শিশু মেলা

খড়ের মালা

মোঃ ইব্রাহিম খান প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০২-২০১৮ ইং ০০:০৫:১৩ | সংবাদটি ১৬৬ বার পঠিত

শীতের সকাল। মফিজ স্যার সবজি বাগানে কাজ করছেন। কাজ রেখে তিনি চোখ তুলে তাকালেন। তাকানোর ভাব দেখে দুই বন্ধুর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কারো মুখে কথা নেই। অনেক কষ্ট করেও তারা কোনো কথা বের করতে পারছে না। মফিজ স্যার দুই ছাত্রের অবস্থা আঁচ করতে পারলেন। তিনি গলা নরম করে জিজ্ঞেস করলেন, কী হে এত সকালে কী চাস?
আলম আমতা আমতা করে বলল, স্যার টিপু টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করে ফেলেছে।
মফিজ স্যার আলমের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কড়া গলায় বললেন, ফেলতো করবেই। টেবিলে সুন্দর করে বইখাতা সাজিয়ে রেখে সারাদিন মোবাইল ফোন টিপাটিপি। পরীক্ষায় পাস করতে হলে ভালোভাবে লেখাপড়া করতে হয়। আলম স্যারের কথাকে মাথা ঝাঁকিয়ে সমর্থন করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘স্যার আপনি যদি হেড স্যারকে একটু বলতেন, তাহলে সে আমাদের সাথে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারত। তার একটা বছর নষ্ট হত না।
এক বছর নয়। বার বছর নষ্ট করেও কেউ এসএসসি পাস করতে পারবে না। যদি সঠিকভাবে লেখাপড়া না করে।
মফিজ স্যারের গলায় রাগের সুর বাজল।
স্যার আপনি যদি একবার ওকে সুযোগ করে দিতেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস টিপু চেষ্টা করলে অবশ্যই পাস করে ফেলবে। আলম অনুনয়ের সুরে আবার স্যারকে বলল।
মফিজ স্যার আলমকে ধমক দিয়ে বললেন, পাশ করে ফেলবে। বললেই হল! যে ছাত্র টেস্ট পরীক্ষায় গণিতে একুশ পায়, বিজ্ঞানে বি পায়, সে পাস করবে এসএসসি? টিপু হল তোমাদের ক্লাসের একটা গাধা। আসল গাধা। তুমি অহেতুক গাধার পিছু পিছু ছুটছ। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। এ প্লাস পাওয়ার জন্যে নিজেকে তৈরি কর। হাত থেকে গাধার দড়ি ছুড়ে ফেল।
টিপু অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় তার সুন্দর ফর্সা গোলগাল মুখটা আঁধারে ছেয়ে গেছে। তার খুব কান্না করতে ইচ্ছে করছে। টিপুর এমন হতাশ ভাব দেখে আলমের বন্ধুসুলভ মনটা একটা কষ্টের ধাক্কা খায়। আলম মফিজ স্যারের আরও কাছে গিয়ে অনুরোধের সুরে বলে, স্যার আপনার কথা হেড স্যার এবং বিএসসি সার মানবেন। আপনি দয়া করে বললেই কাজ হবে।
মফিজ স্যার আলমকে খুব আদর করেন। সে সব পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করে। আগামী এসএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পাবে। এমন দৃঢ় বিশ্বাস মফিজ স্যারের। বন্ধুত্বের টানে যে গাধাটার জন্যে বারবার সুপারিশ করছে।
মফিজ স্যারের মনের ভেতর একটা চিরচেনা মায়া খেলে যায়। চিরন্তন নিঃস্বার্থ এ দয়ামায়ার জন্যে স্যার সমাজে এখনও সম্মানের সর্বোচ্চ স্থান দখল করে আছেন। গুরু শিষ্যের নির্লোভ ভক্তি শ্রদ্ধার রীতি আজও সবকিছুর উর্ধ্বে বলে স্যার বিশ্বাস করেন। শিক্ষক শিক্ষার্থীর নির্ভেজাল সম্পর্কের শ্বাশত বন্ধন তিনি আঁকড়ে ধরে আছেন। তিনি কলমি হাই-স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের দুঃখ দুর্দশা ও সমস্যা সমাধানে সবার আগে এগিয়ে আসেন। টিপুর বিশ একুশ নম্বর পাওয়ার ব্যাপারটা স্যারকে একটু ভাবায়।
মফিজ স্যার মুখে গাম্ভীর্য ভাব নিয়ে বললেন, শুন আলম। শুধু তোমার জন্যে আমি হেড মাস্টার সাহেবকে অনুরোধ করব। তবে জেনে রাখ তার মত অংক বিজ্ঞানের গাধা ছাত্ররা এসএসসি পাস করতে পারে না। আলম বুঝতে পারে মফিজ স্যারের গরম জায়গায় বরফ গলতে শুরু হয়েছে। সে খুশিতে গদগদ করে স্যারকে আশ্বস্ত সুরে বলল, টিপু নিশ্চয় পাস করবে স্যার।
মফিজ স্যার মুখ ভেংচিয়ে টিপুর দিকে তাকিয়ে বললেন, এ্যাই গাধা শুন। তুই যদি পাস করতে পারিস তবে আমি খড়ের মালা গলায় পরে সারা স্কুল ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়াব। পাস করে আমার জন্যে একটা খড়ের মালা বানিয়ে নিয়ে আসিস। টিপুর চোখ হতে কয়েক ফোটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। সে মুখ খোলে কোন কথা বলতে পারল না। মফিজ স্যার সততা, নিষ্ঠা ও নৈতিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর দয়ায় এবং আন্তরিকতায় অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর জীবন আলোর মুখ দেখেছে।
টিপু পড়ার ঘরে নিরবে বসা। তার কানের কাছে খড়ের মালা বানানোর খচখচ শব্দ বাজছে। চোখের সামনে মফিজ স্যার খড়ের মালা পরে হাসি মুখে স্কুল চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। টিপু গণিত, বিজ্ঞান বই হাতে নেয়। বই দুটো বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে বলে, আমি মফিজ স্যারের গলায় মালা পরাবই। এ আমার জীবনমরণ প্রতিজ্ঞা। টিপু দিন রাত পড়ছে। শুধু পড়ছে। বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা ফাড্ডা, খেলাধুলা সবকিছু বন্ধ। সকালে, দুপুরে, রাতের প্রথম প্রহরে এবং শেষ প্রহরে টেবিল চেয়ারের সাথে লেগে আছে। টিপু এখন গভীর জ্ঞান সাধনার সাগরের সাধু পুুরুষ।
বিকেলে গাঁয়ের মেঠো পথ দিয়ে মুক্ত মাঠে আলমের সাথে কিছু সময় হাঁটে। হাঁটতে গিয়েও সে আলমের সাথে গণিত এবং ইংরেজির জটিল সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে। আলমের নিকট থেকে টিপু অনেক কিছু শিখে নেয়। আলমও তাকে আগ্রহের সাথে শেখানোর চেষ্টা করে। আজ এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে। কলমি হাই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মন অশান্ত, অস্থির। কার ভাগ্যে কী ঘটে। দলবেধে ফল প্রত্যাশীরা স্কুলের চারপাশে ঘুরাফেরা করছে। নির্দিষ্ট সময়ে কলমি হাই স্কুলের হেড স্যার হ্যান্ড মাইকে ফল ঘোষণা করলেন। ভাল ফলাফল হওয়ায় পরীক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। স্কুলের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহা খুশি। স্কুল ক্যাম্পাসে বয়ে যাচ্ছে আনন্দের বন্যা। স্কুলের স্যারদের সালাম কদমবুচি আর মিষ্টি মুখ চলছে। এমন খুশির জোয়ারে টিপু নেই। তাকে কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। টিপু পাস করল। শুধু পাস নয়। সে এ প্লাস পেয়েছে।
হঠাৎ টিপু পেছন হতে আলমের কাঁধে হাত রাখল। আলম চমকে ওঠে। টিপু আলমের দিকে তাকিয়ে বলল, চল দোস্ত মফিজ স্যারের কাছে যাই। আলম কোনো কথা না বলে টিপুর হাত ধরে হাঁটতে থাকে। মফিজ স্যার একা একটা চেয়ারে বসে আছেন। টিপু আলম স্যারের সামনে দাঁড়ায়। মফিজ স্যারের মুখের সামনে ধরা দৈনিক পত্রিকাটি সরান।
টিপু হাসিমুখে বলে, স্যার আপনি বলেছিলেন আমি পাস করলে খড়ের মালা বানিয়ে আনতে। আপনি খড়ের মালা পরে সারা স্কুল ঘুরে বেড়াবেন। মফিজ স্যার আলমের কথা শুনে এবং তার হাতে ধরা থলে দেখে ভরকে যান। টিপু কি সত্যি সত্যি তার জন্যে খড়ের মালা বানিয়ে নিয়ে এসেছে। এখন কি এ মালা পরে তাকে স্কুল চত্ত্বরে চক্কর দিতে হবে। হতভম্ব মফিজ স্যার টিপুর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকান।
মুহূর্তের মধ্যে টপু তার হাতের থলে হতে একটা প্রাকৃতিক ফুলের মালা বের করে। চেয়ারে বসা মফিজ স্যারের গলায় সে নিজ হাতে মালা পরিয়ে দেয়। ফুলের গন্ধে আর সৌন্দর্যে মুগ্ধ স্যারের মনের বিস্ময় ভাব কিছুটা দূর হয়। স্যারের চোখ মুখ আনন্দে ভরে ওঠে। টিপু স্যারের পা জড়িয়ে ধরে। সে শিশুর মত হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। কান্নার ফাঁকে বলতে থাকে, স্যার আপনার এমন জেদি কথায় আমার পক্ষে এসএসসি পাস সম্ভব হয়েছে। স্যার আপনি খড়ের বেণীর মাথায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। আর আমি খড়ের বেণীর মত তিন মাস জ্বলেছি।
মফিজ স্যার টিপুকে তার পা হতে টেনে তুলে আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কোমলমনা মফিজ স্যারের চোখ হতে পানি ঝরে পড়ছে। চোখ মুছতে মুছতে স্যার বললেন, পাগল ছেলে। রাগের মাথায় কখন তুকে কী বলেছি তা কী আমার মনে আছে। তুই কস্ট করে লেখাপড়া করে এ প্লাস পেয়েছিস। তোর এমন কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্যে আমরা গর্বিত।
টিপু স্যারের ¯েœহের আলিঙ্গন হতে নিজেকে ছাড়িয়ে শান্ত হয়ে বলে, স্যার আপনার কথায় আমার অন্তরে তুষের আগুন জ্বলতে থাকে। মফিজ স্যার স্বাভাবিক হয়ে বলেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মনের ভেতরে একটা চাপা ফায়ার আছে। এ ফায়ারে জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি ছুড়ে মারা হল শিক্ষকের কাজ। কাঠি জায়গা মত পড়লে সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। আমার মতে এ আগুনই হল প্রতিভা। আর জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি হল প্রেরণা। আমি ছাত্র-ছাত্রীদের বকাঝকা করি। শাস্তি দেই। তিরস্কার করি। আজকাল এসব অন্যায় তবু পুরনো অভ্যাস অনুযায়ী করে ফেলি। কথা শেষ করে মফিজ স্যার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হা-হা-হা করে হাসতে থাকেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT