ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০১-২০১৮ ইং ০৩:১০:২৩ | সংবাদটি ৯৯ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
পার্বত্য বাঙালি বনাম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় জীবন :
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান এই তিন জাতি রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাসই এই উপমহাদেশে আরো আঞ্চলিক ও ক্ষুদ্র জাতি স্বাতন্ত্র্যের উৎসাহ ভিত্তি। সম্প্রদায়গত উত্তেজনার মুহূর্তে ১৯৪৭ সালে রেড ক্লিফ সাহেবের হাতেই অবাঙালি অমুসলিম অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। আর তখনই উত্থিত হয় স্থানীয় উপজাতীয় প্রতিবাদ, যার পরিণতি হলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ। এটা বাংলাদেশে ও বাঙালিদের বিরুদ্ধাচরণও বটে। এই বিরুদ্ধাচারণের উৎপত্তির মূল ক্ষেত্র হলো ১৮৬০ সালে উপজাতীয় অঞ্চল নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠন। অথচ তখন এটিকে বাঙালি প্রধান জেলায় পরিণত করা সম্ভব ছিল। তাতে বাংলাদেশকে আজ উপজাতীয় বিদ্রোহের মোকাবেলা করতে হতো না। সেই বিভক্তিকালে পার্বত্য অঞ্চলের সংলগ্ন ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও রামু উপজেলার পূর্বাঞ্চলকে নতুন জেলার সাথে সংযুক্ত করা হলে অথবা গোটা চট্টগ্রাম পূর্ব-পশ্চিমে অথবা কর্ণফুলী বা শঙ্খের সীমারেখায় বিভক্ত করা হলে, জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক ভারসাম্যের সৃষ্টি হতো। তাই বলা যায় আজকের জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও সংঘর্ষের কারণ ঐ অতীতের উপজাতি গরিষ্ট জেলাকরণ ও সুবিধাদান তথা বাঙালিদের বিপরীতে পাহাড়ীদের মেরুকরণ।
মূলত বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে বাংলাদেশ গঠিত। দেশের ৫০ হাজার বর্গমাইলের ওপর এই সত্য প্রযোজ্য। অবশিষ্ট ৫ হাজার বর্গমাইল হলো এর ব্যতিক্রম, যেখানে বাঙালিরা সংখ্যালঘু। উপজাতীয় অঞ্চলের আনুগত্য লাভ, এই বাঙালি রাষ্ট্রের পক্ষে প্রশ্নসাপেক্ষ। সংঘাত, সংঘর্ষ ও বিদ্রোহের দ্বারা এটা একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। ১৭২৪ সালে উপজাতীয় সামন্ত জালাল খান মোগল সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। ১৭৭৬-৮৬ আমলে চাকমা সর্দার শের দৌলৎ খান ও তদীয় পুত্র জান বখশ খান ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মলগ্নে চাকমা ও মগেরা ঐ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলো। ১৯৭২ সালে শিশু বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘটায়, যা ১৯৯৭ সালে চুক্তি ও আপোষ রফার মাধ্যমে অস্ত্রত্যাগ ও আত্মসমর্পণের ধারায় দমিত হয়। পূর্ববর্তী তিন বিদ্রোহ সামরিকভাবে দমানো হলেও বাংলাদেশ আমলের বিদ্রোহটি সামরিক জয়ের মাধ্যমে নির্মূল করা হয়নি।
দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় বিদ্রোহ একটি ধারাবাহিক আশঙ্কার বিষয়। তাদের আনুগত্যের ব্যাপার নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই। সুযোগ-সুবিধা ও উন্নয়নে এখন এই অঞ্চল বাংলাদেশের সমপর্যায়ভুক্ত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি উন্নত। শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই অঞ্চল এখন আর পশ্চাদপদ নয়। তবু ক্ষোভ-অসন্তোষের সুরাহা হচ্ছে না। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণই এখন উপজাতীয় নেতৃমহলের লক্ষ্য। আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, জাতীয় সংসদ, মন্ত্রীসভা পর্যন্ত পদ ও ক্ষমতা লাভ করেও তারা সন্তুষ্ট নন। আরো বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য উদ্দেশ্যই তাদের কাম্য বলে অনুমান করা যায়, যা বাংলাদেশ ভাঙা ও স্বতন্ত্র উপজাতীয় রাষ্ট্র গঠন ছাড়া সম্ভব নয়। ওই চুড়ান্ত পরিণতি থেকে বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে। সুতরাং উপজাতীয় বিদ্রোহ আর বিচ্ছিন্নতা থেকে বাঁচার জন্য জাতীয় নেতা শেখ মুজিবই সংবিধানে বাংলাদেশকে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে রূপদান করে, দীঘি-নালা ও রুমায় সেনা ঘাঁটি স্থাপনের আদেশ দিয়েছিলেন। তৎপর প্রেসিডেন্ট জিয়া ভূমিহীন বাঙালিদের আবাসন গড়ার আদেশ দেন, যাতে দুর্গম জঙ্গলাকীর্ণ ও জনবিরল পার্বত্য চট্টগ্রাম বিদ্রোহীদের অপতৎপরতা ও আত্মগোপন থেকে আবাদ হয়ে মুক্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের দূরদর্শিতা প্রদর্শনের প্রয়োজন ছিলো বিদ্রোহ ত্যাগ, আনুগত্য প্রদর্শন ও নিজেদের সংখ্যা প্রাধান্য রক্ষায় সরকারকে উদ্বুদ্ধ করা। বিপরীতে সংঘাত ও বিদ্রোহ জোরদারই হয়েছে। সুতরাং উপজাতিদের সংখ্যাগতভাবে দুর্বল করার লক্ষ্য অর্জনে বাঙালি বসতি স্থাপন ছাড়া সরকারের হাতে আর কোন বিকল্প ছিল না। অতএব বলা যায়, উপজাতীয় বিদ্রোহেরই ফল বাঙালি বসতি স্থাপন। এই বাঙালিদের প্রতিষ্ঠিত করার মাঝেই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য উপজাতীয় বিদ্রোহের প্রতিকার নিহিত। এটা উপজাতি দমন নয়, দেশ রক্ষা ব্যবস্থা।
এখন সরকারের নীতি হওয়া উচিত উপজাতিদের সুযোগ-সুবিধা দান ও পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন এবং বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদেরও পূর্ণ নাগরিক সুবিধা মঞ্জুর। পাহাড়ি-বাঙালি উভয়ে মিলে এক জাতি, এই অনুভূতিতে এগিয়ে যেতে হবে। কারো প্রতি বৈষম্য আর অবিচার আরোপনীয় নয়। পার্বত্য চুক্তি সংবিধানের আওতাভুক্ত বলে ঘোষিত হওয়ায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। অনুরূপ ত্রুটিগুলোর সংশোধন করা জরুরি। [চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • জাফলং নামকরণের ইতিকথা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • জলপ্রপাতের নাম হামহাম
  • কেমুসাসের কাচঘেরা বাক্সে মোগল স¤্রাটের হাতে লেখা কুরআন
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বরইতলা গণহত্যা সম্পর্কে আজিজুল হক
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম জলঢুপ
  • বাংলাদেশের বয়ন ঐতিহ্য
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ইতিহাস গবেষক দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী
  • লৌকিক শিল্প নকশি পিঠা
  • জেনারেলের বাড়িতে গণহত্যা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • হত্যাকারির নাম বলা যাবে না
  •  প্রযুক্তির অপব্যবহারে বিপন্ন নারী-শিশু ও যুবসমাজ
  • মুক্তিযুদ্ধে লাউয়াই
  • সুবিধাবাদীদের পরিণতি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঝরনা কলম : আজ বিলুপ্তপ্রায়
  • মুক্তিযুদ্ধে পুণ্যভূমি সিলেটের সূর্যসন্তানরা
  • Developed by: Sparkle IT