মহিলা সমাজ শাম্মী আখতার

চিঠি দিও প্রতিদিন!

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০১-২০১৮ ইং ২৩:৫০:২৭ | সংবাদটি ১৪৪ বার পঠিত


বাংলাদেশের তিনজন গানের শিল্পী আমার গানের গুরু। ফরিদা পারভীন, সাবিনা ইয়াসমিন এবং শাম্মী আখতার। সবাই ভাবছেন তাঁরা আমার গুরু হলেন কিভাবে? আসলে আমি তাঁদের সরাসরি কোন ছাত্রী না, তবে ছোট বেলায় রেডিওতে তাঁদের গান শুনে শুনে গভীর মনোযোগ দিয়ে গান শিখতাম। সে-ই গুরুদের একজন ‘শাম্মী আখতার’ চলে গেলেন গত ১৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিকেলে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। তিনি স্বামী সংগীত শিল্পী আকরামুল ইসলাম, এক ছেলে সহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাক্সক্ষী রেখে গেছেন।
ছয় বছর ধরে শাম্মী আখতার স্তন ক্যান্সারে ভুগছিলেন। মঙ্গলবার দুপুরে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ায় রাজধানীর চামেলীবাগের বাসা থেকে বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তাঁকে। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই বিকেল ৪টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আমাদের সকলের প্রিয় শিল্পী শাম্মী আখতার।
‘শাম্মী’ নামে পরিচিত হলেও তাঁর আসল নাম শামীমা আখতার। আদর করে সবাই ডাকতেন শাম্মী বলে। এই শিল্পী ১৯৫৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন। ছয় বছর বয়সে তাঁর সংগীত জীবনের শুরু। বাবা শামসুল করিম সরকারি চাকরি করতেন। বাবার বদলির কারণে দেশের কয়েকটি জেলায় বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে সংগীতের তালিম নেওয়ার সুযোগ পান শাম্মী আখতার। ১৯৭০ সালে তিনি খুলনা বেতারে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে ঢাকায় এসে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পান তিনি। পরে প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক সত্য সাহা তাঁকে ‘অশিক্ষিত’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ দেন। সেই ছবিতে তাঁর গাওয়া গান ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে’ গানটি তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শাম্মী আখতারকে। তাঁর গাওয়া আরও অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘মনে বড় আশা ছিল তোমাকে শোনাব গান’, ‘ভালোবাসলেই সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না’, ‘এই রাত ডাকে ঐ চাঁদ ডাকে হায় তুমি কোথায়’, ‘আমি যেমন আছি তেমন রবো বউ হবো না রে’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’ ইত্যাদি।
২০১০ সালে এই শিল্পী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। চলচ্চিত্রে এ শিল্পী প্রায় ৩০০ গান গেয়েছেন। তাঁর গানে হাতেখড়ি বরিশালের ওস্তাদ গৌর বাবুর কাছে। ১৯৭৭ সালে তিনি ঘর বাঁধেন সিলেটের সংগীত শিল্পী আকরামুল ইসলামের সঙ্গে। শাম্মী আখতার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর ২০১৭ সালের অক্টোবরে সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ তাঁর চিকিৎসায় অর্থ সাহায্য চাইলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তারপর পাঁচ বছর লড়াই করেছেন ক্যান্সারের সঙ্গে। অবশেষে হার মেনে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ‘ যেতে নাহি দিবো হায়! তবু যেতে দিতে হয়’। এ-ই তো নিয়ম! কিন্তু তাঁর কাছে সরাসরি সংগীত শিক্ষা নেওয়া শিষ্যরা যেমন তাঁকে হারিয়ে বেদনায়, শোকে মুহ্যমান তেমনি আমি শাম্মী আখতারের সরাসরি গানের ছাত্রী না হয়েও শোকে ভারাক্রান্ত। প্রতি মুহূর্তে মনে পড়ছে-ছোট বেলায় আমার বয়স যখন ১২/১৩ বছর তখন মা অসুস্থ হলে আমি সন্ধ্যার পরে ভাত রান্না করতাম, পাশে একটা পিঁড়িতে রাখতাম রেডিও। বাংলা ছায়াছবির গান শোনার জন্য বেতারের এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনের গান শুনতাম। শাম্মী আখতারের গান আসলে তাঁর কন্ঠের সাথে তাল মিলিয়ে গাইতাম। চেষ্টা করতাম অবিকল তাঁর মতো করে গাইতে। এভাবে গান শিখা ও গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে হঠাৎ দেখতাম ভাত রান্না হয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে মজার একটি ঘটনা বলছি-২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আমার আপন ছোট ভাইকে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলাম। মেরুদন্ডে আঘাত পেয়ে ভাইটা হাঁটতে পারতো না। সারাক্ষণ শুয়ে থাকতো। তাঁকে নিয়ে আমরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে, এক ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে আরেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতাম এ্যাম্বুলেন্সে করে। গাড়ির ভিতরে আমরা যাঁরা ভাইটির শুভাকাক্সিক্ষ, বন্ধু ছিলাম তাঁরা সকলে মিলে গাইতাম শাম্মী আখতারের সেই বিখ্যাত গান ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আসা পুরাইছে’। আমি গানটিতে প্রথমে লিড দিতাম। বাকীরা আমার সাথে কোরাস গাইতো। অসুস্থ ভাইটি বলতো-তোমরা সবাই আমারে লইয়া মজা খররায়? আমি বলতাম-না, তোমাকে ঢাকা শহরে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছি তুমি হেঁটে হেঁটে হানিফ গাড়িতে উঠবে। তারপর বাড়ি যাবে। আমার স্বপ্ন ছিলো তোমাকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করাবো। সেই আশা পূর্ণ হয়েছে। ঢাকায় এসেছি। এই জন্য মনের আনন্দে গান গাইছি। গাও তুমিও আমাদের সাথে। মেজর অপারেশনের জন্য এখনই মনোবল চাঙ্গা করো। ভাইটিও তখন কেঁদে কেঁদে গাইতো ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে। আমরা সকলে মিলে কেঁদে কেঁদে গাইতাম গানটি। আমার সেই ভাইটির সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আমি। আমার হাত ধরে সে বলতো তোমার কথা যেনো সত্যি অয়। আমি যেনো আবার হাঁটতে পারি।
অপারেশনের প্রায় ২০ দিন পর আমার প্রিয় ভাইটি, যাকে আমি তখন সন্তানের মতো সেবা করতাম। সেই ভাই আবার হাঁটতে শুরু করলো। একদিন বিকেলে হাসপাতালের কেবিনের বারান্দায় ভাইটি আমার কাঁধে হাত দিয়ে ধরে হাঁটছিলো। হঠাৎ সে আমার কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে নিলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম সে হাঁটছে আর একা একা গাইছে-‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে, মনের আশা পুরাইছে। আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে গাইলাম-আরে লাল, লাল, নীল, নীল বাত্তি দেইখ্যা নয়ন জুড়াইছে। ঢাকা শহর আইসা--- ভাইটি আমাকে বললো-তুমি খান্দিও না গো। তোমার চওকো পানি মানায় না!
আমার গানের গুরু শাম্মী আখতার না ফেরার দেশ থেকে এই গল্প কী পড়তে পারছেন! না পারলেও বলবো গুরুজি, চিঠি দিও প্রতিদিন! চিঠি দিও। কিংবা, ঐ রাত ডাকে ঐ চাঁদ ডাকে, হায়! তুমি কোথায় আমার গানের গুরু, প্রিয় শাম্মী আখতার। ঢাকা শহর গেলে কী তোমার দেখা পাবো? আমরা ক’জন বন্ধু! তুমি চিঠি দিও! তুমি চিঠি দিও---।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT