সাহিত্য

মেঘ বালিকা

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০১-২০১৮ ইং ২৩:১৯:২৫ | সংবাদটি ১১৭ বার পঠিত

ভোরের সূর্যটা আজ যেন অতি সুন্দর। কোথাও মেঘের লেশমাত্র নেই। ভোরের পাখিরা কুজন করতে করতে কখন নিরব হয়েছে খেয়াল নেই। দূরে লাল সূর্যটা নব বারতা নিয়ে আলো ছড়াচ্ছে। সোনালী রোদের আভায় নেয়ে উঠেছে পরীক্ষামূলক চাষ করা বিএডিসির বিশাল এলাকার সবুজ ধানক্ষেত আর তামাবিল রোডের পাশে রোপন করা দুসারি বুড়ো গাছ।
শহরতলীর গাছ গাছড়ারা কম যায় না। রঙিন স্বপ্ন নিয়ে জেগে উঠেছে। ভোরের আলো অবগাহন করছে। মেঘ বালিকা ভাবে- হয়ত আজ রঙিন স্বপ্ন নিয়ে আসছে লাল সূর্য। হয়ত- মেঘ হয়ে আর বাতাসে বেড়াতে হবে না। বৃষ্টি হয়ে নামার আগে সূর্যের তাপ চাই। সে তাপ হয়ত আজ সৃষ্টি হবে ভোর গলে দুপুর হবে। সূর্যের আলো হবে আরও প্রখর। প্রচন্ড তাপে সমুদ্রে ডিপ্রেশন তৈরি হবে। বিকাল গড়িয়ে যখন রাত্রি নামবে, ভ্যাপসা গরম সরিয়ে দিতে আসবে বৃষ্টি। কাল বৈশাখির মত ঝড়ঝাপটা শুরু হবে। মেঘ বৃষ্টি হয়ে নামতে চাইবে। গগণ বিদারি মেঘের ডাক সবাই শুনতে পাবে। আচমকা কেঁপে উঠবে সে ডাকে। তথাপি বৃষ্টি চাইবে সবাই। স্বস্তির বৃষ্টি। মেঘবালিকা বৃষ্টি হয়ে নামবে মাটিতে। সে বৃষ্টির ফোটা তাজা করে তুলবে ধুলিমলিন পৃথিবী। আড়মোড়া দিয়ে জাগবে সে, হাসবে তৃপ্তির হাসি...।
মেঘবালিকার স্বামীর ঠিকানা মধ্যপ্রাচ্য। ওখানেই সময় পার করেন। মাঝে মধ্যে দেশে আসেন। তাও আবার বছর দুয়েক পর। তাও নিয়মিত না। এরই মধ্যে সে দু’সন্তানের জননী। তলু আর মলু। ওরা টুইনস। এক সাথে বেড়ে উঠছে। দুটোই ছেলে। মেঘ বালিকা ওদের নিয়েই থাকে। আকাশে ঘুড় ঘুড় শব্দ কিংবা গ্রীষ্মের দাবদাহ সবই পার হয় ও দুটোর হাত ধরে। ভয় করে না। ওরা ছোট হলেও বিপদে আপদে গায়ের সাথে লেপ্টে থাকে। মনে জোর পায় মেঘ বালিকা। আশায় বুক বাঁধে। ওদের বয়স দু’বছর। আর ক’টা দিন পরেই তো ওরা বড় হবে। ওরা দুজন দুনয়নের মণি। ঝড় ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাসে ওরাই হাত ধরে। চোখের পানি মুছে দেয়। কেঁদো না মা। আমরা আছি। কিচ্ছু ভেবানা। আমরা বড় হব, অনেক বড়। তোমাকে অনেক সুখে রাখব মা। আমাদের বাবার মত। বাবা যেভাবে তার মাকে আগলে রাখে আমরাও তোমাকে ওভাবে আগলে রাখব। কোনো দুঃখ তোমাকে ছুতে পারবে না। এতো টুকুন ছেলেদের বোধশক্তি অনেক প্রখর। সবই বুঝে, কথাও বলে কিন্তু আকারে ওরা অনেক ছোট। তারপরও মুখের সান্ত¦না অনেক কিছু। বিপদে এতোটুকু সান্ত¦না স্বস্তি আনে। ক্ষণিকের তরে ভাব জাগায়।
তলু, মলুর বাবা আসবে আজ। বিকেলের ফ্লাইটেই আসার কথা। কিছুদিন ধরে মেঘ বালিকা আলাদা বাসায় উঠেছে। ওর শাশুড়ির সাথে বনিবনা নেই। বিয়ের পর থেকে সে দেখে আসছে ওর স্বামীর মাতৃভক্তি। সেটা মাতৃভক্তি নয় মাতৃভীতি বললেও ভুল হবে না। একান্তে দু’দন্ড থাকা যায় না। কেন যে শাশুড়ি এরকম করে তা তার বোধগম্য নয়। বিয়ের সময় শ্বশুর, শাশুড়িসহ সবাইতো পছন্দ করে আনল। টাকা পয়সারও অভাব নেই। গ্রামে সহায় সম্পত্তি, শহরে নিজস্ব বাসা, ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত। মেঘবালিকার ভাসুর থাকে লন্ডনে। তারও ইনকাম কম নয়। তারপরও কেন জানি শাশুড়ি কাল হয়ে দাঁড়াল সে ভেবে পায় না। তার যতোটুকু সম্ভব সব ধরনের চেষ্টা তদবির করেছে, শাশুড়িকে মানিয়ে চলার। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বিয়ের পর পর একটু স্বাদ আহ্লাদ সবারই থাকে, স্বামী নিয়ে ঘোরে বেড়ানোর। যেই মাত্র প্রস্তুত হয়েছে ঘর থেকে বের হওয়ার, অমনি শাশুড়ির চিৎকার। আরে... কে কোথায় আছরে, এদিকে আসরে আমার হাটু ধররে। হাঁটুর ব্যথায় নিলরে ও মাগো ও আল্লাহ। মেঘবালিকার স্বামী সবার আগে ছুটে যায় মাকে ধরতে। ওমা কী হল। হেই মালিশ নিয়ে আয়- বিদেশী মালিশ...। ও মালিশ করে আর বলে মা তোমার কী হল? চল ডাক্তারে নিয়ে যাই। আর যায় কোথা।
মেঘবালিকার স্বামীর সাথে আর বেড়ানো হল না। ওর স্বামী মাকে নিয়ে গেল ডাক্তারে। মনের ইচ্ছা মনেই মিলিয়ে যায়, সে স্বপ্ন বাস্তব হয়ে উঠে না। এটা শুধু একদিন নয়। মেঘবালিকা অনেক বার দেখেছে। যখনই তার স্বামী একটু সান্নিধ্যে আসে অমনি বিভিন্ন ছলছুতোয় ওকে নাম ধরে ডেকে নিয়ে যায়। স্বামী, সংসার, স্বপ্ন সবই একাকার হয়। মনের দুঃখ মনেই চেপে রাখে। বাপের বাড়িতে এসে তা বলে না, চেপে রাখে। ওর যে বাপ-ভাই। সাথে সাথে ডিসিশান নিয়ে নিবে। ও শুধু অপেক্ষায় থাকে। তার স্বামী তাকেই ভালোবাসে। ও একমাত্র তারই হবে। এখন এরকম যাচ্ছে, হয়ত একসময় স্বামী তার দায়িত্ব নিবে। মায়ের কারসাজি বুঝবে। মা’র দায়িত্ব পালন করবে, আমারও দায়িত্ব কাধে নিবে। সুখী পরিবার হবে। রাজরাণীর বেশে সে ঘুরে বেড়াবে। স্বামী সন্তান নিয়ে হবে সুখের সংসার।
দেখতে দেখতে ছয় বছর কেটে গেল। স্বামী তার একান্ত হয় না। কোনো সময় নিরবে স্বামী স্ত্রী ঘরে আছে। মা হয়ত ছিলেন বাইরে। কলিং বেলের শব্দ আর মায়ের আগমন বার্তা যেন ওকে অস্থির করে তুলে। যেন সে এতোক্ষণ অপরাধে লিপ্ত ছিল। হুড়মুড় করে দৌড়ে গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াবে। এসে গেছেন মা। হ্যাঁ রে। মাকে ঘরে পৌঁছে এটা ওটা কতো কী ফুট ফরমায়েশ তামিল করছে। এদিকে বৌ যে একটা বাড়িতে আছে তা আদৌ খেয়াল নেই। রাত বারটা একটা পর্যন্ত চালছে গল্প গুজব আর মায়ের সাথে আড্ডা। গভীর রাতেও অনেক সময় উঠে গিয়ে মায়ের খোঁজ খবর নেন। মায়ের নামে অন্ধ। কোনো ভালোমন্দ আলাপ আলোচনার সময় নেই। কোনো খোজঁ গল্প, কোনো সুখ দুঃখ শোনার সময় নেই ওর। এরই মধ্যে দু’সন্তানের জন্ম হয়েছে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে মা-সন্তান বেঁচে আছি। সন্তানের পিতা হওয়ার পরও মাতৃভীতি যায় না। কী আজব স্বামীর ঘর। চারপাশে সবই আছে। কিন্তু সুখ নেই। সুখ যেন কোন পিঞ্জরে বন্দী। ধীরে ধীরে মেঘবালিকা তার মাকে বলে সে করুণ কাহিনী। মা থেকে বাবা বাবা থেকে ভাই। জেনে গেল সবাই। ওরা বল যেখানে স্ত্রী হিসেবে মূল্য নেই সেখানে থাকার কী দরকার। কিন্তু মেঘবালিকা ওর স্বামীকে, সংসারকে অনেক ভালোবাসে। তার মনে হয় একদিন না একদিন ওর স্বামী ওর একান্ত হবে। আমার জন্য না হোক সন্তানদের জন্য হলেও ওর ভুল ভাঙবে। স্বামী-সংসার সুখে ভরে উঠবে। ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। স্বামীকে ছাড়তে পারে না, সেপারেশন চিন্তা করতে পারে না।
বাপ-ভাইয়েরা সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আলাদা থাক। বাসা ভাড়া-খরচপাতি আমরা দিব। ও যমপুরীতে যাসনে। যদি এখানে তোর স্বামী আসে তো আসুক আর না হয় একাই থাক সন্তানাদি নিয়ে। অবশেষে এই সিদ্ধান্ত। মেঘবালিকা আজ সুখ খুঁজে একা। একটি ছোট্ট বাসার বাসিন্দা ওরা, মা আর দুই ছেলে তলু আর মলু।
মেঘবালিকার মা-বাবার বাসাও বেশ দূরে নয়। হেঁটে যেতে তিন/চার মিনিট লাগে। ওর মা আসেন সকাল বিকাল, কখনও থাকেন আবার কখনও থাকেন না। তবে সবসময় তদারকি করেন।
মেঘবালিকা আজ অস্থির। এই প্রথম কোনো আলাদা জায়গায় স্বামীর সাথে দেখা হবে। অন্য ভূবনে দুজন কপোত কপোতী আপন ভূবন তৈরি করবে। সেখানে থাকবে না কোনো পিছু টান। সে দেখবে না তার স্বামী ভীত সন্ত্রস্ত। ওকে দেখবে রাজার মত। বিশাল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। ওর পাশে থাকবে সে। হিরো হিরোইনের মতো থাকবে ওরা। কোনো চাপ থাকবে না।
দেখতে দেখতে বিকাল হল। মেঘবালিকা আকাশের দিকে চায়। পড়ন্ত বিকাল। কী সুন্দর। চোখ যত দূর যায় রঙিন দুনিয়াটা চোখে পড়ে। ওর বাসার বেলকনি থেকে দেখা যায় প্রধান সড়কের কিয়দংশ। রিকশা করে কত জোড়া যুবক যুবতী যায়। খিলখিল করে হাসে। ঢলে পড়ে একে অন্যের উপর। মনে মনে ঠিক করে এইবার আসলে ওভাবে একটা রিকশায় চড়ব। অনেক জায়গা ঘোরে বেড়াব। তলু মলুকে কোলে নিবো। দুজন দুজনকে বেশ মজা হবে। একটা ভাল হোটেলে চা খাব। জাফলং, মাধবকুন্ড, মাধব লেক সবই ঘুরব। ন্যাশনাল টি এস্টেট, তারাপুর চা বাগান, বিছনাকান্দি পাথুরে ঝরণা সবই দেখব ওকে নিয়ে। লোকে দেখবে, পাড়া দেখবে, মহল্লা দেখবে, আমরা স্বামী-স্ত্রী সুখী দম্পতি।
বিকাল গলে রাত হল। এতোক্ষণে ফ্লাইট আসার কথা। এখনও কোনো ফোন আসল না। বার বার মুঠো ফোন হাতে নিয়ে শাশুড়িকে ফোন করতে চাইল। কিন্তু পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত নিল পাল্টে। মেঘবালিকা ফোন করবে না। জান গেলেও না। একটা চাপা ক্ষোভ আর অভিমান ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল। এতো করে বুঝালাম আর বললাম এখানে আসতে অথচ রাত এখন ১২টা। ও আমার কথা রাখল না। যাকে ভালোবাসি সে ফিরে চাইল না। অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে কখন যে মেঘবালিকা ঘুমিয়ে পড়ল খেয়াল নেই। ভোরে মুঠো ফোন বেজে উঠল। তাড়াতাড়ি ফোন নিয়ে কানে ধরল। হ্যালো কে? তোমার স্বামী। তুমি কোথায়? আমি মায়ের কাছে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT