ইতিহাস ও ঐতিহ্য

যে বুননশিল্প দেশের সীমানা ছাড়িয়ে

সৈয়দ আছলাম হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০১-২০১৮ ইং ০৩:০৯:৪৯ | সংবাদটি ১৬৩ বার পঠিত

হস্তশিল্প হিসেবে সিলেটের বুননশিল্প শীতলপাটি আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে বর্হিঃবিশ্বে সম্মানের সাথে নিজ গুণে স্থান করে নিয়েছে। গ্রাম্য মহিলাদের মনের মাধুরী মিশানো শিল্পকর্ম মুর্তা, বেত ইত্যাদির ছাল বা বাকল দিয়ে বিভিন্ন রঙের সাজে সাজানো পাটি, মুসলা, চাটি ইত্যাদি বিশ্বের সর্বোচ্ছ সম্মানের স্থান দখল করেছে। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে বিশ্বের নির্বস্তুক সংস্কৃতিক ঐতিহ্য ২০১৭ (দ্যা ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। গত ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে বুধবার দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে ইউনেস্কোর ‘ইনটেন-জিবল কালচারাল হেরিটেজ’ (আইসিএইচ) কমিটির ১২তম অধিবেশনে এ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। শীতলপাটি সম্পর্কে অনেকের ধারণা না থাকলেও বর্তমানে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বিশ্বের দরবারে এর কদর হাজার গুণ বেড়ে গেছে। এটি সিলেটের তথা বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প। (বৈজ্ঞানিক নাম ঝপযঁসধহহরধহঃযঁং ফরপযড়ঃড়সঁং) নামক গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের ছাল থেকে এ পাটি তৈরি হয়ে থাকে।
গ্রামের মহিলারা মেয়ের বিয়ের সময় দু’টি শীতলপাটি উপহার দেয়াকে একটি সম্মানজনক উপহার বলে মনে করে। তাই অনেকে নিজ বাড়িতে মেয়ের বিয়ের প্রস্তুতির ৪/৫ মাস পূর্ব থেকে পাটি তৈরির কাজে হাত দেন। অনেকে এক নাগালে পাটি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন আবার অনেকে অবসর সময়ের ফাঁকে ফাঁকে পাটি, নামাজের মুসল্লা, নিচে বসার জন্য চাটি ইত্যাদি তৈরি করতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। আবার অনেকে বিয়ের কথাবার্তা শুরু হওয়ার সাথে সাথে দুটি বা একটি নিজের পছন্দের পাটি প্রস্তুতকারীর সাথে দাম কষাকষি করে শীতলপাটি তৈরির অর্ডার দেন। এতে একদিকে যেমন গ্রহিতা তার চাহিদামতো ডিজাইনে শীতলপাটি তৈরির নিশ্চয়তা পেয়ে যান অন্যদিকে প্রস্তুতকারী তার পারিশ্রমিক বাবত অনেক টাকা পেয়ে থাকেন।
যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে শীতলপাটি তৈরি করেন তারা পারিবারিকভাবে বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনেকগুলো শীতলপাটি তৈরি করে কোনো কুটির শিল্প মেলায় বা নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়ে উপযুক্ত দামে বিক্রয় করে বেশ লাভবান হোন। অনেক ক্রেতা শখের মোহে এর দাম কম বেশি চিন্তা না করে সর্বোচ্চ দামেও কিনে নিয়ে পারিবারিক বিছানার সাজ সজ্জার সুন্দর পরিবেশ তৈরি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। এই শীতলপাটি জাতীয় পর্যায়ে সম্মানের আসন পেয়ে সিলেটকে এমনকি গোটা বাংলাদেশকে শিল্পকর্মের দিকে সুউচ্চ স্থান এনে দিয়েছে। এবার আমরা জেনে নিতে হবে এই সম্মান অর্জন করতে গিয়ে এর পেছনে কার কিভাবে চেষ্টা করে সম্মান অর্জনে সফল হয়েছেন।
২০১৬ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে ইউনেস্কোর ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিটির ফর দ্যা সেফগাডিং অব দ্যা ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ এর ১২তম অধিবেশনে বিশ্বের নির্বস্তুক সংস্কৃতি ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য প্রস্তাবনা উত্থাপন করে। এই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ২০১৩ সাল থেকে প্রক্রিয়া শুরু হয়। ধারাবাহিকভাবে ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি শীতলপাটি বুনন শিল্পকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। একই বছরের ৭ জানুয়ারি জাতীয় জাদুঘর থেকে শীতলপাটির ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরির লক্ষ্যে ‘জাতিতত্ত্ব বিভাগ’ একটি সভা করে। আবার ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ইউনেস্কোর ‘আইসিএইচ’এ বাংলাদেশের সংস্কৃতি উপাদান অন্তর্ভুক্ত শীর্ষক কমিটির (পিএমসি) নবম সভায় শীতলপাটিকে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। আবার ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি ‘আইসিএম’এ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উপাদান অন্তর্ভুক্তি শীর্ষক কর্মসূচি মনিটরিং কমিটির (পিএমসি) সভায় জাতীয় জাদুঘর থেকে শীতলপাটিকে অন্তর্ভুক্তকরণ প্রস্তাব করা হয় এবং এ প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ২৯ জানুয়ারি সিলেটের শীতলপাটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরির জন্য ইউনেস্কোর চেক পাওয়া যায়। এর স্কিপ তৈরির জন্য গবেষক মনোনয়ন ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের জন্য ওই বছরেরই (২০১৪) ৫ মার্চ থেকে সিলেটের মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ ভ্রমণ করে প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ এবং তা ৩০ মার্চ ‘আইসিএইচ’ এর জন্য (শীতলপাটির প্রথম ফাইল) পাঠানো হয়। পরে ওই বছরেরই ২৪ নভেম্বর ফাইল সংশোধনের জন্য তুলে নেয়া হয় এবং ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে সংশোধনপূর্বক ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বুনন শিল্প ফাইল পুনরায় পাঠানো হয়। সকল যল্পনা কল্পনার বাস্তব সফলতা হিসেবে আজ শীতলপাটি তার মূল্যায়ন পেতে সফল হয়েছে। অবশেষে ইউনেস্কোর ঐতিহ্যের তালিকায় সিলেটের শীতলপাটি স্থান করে নিয়েছে। এই সুনাম ধরে রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে শিল্পকর্মের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। দাতা সংস্থাকে ও সহযোগীদেরকে গ্রামীণ ঐতিহ্য এই শীতলপাটি, নকশী কাঁথাসহ অন্যান্য সকল হস্তশিল্পের কর্মীদের জীবনমান উন্নত করার জন্য পদক্ষেপ নিলে তাদের পরিশ্রম এর ফসল এর মান আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। আমরা এর বহুল প্রচার কামনা করি।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি সোনারগাঁও
  • হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা
  • স্বামী হত্যার বিচার পাননি সাহার বানু
  • বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মিয়ারচর
  • বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা
  • সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ
  • সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযোদ্ধা নজরুল এবং অন্যান্য
  • বানিয়াচং সাগরদিঘী
  • খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT