ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কোরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০১-২০১৮ ইং ০০:৪৭:৫৭ | সংবাদটি ৩৫ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
আরো একটা যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, হজ্জ ফরয হওয়া ও হজ্জের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজের নির্দেশ ইসলাম ইতোপূর্বেই দিয়েছিলো। তাছাড়া হজ্জ যে একটা ফরয কাজ, তা হিজরতের পূর্বে মক্কায় থাকাকালেই জানানো হয়েছিলো। তবে এই উক্তির সপক্ষে তেমন কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। অবশ্য এ কথা সত্য যে, মক্কী সূরা ‘হজ্জের’ কিছুসংখ্যক আয়াতে হজ্জের অধিকাংশ করণীয় কাজের উল্লেখ এভাবে পাওয়া যায় যে, ইবরাহীম (আ.) কে এ সব কাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। ওই সূরার ২৬ থেকে ২৯নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘স্মরণ করো সেই সময়টিকে, যখন আমি ইবরাহীমকে এই ঘরের জায়গা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলাম তাওয়াফকারী ও রুকু সেজদাকারী লোকদের জন্য পবিত্র রাখো। লোকদেরকে হজ্জ করার জন্যে আহবান জানাও, তারা তোমার কাছে সকল দূরবর্তী স্থান থেকে পায়ে হেঁটে ও উটের ওপর সওয়ার হয়ে আসবে, যাতে তাদের জন্যে এখানে রক্ষিত সুবিধসমূহ তারা প্রত্যক্ষ করতে পারে এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনে সেই জন্তু জানোয়ারের ওপর তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে, যা তিনি তাদেরকে দান করেছেন, তা তারা নিজেরাও খাবে এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্র্য লোকদেরকেও দেবে। পরে তারা নিজেদের ময়লা কালিমা দূর করবে। নিজেদের মান্নতসমূহ পূরণ করবে এবং প্রাচীনতম ঘরের তাওয়াফ করবে।’
অতপর ৩২নং আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে, ‘এটাই হচ্ছে আসল হজ্জ। যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, তার সে কাজ অন্তরের তাকওয়ার আওতাভুক্ত।’ অতপর ৩৬ ও ৩৭নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কুরবানীর উটগুলোকে আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত করেছি। তোমাদের জন্যে তাতে বিপুল কল্যাণ নিহিত আছে। কাজেই ওইগুলোকে দাঁড় করিয়ে ঐগুলোর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। আর (কুরবানীর পর) যখন তাদের পিঠগুলো মাটির ওপর স্থির হয়, তখন তা থেকে নিজেরাও খাও, আর যারা অল্পে তুষ্ট হয়ে চুপচাপ আছে এবং যারা এসে নিজেদের অভাবের কথা ব্যক্ত করে, তাদেরকেও খাওয়াও। তোমরা যাতে শোকর আদায় করো, সে জন্যে এই জন্তুগুলোকে আমি এভাবে তোমাদের জন্যে অনুগত করে দিয়েছি। আল্লাহর কাছে ওইসব জন্তুর গোশতও পৌঁছে না, রক্তও পৌঁছে না, কিন্তু তোমাদের তাকওয়া তাঁর কােেছ অবশ্যই পৌঁছে। তোমরা যাতে তাঁর হেদায়াত অনুযায়ী আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পারো। সে জন্যে তিনি এভাবে ওই জন্তুগুলোকে তোমাদের অনুগত করে দিয়েছেন। আর তুমি সৎকর্মশীলদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দাও।’
উল্লেখিত আয়াতগুলোতে কোথাও সরাসরিভাবে এবং কোথাও ইঙ্গিতে হজ্জের কয়েকটি মৌলিক কাজ ও আচার অনুষ্ঠান যথা কুরবানী, তাওয়াফ, এহরাম থেকে মুক্ত হওয়া ও আল্লাহর নাম স্মরণ করা ইত্যাদির উল্লেখ রয়েছে। মুসলিম উম্মাহর পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.) এর জীবনবৃত্তান্ত বর্ণনার মাধ্যমে এখানে প্রকারান্তরে মুসলিম উম্মাহকেই সম্বোধন করা হয়েছে। মুসলমানরা যেহেতু হযরত ইবরাহীমের সন্তান এবং হযরত ইবরাহীম (আ.) হজ্জের এই সব আচার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছিলেন, তাই এ বর্ণনা থেকে আভাস পাওয়া যায় যে, হজ্জ অনেক আগে থেকেই মুসলমানদের ওপর ফরয হয়ে আছে। কিন্তু কাবা শরীফের যাবতীয় কর্তৃত্ব মোশরেকদের হাতে থাকায় এবং সেই মোশরেকদের সাথে মুসলমানদের বনিবনা না থাকায় এ যাবত মুসলমানদের পক্ষে হজ্জ পালন করা সম্ভব ছিলো না। এটা একটা ভিন্ন যুক্তি বটে।
ইতোপূর্বে এই পারার শুরুতে আমি এ কথা বলে এসেছি যে, দ্বিতীয় হিজরিতে কেবলা পরিবর্তনের পর কিছু কিছু মুসলমান ব্যক্তিগতভাবে হজ্জ আদায় করতেন। যাই হোক, হজ্জ ফরজ হওয়ার ইতিহাস সম্পর্কে এখানে যা কিছু বর্ণনা করা হলো হজ্জ সংক্রান্ত আলোচ্য আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
এবার ১৯৬নং আয়াত লক্ষ্য করুন। এতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা হজ্জ ও ওমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে পূর্ণ করো। তবে কোথাও যদি অবরুদ্ধ হয়ে যাও, তবে যে কুরবানীই সম্ভব, তাই পেশ করে দাও। আর যতক্ষণ কুরবানী যথাস্থানে পৌঁছে না যায়, ততক্ষণ নিজের মাথা কামিওনা। কিন্তু যে ব্যক্তি রুগ্ন হয়ে পড়ে, অথবা তার মাথায় কোনো ব্যাধি হয়, (এবং সে জন্যে মাথা কামিয়ে ফেলে) তার ফিদিয়া হিসাবে রোযা রাখা, সদকা দেয়া অথবা কুরবানী করা কর্তব্য। এরপর যদি শান্তি ফিরে আসে ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় (এবং তোমরা হজ্জের আগেই মক্কায় পৌঁছে যাও) তবে তোমাদের যে ব্যক্তি হজ্জের সময় আসা পর্যন্ত ওমরার সুযোগ গ্রহণ করবে, সে যেন সামর্থ অনুসারে কুরবানী দেয়। আর তা সম্ভব না হলে সে যেন তিনটি রোযা হজ্জের সময়ে এবং সাতটি বাড়ি ফেরার পর রাখে। এভাবে মোট দশটি রোযা পূর্ণ হবে। যাদের ঘরবাড়ি মাসজিদুল হারামের নিকটবর্তী নয় তাদের জন্যে এই সুবিধা। আল্লাহর এই আদেশসমূহ সম্পর্কে সতর্ক থাকো এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।’
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT