সাহিত্য

একুশে বইমেলার অসম্পাদিত বই

ফায়যুর রাহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০১-২০১৮ ইং ২৩:২০:১১ | সংবাদটি ২০১ বার পঠিত

লেখকের সৃষ্টিউম্মাদনা ও প্রকাশকের ব্যবসাপ্রণোদনা নিয়ে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির বইমেলা আসে। মেলাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বই প্রকাশ হয়। লাখো মানুষের সমাগম হয়। কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। কিন্তু জাতির মননগঠনে এ মেলা কতোটা ভূমিকা রাখেÑ প্রশ্নটা ঘুরেফিরেই আসে। প্রতিবছরই।
প্রশ্নটা মেলা নিয়ে নয়, মেলার পণ্য নিয়ে। মেলায় প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়ে। তাই বোদ্ধাজনরা যখন বলেন, মেলায় প্রকাশিত পাঁচ হাজার বইয়ের মধ্যে হাতে নেয়ার মতো পঞ্চাশটা বইয়ের নাম বলতে পারো? তখন মাথা চুলকাতে হয়। উত্তর দেয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফেব্রুয়ারির সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ অমর একুশে বইমেলা। বাঙালি মানুষের কাছে এ বইমেলার একটা আবেগগত মূল্য আছে। যে ক’টি বড় উৎসব বাঙালির হৃদয়দুয়ারে ধাক্কা দেয়, এটি তার একটি। এ উৎসবে সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে প্রকৃত পাঠকÑ এমনকি বইপত্রের সঙ্গে যাদের যোগাযোগই নেই, তারাও শামিল হন। মেলায় আসেন, বই কেনেন, বইয়ের সংস্পর্শে আসেন। ফলে বইয়ের সঙ্গে গণমানুষের মিলনমেলাও হয়ে যায় এটা। লেখকরাও অপেক্ষা করেন নতুন বই প্রকাশের। যারা লেখক নন, হয়তো হবেনও না, হতে চানও না, তারাও বই প্রকাশ করে ফেলেন। ফলে যারা সারা বছরের লেখক নন, তারা একুশে বইমেলার লেখক হয়ে যান।
আস্তে আস্তে এই প্রবণতা সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। সারা বছর বইপ্রকাশ বন্ধ রেখে ফেব্রুয়ারির মেলাতেই বই প্রকাশ করার ইচ্ছেটা আজকাল সবার মধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে এই প্রবণতার বাইরে কেউ আর থাকতে পারবেন না। প্রশ্ন হচ্ছে, বইমেলায় এক মাসে যে বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশ হয়, তা আমাদের সাহিত্যের ভান্ডারে মূল্যবান সংযোজন বলে দাবি করা যাবে কি? পাঁচ হাজার বইয়ের মধ্যে হাতে নেয়ার মতো পঞ্চাশটা নাম বলা যাবে কি? যদি তাই না হয়, তাহলে এই গ্রন্থস্তূপকে কী বলা যাবে? আবর্জনা? অথচ এটাই তো উৎপাদিত হচ্ছে। এটা নিয়ে বাণিজ্য হচ্ছে। অলেখকরা লেখকখ্যাতি পাচ্ছেন। আর রসিকরা ‘মোরগা লেখক’ ও ‘শেয়াল প্রকাশকের’ গল্প বলে হাসাহাসি করছেন। এই হলো ঘটনা।
একুশে বইমেলার এই বিপুলসংখ্যক বই কী প্রক্রিয়ায় প্রকাশ হয়, কীভাবে সম্পাদনা হয়, (আসলে হয় কি?) কীভাবে মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়, তা সকলের পক্ষে বুঝা কঠিন।
বলা হয়, বই হচ্ছে মানসিক খাদ্য। এই মানসিক খাদ্য গ্রহণের আগে আমরা কি জানার সুযোগ পাচ্ছি খাদ্যটি আসলেই পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত কিনা?
সঠিক তথ্য, উপযোগী ভাষা ও বিন্যাস, সৌকর্য, ভাষাশৈলী ও বিষয়ের সুনিপুণ উপস্থাপনাÑ এই সবই সম্পাদিত বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাহলে বইমেলায় অসম্পাদিত বই আসে কেনো? এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে মোটা দাগে কেবল টেকনিক্যাল বিষয়ের কয়েকটি দিক তুলে ধরা যাক।
একটা তথ্যতালিকা দিলে আলোচনাটা সহজ হতে পারে। ডাবল ডিমাই ১/১৬ আকারের ১০ ফর্মা, অর্থাৎ ১৬০ পৃষ্ঠার একটা সাধারণ মানের বই এক হাজার কপি প্রকাশ করতে এদেশের অধিকাংশ প্রকাশক খরচের যে হিসেবটি কষেন, তা মোটামুটি এ রকম : পান্ডুলিপি সম্পাদনা : শূন্য টাকা। (মোট খরচের শূন্য শতাংশ), প্রুফ রিডিং : তিন হাজার টাকা। (বইপ্রতি খরচ তিন টাকা), কম্পোজ ও ট্রেসিং : পাঁচ হাজার টাকা (বইপ্রতি পাঁচ টাকা), কাগজ : পঁচিশ হাজার টাকা। (বইপ্রতি খরচ পঁচিশ টাকা), পেস্টিং, প্লেট, মুদ্রণ : ছয় হাজার টাকা। (বইপ্রতি খরচ ছয় টাকা), বোর্ড বাঁধাই, পুস্তানি : বাইশ হাজার টাকা। (বইপ্রতি খরচ বাইশ টাকা), কভার (ডিজাইন, প্রিন্ট ও লেমিনেশন) : দশ হাজার টাকা। (বইপ্রতি খরচ দশ টাকা। মোট : একাত্তর হাজার টাকা।
তালিকার দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে, যেখানে প্রত্যেকটি বইয়ের উৎপাদন খরচ একাত্তর টাকা; তার মধ্যে পান্ডুলিপি সম্পাদনার খরচ শূন্য। অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্প এমন একটা স্তরে আছে, যে-স্তরে পান্ডুলিপি সম্পাদনা এখনো খরচের কোনো খাত হয়ে ওঠেনি। কিন্তু যেসব দেশ প্রকাশনাশিল্পে উন্নতি করেছে, তাদের কাছে এটিই খরচের সবচেয়ে বড় খাত। কারণ এটা হলো সেই খাত, যে খাতের উপর নির্ভর করে বই নামক পণ্যটির গ্রহণযোগ্যতা, স্থায়িত্ব, বিক্রি, লেখক ও প্রকাশকের ঔজস্বিতা। বৃহত্তর অর্থে সমাজের অগ্রগতি। তবে খরচের সবচেয়ে বড় খাত হলেও এটা এমন একটা খাত, যে খাতে একবার ব্যয় করলে ভবিষ্যতে যতবারই বইটা ছাপা হোক, ব্যয় আর বাড়বে না।
তথ্যতালিকায় উল্লিখিত বইটির সম্পাদনা বাবদ যদি দশ হাজার টাকাও ব্যয় ধরা হতো, তাহলে বইপ্রতি দশ টাকা করে অতিরিক্ত খরচ যোগ হতো। ভবিষ্যতে এই বই দশ হাজার কপি ছাপা হলেও খরচ আর বাড়তো না। তখন বইপ্রতি সম্পাদনা বাবদ খরচ গিয়ে দাঁড়াতো মাত্র এক টাকায়। কিন্তু খরচের অন্য প্রায় সকল খাতের চরিত্রই এই হিসেবের উল্টো। বই যতো বেশি ছাপা হবে, খাতওয়ারি খরচ ততো বাড়বে। শুধু তাই নয়, সময় যতো গড়িয়ে যাবে, খরচও ততো বাড়তে থাকবে।
বাংলাদেশের লেখক ও প্রকাশকদের পান্ডুলিপি সম্পাদনা ও খরচের খাতগুলোর তুলনামূলক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে না পারা বইমেলায় অসম্পাদিত বই আসার একটা কারণ। এর পরের কারণটা হলো লেখকদের উচ্চাভিলাস। যে যতোটা না লেখক, তার চেয়ে বেশি ঢেকুরের ফলে জনপ্রিয় হওয়ার মোহ এখন নদীর প্রবাহের মতো একটা ধারা তৈরি করছে। তরুণ লেখকরা এ ¯্রােতের খড়কুটো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই।
মেলায় অসম্পাদিত বই আসার আরেকটা কারণ হলো, একুশে বইমেলার প্রায় সকল পান্ডুলিপি তৈরি হয় মেলার দু’তিন মাস আগে। এবং এই পান্ডুলিপির সংখ্যা থাকে পাঁচ হাজারেরও বেশি। এগুলোর পৃষ্ঠাসংখ্যা গড়ে ১০০ ধরলে মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা দাঁড়ায় ৫ লাখ। গড়পড়তা প্রতিটি পৃষ্ঠায় ৫০০ শব্দ থাকলে মোট শব্দসংখ্যা হয় ২৫ কোটি। ঈযরপধমড় গধহঁধষ ড়ভ ঝঃুষব অনুযায়ী একজন দক্ষ সম্পাদককে এক লাখ শব্দের একটি পান্ডুলিপি সম্পাদনা করতে ১২০ ঘণ্টা নিবিড়ভাবে কাজ করতে হয়। সম্পাদকের মতামতের ভিত্তিতে লেখক যদি পান্ডুলিপিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন, তবে আরো বেশি সময় প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে সম্পাদক পান্ডুলিপিটি তিনবার সম্পাদনা করেন। প্রকৃত শ্রমঘণ্টা ৬ ধরলে এই কাজে তার লাগবে ২০ দিন। সুতরাং একুশে বইমেলার সব বই যদি এ ধরনের একজন সম্পাদককে সম্পাদনা করতে হয়, তাহলে তার প্রয়োজন হবে ৫০ হাজার দিন, অর্থাৎ প্রায় ১৩৭ বছর। বাংলাদেশে দক্ষ পান্ডুলিপি সম্পাদক যদি ১০০ জনও থাকেন এবং তাঁদের প্রত্যেকে যদি ৫০০ দিন নিবিড়ভাবে কাজ করেন, তাহলে বইমেলার সব বই সম্পাদিত হয়ে প্রকাশ হওয়া সম্ভব। আর সব বই দুই মাসের মধ্যে সম্পাদনা করতে হলে লাগবে প্রায় ৮৩৩ জন সম্পাদক। এতো সম্পাদক দেশে আছেন কি? আর এতো সময়ইবা লেখক-প্রকাশকের আছে কি? লেখকের সৃষ্টিউন্মাদনা ও প্রকাশকের মুনাফার তাড়নার কাছে সম্পাদনার মতো মানবিক শ্রমও এখানে নিতান্ত অসহায়। মেলায় অসম্পাদিত বই আসার প্রধান কারণ এটা।
সম্পাদনার কয়েকটি ধাপ আছে। সম্পাদনার সময়ের যে হিসাবটা আগে দেয়া হলো, এটা সম্পাদনার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। এর আগের ধাপে রয়েছে উন্নয়নমূলক সম্পাদনা। এই ধাপে পান্ডুলিপিকে উদ্দিষ্ট পাঠকের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। এ পর্যায়ে পান্ডুলিপির বিষয় ও চরিত্র অনুযায়ী সম্পাদক ও লেখক অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন। এর পরের ধাপেই আসে কারিগরী সম্পাদনা। এটা পান্ডুলিপির বাক্য, ব্যাকরণ, বানান, যতি, টাইপ, স্পেস ইত্যাদির পরিমিতি নির্ধারণ করে। এর পরে, একেবারে শেষে থাকে প্রুফ-রিডিং।
সাধারণত উন্নত প্রকাশনা সংস্থাগুলো সম্পাদনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের কাজ সম্পন্ন করেই পান্ডুলিপি প্রকাশ করে। প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেন পেশাদার সম্পাদক বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তিন ধাপ পার হওয়ার পরেও অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ হয় না। প্রবন্ধ বা গবেষণামূলক পান্ডুলিপি হলে নির্ঘণ্ট, শব্দসংক্ষেপ, শব্দসংকেত, পরিশিষ্ট, গ্রন্থপঞ্জি, বিস্তারিত সূচি ইত্যাদি বহু রকমের কায়কারবার আছে, যেগুলো পৃথকভাবে করতে হয়।
এতসব বিষয় না জানার অনেক সুবিধা! ‘শেয়াল প্রকাশকরা’ নতুন লেখকদের এই অজ্ঞানতা ও সৃষ্টিউন্মাদনাকে কাজে লাগান। নবীন লেখকদের কাছ থেকে দ্বিগুণ পয়সা নিয়ে বইমেলায় তাদের বই প্রকাশের বন্দোবস্ত করেন। এতে ‘শেয়াল প্রকাশকদেরই’ সুবিধা। মুনাফা করার।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে গ্রন্থউন্নয়ন ও পাঠক বাড়ানোর নামে রাষ্ট্রের যারা কর্তা, তারা রাষ্ট্রের পয়সা খরচ করে বিদেশ থেকে নি¤œমানের বই কিনে আনেন। একটি রাষ্ট্র যতোই উন্নত হোক, তার সংগ্রহশালার ধারণক্ষমতা কিন্তু অসীম নয়। আমাদের দেশের অতি অল্প আয়তনের সংগ্রহশালাগুলো বিদেশি নি¤œমানের গ্রন্থসাদৃশ্য আবর্জনায় ভরিয়ে দেয়া হয়। এতে সুবিধা হচ্ছে ভরানোর কাজে যুক্তদের লাভ, মানুষ আবর্জনায় ডুবে থাকলে আয়েশে শাসন-শোষণ করা যায়।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তাদের অধিভুক্ত সারাদেশের কয়েক হাজার লাইব্রেরিতে যোগান দেওয়ার জন্য যেসব গ্রন্থ স্তূপ করে রেখেছে, সেগুলোর সঙ্গে শাহবাগের জাতীয় গণগ্রন্থাগারের সংগ্রহশালার নমুনা পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই উপলব্ধি করা যায়, দেশে কেন ভালো বইয়ের পাঠক কমছে। এ দুটো প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কিছু মন্ত্রণালয় এবং দেশিবিদেশি বিভিন্ন উন্নয়নবাণিজ্যিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে কিছু ভালো বইয়ে শাক দিয়ে ঢেকে বিবিধ প্রক্রিয়ায় অসংখ্য নি¤œমানের বইয়ের মাছ জাতিকে খাইয়ে যাচ্ছে। নি¤œমানের বই পাঠ করে পাঠকদের রুচি বিগড়ে যাচ্ছে। ফলে আরো নিকৃষ্ট বইয়ের চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে। রুচিশীল পাঠক বইবিমুখ হয়ে পড়ছে। এটা একটা দুষ্টচক্র। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT