কলকাতার আকাশ বানীও শুনতাম। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ডলি আমাদের সাথে বসতো এবং রেডিও শুনতো, সে আমাদেরকে গভীরভাবে দেখতো। যুদ্ধ মাসের পর মাস দীর্ঘ হতে থাকলো। আর আমার মায়ের সকল চিন্তা হয়ে দাড়াঁলো তার মা ও পরিবারের জন্য। তখনকার দিনে কোন টেলিফোন ছিল না। মোবাইল ছিল না। এমনকি গ্রামে একটি রেডিও পাওয়া খুব কষ্টের ছিল।
হাইওয়ে আমাদের গ্রামের রাস্তাকে সিলেটের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত সংযুক্ত করেছিল বলে পাকিস্তানিরা বিভিন্ন জায়গায় চেক পয়েন্ট বসিয়েছিল। তারা ইচ্ছে মতো এলোমেলো ভাবে মানুষজনকে বাস, রিক্সা ইত্যাদি থেকে নামিয়ে লাইন ধরে দাড় করতো এবং গুলি করে, ব্রাশ ফায়ার করে মেরে ফেলতো। ফলে আমার আম্মা নানুকে দেখতে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারলেন না।
একদিন কিছু রাজাকার প্রতিশোধ নিতে হাফডজন পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে গ্রামে আসলো। তারা প্রথমে আমাদের সামনের বাড়িতে আসলো। আমরা সবাই এই খারাপ অবস্থার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আমরা আমাদের বই পত্র লুকাচ্ছিলাম এবং ছোট ছেলে মেয়েদেরকে লুকানো হচ্ছিল। সৌভাগ্যবশত সকালে আমার মামা বাইসাইকেলে করে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। দুপুর প্রায় তিনটার দিকে পাকিস্তানিরা আমাদের বাড়িতে ঢুকলো। আমার মামা শহরে থাকার কারণে উর্দূ জানতেন। ফলে তারা যখন আসছিল তিনি তাদেরকে সালাম দিলেন। তাদের মধ্য থেকে একজন মামাকে চিনতে পারলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করল এখানে কী করছেন খাদিম সাহেব? উত্তরে তিনি বললেন এটা আমার বোনের বাড়ী, আসেন চা খান, কিন্তু তারা মামাকে ধন্যবাদ দিল এবং বলল যে, তারা অন্য গ্রামে যাবে।
সবাই মুক্তি পেল, তাদের সাথে এটাই ছিল আমাদের একমাত্র সাক্ষাৎ। যদিও আমরা প্রতিরাতে গুলির আওয়াজ শুনতে পেতাম। কখনো কখনো দিনে একদম নিচ দিয়ে যুদ্ধ বিমান যেত, একেবারে গ্রামের উপর দিয়ে। গ্রামের মানুষেরা যখন দেখতো তাদের উপরে দিয়ে প্লেন যাচ্ছে বাঁচার জন্য তারা মাটিতে শুয়ে পড়তো।
সৌভাগ্যক্রমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আমাদের সোনালি ফসল ছিল এবং আমরা তা মজুদ করে রেখেছিলাম। যা যথেষ্ট ছিল এবং তা দিয়ে কয়েক বছর আমাদের চলে যাবে। যদিও অন্যান্য জিনিসের আকাশ ছোয়া দাম হয়ে গেল। ফলে যুদ্ধের সময় অধিকাংশ লোকের খাদ্য হয়ে দাড়াল লাল মসুরি ডাল। এসময় আমার চাচা প্রচুর মানুষকে সাহায্য করেছেন। কিন্তু আমার স্মৃতিতে ভাসে- প্রচুর মানুষ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সামনে গিয়ে লাইনে ভিড় করতো সামান্য আটার খামির জন্য, যা দিয়ে তাদের পরিবারের লোকগুলোর জন্য খুব কষ্টে রুটি বানাতে পারতো। সাধারণত মহিলারা তাদের আঁচলে করে এসব খামি নিয়ে যেত। এরকম ভয়াবহ অবস্থার ভেতরেই সময় অতিবাহিত হতে লাগল। ডলি খানিক চিন্তিত হলেও মানসিকভাবে শক্ত ছিল।
আমরা মনে মনে ভাবতাম অন্যান্য গ্রামের মতো যদি রাতে আমাদের গ্রামেও পাকিস্তানি সৈন্যরা আসে তবে ডলি তো তার দায়িত্ব পালন করতে যাবে আর সৈন্যরা আমাদের ডলিকে মেরে ফেলবে।
ভাগ্য ভালো, এসব কিছুই ঘটলো না আর ডলিও তার মতো করে দায়িত্ব পালন করে যেতে লাগলো। আমাদের পাশের গ্রামের এক পাগল লোক শহর ঘুরে এসেছে এবং বলছেÑ এক দুই তিন, এখন আমি স্বাধীন। পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে তিনবার গুলি করলেও সে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু শহরে যখন শেষবার সে গেল আর ফিরে আসলো না। আর এমনই ছিল পাকিস্তানী বর্বর আর্মিরা। যুদ্ধ চলছিল। আমরা বিবিসি সংবাদ শুনে বুঝতে পারছিলাম সত্যিকার অর্থের স্বাধীনতা খুবই নিকটে। প্রকৃতপক্ষেই নয় মাসের যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সব কিছুর পরিসমাপ্তি হলো। নিয়াজীর নেতৃত্বে পাকিস্তানী সৈন্যরা প্রতিপক্ষ দল বাংলাদেশী সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পন করল। বিজয়ের দ্বিতীয় দিনে আমার মা প্রস্তুত হলেন আমার নানিকে দেখতে যাওয়ার জন্য। রিক্সায় করে মা, আমি ও  আমার ভাই-বোন গ্রাম থেকে রওয়ানা দিলাম। ডলিও পিছু পিছু  আমাদের সাথে আসছিল আমি রিক্সার পিছন দিক দিয়ে মাথা বের করে ডলিকে ডাকতে লাগলামÑ ডলি... ডলি... আসো... আসো..  
ডলি চার মাইল আমাদের পেছনে পেছনে এক নাগাড়ে দৌঁড়ে আসলো। শহরের প্রবেশদ্বারে সুরমা নদীর উপর ক্বীনব্রীজ ছিল। যা ভেঙ্গে সম্পূর্ণ রূপে আলাদা হয়ে গেছে। এই ব্রিজটি ১৮৩৬ সালে ওয়েন্টওর্থ এন্ড কোম্পানি বানিয়েছিলো। কোম্পানীটি ছিল ইংল্যান্ডের লাফবরার।  ব্রীজটি পাকিস্তানিদের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা নদী পার হওয়ার জন্য নৌকাতে উঠলাম তখন প্রচুর মানুষ ছিল। তন্মধ্যে একজন ডলিকে চুরি করে নিয়ে গেল। পলকেই ডলি হারিয়ে গেল। আমি কাঁদতে লাগলাম, আমার ডলি... আমার ডলি...
মা আমাকে শান্ত করার জন্য বললেনÑ আমাদের ডলিকে কে নিবে? আল্লা চায়  তো আমাদের ডলি আমাদের কাছে ফিরে আসবে। তুমি চিন্তা করো না। নদী পার হওয়ার সময় দেখলাম মাথা মুন্ডানো পাকিস্তানী সৈন্যরা  পানিশমেন্ট হিসেবে ব্রিজের মেরামত কাজ করছে। আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল তাদের বেল মাথায় পাথর ছুঁড়ে মারি। মাথা মুন্ডানো কাউকে দেখলে বলতাম- বেল মাথা চাইরানা, চাবি দিলে ঘুরে না। এদের দেখে আমার খুব রাগ হচ্ছিল । কারণ তাদের জন্যই আমার ডলি হারিয়ে গেছে। আমরা ডলিকে খুঁজতে লাগলাম। সকল আত্মীয়-স্বজনও ডলির জন্য আক্ষেপ করছিল। কিন্তু ডলি কখনোই ফিলে এলো না, কখনোই না।  

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT