ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জলসা এবং আমাদের সংস্কৃতি

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০১-২০১৮ ইং ০৩:০৯:২৪ | সংবাদটি ২০২ বার পঠিত

কৃষ্ঠি এবং সংস্কৃতির ঐতিহ্যগত সম্পদের মধ্যেই বাঙালি জাতির বাস। ভৌগোলিক অবস্থান, বিভিন্ন সময়ের ঔপনিবেশিক শাষণ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন সব কিছুর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হওয়া ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে আছে, আবেগময় এক সম্পদশালী কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। উন্নত জীবনের আশায় পরিবর্তীত হয়েছে চলমান ধারা। পরিমার্জন ঘটেছে অনেক কিছুতে। সময়ের দোহাই দিয়ে সামাজিক রেওয়াজ আজ অবহেলিত। ষড়ঋতুর দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। মূলত ছয় ঋতুর ছয় রূপ নিয়ে এদেশের প্রকৃতি। কিন্তু তারপরও সমষ্টিগত ঋতু বৈষম্য বলতে শীত, গ্রীষ্ম আর বর্ষা। গ্রীষ্মকাল খুব গরম, বর্ষায় বৃষ্টি বন্যা ঝড় তোফানে জনজীবন অতিষ্ট। তাই উৎসব আয়োজনের শ্রেষ্ঠ সময় শীতকাল। কৃষি নির্ভর এই দেশের সমতল ভূমিতে যে ধান চাষ করা হয় তা শীতের শুরুতে পাকাধান কাটার মধ্য দিয়ে ফসলি জমির বিরাট অংশ শুকানো মাঠে পরিণত। দিগন্ত জোড়া হাওর বাওর মাঠকে দেখে মনে বিরাট সবুজ এক গালিচা, নীল আকাশকে সামিয়ানা বানিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ যেন ডাকছে আকাশ, ডাকছে বাতাস, ডাকছে মাঠের সবুজ ঘাস। আজ সবাই উৎসব আনন্দে মেতে থাক। আনন্দ ছাড়া জীবন জীবনই নয়। বিষয়, উদ্দেশ্য লক্ষ্য এবং সম্পর্কিত সকল সৃষ্টির উৎস হচ্ছে আনন্দ। তাই শীতকালকে ঘিরে আয়োজিত নানান উৎসবের মধ্যে আবহমান গ্রাম বাংলার এই উল্লেখযোগ্য উৎসব হচ্ছে, ওয়াজ-মাহফিল, যা ইসলাম ধর্মের প্রসারের জন্য পরিচালিত।
গ্রামে গ্রামে শীতের শুরু থেকেই আরম্ভ হয়ে যায় এমন ওয়াজ মাহফিলের। দুই থেকে কখনো কখনো কোন জায়গায় পাঁচ দিন ব্যাপী হয় এই ইসলামি জলসা বা মাহফিল। ইসলামি হামদ, নাথ, তেলাওয়াত, তর্জমা এবং বিভিন্ন আলেমদের সুন্দর বয়ানের মধ্য দিয়ে চলে ওয়াজ মাহফিল। এই জলসা যে অঞ্চল, বা গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়, সেই গ্রামের ঘরে ঘরে বয়ে চলে উৎসবের আমেজ। গ্রামের প্রতি ঘরের মেয়েরা এই ওয়াজ মাহফিলের উদ্দেশ্যে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি নাইওর আসে। যাদের শিশু-কিশোরবেলার খেলার সাথী বোন, বান্ধবী যাদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় একেকজন একেক জায়গায় অনেক দূরে বসবাস করে তারা সবাই ওয়াজ মাহফিলের উদ্দেশ্যে বাবার বাড়ি আসলে একে অন্যের দেখা হয়। আবার অনেকের বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয় স্বজন আসেন এই মাহফিলকে কেন্দ্র করে, ঘরে ঘরে চলে নবান্নের পিঠা উৎসব। সারাদিন কাটে সুখ দুঃখ হাসি কান্নার গল্পে। আর রাতভর চলে, আলেমদের বয়ান।
বেশিরভাগ জায়গায় মাহফিলকে ঘিরে মেলার আয়োজন করা হয়। এই সব মেলায় যেমন থাকে মুখরোচক নানান ধরনের খাবারের দোকান। তেমনি নারী পুরুষের সাজগোজ এবং নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রির পসরা সাজিয়ে বসে অনেক অস্থায়ী দোকান। আবার ছোট শিশুদের খেলার সামগ্রি নিয়ে বসে দোকান। গ্রামের ছোট বড় অনেকেই সারা বছর পয়সা জমিয়ে রাখে। এই রকম মেলা থেকে জিনিস কেনার জন্য। আবার যারা নাইওর আসে, তারা মেলা থেকে প্রয়োজনীয় টুকিটাকি কেনার বাজেট নিয়ে আসে। আরও মজার বিষয় হল, অঞ্চলভেদে এই সব মেলায় শুধু মুদ্রার বিনিময়ে যে ক্রয়-বিক্রয় হয় তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো জিনিসের বিনিময়ে চলে বেচাকেনা। যেমন কার্তিক-অগ্রহায়ণ থেকে শুরু হয়। সুপারির মওসুম; আবার এই সময়টাতে শীতের মজাদার শাক-সবজি, খেজুর গুড়ের সময়। তাই কখনো কখনো ওয়াজ মাহফিলে যে মেলা বসে, এই সব জিনিসের বিনিময়ে চলে ক্রয় বিক্রয়।
মোটকথা জলসাকে ঘিরে এক মায়া-মমতার বন্ধনে শুরু হয় মিলনমেলা। যদিও মুসলিমদের কেন্দ্র করে এই আয়োজন, কিন্তু খুশি আনন্দের ভাগিদার হয় সবাই। বাংলাদেশের চারপাশ ঘিরে রয়েছে প্রতিবেশি দেশ ভারত। দেশ বিভাগের আগে সব এক ছিল, আবার এখনো সীমান্তের কোনো কোনো জায়গায় নৈকট্য দেশের চেয়ে ভারতের বেশি। তাই প্রতিবেশি এই রাষ্ট্রের সাথে সীমান্তবর্তী এলাকার রয়েছে আত্মীয়তার বন্ধন, আর এই জন্য এইসব জায়গায় যখন ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন হয় তখন প্রতিবেশি দেশ থেকেও মেহমানরা আসেন বয়ান শুনতে এবং সেই সুযোগে আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে।
দুই থেকে পাঁচ দিন ব্যাপী চলা এই সব ওয়াজ মাহফিল বা জলসা অনুষ্ঠানে বড় রকমের খাবারের শিন্নির আয়োজন করা, শুকনো নেড়া ধোয়া মাঠে সারিবদ্ধভাবে চুলা করে চলে রান্নার আয়োজন। এই রান্নার আয়োজনে গ্রামের ধনী-গরিব সবাই অংশগ্রহণ করে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় রান্না সম্পূর্ণ হলে; খোলা মাঠে সারিবদ্ধভাবে বসে, কলাপাতায় শুরু হয় খাওয়া। ওয়াজ-মাহফিলে আসা বয়ানকারী হুজুরদের জন্য চলে খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা। শেষ মুনাজাতের মধ্য দিয়ে যদিও আয়োজনের সমাপ্তি হয়, কিন্তু তারপরেও আরেকটা আনুষ্ঠানিকতা থাকে, যে মঞ্চে এতোদিন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ওয়াজ বা বক্তৃতা করেছিলেন, সেই মঞ্চে আগত মেহমান, এবং গ্রামবাসীর কেউ কেউ উপহার সামগ্রি প্রদান করেন। এই উপহার সামগ্রির মধ্যে নগদ অর্থ, ব্যবহৃত নতুন জিনিসের সাথে থাকে আরও অনেক কিছু। গাছের লাউ, কুমড়া, নারিকেল থেকে শুরু করে ডিম, মুরগ, হাঁস, ছাগল, গরু সবই উপহার হিসাবে দেয়া হয়। এই উপহার আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে মূলত এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে গ্রামবাসি, আয়োজক এবং আগন্তু অতিথিদের মধ্যে ভালোবাসা প্রকাশ পায়। সমাজ বিজ্ঞানী কালর্টন বলেছেন-উপহার দেওয়া নেওয়াটা মানুষের সাথে প্রীতির সম্পর্ককে গাঢ় করে।
নতুনের প্রতি আকাক্সক্ষা মানুষের চিরন্তন, প্রকৃতির নিয়মেই যা কিছু পুরাতন হয় তাকে জড়তা ও জীর্ণতা গ্রাস করে। বিনাশের বীজ তার কর্মে প্রবিষ্ট। কাজেই নতুনের অমোঘ প্রতিষ্ঠা ও প্রসার এক সময় অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আর তাইতো সেকেলে বলে অনেক কিছু চলার মানসিকতায় আমাদের ব্যস্ত বর্তমান সমাজ। অথচ এই যে, ওয়াজ-মাহফিল বা জলসা যা আজও টিকে আছে, তা টিকে থাক! এর মধ্য দিয়ে আধুনিকতার বিকাশ ঘটাতে কোনো বাঁধা নেই। বিবেকই মানুষের মাঝে বিধাতার উপস্থিতি। যেহেতু এই ওয়াজ-মাহফিল বা জলসা ইসলাম ধর্ম কেন্দ্রিক, এবং এখানে যে আলোচনা হয়, সত্য ও সুন্দরের আলোচনা করা হয় এই ধারাবাহিকতা চলুক। সমাজ বিজ্ঞানী জর্জ ক্র্যাবি বলেছেন-‘প্রত্যেক ধর্মই ভালো, কারণ প্রত্যেক ধর্মই মানুষকে ভালো হবার শিক্ষা দেয়।’ তাই এমন ভালো কাজে সমাজের উপকার নিহিত। যেহেতু এই আচার বা সংস্কার আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অংশ। ঐতিহ্যকে মানা, মানে অতীতের ও বর্তমানের যা কিছু সর্ম্পকীয় তাকে যথাযথ মূল্যায়ন দেওয়া। আর মূল্যায়ন দেওয়ার উপরই নির্ভর করে সভ্যতার ধারাবাহিকতা।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT