ইতিহাস ও ঐতিহ্য

লোক সংস্কৃতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০১-২০১৮ ইং ০৩:১০:৫২ | সংবাদটি ২৫৩ বার পঠিত


সংস্কৃতি প্রবাহমান নদীর মত-এর রূপান্তর আছে, মৃত্যু নেই। মানুষের জীবনচর্চা ও চর্চার বৈচিত্র্যময় সমন্বিত রূপই সংস্কৃতি। দেশাচার, লোকপ্রথা, প্রচলিত বিধি ব্যবস্থা যা মানুষ পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে দেখে ও শুনে লাভ করে তাই লোক সংস্কৃতির সম্পদ। অর্থাৎ লোক সংস্কৃতি প্রধানত; ঐতিহ্য নির্ভর। পৈত্রিক সম্পত্তির মতো এগুলো বিনা দ্বিধায়, বিনা বিচারে তা মানুষ গ্রহণ করে ও পালন করে। গভীর অনুধাবন, অনুসন্ধান ও অনুশীলন নেই বলেই লোক ভাবনার দ্বারা নতুন উদ্ভাবন সম্ভব হয়না। সামাজিক মানুষের জীবন পদ্ধতি ধারাবাহিক ঐতিহ্য, প্রজন্ম পরম্পরা, আচার-বিশ্বাস, ভুয়োদর্শন, চিন্তা-চেতনা, নীতি নৈতিকতা এসবই সংস্কৃতির মূল উপকরণ। সংস্কৃতির পরিধি বিশাল ও ব্যাপক। তাই নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা সূত্রে একে সীমাবদ্ধ করা চলে না।
সংস্কৃতির ধারক ও বাহক পল্লীগ্রাম। অন্যদিকে শহরের বাসিন্দারা অধিকাংশই ভাসমান জনতা। আজ এখানে, কাল ওখানে। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরির উদ্দেশ্যে মানুষের শহরে সমাবেশ। এ থেকেই শহরের পত্তন ও প্রসার। তাতে নিত্য-নতুন লোকের আমদানি। এদের মধ্যে প্রতিবেশির গড়ে ওঠার সময়ই হয়না। শহরের বুনিয়াদী বাসিন্দাদের মধ্যে মহল্লায় মহল্লায় যে একটা প্রতিবেশিত্ব চালু ছিল তাও ভেঙে যাচ্ছে। শহরের উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি ও পুননির্মাণের বন্যায়  ওসঢ়ৎড়াবসবহঃ ঃৎঁংঃ-এর থ্রাস্ট (ঞযঁৎংঃ) বা ধাক্কায় ঐসব যে কোথায় ভেসে যাচ্ছে, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। পক্ষান্তরে পাড়াগাঁয়ে এ প্রতিবেশিত্ব স্বাভাবিক। সেখানে এক বাড়িতে একজনের অসুখ হলে সারা গ্রাম রটে যায়। শহরে পাশের বাড়িতে লোক মরে গেলেও কেউ খবর রাখে না। শহরের জনতার পরিবর্তন ঘটছে প্রতিদিন, প্রতি ঘন্টায়, প্রতি মিনিটে। পল্লীর লোক দাদা-পরদাদার আমল থেকে চৌদ্দ পুরুষ ধরে একই ধরনে একই জায়গায় বসবাস করছে। এ কারণেই পল্লীগ্রামের লোকদের মধ্যে সুখে-দুঃখে, হাসি-কান্নায় একটা আন্তরিক সমবেদনা ও আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। এ আত্মীয়তা তাদের আনন্দ উল্লাসে, আমোদ-প্রমোদে, শোক-মাতমে, অভাব অনটনে, আচার-ব্যবহারে, পোশাক-পরিচ্ছদে, চিন্তা-ভাবনায়, প্রথায়, সংস্কারে কাহিনী কিংবদন্তিতে। আর এটাই হচ্ছে সামাজিক আচারের সমাবেশ ও সমষ্টি যা জাতির সংস্কৃতি। পল্লী জীবনের এ ইউনিফর্মিটিই হচ্ছে সংস্কৃতির বুনিয়াদ। এ জন্যই সংস্কৃতি মূলত এবং প্রধানত পল্লীর সম্পদ। পল্লী জীবনই সে সম্পদের ধারক ও রক্ষক। মন ও মস্তিষ্ক মানুষকে অন্যান্য জীবজন্তু হতে পৃথক করেছে। সে মনের বিকাশের নাম সংস্কৃতি আর মস্তিষ্কের বিকাশের নাম সভ্যতা। জ.গ গধপষাবৎ বলেন, ঈঁষঃঁৎব রং যিধঃ বি ধৎব ধহফ পরারষরুধঃরড়হ রং যিধশ বি যধাব সভ্যতা হচ্ছে ইমারত আর সংস্কৃতি হচ্ছে গাছ। ইমারত মাটি হতে রস গ্রহণ করে না। কাজেই যে কোন সরঞ্জামের যে কোন প্ল্যানের ইমারত যে কোন দেশে নির্মিত হতে পারে। কিন্তু গাছকে মাটি হতে রস সংগ্রহ করে বাঁচতে হয়। কাজেই যে কোন গাছ দুনিয়ার যে কোনো দেশে লাগানো যায় না। মাটি থেকে রস সংগ্রহের উপযোগী না হলে চারা লাগালেও বাঁচে না। সংস্কৃতি সম্বন্ধেও বলা যায়, যে কোন দেশের সংস্কৃতি তা যতই সুন্দর হোক না কেন, অন্য যে কোনো দেশে তা চালানো যাবে না। স্থানীয় রসের অভাবে তা মারা যাবে। কারণ সংস্কৃতি মনের বস্তু, মস্তিষ্কের বস্তু নয়। এ দিক হতে বিচার করে বলা যায়, সভ্যতা (ঈরারষরুধঃরড়হ) একটি জধঃরড়হধষ ঈড়হংঃৎঁপঃরড়হ আর সংস্কৃতি একটি ঊসড়ঃরড়হধষ এৎড়ঃিয.
কোনো জাতির সংস্কৃতি ভুঁইফোড়ের মত অকস্মাৎ গজিয়ে ওঠেনা। জাতীয় জীবনের দীর্ঘ সাধনা ও সংস্কৃতির প্রবাহ ও সংরক্ষণ দ্বারা এর স্বতন্ত্র রূপ গড়ে ওঠে। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এ নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। জাতির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা লাভের সূচনা থেকে এদেশের নির্দিষ্ট পরিবেষ্টনে পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে যুগে যুগে স্তর পরম্পারায় জীবনধারার অনুবর্তন-বিবর্তন দ্বারা আপন মানসিকতার আদর্শে একটি অনন্য সাদৃশ্য অখন্ড রূপ পরিগ্রহ করেছে। আমাদের অগণিত লোক সংস্কৃতি রয়েছে। আমাদের লোক সংস্কৃতিগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নি¤েœ উপস্থাপন করা হল ঃ-
(ক) লোকচিত্র ঃ (১) নকশি কাঁথা ঃ নকশি কাঁথা বাংলার নিজস্ব শিল্প সম্পদ। গ্রামের মেয়েরা এর রূপকার। পুরাতন পরিধেয় বস্ত্রের প্রয়োজনীয় মাপের কয়েক ফালি সাজিয়ে কাঁথার ‘জমিন’ তৈরী করা হয়। শাড়ির পাড়ের সুতা বা তাঁতির সুতা চার-পাঁচ লরি একত্রে পাকিয়ে সেলাই করা হয়। নকশার কাজে সুতার এক একটি ফোঁড়ই মূল শক্তি। কাঁথার জমিনে প্রয়োজনীয় দূরত্বে ছোট-বড় ফোঁড়ের কৌশল বিন্যাসে অভীষ্ট ছবি বা নকশা তোলা হয়। বাংলা একাডেমীর লোকশিল্প সংগ্রহে ১০ রকমের কাঁথার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-শয্যাবরণী, গাত্রাবরণী, বালিশের আবরণী, জায়নামাজ ও আসন, খাওয়ার জন্য দস্তরখানা, আয়না চিরুনী ও পানসুপারী রাখার জন্য, বই ও তৈজসপত্র রাখার জন্য, ফকিরের ভিক্ষার ঝুলি, কোরআন শরীফ রাখার ঝোলা।
(২) নকশি পাখা ঃ ফুল, পাতা, গাছ, লতা, চাঁদ, তারা, পাখি, মানুষ, হাতি প্রভৃতি সুতার তৈরী, বাঁশের তৈরী, নকশি পাখায় বেতের তৈরী-লেখা থাকে ভালোবাসার কথা।
(৩) নকশি পাটি ঃ নল, বেত, বাঁশ দিয়ে এ পাটি তৈরী হয়। আঁকা হয় বিভিন্ন ছবি। কবি জসীম উদ্দিন কামরাঙ্গা পাটিতে বরের আসনপাতা সম্পর্কে লিখেছেন “আসুক আসুক বেটির দামান/কিছুর চিন্তা নাইরে/আমার দরজায় বিছাইয়া থুইছি/কামরাঙ্গা পাটিনা রে”।
(৪) নকশি শিকা ঃ সুতা ও পাট দিয়ে হাঁড়ি, কৌটা, বাটা ও খাদ্যদ্রব্য প্রভৃতি শিকায় তুলে রাখা হয়। দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন “বাংলার নানা স্থানে শিকার মধ্যে শুধু ফল, লতা, পল্লব, নহে, রাধা কৃষ্ণ ও অপর দেব-দেবীর মূর্তি সূতা দিয়ে নির্মিত হয়।”
(৫) নকশি পিঠা ঃ আতপ চালের আটার সাথে তালের রস মিশিয়ে তাল পিঠা, গুড় মিশিয়ে গুড় পিঠা, নারকেল মিশিয়ে পুলি পিঠা হয়। তেলে ভেজে হয় তেলই পিঠা, আগুনে সেঁকে হয় চিতই পিঠা।
(৬) নকশি ছাঁচ ঃ মাটি, পাথর বা কাঠ দিয়ে তৈরী করা হয়। এই ছাঁচে মিঠাই ক্ষীর, আমসত্ত্ব, গুড়ের পাটালি প্রভৃতি নির্মিত হয়। দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন “নানাজাতি পিঠা করে গন্ধে আমোদিত/চন্দ্রপুলি করে কন্যা চন্দ্রের আকিরত।”
(৭) নকশি পুতুল ঃ হাতের সাহায্যে মাটির পুতুল তৈরী করা হয়। রঙ দিয়ে বিন্যাস করা হয়। কাপড়ের পুতুল তৈরী করা হয়।
(৮) নকশি দরজা ঃ ঘরের পার্টিশন হিসেবে পাকা বাঁশ খোদাই করে অথবা কাঁচা বাঁশ মোচড় দিয়ে দরজার গায়ে ফুল, লতা-পাতা, পাখি ডিজাইন করা হয়। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জে নকশি দরজা প্রচলিত ছিল।
(৯) আল্পনা ঃ রঙ লেখার লেপন দিয়ে আল্পনা আঁকা হয়। হিন্দু ও মুসলমান সমাজে প্রচলিত কালি কলম, হাতের আঙুল দিয়ে ঘরের খুঁটি, মেঝে, দুয়ার, দেয়াল, বারান্দা, আঙিনা, পূজার বেদী, পিঁড়ি, কুলা, সরা, হাড়ি, কলস, ঝাঁপি ইত্যাদি স্থানে ও পাত্রে আল্পনা আঁকা হয়।
(১০) চিত্র ও নকশা ঃ বিভিন্ন পটচিত্র, রেখাচিত্র, মুখোশচিত্র, দারুচিত্র, অঙ্গচিত্র, কনে চন্দন, খোঁপা, উল্কি প্রভৃতি চিত্র নকশা করে সৌন্দর্য বর্ধন করার চেষ্টা করা হয়।
(খ) লোকনৃত্য ঃ- উদ্ভাবন ও উদযাপনের বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করে বাংলায় প্রচলিত লোক নৃত্যগুলোকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন (১) ধর্মীয়-জারিগান, ফকির নাচ, কীর্তন নাচ, চেলা নাচ, বাউল নাচ, (২) সামাজিক-ঢালিন নাচ, লাঠি নাচ, রায় বেঁশে নাচ। (৩) আনুষ্ঠানিক-ঘাটু নাচ, খেমটা নাচ, সারি নাচ, বালি নাচ, ফকিরের নাচের কথা-“চল যাই ভান্ডারে/দেখিব মাওলারে/পুরা মনের বাসনা/ও ভাই/বসি বসি হয়না জিগির/লাফদি ফালদি কর জিগির/চায়নি খোদা রাজি হয়।” লোক বাদ্যযন্ত্র-ভারতীয় সঙ্গীত শাস্ত্রে চার শ্রেণির বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ আছে যেমন (১) তত ঃ তারযোগে নির্মিত বাদ্যযন্ত্র-একতারা, দোতারা, বীনা, সেতারা, সারেঙ্গী। (২) শুষির ঃ ফুঁ দিয়ে যে বাদ্য জানানো হয়-বাঁশি, শঙ্খ, সানাই, শিঙ্গা ইত্যাদি। (৩) ঘন ঃ ধাতু নির্মিত বাদ্যযন্ত্র-আঘাত দিয়ে বাজানো হয়। যেমন-কাঁসর, করতাল, মন্দিরা, ঘন্টা ইত্যাদি। (৪) আনদ্ধ ঃ চর্মাচ্ছাদিত বাদ্যযন্ত্র, আঘাত দিয়ে বাজানো হয়। যেমন-ঢাক, ঢোল, খোল-মাদ, খঞ্জরী, ডুগডুগি ইত্যাদি।
(গ) লোকচার ঃ সন্তান কামনায় বা বন্ধ্যা নারীর সন্তান কামনায় ‘সাইটোর’ অনুষ্ঠান হয়। রংপুর জেলার এটা আঞ্চলিক নাম। গ্রামের মেয়েরা এ উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক গীত গায়। নবজাতকের নিরাপত্তায় ‘আঁতুড়বন্ধন; শিশুর চলৎশক্তির আশায় ‘গড়গড়া’ এসব আচারের কোন বস্তুমূল্য নেই, মানসিক স্বস্তি ছাড়া। শিশুর নামকরণ, বিবাহ, জলকাউরিরমা, বেরা ভাসানো, ত্যাপথের ছেকা, বাড়িবন্ধন, চোরারুটি, খঞ্জনবাহন ইত্যাদি লোকাচার বাঙালিরা পালন করে থাকে।
(ঘ) চাষাবাদ ও ফসল ঃ কোদাল, কাস্তে, নিড়ানি, মই, জোয়াল প্রভৃতি চাষাবাদের যন্ত্রপাতি। একখানা লাঙ্গল ও এক জোড়া বলদ কৃষকের প্রধান সম্বল। বাঙালিরা বৃষ্টির দেবতাকে মেঘরাণী হিসেবে কল্পনা করে। মেঘরাণীকে সম্বোধন করে ছড়া, গান, মন্ত্র প্রচলন করা হয়েছে বৃষ্টির প্রত্যাশায়। স্থান বিশেষ মানিক পীরের জারি গেয়ে কৃষকরা বর্ষাকে আহবান করে। বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করে “চৈত্রেতে খর খর/বৈশাখে ঝড় পাথর/জ্যৈষ্ঠেতে তারা ফুটে/তবে জানবে বর্ষা বটে।” অথবা “শনির সাত মঙ্গলের তিন/আর সব দিন দিন/ভাদুরে মেঘ বিপরীত কয়/সেদিন বৃষ্টি কে ঘোচায়।” বৃষ্টি আহবান মন্ত্র “আয় বৃষ্টি ভাসাইয়া দে/মাটির পোম জাগাইয়া দে/প্রতিটি ফোঁটার সমান।”
(ঙ) গবাদিপশু ঃ গরু হচ্ছে বাঙালি কৃষকের ঘরে ‘লক্ষ্মীস্বরূপ’। অঞ্চলভেদে গরু খরিদ করে আনলে এর বরণের রীতিও ভিন্ন হয়। ময়মনসিংহে ধান-দূর্বা দিয়ে পানি ছিটিয়ে নতুন গরু বরণ করা হয়। উত্তরবঙ্গে গরুর চার পায়ে গৃহকর্তা পানি ঢেলে দেয়। নোয়াখালীতে সোনা-রূপার ছোয়ানো পানি আমের কচি পাতার সাহায্যে গরুর গায়ে ছিটিয়ে দেয়া হতো। এতে গরুর ‘পূর্বদোষ’ দূর হয়। চৈত্র মাসে গ্রামের হাটে ‘বারুণী মেলা’ বসলে কিশোর রাখাল ছেলেরা দলবেঁধে পথের ধারে গামছা পেতে গোরক্ষকের নামে শিরনি প্রার্থনা করে। একে ‘গোরক্ষকের লাই পাতা’ বলে। এ উপলক্ষে মাগনের ছড়া বলা হয়-“অক্ষি লো মেনাগাই/গোরক্ষের নামে সিন্নী চাই/গোরক্ষের লাই/গোরক্ষের লাই/এক কড়া হইলে আমরা গোরক্ষেরে বুঝাই/হাটো যাও হাটুল্ল্যা ভাই পথে সারি সারি/গোরক্ষের লাগি কিইন্যা আইনো অগ্নিপাটের শাড়ি/আমরা যে রাখাল ভাই আমরা কিছু পাই/চালিয়া চল্লিশ বাড়ি গোরেক্ষেরে বুঝাই।”
(চ) লৌকিক পীরবাদ ঃ পীরের উদ্দেশ্যে শিরনি ও দরগায় বাতি দেয়া এবং পীরের নাম জপ করা, পীরের অলৌকিক বর্ণনা, পীরদের দেবাত্মা ভাবা, রোগশোকে পীড়িত ও অভাব-অনটনে জর্জরিত, লোক সমাজে পীরের সেবা, সাহায্য, অনুগ্রহ নিত্য কাম্য ছিল। পীর সম্পর্কে বলা হয়-“সেই ম্লেচ্ছ মধ্যে এক পরম গম্ভীর/কালবস্ত্র পরে সেই লোকে কহে পীর।” ব্যক্তিত্ব ও অস্তিত্বের দিক দিয়ে পীর দেরকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন (১) ঐতিহাসিক-বদরপীর, সাদারপীর, গাজীপীর, (২) পৌরাণিক-খোয়াজ খিজির, হাওয়া বিবি, এনাথ পীর, (৩) লৌকিক-সত্যপীর, মানিকপীর, সোনাপীর, বনবিবি, জঙ্গলীপীর, মনাইপীর, ঠানুকাপীর, কাউয়াপীর, নোরাপীর, ঘোড়াপীর।
(ছ) লোক বিশ্বাস ও লোক সংস্কার ঃ শুভাশুভ চিহ্ন-সাধারণত যাত্রা কালে এবং কোন শুভ কাজ করার সময় শুভাশুভ বিচার করা হয়। কতগুলো ঘটনা কুলক্ষণযুক্ত-সেসব দেখা ও শোনা অশুভ সূচক। মানুষ এগুলো এড়িয়ে চলতে চায়। শুভ বস্তু হিসাবে ধান, দূর্বা, কুলা, শাখা, সিঁদুর প্রভৃতি গণ্য করা হয়। ধর্মাচার পালনে ও সামাজিক শুভ কাজে এগুলো ব্যবহার করা হয়। অশুভ হিসাবে কাক, কংক, গৃধœ, বন-কুক্কুট, রক্তপাদ, বনকপোত প্রভৃতি পাখির মাথার ওপর পতন অথবা গৃহে প্রবেশ, পেঁচার ডাক, অকালে ফুল-ফলের জন্ম ইত্যাদি।
(জ) জীবন প্রতীক ঃ রূপকথার রাজকুমার পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে রাক্ষুসপুরী রাজ প্রাসাদে মৃতবৎ রাজকন্যাকে দেখল। ‘সোনার কাঠি’ ছোঁয়ালে সে জেগে ওঠে, ‘রূপার কাঠি’ ছোঁয়ালে সে মৃতবৎ পড়ে থাকে। রাক্ষস প্রধানের কাছে রাজকন্যা জানতে পারে সমস্ত রাক্ষসের জীবন আছে জীবন্ত ভ্রমরের মধ্যে। পুকুরের তলায় কুয়ার নিচে সোনার কৌটায় সে ভ্রমর আছে। রাজকুমার ভ্রমর হত্যা করে রাক্ষসদের নিধন করে এবং রাজকন্যাকে উদ্ধার করে স্বদেশে ফিরে আসে।
(ঝ) লোকিক খেলাধূলা ঃ রাজার কোটাল, চোর চোর, মোগল-পাঠান প্রভৃতি গ্রাম্য খেলার মধ্যে জীবনের ছবি আবিষ্কার করা যায়। কানামাছি খেলা, বানর খেলা, তাস খেলা, কুস্তি, লড়াই খেলা, তালুক খেলা, তরবারি খেলা, বাজি খেলা।
(ঞ) অন্যান্য ঃ এছাড়াও লোক সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে লোক স্থাপত্য ও লোক ভাস্কর্য, যা বাংলার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে যুগ যুগ ধরে বাংলার ইতিহাসকে সৌন্দর্যমন্ডিত ও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
সংস্কৃতি সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পন স্বরূপ। প্রতিটি সমাজ ও রাষ্ট্রের নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে। এ সংস্কৃতিই বিশ্বের দরবারে একটি জাতির গৌরব-অগৌরবের জানান দেয়। কোন দেশের সংস্কৃতির দিকে তাকালেই সে দেশের চেহারা উপলব্ধি করা সম্ভব। সুজলা-সুফলা-শস্য শ্যামলা সোনার বাংলাদেশে লোক সংস্কৃতির ঐতিহ্যের কোন কমতি নেই। বাংলার এসব লোক সংস্কৃতির ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। কালের পরিক্রমায় ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে বর্তমান রূপ পেয়েছে আমাদের লোক সংস্কৃতি। সময়ের পরিক্রমায় অনেক গ্রহণ, বর্জন, পরিবর্তন পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। আবার হারিয়ে গেছে অনেক অনেক উপাদান। পরিশেষে সঙ্গীত জগতের কিংবদন্তী আব্বাস উদ্দিনের কৃতি সন্তান খ্যাতনামা সঙ্গীত শিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসীর ভাষায় বলা যায় “বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র হলেও ভাবসম্পদে কিন্তু স¤্রাট। বাংলাদেশ লোক সংস্কৃতিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বিশ্বের সমৃদ্ধতম লোক সংস্কৃতির ৮টি দেশের অন্যতম।”

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি সোনারগাঁও
  • হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা
  • স্বামী হত্যার বিচার পাননি সাহার বানু
  • বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মিয়ারচর
  • বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা
  • সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ
  • সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযোদ্ধা নজরুল এবং অন্যান্য
  • বানিয়াচং সাগরদিঘী
  • খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT