ধর্ম ও জীবন

আমি কে?

মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০১-২০১৮ ইং ০০:৪৭:০২ | সংবাদটি ১৮৬ বার পঠিত

আমি কে? দু’টি শব্দ দ্বারা গঠিত প্রশ্নটি খুব ছোট। উচ্চারণ করতে এক সেকেন্ড লাগে। এর জবাব খুঁজতে বহুকাল লাগে। অনেক মনীষী, ঋষি, দার্শনিক সারা জীবন এর জবাব খুঁজেছেন। কোথায় ছিলাম? কেন এলাম? কোন কারণে? পুনরায় কোথায় যাব?
মানুষ নামক জীব মূলত দু’টি উপাদানে গঠিত। আত্মা দেহ। আত্মা কোন জিনিস? ইহা কি দ্বারা গঠিত? দেহের কোন অংশে তার বসবাস? এ সব প্রশ্নের জবাব মেলানো কঠিন। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এখন পর্যন্ত মানুষ আত্মা সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণা করে আসছেন। অত্যাধুনিক যুগেও মানুষ এর গঠন; আকৃতি, প্রকৃতি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বল, রূহ আমার প্রত্তুর নির্দেশ। অর্থাৎ এক হুকুম ছাড়া আর কিছুই নয়। এর বেশি মানুষ আর কিছুই জানেন না।
এক বিশেষ মুহূর্তে প্রাণীদেহে আত্মা সংযোজিত হয়। প্রাণী তা টেরই পায় না। আবার নির্দিষ্ট সময় পর দেহ ত্যাগ করে। ঐ সময় প্রাণী টের পায়। মানবাত্মা দেহ ত্যাগের সময় কত কষ্ট, কত যাতনা! কষ্টের মাত্রা যার যার কর্ম ফলের উপর নির্ভরশীল। দেহে আত্মার সংযোজন-বিয়োজনে মানুষের কোনো হাত নেই। তা চুল পরিমাণ হেরফের করতে কারো সাধ্য নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে ৮ সপ্তাহ পর অন্তসত্ত্বা নারীর গর্ভে প্রাণের সঞ্চার ঘটে। কিভাবে ভ্রুণে প্রাণের সংযোজন হয় যা মা টেরই পান না। ইহা মানুষের অজানা। গবেষণা করে কি এর কুল কিনারা পাওয়া যাচ্ছে?
আল্লাহ পাক বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা মানুষের ও তাঁর আত্মার মধ্যে বিরাজমান। আত্মা হলো দেহের রাজা। নিজেকে চিনতে না পারলে মানুষ আত্মাকে চিনতে পারবে না। লালন ফকির তাঁর বিখ্যাত গানের মাধ্যমে আত্মাকে খুঁজেছেন। ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।’
দেহ তত্ত্ব নিয়ে তাঁর চিন্তা ও চেতনা গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু আত্মার পরিচয় দিতে পারেননি। আত্মা এমন এক অতি আশ্চর্য্য আল্লাহর আদেশ (হুকুম) যার প্রকৃত তত্ত্ব অনুধাবন করতে জ্ঞানবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে দিশেহারা ও ব্যর্থ করে দেয়।
আত্মা ছাড়া দেহের কোনো মূল্য নাই। মানুষের দৈহিক গঠন কতো সুন্দর, কতো মনোরম! অক্ষি কোটরে রক্ষিত চক্ষুদ্বয় ডানে-বায়ে ও উপর-নিচ নড়তে সক্ষম। মানুষ এক টানা চেয়ে থাকতে পারেন না। চোখের পাতা মারতে হয়। মানুষ দৈনিক শত শত বার চোখ নাড়া ছাড়া করেন ও চোখের পাতা মারেন। তাতে ব্যাথা হয় না। নাসারন্দ্র দিয়ে দৈনিক শত শতবার শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া হয়। তাতে নাকের ভেতর শুকিয়ে ফেঁটে চৌচির হওয়ার কথা। কিন্তু না, কোন সমস্যা হয় না। গাড়ির টায়ার দীর্ঘ দিন ব্যবহারের ফলে ক্ষয় প্রাপ্ত হয়। খাজ মুছে গিয়ে ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। মানুষ ৬০/৭০ বছরের জীবনে হাজার হাজার কিলোমিটার হাঁটেন। সে হিসেবে পায়ের পাতা থেকে ক্ষয় হয়ে হাটু পর্যন্ত উঠত। কিন্তু না, চুল পরিমাণও ক্ষয় প্রাপ্ত হয় না। শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার ছ’মাস পূর্বে মায়ের স্তনে দুধ আসে। শিশু ভূমিষ্ট হয়ে মায়ের বুকের দুধ পানের জন্য প্রস্তুত পায়। বুকের দুধ কুসুম গরম থাকে। কেননা ঠান্ডা দুধ পান করলে শিশুর নিউমোনিয়া হতে পারে। চুল ও নখ কাটলে ব্যাথা হয় না। বয়স বৃদ্ধি পেলে চুল সাদা বর্ণ ধারণ করে। মানুষ বৃদ্ধ হতে থাকেন। কোন কারণে মানুষ বৃদ্ধ হন তা চিকিৎসা বিজ্ঞানের অজানা।
বার্ধক্য ঠেকানোর জন্য কতো গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। এর নেপথ্যে কার হুকুম? নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা। মানবদেহ স্রষ্টা কতো নিখুঁত ভাবে সৃজন করেছেন তা লিখে শেষ করা যাবে না। তবে আত্মা বেরিয়ে গেলে দেহ পচে গলে বিনষ্ট হয়। কোনো মূল্য থাকে না। তখন মৃত ব্যক্তির পরিচয় হয় ‘লাশ’ হিসেবে।
আল্লাহ পাক মানুষের আত্মা সৃষ্টি করে রূহ জগতে রেখেছেন। রূহ জগৎ থেকে মাতৃগর্ভে ভ্রুণে আত্মার প্রবেশ ঘটে। গর্ভে বাচ্চার নড়াছড়া মা বুঝতে পারেন। সাধারণত ১০ মাস ১০ দিন পর মানব সন্তান ভূমিষ্ট হয়। ৫/৬ বছর যাবৎ শিশু একেবারে অবুঝ থাকে। তার স্মৃতি শক্তি দুর্বল থাকে। ৭/৮ বছরের বাচ্চার স্মৃতি শক্তির উন্নতি হতে থাকে। এ বয়সের কিছু ঘটনা পরিণত বয়সে স্মরণ থাকতে পারে। ৮/১০ বছর পেরিয়ে ১২/১৪ বছরে পৌঁছিলে শিশুর বোধ শক্তি বৃদ্ধি পায়। যৌবন প্রাপ্ত হলে তাদেরকে পূর্ণ মানব হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের পাপ পূণ্যের হিসাব নিকাশ শুরু হয়। তবে আমাদের রাষ্ট্রীয় আইনে ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের ভোটাধিকারসহ মতামতের মূল্য থাকে না। ১৬, ১৮, ২০ পেরিয়ে মানুষ পূর্ণ যৌবন লাভ করে। ২৫/৩০ বছরের মানব পূর্ণ যৌবনের অধিকারী। তাদের দেহ সুগঠিত থাকে। ইহাই মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। ৩৫/৪০ বছর পেরিয়ে মানুষ পৌঢ় বয়সের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ৬০/৭০ বছর হলে বৃদ্ধ বলে বিবেচিত হন। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দুর্বল হতে থাকে। স্মৃতি শক্তি কমতে থাকে। ৭৫/৮০ বছর হলে বার্ধক্যের বোঝা বৃদ্ধি পায়। ৮০ বছরের পর মানুষ পুনরায় বাচ্চাদের মতো দুর্বল হতে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
জন্মিলে মরতে হবে। কেউ মাতৃগর্ভে মারা যান। কেউ শিশু-কিশোর বা যৌবনে মৃত্যুবরণ করেন। আবার কেউ পৌঢ় কিংবা বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেন। কে কখন কোন অবস্থায় পরলোকগমন করবেন তা সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ বলতে পারবেন না। দুনিয়া তাসের ঘর। ক্ষণিকের এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। ৬০/৭০ বছরের জিন্দেগীতে সুখ স্বাচ্ছন্দের জন্য আমরা কতো চিন্তা ও পেরেশানি করি। আমি কে? কোথায় ছিলাম? কেন এলাম? তারপর কোথায় ও কিভাবে যাব তা নিয়ে ভাবা দরকার। ঐ ভাবনা মৃত্যুর কঠিন ঘাট ও পরকালের জীবনের সুফল বয়ে আনতে পারে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT